বিধ্বংসী ঝড়ে বদলে যায় নদীপথ, অক্ষত বিস্ময় সেতু ‘চোলুটেকা’

ঢাকা, রোববার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১২ ১৪২৭,   ০৯ সফর ১৪৪২

বিধ্বংসী ঝড়ে বদলে যায় নদীপথ, অক্ষত বিস্ময় সেতু ‘চোলুটেকা’

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৪৩ ৯ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৯:৪৯ ৯ আগস্ট ২০২০

চোলুটেকা ব্রিজ। ছবি: সংগৃহীত।

চোলুটেকা ব্রিজ। ছবি: সংগৃহীত।

১৯৯৮ সাল। তখন এক বিধ্বংসী ঝড় মানুষের হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়েছিল। সেই ঝড়টির তাণ্ডবে প্রাণ হারান হাজার হাজার মানুষের। পরিবর্তন হয় পুরো একটি নদীর গতিপথ। তবে নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেতুর চুল পরিমাণ পরিবর্তন হয়নি। সেতুর ভিতগুলো এতোটাই মজবুত যে, প্রকৃতির কোনো প্রলয়ঙ্কর ঝড়ই তার অস্তিত্বকে নড়াতে পারবে না। ঝড়ের পরও ২২ বছর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেতুটি। বিস্ময় সেতুটির নাম হচ্ছে চোলুটেকা ব্রিজ যা হন্ডুরাসে অবস্থিত।

চোলুটেকা ব্রিজ কত শত ভাঙা-গড়ার খেলা দেখেছে। ফসিল হয়ে যাওয়া ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এক অথর্ব, নিঃসঙ্গ সেতুটি আজও দাঁড়িয়ে আছে। এ সেতুকে আজকাল ব্যবহার হয় না। তাই প্রচারনায়ও নেই। তবে নিজের নির্মাণ শৈলির অহংকার নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেতুটি।

সেতু মানেই সংযোগ, আর সংযোগের সড়কটিই ছিনিয়ে নিয়েছে প্রলয় ঝড়। কিন্তু তাও সেতুটি এক নব জীবনের ইঙ্গিত দেয়। হন্ডুরাসের মানুষজনের কাছে এ সেতু পুনর্জন্মের প্রতীক।

স্থানীয়রা বলেন, চোলুটেকা ব্রিজকে উদিত সূর্যের সেতু বলা হয়। সেতুটি সব হারিয়েও শিরদাঁড়া সোজা করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা প্রদান করে। সেতুটি সূর্যের আলোর মতোই নতুন দিনের কথা বলে। চোলুটেকা শুধু ইতিহাসের অংশ নয়, হন্ডুরাসের ভাবাবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। জীবনের নানা উত্থান-পতনের সঙ্গে সেতুটির তুলনা করা হয়।

১৯৩৫ সালে আমেরিকার সেনা ইঞ্জিনিয়াররা নির্মাণ করে ‘ক্যারিয়াস ব্রিজ’ 

১৯৩৫ সালে হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন টিবারসিও ক্যারিয়াস অ্যানডিনো। টিবারসিও পরপর দুই বার হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট হন। একবার ১৯২৪ সালে, পরেরবার ১৯৩৩ সালে।

টিবারসিও-এর নির্দেশে মার্কিন সেনার ইঞ্জিনিয়াররা প্রায় ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ শুরু করে। ১৯৩৭ সালে সেতুর নির্মাণ সমাপ্ত হয়। সেতুর নাম দেয়া হল প্রেসিডেন্টের নামেই ‘ক্যারিয়াস’ ব্রিজ। যাকে পুরনো চোলুটেকা বলা হয়। এ সেতু তখনকার সময়ে শুধু হন্ডুরাসের নয়, মধ্যে আমেরিকার দীর্ঘতম সেতু ছিল।

১৯৩৫-৩৭ সালেও এ সেতুর নির্মাণশৈলী মুগ্ধ করে। তখনও চোলুটেকা উদিত সূর্যের সেতু হয়ে ওঠেনি। তার গড়ন এতটাই পাকাপোক্ত ছিল যে, নানা ঝড়ঝাপটা সইবার ক্ষমতা ছিল।

