‘বিপুলা পৃথিবী’ শূন্য করে 

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭,   ১১ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

‘বিপুলা পৃথিবী’ শূন্য করে 

 প্রকাশিত: ১৪:০৭ ১৫ মে ২০২০  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

কিছু মানুষ নিজের কর্মের মাধ্যমে একটি জাতির জন্য মহিরুহসম হয়ে ওঠেন। জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান তেমনই একজন বাতিঘর। তিনি কয়েক প্রজন্মের প্রিয় শিক্ষক তাই ‘স্যার’ হিসেবেই পরিচিত ও গণ্য ছিলেন।

দেশ ও মানুষের যে কোনো সংকটে তিনি অতন্দ্র বাতিঘরের মতো যুক্তিনিষ্ঠ, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে নিরাবেগ মতামত ও দিকনির্দেশ প্রদান করে আসছিলেন দীর্ঘদিন। ড. আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় শিক্ষা  কমিশনের সদস্য ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ড. আনিসুজ্জামান অনন্য হয়ে ওঠেন মূলত তার উদার, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিপন্থী মানবিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কারণে। তিনি কখনোই নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যূত হননি। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে চরম মৌলবাদের আক্রমণ ঘটেছে, মুক্তবুদ্ধি, ভিন্নমতাবলম্বীদের খতম করতে চেয়েছে একদল সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী, দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তিনি বলতেন, বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে এসেছে বটে, কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম রয়ে গেছে। এ দু’টি কীভাবে পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে, তা সহজ বুদ্ধিতে উনি বুঝতে পারেন না। তাই মেরুদণ্ড সোজা রেখে স্পষ্ট ভাষায় তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে নাগরিকের ধর্মপালনের অধিকার যেমন থাকবে, ধর্ম না-পালনের অধিকারও থাকতে হবে। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম হতে পারে না। কোনো বিশেষ ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারে না রাষ্ট্র। রাষ্ট্র হবে সর্বোতোভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। মননে আধুনিক এবং উদার না হলে এমন স্পষ্ট উচ্চারণ কোনো ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব নয়। তিনি এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘ভাষা-আন্দোলনের অল্পকাল পরে আমি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসি। সে সংযোগ বছর পাঁচেকের বেশি স্থায়ী হয়নি। তবে ওই সময়ে বামপন্থার যে শিক্ষা লাভ করেছিলাম, তা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি চিরকালের জন্যে গঠন করে দিয়েছিল। ওই শিক্ষা না পেলে আমি আজকের আমি হতে পারতাম না।’ ফলে সব মিলিয়ে আনিসুজ্জামান স্যারকে সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান বললেও বোধ করি অত্যুক্তি হয় না।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যখন সাদা পায়জামা ও খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে হেঁটে যেতেন, তাকে দেখলেই শ্রদ্ধায় নুয়ে আসত মাথা। গম্ভীর চেহারা, ভরাট গলা ও ভারী চশমার এই মানুষটিই জাতির শিক্ষক- আমি অবাক হয়ে দূর থেকে তাকিয়ে দেখতাম। সৃষ্টিশীল তরুণদের তিনি খুব পছন্দ করতেন বলে জেনেছি। তিনি শুভ কাজে সহজে কাউকে ‘না’ বলতে পারতেন না। যে কারণে অসুস্থ শরীর নিয়েও তাকে নানান অনুষ্ঠানে হাজির হতে হয়েছে। স্যারের সঙ্গে আমার তেমন সখ্য গড়ে ওঠেনি। কথা হয়েছে কালে ভদ্রে। দূর থেকে সালাম বিনিময়েই আমি অভ্যস্থ। তবে ২০১৭ সালে আমার সম্পাদিত ‘দৃষ্টি’র সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা প্রকাশের পর স্যারের হাতে দিয়েছিলাম। এর পর নানা অনুষ্ঠানে দূর থেকেই শ্রদ্ধা জানিয়েছি স্যারকে। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আবার স্যারের কাছে যাই আমার সম্পাদিত ‘দৃষ্টি’র ১৯তম (কবি আমিনুল ইসলাম) সংখ্যাটি দিতে। ‘দৃষ্টি’ হাতে নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, সৈয়দ হককে নিয়ে সংখ্যাটি ভালো হয়েছিল। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। তিন বছর পর জাতির বাতিঘরের মুখে ‘দৃষ্টি’র প্রশংসা শুনে আমি যারপর নাই খুশি এবং নির্বাক। পরে ভয়ে ভয়ে একটি সম্পাদিত গ্রন্থের মুখবন্ধ লেখার জন্য অনুরোধ করি। তিনি সানন্দে রাজি হলেন। মার্চের প্রথম সপ্তাহেই লেখাটি বাহকের মাধ্যমে হাতে পাই। স্যার রাশভারী ছিলেন এবং প্রয়োজন ছাড়া সাধারণত কথা বলতেন না। এটাও স্যারের একটি পরম গুণ বলে আমি মনে করি। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী আনিসুজ্জামান স্যারের অগাধ দখল ছিল বাংলা ভাষার ওপর। বিভিন্ন শব্দের তাৎপর্য ও উৎপত্তি বোঝার যে ক্ষমতা থাকা দরকার সেটা তার ছিল এবং জাতিকে তিনি সেটা বোঝানোর চেষ্টা করে গেছেন। 

