Alexa বিশ্ব দরবারে হলি আর্টিজেনের রায় অত্যন্ত ইঙ্গিতবাহী

ঢাকা, সোমবার   ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৌষ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

বিশ্ব দরবারে হলি আর্টিজেনের রায় অত্যন্ত ইঙ্গিতবাহী

 প্রকাশিত: ১৫:০৩ ৩০ নভেম্বর ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

তথ্যে ভারাক্রান্ত না করে শুরুতেই বলা ভালো– কুর্ণিশ বাংলাদেশ। গুলশানে হলি আর্টিজান মামলায় সাতজনের ফাঁসির আদেশ হওয়ায় আরেকবার বিশ্বের কাছে প্রমাণিত হলো- সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কতটা আন্তরিক এই দেশ। 

জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বার বার বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তা করেও দেখাচ্ছেন। তথ্য বলছে- বাংলাদেশে অতিদ্রুততায় আদালতে তদন্তের পরে প্রমাণসহ অভিযোগপত্র পেশ করছে এই দেশের পুলিশ-প্রশাসন। এ কথা আজ ভারত কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে- ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে যে সন্ত্রাসরাজ দীর্ঘদিন চলেছিল তা একধাক্কায় নির্মূল করে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরে। বাংলাদেশের পূর্বতন সরকারের সযত্নে ভারতীয় সন্ত্রাসীদের লালন নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিল ভারতীয় প্রশাসনকে। কিন্তু যে কোনো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কাজে প্রয়োগ করে দেখিয়েছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। যার ফলশ্রুতি এখনকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে বিরাজিত শান্তি।

কিন্তু বাংলাদেশের এই নব্যধারার সন্ত্রাসবাদের সূত্রপাত ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরের উপকণ্ঠে খাগড়াখড়ের একটি বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনাস্থলেই জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) দুই জঙ্গির মৃত্যু হয়। এ বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তভার নেয় এনআইএ। এ মামলায় একটি অভিযোগপত্র এবং চারটি অতিরিক্ত অভিযোগপত্র দেয়া হয়।

গ্রেফতার হওয়া ৩১ জনের মধ্যে ১৯ জন আসামি দোষ স্বীকার করেন। বিচারক ১৯ আসামিকে দোষি সাব্যস্ত করেন। এই মামলায় চার বাংলাদেশিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে এবং বাকি ১৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই মামলার মূল অভিযুক্ত কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ধরা পড়েনি। খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পরে সেই জঙ্গি ঢাকায় হলি আর্টিজান কাণ্ডের অন্যতম চক্রী। অবশেষে মুর্শিদাবাদের সীমান্ত লাগোয়া বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে তিন শিষ্যসহ ধরা পড়ল নব্য জেএমবি'র নেতা হাতকাটা নাসিরউল্লাহ ওরফে সোহেল মাহফুজ । ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত হাতকাটা নাসিরুল্লাহ ভারতে ছিল জেএমবি'র আমিরের দায়িত্বে। তখনই নাম বদলে হয় নাসিরউল্লাহ। পরে খাগড়াগড়–কাণ্ডের পর বাংলাদেশে ফিরে এলেও জেএমবি–র ভারত শাখার প্রধান হিসেবেই ছিল। পরবর্তীকালে গুলশানে হোলি আর্টিজানে হামলার মূল পাণ্ডা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। গ্রেনেড সরবরাহ করে। এই মামলায় তার ফাঁসির আদেশ হলো।

ভারতের রাজধানীর সংবাদমাধ্যমের বৃত্তেও এই মামলার রায় নিয়ে দিনভর আলাপচারিতা চলেছে। বাংলাদেশ আদালতের রায়ে খুশি সবাই। কিন্তু এদেশে জঙ্গি বা মিলিটেন্ট শব্দটির অপব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সারা পৃথিবীতেই মুসলমানদের পিছনে এই শব্দটি জুড়ে দিয়ে ইসলাম ভীতি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। মুসলমানদেরকে সংঘটিত সকল অঘটনের মূল হিসাবে  চিত্রায়িত করা নতুন কিছু নয়। জঙ্গি পরিচয়ের যে ধারণা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে তা যদি সত্যিই হয়েও থাকে তাহলে এর সঙ্গে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্ক কতটুকু! এখানে একটা কথা বলা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না তা হলো ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে সাধারণের অজ্ঞানতা। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। হত্যাকারীর স্থান হবে জাহান্নামে উল্লেখ করে কুরআনে বলা হয়েছে, ‌কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মু’মিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে।’ [সূরা নিসা : ৯৩] যারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে লা’নত এবং মন্দ আবাসের হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। [সূরা রা’দ : ২৫] রাসুল (সঃ) রক্তপাত সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‌কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মোকদ্দমার ফায়সালা হবে তা হলো, রক্তপাত বা হত্যা সম্পর্কিত।' [বুখারি : ৬৩৫৭]।