যেভাবে পুরনো রূপ থেকে ‘উদিত সূর্যের সেতু’ বানালেন জাপানিরা

১৯৯০ সালের পর থেকে নতুন সড়ক নির্মাণের প্রয়োজন পড়ে। হন্ডুরাস সরকার ঠিক করে নতুন চোলুটেকা সেতু তৈরি হবে। এ খবর যায় জাপানের প্রথম দশের তালিকায় থাকা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি হাজ়ামা আন্দো কর্পোরেশনে। এ জাপানি সংস্থার তখন বিরাট খ্যাতি। ১৯৯৬ সালে নতুন চোলুটেকা তৈরির কাজ শুরু করে জাপানি ইঞ্জিনিয়াররা। ১৯৯৮ সালে সেতু তৈরি শেষ হয়। পুরনো চোলুটেকার থেকেও এর দৈর্ঘ্য বৈশি দেখা যায়। প্রায় ৪৮৪ মিটার দীর্ঘ সেতুর নামকরণ হয় ‘উদিত সূর্যের সেতু’। চোলুটেকারই আবারো নতুন জন্ম হয়। জাপানি ইঞ্জিনিয়ারদের তৈরি লাতিন আমেরিকার দীর্ঘতম সেতুর তকমা পায় চোলুটেকা।

মজবুত, সুদর্শন সেতুটির নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে চোলুটেকা নদী। ১৯৯৮ সাল থেকেই এ সেতুকে জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। ভারী যান চলাচলেও ছিল না নিষেধাজ্ঞা। তবে এ সুখ বেশিদিন সইল না। ওই বছরই হন্ডুরাসে আছড়ে পড়ল সুপার সাইক্লোন হারিকেন মিচ।

প্রলয় ঝড়ে তছনছ হয় হন্ডুরাস, চোলুটেকারের সুখে দুঃখ প্রবেশ

১৯৯৮ সালে মধ্য আমেরিকায় আছড়ে পড়ল প্রলঙ্কয়ী ঝড় হারিকেন মিচ। ‘ফিফথ ক্যাটেগরি’ সুপার সাইক্লোন যাকে দ্বিতীয় ভয়ংকর আটলান্টিক হারিকেন হলা হয়। ঝড়ের দাপটে তছনছ হল মধ্য আমেরিকা। হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়াতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়লো। হন্ডুরাসের প্রায় ১৫০ ব্রিজ ভাঙল, নদীর পানি উপচে শহর-গ্রাম ভাসিয়ে গিয়েছিল। পানিতে ডুবল ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট। প্রাণ গেলে প্রায় সাত হাজার মানুষের। ঝড়ের তাণ্ডবে নিকারাগুয়াতে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারালেন।

নদীপথ বদলে গেলেও আগের অবস্থানেই রয়েছে চোলুটেকা ব্রিজ বা সেতু।

বিধ্বংসী ঝড়ের দাপট দাঁড়িয়ে সহ্য করল চোলুটেকা। তার চারপাশে শুধুই ধ্বংস আর হাহাকারের চিহ্ন। রাস্তাঘাট নেই, নদীর গতিপথ বদলে গেছে। এমনকি নদী উপত্যকা বন্যায় ভেসে গেছে। বদলে গেল গোটা এলাকার মানচিত্র। মিটে যায় বাড়িঘর, মানুষের অস্তিত্ব। শুধু খাঁ খাঁ প্রান্তর এক অতি ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিভীষিকা নিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে রয়েছে। তারই মাঝে মাথা উঁচু করে আছে নিঃসঙ্গ চোলুটেকা। সেই ভয়ংকর ঝড় তার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।

মুখ ফিরিয়েছে নদী, চোলুটেকা আজও একা

প্রচণ্ড ঝড়ের দাপটে নদীর গতিমুখই বদলে গেছে। পাল্টে গেছে একটা এলাকার মানচিত্রই। একটা আস্ত নদীকে যেন জোর করে তার গতিপথ থেকে সরিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এত কিছুর পরেও চোলুটেকা সেতুর একটা ভিতে কাঁপন ধরেনি।

একদিকে প্রযুক্তির উৎকর্ষের গর্ব চোলুটেকার, অন্যদিকে অভিশাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেতু এখন ব্যবহার হয় না। যোগাযোগের সড়ক পর্যন্ত নেই। সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে যায় সেই নদী মুখ ঘুরিয়েছে।

হন্ডুরাসবাসীরা বলেন, ‘The Bridge to nowhere’। চোলুটেকা সেতু নিয়ে এখনও রয়েছে নানারকম তর্ক-বিতর্ক। অনেকেই বলতেন, ১৯৯৮ সালে এমন একটি ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়তে পারে। এমন পূর্বাভাস পাওয়ার পরও নব নির্মাণ পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ঝড়ের দাপটে সেতুর কি কি ক্ষতি হবে তা খতিয়ে দেখেননি ইঞ্জিনিয়াররা। 

চোলুটেকা সেতুর নির্মাণকাজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করা হয়। সেই সেতুটি এখন কর্মহীন। সেতুকে ভবিষ্যতে মূলস্রোতে আনার বিষয়টি এখনো ধোঁয়াশায় রয়েছে।

সূত্র-দ্য ওয়াল।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