আনিসুজ্জামান স্যার আমৃত্যু সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এবং অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে কথা বলেছেন। দেশে সংখ্যালঘুদের পক্ষে তিনি শক্ত অবস্থানে থেকে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী শক্তির ঐক্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। স্যারের গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘বিপুলা পৃথিবী’ আমি কয়েকবারই পাঠ করেছি। এটি স্যারের আত্মস্মৃতি। এতে ধরা পড়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির নানা ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এর যাত্রাকাল। ইতিহাসের বহু ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ভেতর থেকে। বহু উদ্যোগে সক্রিয় থেকেছেন। দেশে ও বৃহত্তর বাংলা ভূখণ্ডের রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে এ সময়ের ইতিহাসের যারা নায়ক, তিনি তাদের সংস্পর্শে এসেছেন। নিবিড় সান্নিধ্য ও বন্ধুত্ব পেয়েছেন অনেকের। বোদ্ধাদের মতে, ‘এ আত্মস্মৃতি তাই শুধু আনিসুজ্জামানের নিজেরই উন্মোচন নয়, এ আত্মস্মৃতি নবীন এক রাষ্ট্রের অন্তরঙ্গ সামাজিক উন্মোচন। আনিসুজ্জামানের কৌতুকপ্রিয় দৃষ্টি, ভারসাম্যপূর্ণ মন ও প্রাঞ্জল গদ্য এ আত্মস্মৃতিকে সুষমা দিয়েছে।’ এ গ্রন্থটির জন্য ১৪২৩ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। জীবনভর প্রচুর লেখালেখি করেছেন তিনি। আর স্বীকৃতিস্বরুপ পেয়েছেন দেশ-বিদেশের নানান পুরস্কার ও সম্মাননা। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও ১৯৮৫ সালে একুশে পদক। জীবনজুড়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আরও পেয়েছেন অলক্ত পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার। এ ছাড়াও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রিতে ভূষিত হয়েছেন। তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ও লাভ করেন।

আনিসুজ্জামান ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা এ টি এম মোয়াজ্জেম ছিলেন বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক। মা সৈয়দা খাতুন গৃহিনী হলেও লেখালেখির অভ্যাস ছিল। পিতামহ শেখ আবদুর রহিম ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে চতুর্থ ছিলেন আনিসুজ্জামান। কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করেন তিনি। এখানে তৃতীয় শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর বাংলাদেশে চলে আসেন এবং খুলনা জেলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এক বছর পর পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘বাংলাদেশের মাটিতে আমি জন্মগ্রহণ করিনি। তবে এই মাটিই যেন আমার শেষ আশ্রয় হয়, এই আমার অন্তিম প্রার্থনা।’ প্রকৃতি আনিসুজ্জামানের অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করেছে। তবে ‘বিপুলা পৃথিবী’ শূন্য করে করোনাক্রান্তিকালে তার এই চিরপ্রস্থান বাঙালি জাতিকে শোকবিহ্বল এবং অসহায় করে তুলেছে। তার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর