বিরোধী শক্তির দূর্বলতায় সরকার ক্ষমতায়

ঢাকা, সোমবার   ০১ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৮ ১৪২৭,   ০৮ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

বিরোধী শক্তির দূর্বলতায় সরকার ক্ষমতায়

 প্রকাশিত: ১৮:৩৪ ২৫ মে ২০১৮  

বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান

বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান

গেল সাড়ে চার দশকে দেশের রাজনীতিতে হয়েছে নানা উত্থান-পতন। অনেকের মতোই  এসবের সাক্ষী চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেয়া অন্যতম ব্যক্তিত্ব বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। বামপন্থি ছাত্র আন্দোলন আর ন্যাপ-ভাসানী’র মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি। তবে আশির দশকে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন।

এরপর গত কয়েক দশকে আর এক পা-ও পেছনে ফিরতে হয়নি তাকে। ক্রমে হয়ে ওঠেন বিএনপির অপরিহার্যদের একজন। একে একে পাঁচবার এমপি হন তিনি। চার বার মন্ত্রী (মৎস,পশু ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, শ্রম ও মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হয়ে ওঠেছেন চট্টগ্রাম বিএনপির অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি ও আস্থার প্রতীক। সৎ, বিনয়ী এবং উদারপন্থি রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত আবদুল্লাহ আল নোমান সবশেষ গত জোট সরকারের আমলেও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

জিয়াউর রহমানের সময়ে বিএনপিতে যোগ দেয়ার পর, তিনি মনোনিত হয়েছিলেন শ্রমিক দলের প্রথম সহ-সভাপতি। তারপর নানা উত্থান-পতনেও দল ছেড়ে যাননি এই মানুষটি। এরশাদের শাসনামলে কারাভোগও করেছেন। দলের টালমাটাল অবস্থায় খালেদা জিয়ার পাশ থেকে সরে যাননি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দলের যে ক’জন সিনিয়র নেতা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিএনপি’র রাজনীতি করে গেছেন তাদের অন্যতম আবদুল্লাহ আল নোমান।  মুক্তিযুদ্ধে সাহসী অবদান রাখা নোমান বিভিন্ন সময়ে দলের কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন ছাড়াও পর্যায়ক্রমে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম মহাসচিব, শ্রমিক দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

আবদুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে উঠে আসে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা, বিএনপির বর্তমান অবস্থা ও ব্যক্তি জীবনের জানা-অজানা অনেক তথ্য।

ডেইলি বাংলাদেশ: দেশের চলমান রাজনীতিকে কিভাবে দেখছেন?

আব্দুল্লাহ আল নোমান: দেশে একদলীয় শাসন চলছে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনও দেশে আছে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সেটা হচ্ছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযু্দ্ধের মধ্যদিয়ে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো, অর্থনৈতিক মুক্তি এসেছিলো, সে সবকিছু ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছে বর্তমান সরকার।  সরকার সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সংবিধানের আগের মৌল ভিত্তিগুলো এখন আর নেই।

তিনি বলেন, এ বছর নির্বাচনের বছর। সবাই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না, এটাও মানুষ বুঝতে পারছে। কারন সরকার কোনোভাবেই স্বৈরাচারী আচরণ ও বিরোধী দলের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কার্যক্রম থেকে সরে আসছে না।

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নতুন প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে। স্পষ্ট করে বলা যায় এ নির্বাচনে জালভোট হয়নি, হয়েছে কেন্দ্রগুলো দখল। এর সঙ্গে শুধু আওয়ামী লীগই নয়, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনও জড়িত।

সংসদীয় ব্যবস্থায় রাজনীতিতে ভোট হচ্ছে, বুলেটের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। আর সেই ভোট থেকে দেশের জনগণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকেই বঞ্চিত। বার বার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ায় রাজনীতি থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন মানুষ। এ অবস্থা চলতে থাকলে, রাজনীতি শূন্য হবে দেশে। রাজনৈতিক শূন্যতার কারণেই গণতান্ত্রিক শক্তি যথেষ্টভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। এখনো গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ নয়। বিরোধী শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ না হওয়ার দুবর্লতা কাজে লাগাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

তবে এরপরও আমরা মনে করি দেশে অবশ্যই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে। কিন্তু এ জন্য রাস্তার আন্দোলন প্রয়োজন। বর্তমানে যে আন্দোলন চলছে তা দিয়ে কখনই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ: বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিএনপির চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কি যথেষ্ট?

