.ঢাকা, সোমবার   ২২ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৮ ১৪২৬,   ১৬ শা'বান ১৪৪০

বিবর্তনবাদের মূল ধারণা

 প্রকাশিত: ১৯:৪৫ ২৭ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৯:৪৫ ২৭ অক্টোবর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বিবর্তন- অধিকাংশ বিজ্ঞানীদের মতে এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত ব্যাপার হলেও অনেক সাধারন মানুষ এখনো এ ধারণাটিকে বিতর্কিত বলে মনে করেন। কিন্তু যদি ওইসব সাধারন মানুষদের মধ্যে নাও হন অথবা বিবর্তন সম্পর্কে বেশ ভাল ধারণা থাকে; তারপরও হলফ করে বলা যায় বিবর্তন নিয়ে অনেক ভুল ধারণা এখন আপনার মনে বাসা বেঁধে আছে! এটাই স্বাভাবিক। যেমন: বিবর্তন সম্পর্কে অনেক পড়াশোনা করার পরও অনেকে মত দেন - "বিবর্তন হলো প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গসমূহের পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা।" এটি বিবর্তনের একটি প্রাচীন সংজ্ঞা, যা বর্তমানে বিজ্ঞানীদের মহলে বেশ নিন্দিত।

বিবর্তনবাদের প্রবর্তক চার্লস ডারউইনের জন্মের ৬০ বছর আগে বিজ্ঞানী জাঁ ব্যাপ্টিস্ট ল্যামার্ক মত দেন যে, প্রয়োজন এর ওপর ভিত্তি করে প্রাণীদেহে বিভিন্ন নতুন অঙ্গ সৃষ্টি অথবা পুরাতন অঙ্গের রূপ পরিবর্তন ঘটে এবং এই পরিবর্তন পরবর্তী প্রজন্ম থেকে ওই জাতের সব প্রাণীদের মধ্যেই সঞ্চারিত হয়। ব্যাপারটি একটু ভেঙে বলা যাক। জিরাফ এর কথাই ধরুন। সাহারা মরুভূমির দক্ষিনে সাব সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলের রুক্ষ ভূমিতে এই প্রাণীদের বাস। সবাই জানি এই প্রাণীটির গলা ইয়া বড় লম্বা। ল্যামার্ক বলেন, পূর্বে যখন সাব সাহারান অঞ্চল সুজলা সুফলা ছিল, তখন জিরাফের গলা এত লম্বা ছিল না। কারন, চাইলেই তারা মাটিতে থাকা লতা ও গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ খেতে পারতো। কিন্তু ক্রমশ প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে যাওয়ায় জিরাফকে বাধ্য হয়ে উঁচু শাখা প্রশাখা যুক্ত দীর্ঘজীবী গাছের পাতা খেতে হতো। অতি উঁচুতে থাকা পাতার নাগাল পেতে জিরাফের গলায় যে টান পড়তো, তাতেই আস্তে আস্তে তার গলা এত লম্বা হয়েছে! এবং বংশ পরম্পরাতেও বিবর্তনের ফলে প্রাপ্ত এ পরিবর্তন অক্ষত রয়েছে। কোনো জিরাফ এখন আর আদি পূর্বপুরুষদের মত খাটো গলা নিয়ে জন্মায় না।

এখন আমরা জানি, জিনগত বংশগতি মোটেও এভাবে কাজ করে না। বস্তুত, কোনো একটি অঙ্গ নিজ থেকে কখনো বিবর্তিত হয় না। বরং যথেচ্ছভাবে জিনগত বিবর্তনের ফলে কিছু জিরাফ কোনো এক সময় বড় ঘাড় নিয়ে জন্ম নিলো। পরে দেখা গেল, অদ্ভুত-দর্শন এ জিরাফ খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে অন্য সব সাধারণ জিরাফদের তুলনায় বেশ এগিয়ে আছে, তার অপেক্ষাকৃত বড় ঘাড়ের জন্য। এই সুবিধাটি তাদেরকে অন্য সব জিরাফের থেকে বেশি প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকতে সাহায্য করল। এই টিকে থাকার ব্যাপারটিই আসলে মূল। এখান থেকেই 'সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট' ধারণার উৎপত্তি। ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ও প্রতিযোগিতাময় এ পৃথিবীতে যারা সবচেয়ে 'ফিট' বা উপযুক্ত তারাই শেষ পর্যন্ত 'সারভাইভ' করতে পারে বা টিকে থাকতে পারে। আর যারা ফিট নয়, তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

'সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট' কথাটি শুনলে অনেক সময় মনে হতে পারে, বিবর্তন হয়তো শুধু বৃহদাকার, শক্তিশালী ও দ্রুতগামী প্রাণীদের পক্ষেই কাজ করে। কিন্তু আসলে এমনটি নয়। প্রাণী যত বড় যত শক্তিশালী বা যত দ্রুতগামীই হোক না কেন সেটি তার বসবাসরত পরিবেশের সঙ্গে কতটা মানানসই- সেটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। হয়তো লম্বা ঘাড় নিয়ে জিরাফের দল বেশ শান্তিতেই আছে, কিন্তু হঠাৎ কোনো প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে যদি সাব সাহারান অঞ্চলের সব বড় বড় গাছ ধ্বংস হয়ে যায়, শুধু ঘাস-লতাগুল্ম বেঁচে থাকে, তখন এই জিরাফই সমস্যার সম্মুখীন হবে; এমনকি বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, টিকে থাকার প্রয়োজনে হঠাৎ করে কখনো বিবর্তনজনিত পরিবর্তন ঘটে না। বিবর্তন ঘটে প্রজননের মধ্য দিয়ে। যেমন, প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটি জিরাফ যদি কখনো অনুধাবন করত, টিকে থাকার জন্য লম্বা ঘাড় প্রয়োজন, তবুও কখনো সে তা পেতো না। সঠিক প্রক্রিয়াটি হলো, প্রজননের মাধ্যমে আগে আসবে লম্বা ঘাড়ওয়ালা জিরাফ, তারপর দেখা হবে সেটি টিকে থাকার জন্য সহায়ক কিনা। যদি সহায়ক হয় তবেই সে বিবর্তন স্থায়ী হবে।

অর্থাৎ আমরা দেখলাম, ল্যামার্ক বলেছিলেন প্রয়োজনীয়তাই বিবর্তনের জন্ম দেয়। কিন্তু তার তত্ত্বটি ছিল ভুল। আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ বহুবার ইকারুসের মত ওড়ার জন্য ডানার অভাব বোধ করেছে। পাখির মত উড়ে উড়ে আকাশে দাপিয়ে বেড়াবার শখ নিশ্চয়ই মানুষের বহুদিনের। যদি প্রয়োজনীয়তা অনুভবই বিবর্তন ঘটাতো, তবে অনেক আগেই ডানাযুক্ত মানুষের জন্ম হয়ে যেত। কিন্তু তা হয়নি। জয় হয়েছে ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদের।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড