বিশ্ব সুন্দরী খেতাব পেয়েও নায়িকা নয় হলেন চিকিৎসক

ঢাকা, বুধবার   ০৮ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৬ ১৪২৬,   ১৫ শা'বান ১৪৪১

Akash

বিশ্ব সুন্দরী খেতাব পেয়েও নায়িকা নয় হলেন চিকিৎসক

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:১৮ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৬:২৯ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: রীতা ফারিয়া

ছবি: রীতা ফারিয়া

যুগ যুগ ধরে বিশ্ব সুন্দরীদের বাছাই করার লক্ষ্যে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগীতা চলমান রয়েছে। বিশ্বজুড়ে মিস ওয়ার্ল্ড হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ও প্রধান আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতা। 

যুক্তরাজ্যের এরিক মোর্লে ১৯৫১ সালে এই প্রতিযোগিতাটির গোড়াপত্তন করেছিলেন। যা ২০০০ সালে তার মৃত্যুর পর থেকে তার স্ত্রী জুলিয়া মোর্লে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সারাবিশ্বের সুন্দরীদের জন্য এটি একটি কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি। তবে সৌন্দর্য যে শুধু নারীর গায়ের রং নয় বরং মেধায়। সেটিই প্রমাণ করে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা। এমনকি তারা এটাও প্রমাণ করেছেন সৌন্দর্যের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। 

সব প্রতিযোগীরা১৯৫১ সালে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা শুরু হলেও ভারত সেখানে অংশ নেয় ১৯৬৬ সালে। আর সেবছরই ভারতের রীতা ফারিয়া অর্জন করেন মিস ওয়ার্ল্ডের মুকুট। এরপর ১৯৯৪ সালে ঐশ্বরিয়া রাই, ১৯৯৭ সালে ডায়ানা হেইডেন, ১৯৯৯ সালে যুক্তা মুখী, ২০০০ সালে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। এছাড়াও সর্বশেষ ২০১৭ সালে মিস ওয়ার্ল্ডের খেতাব জেতেন ভারতের মানুষী চিল্লার। প্রথম ভারতীয় মিস ওয়ার্ল্ড রীতা ফারিয়াকে চেনেন নিশ্চয়! তবে তার মিস ওয়ার্ল্ড হয়ে ওঠার গল্পটা জানেন কি?

চলুন আজ আপনাদের নিয়ে যাবো ১৯৬৬ সালের সেই মিস ওয়ার্ল্ডের মঞ্চে। জানাবো রীতা ফারিয়ার মেডিকেল ছাত্রী থেকে মিস ওয়ার্ল্ড হয়ে ওঠার জার্নিটা। ভারতের মুম্বাই শহর একসময় বোম্বে নামেই পরিচিত ছিল। সেখানেই রীতার জন্ম আর বেড়ে ওঠা। রীতার বয়স যখন ৬ থেকে ৭ বছর। তখন তার অ্যাজমা হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে ডাক্তার আর নার্সরা চিকিৎসা দিতে তার বাড়িতে যেতেন। তাদের দেখে রীতা মনে প্রাণে ডাক্তার হবেন এই সিদ্ধান্ত নেন। সেভাবেই চলতে থাকে তার প্রস্তুতি। 

তিনিই প্রথম বাঙালি বিশ্ব সুন্দরীঅন্য কোনো দিকে তেমন কোনো খেয়ালই ছিলনা সরল স্বভাবের রীতার। তার মতে, মেকআপ কিংবা পোশাক এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় ছিল আর আগ্রহ কখনো ছিল না আমার। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আমি দাঁত ব্রাশ করে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতাম। কখনো আয়নার দিকে তাকাতেও ভুলে যেতাম। তখন অনেকেই আমার সৌন্দর্য নিয়ে মন্তব্য করতো।

একবার মায়ের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে একজন চলচ্চিত্র প্রযোজকের কাছ থেকে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন রীতা। তখন তার বয়স মাত্র ১৬ বছর। প্রযোজকের কথা শুনে তার মা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ সেসময় অভিনয় করা খুব একটা সহজ ব্যাপার ছিল না। এরই মধ্যে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা পরিণত হয়েছিল টেলিভিশনের একটি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে। সারা পৃথিবীতে লাখ লাখ মানুষ এই শো উপভোগ করতো।

বিশ্ব সুন্দরীরা১৯৬৬ সালেই ভারত প্রথমবারের মতো মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একজন মিস ইন্ডিয়া খুঁজে বের করার জন্য তখন ভারতের পাঁচটি শহরে আয়োজন করা হয় প্রতিযোগিতার। তখন রীতা ফারিয়া ছিলেন মেডিকেলের শেষ বর্ষের ছাত্রী। তার বোনই তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন মিস বোম্বে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য। রীতার বোন তাকে বলেছিল তুমি কেন যাচ্ছো না? কে জানে তুমি হয়তো লন্ডনেও চলে যেতে পারো! 