জঙ্গি,উগ্রপন্থী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তখন তৈরি হয় যখন কোনো রাষ্ট্র বা কোনো বিশেষ শক্তি স্বীয় উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে তাদের নেপথ্যে শক্তি হিসেবে কাজ করে। এই উপমহাদেশে পাকিস্তান হচ্ছে সন্ত্রাসবাদের আঁতুড় ঘর। তারা কখনোই এই উপমহাদেশ সুস্থির থাকুক চায় না। তবে জঙ্গিবাদের ইতিহাস অনেক পুরনো। প্রকৃতপক্ষে, সন্ত্রাস বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপে ছিল, এবং এটি ইউরোপ থেকে মধ্যে প্রাচ্যের সকল স্থানেই ছিল। পৃথিবীর প্রথম আধুনিক সন্ত্রাস দেখা  যায় ফ্রান্সে। সন্ত্রাসের প্রথম সংজ্ঞা দেয়া হয় ফ্রেঞ্চ একাডেমি থেকে ১৭৯৮ সালে, যা ছিল 'ত্রাসের শাসন অথবা ব্যবস্থা '। ধারনা করা হয়, পৃথিবীতে প্রথম সন্ত্রাসের ব্যবহার হয়েছিল দখলদার রোমানদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী ইহুদীদের দ্বারা। তবে সন্ত্রাসবাদের প্রধান এবং অন্যতম কারণ হল রাজনৈতিক। রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী  সন্ত্রাসের মাধ্যমে তাদের কথা বা ক্ষোভ প্রকাশ করে। অর্থনৈতিক অসমতার কারণেও সন্ত্রাস তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে দুই দল দেখা যায়, যারা সন্ত্রাসের নেতৃত্ব দেন, বা সন্ত্রাস তৈরি করেন এবং যাদের দিয়ে সন্ত্রাস করা হয়। অনেক গরীব মানুষকে টাকা দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। যেমন: অনেক পেট্রোল বোমা হামলায়, অনেক গরীব ছেলেকে ব্যবহার করা হয়, যাদের কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নেই, বরং সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে  তারা সন্ত্রাসের কাজ করে থাকেন। এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করা গেছে কাশ্মীরে। মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে ভারতীয় সেনাদের দিকে পাথর ছোঁড়ার কাজে নাবালকদের নিয়োগ করেছে পাকিস্তানি আইএসআই।  কিন্তু সমস্যা হয় যখন ধর্ম বা কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য সন্ত্রাসের আশ্রয় মানুষ নেয়। কারন তারা সন্ত্রাসকে নিজের প্রয়োজনে ধর্ম বা কোনো মতবাদের মোড়কে ব্যবহার করে। সে ধর্ম, অথবা দেশপ্রেম অথবা জাতি প্রেম অথবা গোত্রীয় প্রেম অথবা অন্যকোন মতবাদের আশ্রয় নেয়। এছাড়া আছে মানসিক বা মনোবৈজ্ঞানিক কারন যেমন দেখা যায় যে প্রতিশোধ নেবার তাগিদে মানুষ সন্ত্রাস চালায় এবং নিরীহ মানুষের সংজ্ঞা তাদের কাছে ভিন্ন। কিন্তু সব সন্ত্রাস সাধারণ মানুষকে বিপন্ন করে।

বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে ছোট রাস্ট্র। সংবিধান অনুযায়ী ইসলামিক দেশ। এই দেশে ধর্মকে নিজস্ব স্বার্থে ব্যবহারকামী মানুষজনের সংখ্যাও কম নয়। তা সত্ত্বেও যেভাবে এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামিল হয়েছে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। প্রসঙ্গত একটা কথা বলা হয়ত অত্যুক্তি হবে না তা হল সন্ত্রাস একটি ব্যাপক বিষয়, এবং এর সমাধান আছে ছোট ছোট ন্যায় সম্পন্ন কাজে। কিন্তু বাংলাদেশের একার পক্ষে এর সমাধান করা সম্ভব নয়। পারিপার্শ্বিক রাস্ট্র বৌদ্ধধর্মী মিয়ানামার যেভাবে রাস্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে দশ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে তার সমাধান আন্তর্জাতিক মহল যদি অবিলম্বে না করে তাহলে ভবিষ্যতে পালটা সন্ত্রাসী আক্রমন এই রোহিঙ্গারা করবে না তার গ্যারান্টি কে দেবে? এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা এর মধ্যে ভারত নিয়েছে ঠিকই কিন্তু বাকিরা? চীন, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া? ভাবার সময় এসেছে। হলি আর্টিজেনের রায় কিন্তু অত্যন্ত ইঙ্গিতবাহী। নিতান্তই ৭ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ নয়। একটি দেশের অ্যাটিটিউড এই রায়ে প্রকাশিত। অন্য অগ্রগামী দেশগুলির অবিলম্বে উচিত এই ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রতি তাদের সব ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও বটে। তাহলেই বাংলাদেশের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর