Exim Bank Ltd.
ঢাকা, সোমবার ২২ অক্টোবর, ২০১৮, ৭ কার্তিক ১৪২৫

কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস

বিশ্ব কাপানো ১৩ দিন

মেহেদী হাসান শান্তডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
বিশ্ব কাপানো ১৩ দিন
ছবি: সংগৃহীত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘ ৪৫ বছর সমগ্র মানব জাতি এক অস্থির উৎকণ্ঠা নিয়ে দিনাতিপাত করেছে! ইতিহাসে এই সময় শীতল যুদ্ধ বা 'কোল্ড ওয়ার' নামে খ্যাত, যার এক পক্ষে ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর অন্য পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বেশ কয়েকবারই দুই পক্ষই সংঘর্ষের একেবারে কাছাকাছি থেকে ফিরে এসেছে। তবে সবচেয়ে কাছাকাছি যায় ১৯৬২ সালে, বা আরো পরিস্কার করে বললে যখন পুরো বিশ্ব প্রায় নিশ্চিত, শুরু হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এ শঙ্কাটি 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' নামে ইতিহাসে পরিচিত। কিউবার মিসাইল সংকটের সেই ১৩ দিনের উৎকণ্ঠা যেন সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায়। সেই ঘটনা ও তার পটভূমি সম্পর্কে জেনে নিন-

১৯৬১ সাল, কিউবায় চলছে কমিউনিস্ট শাসন। ব্রিগেড ২৫০৬ নামের একটি প্যারামিলিটারি দল হানা দেয় কিউবায়। উদ্দেশ্য ক্যাস্ট্রোকে উৎখাত। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ট্রেনিং এবং রসদ নিয়ে হামলা চালানো হলেও তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। এই ভেস্তে যাওয়া প্রচেষ্টাকে অভিহিত করা হয় 'বে অফ পিগস' নামে। এতদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কোনরূপ আঁতাত না থাকলেও কিউবা এবার তাদের সাহায্য কামনার সুযোগ পেয়ে যায়। তৎকালীন সোভিয়েত প্রিমিয়ার (সোভিয়েত মন্ত্রী পরিষদের চেয়ারম্যানকে তখন 'প্রিমিয়ার' বলা হত) নিকিতা ক্রুশ্চেভ বেশ খুশী মনেই কিউবার এ আহ্বানে সারা দেন। অতি গোপনে কিউবায় পারমানবিক বোমা বহনে সক্ষম আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্রের যোগান দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। শুধু কিউবাকে মার্কিন আগ্রাসন থেকে মুক্ত করাই যে এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তা কিন্তু নয়। ইতালি ও তুরস্কে আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র বসিয়ে আমেরিকা সোভিয়েতের জন্য যে হুমকি তৈরি করে রেখেছিল এটাকে বলা যায় তার জবাবে গৃহীত পদক্ষেপ ও পাল্টা হুমকি।

কিন্তু যতদিনে মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী এ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পারল ততদিনে কিউবায় ক্ষেপনাস্ত্র তৈরির সব উপকরণ ও কারিগরি সহায়তা পৌঁছে গেছে। এই ক্ষেপনাস্ত্রগুলোর অবস্থান ফ্লোরিডা বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র ৯০ মাইল দুরে এবং রাজধানীসহ কমপক্ষে নয়টি শহরে আঘাত হানতে সক্ষম। অবস্থার গুরুত্ব বিশ্লেষণ ও করণীয় নির্ধারণ করতে ১৯৬১ সালের ১৬ অক্টোবর এক জরুরি মিটিং-এর আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। সেই মিটিং-এ মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে বিমান হামলা ও কিউবা দখল করার পরামর্শ দেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি আরো নিরাপদ পথে হাঁটলেন। ২২ অক্টোবর তিনি ঘোষণা দিলেন, তখন থেকে মার্কিন নেভি কিউবায় আসা সকল জাহাজের চালান আটক ও পরীক্ষা করবে।

কিন্তু এখানে ছিল একটি গভীর সমস্যা। নৌ অবরোধকে তখন যুদ্ধের সূচনা হিসেবে গণ্য করা হতো। কেনেডির মতে যদিও এটি ছিল একটি বিপদজনক পদার্থবাহী জাহাজ পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া এবং নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্য চালানের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল না, তবুও সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ মার্কিনী এ আচরণকে ভালোভাবে নেয়নি। ক্রুশ্চেভ ক্ষুব্ধ হয় কেনেডিকে চিঠি লেখেন- আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা ও আকাশসীমা ব্যবহারের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হল চূড়ান্ত আগ্রাসী আচরণ, এই কর্মকাণ্ড মানব সভ্যতাকে একটি বিশ্বব্যাপী পারমানবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এভাবেই শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে উৎকণ্ঠায় এক সপ্তাহ শুরু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত কিউবা থেকে সোভিয়েত ক্ষেপনাস্ত্র সরিয়ে নেয়ার দাবি জানায়। অন্যদিকে, কিউবা এবং সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ দাবি করে এসব প্রতিরক্ষার জন্য। মিসাইলগুলো পারমাণবিক গোলাবারুদে ঠাসা হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রস্তুত করছিল সম্ভাব্য আক্রমণের জন্য। ২৭ অক্টোবর মেজর রুডলফ অ্যান্ডারসন চালিত মার্কিন গুপ্তচর বিমান সোভিয়েত ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে ভূ-পতিত হয়। একই দিনে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত একটি সোভিয়েত সাবমেরিনকে ইউএস নেভির যুদ্ধজাহাজ পানির উপরে ওঠার সিগন্যাল অগ্রাহ্য করায় সাবমেরিনটিতে হামলা করা হয়।

যদিও সাবমেরিনটি পানির উপরিপৃষ্ঠ থেকে অনেক গভীরে থাকায় তার কমান্ডার মার্কিনদের সিগন্যাল বুঝতে পারেননি। তিনি ধরে নেন হয়ত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে বলেই তাদের আক্রমণ করা হচ্ছে। ফলে সাবমেরিন থেকে একটি পারমানবিক শক্তি সম্পন্ন টর্পেডো নিক্ষেপের প্রস্তুতি নেয়া হয়। তবে সে সময় নিয়ম ছিল যে কোনো পারমানবিক হামলার আগে তিন জন নেতৃত্বদানকারী অফিসারের একমত হওয়ার প্রয়োজন। সাবমেরিনে থাকা ক্যাপ্টেন ও পলিটিকাল অফিসার নিক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিলেও সেকেন্ড ইন কমান্ড অফিসার ভাসিলি আকিপভ এই আক্রমণে মত দেননি। ভাসিলির সিদ্ধান্ত প্রায় শুরু হতে যাওয়া পারমানবিক যুদ্ধ থেকে সেদিন রক্ষা করে পুরো পৃথিবীটাকেও।

কিন্তু সংকট তখনো অবসান হয়নি। ইতিহাসে প্রথমবার মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের 'ডেফকন-২' জরুরি অবস্থা জারি করে। সম্ভাব্য পারমানবিক আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সর্বোচ্চ জরুরি অবস্থা এটি। সেইসঙ্গে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চলমান ছিলো। ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন অ্যাটর্নী জেনারেল রবার্ট কেনেডি সেখানকার সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত আনতনলি ডুবিরিনের সঙ্গে দেখা করেন। বেশ কয়েক ঘন্টা বাক-বিতণ্ডার পর তারা চুক্তি করেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও তুরস্ক থেকে তাদের ক্ষেপনাস্ত্র অপসারণ করবে এবং কখনোই কিউবা দখল না করার প্রতিশ্রুতি দেবে। বিনিময় সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় থাকা তাদের আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র মার্কিন নজরদারির মধ্য থেকে সরিয়ে নেবে।