এরপর রীতার বোনই তাকে একজন ফটোগ্রাফারের কাছে নিয়ে ছবি তুলে পোর্টফোলিও তৈরিতে সাহায্য করেন। এরপর সেই ছবি পাঠানো হলো। শেষ পর্যন্ত রীতা ফাইনালে ডাক পেলেন। মিস বোম্বে প্রতিযোগিতা হয়েছিল সেপ্টেম্বর মাসে, তারপরের মাসেই হলো মিস ইন্ডিয়া। এই দুই মাস কিন্তু পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন রীতা। কেউই কিছু বুঝতে পারেনি। একটার পর আরেকটা প্রতিযোগিতায় জিতে নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন রীতা।

বিভিন্ন লুকে রীতাদিনটা ছিল ১৭ই নভেম্বর। সাল ১৯৬৬। লন্ডনের লাইসিয়াম বলরুমে দর্শক উপচে পড়েছিল। সেখানেই ইতিহাস সৃষ্টি করেন ২৩ বছর বয়সী এই ভারতীয় নারী। চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় রীতা বিচারকমণ্ডলী হিসেবে উপস্থিত সবাইকে তার সহজাত সৌন্দর্য্য, গুরুত্ব, সর্বোপরি স্বীয় বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের মাধ্যমে বিমোহিত করেন। তিনি একে-একে যুগোস্লাভিয়ার নিকিকা ম্যারিনোভিক (১ম রানার-আপ), গ্রীসের এফি ফনটিনি প্লাম্বি (২য় রানার-আপ), ব্রাজিলের মার্লুচ্চি ম্যানভেইলার রোচা (৩য় রানার-আপ)-কে পিছনে ফেলে অসাধারণ সাফল্য হিসেবে মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব জয় করেন। 

মিস বোম্বে জেতার পর মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে রীতা লন্ডনে যান। ভারত যেহেতু এই প্রথমবারের মতো এ রকম একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাচ্ছিল। তাই সেসময় অনেকেই তাকে সমর্থন করেনি। তবে রীতা সবকিছুই সহজভাবে নিয়েছিলেন। সবার কাছে গিয়ে নিজেই হাসিমুখে সমর্থন চেয়েছেন। কারণ তিনি তো ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করতে লন্ডনে যাচ্ছেন। মিস বোম্বে প্রতিযোগিতায় শাড়ি পরে অংশ নিয়েছিলেন রীতা ফারিয়া। পরে মিস ইন্ডিয়া নির্বাচিত হয়েছিলেন সাঁতারের পোশাক সুইমস্যুট পরে।  

রীতা ও তার স্বামীরিহার্সাল রুমে আয়োজকরা রীতাকে বলেছিল, যে সুইমস্যুট তিনি পরেছিলেন সেটা নাকি তার উপযোগী ছিল না। মজার ব্যাপার হলো, এটা তো আরেক জনের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছিল। এমনকি সেটা ঠিক মতো তার গায়েও লাগেনি। সে বছর মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন ৫১ জন প্রতিযোগী। এক পর্যায়ে রীতা পৌঁছে গেলেন প্রথম সাত জনের তালিকায়। 

সাতজনের মধ্যে রীতা আছেন। তার মানে কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন তিনি। এটা ভেবেই অনেক খুশি ছিলেন। এরপর ঘোষণা করা হলো পঞ্চম, চতুর্থ, তৃতীয়, দ্বিতীয় জনের নাম। দ্বিতীয় হিসেবে যার নাম ঘোষণা করা হলো। রীতা ভেবেছিলেন, তিনি-ই মিস ওয়ার্ল্ড নির্বাচিত হবেন। তিনি ছিলেন মিস ইয়োগোস্লাভিয়া। এরপরই ঘোষণা করা হলো রীতার নাম। রীতা ফারিয়াকে ঘোষণা করা হলো বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী নারী হিসেবে। নিজের নাম শুনে বিশ্বাসই হচ্ছিল না রীতার। হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।   

