Alexa বিলাস দাস’র কবিতাত্রয়  

ঢাকা, রোববার   ২০ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৫ ১৪২৬,   ২১ সফর ১৪৪১

Akash

বিলাস দাস’র কবিতাত্রয়  

 প্রকাশিত: ১৯:২৮ ২৩ মার্চ ২০১৮  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

 

চোখের কোনে শুকনো রক্ত

 

ওই দিনও সূর্য্য উঠেছিলো দখিনের গগনে

শিমুল-পলাশ ফুটেছিলো সেই গায়ের বাগানে

কে বুঝিবে-দানব তাণ্ডবে অশ্রু ঝড়বে নয়নে নয়নে।

দুপুরের খানা খেতে বসেছিলো নিজ ঘরের মেঝেতে

ভাবেনি, পাকসেনার গানর্বোড ভিড়বে পায়রা ঘাটিতে

প্রাণ বাঁচাতে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা মাতবে ছোটাছুটিতে।

সাত মাসের অন্তঃস্বত্তা, চার বছরের নাছিমা তার কোলে

পাকসেনা ঘেরাও করেছে গ্রাম, নাছিমার বাপ এসে বলে

গর্বতলে হাত দিয়ে দৌড়ায়, নাছিমা তার কোলে।

আহার ফেলে স্বামী নাছিমাকে নিয়া পালায় ধান ক্ষেতে

চোখের সামনে গুলি ভরা বন্দুক আছে ওৎপেতে

পিছনেও তাকিয়ে দেখে গানর্বোড বাঁধা কচাবুনিয়ার ঘাটে।

ধরা পরে যায় চারজন। পাক সেনার গুলির মাথায়

চুলের মুঠি ধরে বলে, এ্যাহন তুই পালাবি কোথায়

কোন কথা নয়, চল আমাদের সাথে নিয়ে যাবো যেথায়।

নাছিমার মা রেহাই পেতে পাকের সনে করে ধস্তাধস্তি

ক্ষিপ্ত হয়ে দানবদল ঝোপ-ঝারে নিয়া করে জবরদস্তি

পালাক্রমে চলে পাকের পাষবিক যৌন ক্ষুদার দোস্তি।

লালসার স্বাধ মিটিয়ে গুলি ছোরে অন্তঃস্বত্তার গায়

মায়ের হাত ভেদ করে সেইগুলি বিদে শিশুর মাথায় 

এরপরে তিন জনকেই তুলে নেয় পাকের প্রমোদশলায়। 

গুলিবিদ্ধ শিশুর রক্তাত্ব দেহে চলে অন্তিম চিৎকার 

তার পাশেই পাষবিক নির্যাতনে হাজেরা হয় শিকার

স্বাধ মিটিয়ে নিথর দেহ নিয়া গায়ে ফেরে নাছিমার।

দীর্ঘ বছরে শুকিয়ে গেছে সেই বিরঙ্গনার নয়ন জল

তবুও, শুকনো রক্ত নয়নে বাসা বেধে করে টলোমল

স্বাধীনতা পেয়েছে, ভুলেনি প্রমোদশলার রক্তের ঢল। 

বীরঙ্গনা

 তুমি-আমি কাকে করছি বিদ্রুপ

আমরা কি দেখেছি তাঁদের

সেই কালো রাতের রক্তাত্ব রূপ।

যারা পৈচাষিক সঙ্গে বিলিয়ে অঙ্গ

এনেছে এ বাংলায় স্বাধীনতা

আজ অনায়াসে ভুলতে বসেছি

মায়েদের সেই করুণ কথা।

শুধু মুঠো কাগজের পাতায় হয়েছে স্থান

বিনিময়ে জয় করেছে,

অভাব, দারিদ্র্যে আর কলঙ্কিত জীবন।

যুগ-যুগান্তর পেড়িয়ে হয়েছে কুব্জ্য

তাঁরা-নানা প্রশ্নের ভারে

কেউ বা দিয়েছে প্রাণ

কেউবা আবার থমকে দাঁড়িয়ে

জীবনের অন্তিম কিনারে।

তুমি-আমি শুধুই শুনেছি তাঁদের-

রক্তাত্ব আর অভিশপ্ত কাহিনী,

বিনিময়ে এ মাটি তাঁদের দিয়েছে কী

সে কথা একবারো ভাবোনি। 

লক্ষ প্রাণ বাঁচাতে হায়েনার মাঝে

বিলিয়েছে সম্ভ্রম, অভিলাষ, অঙ্গ

ভেবে নাও তাঁরা আমাদেরই স্বরূপ

তবুও তাঁদের দিয়েছো কি সঙ্গ?

একাত্তরের ভয়াল রাতে স্বজন

সমাজ আর প্রীতি হারিয়ে

ঝিলের পাড়ের তাল গাছটির মতই

নিভৃতে রয়েছে শত বিরঙ্গনা দাঁড়িয়ে।

কত না হারিয়ে- বিলিয়ে

এনেছিল এ বাংলায় স্বাধীনতা

যদিও তোমাতে কিছু নেয় কেরে

দিওনা তাঁদের ব্যাথা।

অনেক আশা নিয়া মরনকে করেনি বরণ

কুড়িয়েছে শুধুই লাঞ্চনা, বর্জনা

কোথাও হয়নি তাঁদের ঠাই

এ সমাজ ডাকছে তাঁদের ‘বীরঙ্গনা’! 

২৬ মার্চ 

এ বাংলার মাটিতে বইছে মহান স্বাধীনতা দিবস

গ্রাম-শহরের অলিতে-গলিতে আনন্দের উল্লাস

আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার প্রাণে নব-নিত্যের উদ্ভাস

আহা কি আনন্দ,আজ আমাদের স্বাধীনতা দিবস।

গ্রামীণ জনপথ আর মাঝি-মাল্লার গলাতে শুনি

দেশাত্ব বোধক গান,শুনি নতুন জীবনের জয়ধ্বনি

স্বাধীনতার গান গেয়ে রিকসা চালায় আব্দুল গনি

একাত্তরে যারা দিয়েছে প্রাণ, তাদের কি করে ভুলি।

দারিদ্র্য মায়ের বালিকা পতাকা নিয়ে হাঁটছে রাস্তায়

সেই দৃশ্যে আমার চেতনা প্রবাহিত হয় অশ্রু ধারায়,

আবুল মিয়া কাজ বন্ধ দিয়ে, নব প্রজন্মকে কি শোনায়

ঘরে নাই তাঁর চাইল, ডাইল, আছে পরনে অর্ধ বসন

তবুও ওই প্রাণ মাতে সেই চেতনায়।

মনে জাগে…!

কেন এই বিংশ শতাব্দিতে আমি জন্মিলাম

একাত্তরে যদি আসতাম কোন মায়ের কোলে

লাল বৃত্ত হয়ে এটে রইতাম, পতাকার কোলে,

লুকাইতাম সন্তান হারা মায়ের আচলের তলে।

এ বাংলার আকাশে-বাতাসে স্বাধীনতার গান

এসো, সব ভুলে করি সংঘাতের চির অবসান

কাধে কাধ মিলিয়ে গাই মোরা দেশের গান

দ্বন্দ্ব জলাঞ্জলি দিয়ে নতুন প্রত্যয়ে গাঁথি প্রাণ।