এই চুক্তির ফলে সোভিয়েত রাশিয়ার তৎপরতা সফল হয়। ডুবিরিন সঙ্গে সঙ্গে মস্কোতে তারবার্তার মাধ্যমে জানান, সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের এমন সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। পর দিন সকাল ৯ টায় ক্রুশ্চেভ কিউবা থেকে আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র অপসারণের ঘোষণা দেন। অবশেষে হয় সংকটের অবসান। কিউবান মিসাইল ক্রাইসিসের এ ঘটনা কেনেডি ও ক্রুশ্চেভের কূটনৈতিক দক্ষতাকে সামনে নিয়ে আসে। শুধু যুদ্ধ নয় কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে যে অনেক মারাত্মক সমস্যার সমাধান সম্ভব এই ঘটনা তা প্রমান করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
আজো হিমঘরে সন্তানের প্রতীক্ষায় ‘বাবা’!
আজো হিমঘরে সন্তানের প্রতীক্ষায় ‘বাবা’!
আইয়ুব বাচ্চু মারা গেছেন
আইয়ুব বাচ্চু মারা গেছেন
দুই স্বামীকে ‘ছেড়ে’ মন্ট্রিলে দেখা মিলল তিন্নির!
দুই স্বামীকে ‘ছেড়ে’ মন্ট্রিলে দেখা মিলল তিন্নির!
না ফেরার দেশে সালমানের ‘শেষ প্রেমিকা’
না ফেরার দেশে সালমানের ‘শেষ প্রেমিকা’
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সময়সূচি
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সময়সূচি
যেভাবে প্রথম বুবলীর ‘ভাই’
যেভাবে প্রথম বুবলীর ‘ভাই’
স্ত্রী ফিরে দেখে বাসায় অন্য নারী!
স্ত্রী ফিরে দেখে বাসায় অন্য নারী!
‘ওয়েব সিরিজে ভরপুর নগ্নতা’ দেখার কেউ নেই!
‘ওয়েব সিরিজে ভরপুর নগ্নতা’ দেখার কেউ নেই!
দাম শুনলে চমকে যাবেন যে কেউই!
দাম শুনলে চমকে যাবেন যে কেউই!
মৃত্যুর আগে কোথায় ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু?
মৃত্যুর আগে কোথায় ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু?
অনেকেই সাবান জমান কেউ গোসলই করেন না!
অনেকেই সাবান জমান কেউ গোসলই করেন না!
এক উঠোনে মসজিদ-মন্দির, প্রার্থনায় নেই বিবাদ
এক উঠোনে মসজিদ-মন্দির, প্রার্থনায় নেই বিবাদ
দুলাভাইয়ের কাছে শ্যালিকার আবদার!
দুলাভাইয়ের কাছে শ্যালিকার আবদার!
বন্ধুর ‘অকাল প্রয়াণে’ যা বললেন হাসান
বন্ধুর ‘অকাল প্রয়াণে’ যা বললেন হাসান
এবার মেয়েকে নিয়ে মারাত্মক কথা বললেন ঐশ্বরিয়া!
এবার মেয়েকে নিয়ে মারাত্মক কথা বললেন ঐশ্বরিয়া!
‘বেঁচে আছেন বাচ্চু?’ এ কী শোনালেন!
‘বেঁচে আছেন বাচ্চু?’ এ কী শোনালেন!
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাচ্চুর ৬০টি গিটার!
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাচ্চুর ৬০টি গিটার!
১ কোটি টাকা চেয়েছিলেন অনন্ত
১ কোটি টাকা চেয়েছিলেন অনন্ত
মিলনেই মৃত্যু, কারা ছিলো সেই ‘বিষকন্যা’?
মিলনেই মৃত্যু, কারা ছিলো সেই ‘বিষকন্যা’?
কাদের ওপর চটেছেন জেমস?
কাদের ওপর চটেছেন জেমস?
শিরোনাম:
বাংলাদেশ দলকে প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন বাংলাদেশ দলকে প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়েকে হারাল টাইগাররা ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়েকে হারাল টাইগাররা