আব্দুল্লাহ আল নোমান: বিএনপির চলমান আন্দোলন- একটা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের আন্দোলন। এ আন্দোলন ছোট নয়। আন্দোলনে হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে যেতে হচ্ছে। খালেদা জিয়াকে যেদিন কারাগারে নেয়া হয়েছে সেদিনও, শত শত নেতাকর্মীকে জেলে যেতে হয়েছে। মামলা হামলার শিকার হয়েছেন। সরকারের বড় প্রতিরোধ থাকা স্বত্তেও ছাত্রদল, যুবদলসহ আমাদের সব পর্যায়ের নেতারা সেদিন গিয়েছিল মাঠে। কাজেই নিরস্ত্র মানুষ সশস্ত্র মানুষের সঙ্গে লড়াইয়ে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে।

আন্দোলনের শেষ পর্যায় হবে- যেমন এরশাদবিরোধী আন্দোলন, আইয়্যুববিরোধী আন্দোলনে আমরা দেখেছি সেগুলো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু সরকারের কৌশল- বিরোধী দলের তীব্র আন্দোলন মোকাবিলায় আগেভাগেই সন্ত্রাসী আন্দোলন আখ্যায়িত করছে। রাজনীতির বাইরের আন্দোলন প্রমাণের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ কারণেই বিএনপিকে অত্যন্ত কৌশলে অগ্রসর হতে হচ্ছে। আন্দোলনও করতে হচ্ছে আবার সরকার যেন সন্ত্রাসী আন্দোলন প্রমাণ করতে না পারে সেদিকেও লক্ষ রাখতে হচ্ছে। তাই কৌশলগত আন্দোলন বেছে নিয়েছে বিএনপি। তবে এটা দুর্বার আন্দোলন নয়। জনগণের মাঝে আন্দোলনের যৌক্তিকতা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

শুধু বিএনপিকে নয়, সরকারও জনগণের মুখোমুখি হয়ে গেছে।

ডেইলি বাংলাদেশ: নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেমন দেখছেন ?

আব্দুল্লাহ আল নোমান: বর্তমান নির্বাচন কমিশন সরকারের অজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান। অজ্ঞাবহ কমিশন দিয়ে জাতীয় নির্বাচন সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধান বিষয় হওয়া উচিত নির্বাচন কমিশন পুনর্ঘটন।

বিএনপির পক্ষে জনস্রোত দেখে সরকার গাজীপুর আটকে দিয়ে উলঙ্গ হস্তক্ষেপ করে কেড়ে নিয়েছে খুলনা।

ব্যক্তি জয় পেল কি পেল না, সেটা বড় বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সেখানকার জনগণের ভোটাধিকারে বাধা। তা এতো নির্লজ্জভাবে হয়েছে, দখল করে নেয়া হয়েছে। খুলনার পর্যবেক্ষণ থেকে বলা যায় গাজীপুর নিয়েও সরকারের চিন্তাভাবনা একই। তাহলে বুঝতেই পারছেন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিএনপি কী ভাবছে।

ডেইলি বাংলাদেশ: আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে চলমান সংকট সমাধান হবে কীভাবে?

আব্দুল্লাহ আল নোমান: এ দেশে কখনই কোনো পরিবর্তন সহজে আসেনি। এখন প্রশ্ন হলো- গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় এগিয়ে যেতে না পারলে পরিস্থিতি কি রূপ ধারন করবে? নতুন একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হবে। যে প্রেক্ষপটে গণতন্ত্রের বিপক্ষে শক্তি আওয়ামী লীগের বাইরেও আছে। তারা দেশি-বিদেশি শক্তি, সুযোগটা তারাই নেবে। মানুষের মধ্যে থাকা হতাশা তখন কাজে লাগাবে।

ডেইলি বাংলাদেশ: একদিকে দলীয় চেয়ারপারসন কারাগারে অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদেশে- এই পরিস্থিতিতে বিএনপি কি জিয়া পরিবার ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে?

আব্দুল্লাহ আল নোমান: আমাদের আন্দোলন দলের চেয়ারপারসনকে মুক্তি করেই আগামী নির্বাচনে অংশ নেবো। কিন্তু ম্যাডাম এখনও মুক্ত হননি। মুক্তির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে শেষ মুহুর্তে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত হবে। কলাকৌশল নির্ধারন হবে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি যদি ওরকম হয় তাহলে বিএনপিকে নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। তবে কি কৌশল সেটা সময়ই বলে দেবে।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনাদের দলীয় কোন্দল আছে কি?

আব্দুল্লাহ আল নোমান: বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। এত বড় একটা রাজনৈতিক দলে কোন্দল থাকাটা তো অস্বভাবিক নয়। তবে সেই কোন্দল যত না রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত। এ ধরনের রাজনৈতিক দলে ব্যক্তি সব সময় তার নিজের অবস্থানকে আরো একধাপ সামনের দিকে চিন্তা করে। এ সমস্যা বিএনপি বা আওয়ামী লীগের বিষয় নয়। তবে বিগত দিনের পর্যালোচনায় বলা যায় বিএনপি এখন অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ।

বিএনপির এমন কোনো রাজনৈতিক বিরোধ নেই, যে বিরোধে সংকটে পড়তে হবে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে রেষারেষি তা ম্যাডাম যখন বাইরে ছিলেন তখন দৃশ্যত দেখা গেছে কখনও কখনও। এখন বিএনপি সর্বক্ষেত্রেই এক ও অভিন্ন। কারণ নেত্রী কারগারে। যা সিদ্ধান্ত হবে তা নেত্রীর ওপরই নির্ভর করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএএম/এসআই/এলকে/টিআরএইচ