সেই রীতা এবং তার বর্তমান অবস্থাবিশ্বের সেরা সুন্দরী হয়েও কোনো ছবিতে অভিনয় করতে রাজি নন তিনি। পড়াশোনাকেই তিনি অগ্রাধিকার দিলেন। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন তার তো সে ছোটবেলা থেকেই। তা ভুলে যেতে পারেননি কোনোভাবেই। বিনোদন কোম্পানি মেকা চাইলো তাদের মিস ওয়ার্ল্ড সরাসরি মেডিকেল কলেজে ফিরে না গিয়ে পরের বছরে তাদের হয়ে কাজ করুক। মার্কিন কমেডিয়ান বব হোপের সঙ্গে তাকে কাজের প্রস্তাব দেয়া হলো। তখন কমেডিয়ান বব হোপের সঙ্গে মিস ওয়ার্ল্ড ভিয়েতনামে যাবেন ক্রিসমাসের সময় সৈন্যদের বিনোদন দিতে।

ভারত সরকার এতে খুশি ছিল না। কারণ ভিয়েতনাম যুদ্ধে তারা আমেরিকাকে সমর্থন করেনি। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এরইমধ্যে মেকার সঙ্গে এক বছরের চুক্তিতে সই করে ফেলেছেন রীতা। কারণ তাকে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার পক্ষে প্রচারণা চালাতে হবে। এরপর ভিয়েতনামে চলে আসেন তিনি। এ নিয়ে নানা  বিতর্ক চলতে থাকলো সারা ভারতে। ভিয়েতনাম গেলে মেকা রীতার পাসপোর্ট আটকে রাখলো। তারা তাকে ভারতে ফিরতে দিল না।  মেকার এই সিদ্ধান্ত খুব সহজে মেনে নিতে পারেননি রীতা ফারিয়া। বিশ্ব সুন্দরী হয়েও চলচ্চিত্র অঙ্গনে যাত্রা করেননি তিনিপরের বছরে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়ানোর কথা থাকলেও তিনি জানতেন যে তাকে মেডিকেলের পড়া শেষ করতে হবে। কারণ এটাই ছিল তার জীবন আসল স্বপ্ন। সে বছরটা খুব কঠিন ছিল রীতার জন্য। কারণ সেসময় পরিবারের সদস্যরা কেউ পাশে ছিল না। তখন একটি সুটকেসকে ঘিরেই বেঁচে ছিলেন রীতা। পরবর্তী মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার আগে মেকা তাকে লন্ডনে মেডিকেলের পড়াশোনা শেষ করার প্রস্তাব দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই তা লুফে নেন তিনি।   

রীতা ফারিয়াই প্রথম একজন ডাক্তার যিনি মিস ওয়ার্ল্ড নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৭ সালের মিস ওয়ার্ল্ডের খেতাব জয়ী মানুষী ছিল্লার পেশায় একজন ডাক্তার। রীতা লন্ডনেই তার লেখাপড়া শেষ করেন। সেসময় তার পরিচয় হয় এন্ডিওক্রাইনোলোজিস্ট ডেভিড পাওয়েলের সঙ্গে। ১৯৭১ সালে বিয়ে করেন তারা। এরপর ১৯৭৩ সালে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে চলে যান। এরপর থেকে সেখানেই বসবাস শুরু করেন তারা। বিয়ের পর ফারিয়া তার স্বামীর নাম ধারণ করেন। হয়ে যান রীতা ফারিয়া পাওয়েল। এ দম্পত্তির ঘরে ২ সন্তান এবং ৫ নাতি-নাতনী রয়েছে। 

মিস ওয়ার্ল্ড জয়ের এক বছর পর রীতা মডেলিং এবং চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চিকিৎসাশাস্ত্রেই মনোনিবেশ ঘটান রীতা। তবে ১৯৯৮ সালে ফেমিনা মিস ইণ্ডিয়া প্রতিযোগিতায় বিচারকমণ্ডলীর একজন ছিলেন তিনি। এছাড়াও মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় কয়েকটি পর্বে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন রীতা ফারিয়া। 

সূত্র: বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস