বিদেশ পাঠানোর প্রলোভনে টর্চার সেলে নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় 

ঢাকা, সোমবার   ০৩ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭,   ১২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

বিদেশ পাঠানোর প্রলোভনে টর্চার সেলে নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় 

ইদ্রিস আলম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:০১ ৪ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৭:১৯ ৪ জুলাই ২০২০

বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যেতে চাওয়া অনেকেই মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ছে। ফাইল ফটো

বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যেতে চাওয়া অনেকেই মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ছে। ফাইল ফটো

উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া যেতে চাওয়া অনেকেই মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ছেন। সেই সাথে বন্দি হচ্ছেন এই চক্রের টর্চার সেলে। সেখানে মুক্তিপণের দাবিতে নির্যাতনের মুখে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে।

টর্চার সেলে আটকে রেখে জিম্মিদের পরিবারের কাছে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। আর টাকা দিতে না পারলে তাদের উপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। অনেকেই নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন। অনেক সময় হত্যা করে গহিন জঙ্গলে বা সমুদ্রে মাছের খাবার হিসাবে ফেলে দেয়া হয় মৃতদেহ।

গত ২৮ মে লিবিয়ার মিসদাহ উপ-শহরের মরুভূমিতে ২৬ জন বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে মানব পাচারকারীরা। মারাত্মকভাবে আহত করা হয় আরো ১১ জনকে। ২৬ জন বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নড়েচড়ে বসে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

র‌্যাবের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মানব পাচার চক্রের টর্চার সেলের তথ্য। মালয়েশিয়ার সাগর তীরবর্তী এলাকায় রয়েছে জলদস্যুদের একাধিক টর্চার সেল। গহিন জঙ্গলের মধ্যে গড়ে ওঠা সেসব টর্চার সেলের জলদস্যুদের সাথে সখ্যতা রয়েছে দেশটির কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক সংগ্রহ করে প্রথমে চট্টগ্রামে আনে মানব পাচারকারী চক্র। সেখান থেকে কক্সবাজারের টেকনাফে নিয়ে আসে। টেকনাফ থেকে ধাপে ধাপে তাদের মালয়েশিয়াগামী মাছ ধরার ট্রলারে ওঠায়। এর পরই শুরু হয় তাদের ওপর অমানবিক নিযাতন। টর্চার সেলে আটকে রেখে জিম্মিদের পরিবারের কাছে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। আর টাকা দিতে না পারলে তাদের অনেকেই নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন।

কেউ কেউ আবার জীবন বাঁচাতে মুক্তিপণের টাকা দিয়ে হচ্ছেন সর্বস্বান্ত। একটি মানব পাচার মামলার তদন্তে নেমে র‌্যাবের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই ভয়াবহ সব তথ্য। র‌্যাব জানায়, একাধিক মানব পাচারকারী চক্র দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নিরীহ মানুষকে বিনা পয়সায় মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলছে।

২০১৫ সালে করা একটি মানব পাচার মামলার তদন্ত শেষে গত মঙ্গলবার ১৮ জনের বিরুদ্ধে টাঙ্গাইলের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে র‌্যাব। 

অভিযোগ পত্রে দাখিলকৃত আসামিরা হলো, মো. রুহুল আমিন ওরফে রুবেল, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আবু মোহাম্মদ, মো. পিন্টু আলী, মো. আনোয়ার ইসলাম, মো. মাহমুদল হক, মো. হামিদুল হক ওরফে কামাল ডাকাত, ইউনুছ আলী, মো. শওকত আলী, বাপ্পী বাকুইল্ল্যাহ ওরফে শফি, মো. আব্দুল করিম, মনসুর, মো. আবুল কালাম, আবদুল গফুর, বেলাল। 

তদন্তে প্রাপ্ত পলাতক আসামিরা হলো- মো সুরুত আলম, মো. আকবর ওরফে ছৈয়দ আকবর ও সাবু।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ সুপার মুহম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী জানান, মামলার আসামিরা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিনা পয়সায় মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে দেশের দালালের মাধ্যমে লোক সংগ্রহ করে বলে প্রমাণ হয়েছে। এ ধরনের একেকটি চক্রে ১০ থেকে ২০ জন সদস্য রয়েছে।

এসপি ফারুকী আরো জানান, তারা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক সংগ্রহ করে প্রথমে চট্টগ্রামে নেয়। সেখান থেকে নেয় কক্সবাজারের টেকনাফে। এরপর টেকনাফ থেকে ধাপে ধাপে তাদের মালয়েশিয়াগামী মাছ ধরার ট্রলারে ওঠায়। ট্রলারে ওঠানোর পর থেকেই যাত্রীদের বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। নির্যাতন ও অনাহারে যাত্রীদের মধ্যে কেউ গুরুতর অসুস্থ বা মৃত্যুবরণ করলে তাদের সাগরে ছুড়ে ফেলা হয়। মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জলসীমায় ট্রলার পরিবর্তন করে যাত্রী হস্তান্তর করা হয়। এভাবে মালয়েশিয়া সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছার আগেই জীবিত সব যাত্রী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, মামলাটির গ্রেফতার হওয়া ও পলাতক আসামিরা প্রায়ই সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাতায়াত করে। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন ও শাহ্ পরীর দ্বীপ এলাকা থেকে মাছ ধরার ট্রলারে পাচার করা ভিকটিমদের তারাই আবার মালয়েশিয়ায় গিয়ে গ্রহণ করে। এরপর মালয়েশিয়ার সাগর তীরবর্তী গহিন বনে জলদস্যুদের টর্চার সেলে নিয়ে যায় তাদের। সেখানে আটকে রেখে ভিকটিমদের বাংলাদেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের কাছে মেসেঞ্জার, হোয়াটস অ্যাপ, ভাইবার বা ইমোর মাধ্যমে ভিডিও কল করে ভিকটিমদের মারধরের ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করে। যেসব যাত্রী টাকা দিতে অসমর্থ হয়, তাদের অনেককেই মেরে সাগরে ছুড়ে ফেলে বা শারীরিক নির্যাতন করে পঙ্গু করে দেয়। এই জলদস্যুদের সঙ্গে মালয়েশিয়ার কিছু পুলিশেরও সখ্যতা রয়েছে। তারা দস্যুদের সহায়তা করে থাকে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এর আগে গত ২০১৫ সালের ১২ মার্চ র‌্যাব-১২ এর কাছে ফজলুর রহমান (৩৫) নামে এক ব্যক্তি তার দুই সন্তান জাহাঙ্গীর ও সোহেলকে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। এতে পাচারকারী হিসেবে টাঙ্গাইল মডেল থানার চৌবাড়ীয়া ও ইছাপাড়া গ্রামের রুবেল, শহিদুল, শওকত ও ইউসুফ চট্টগ্রামের আবু মোহাম্মদ ও পিন্টু এবং কক্সবাজারের আনোয়ার, মাহমুদুল ও হামিদুলের নাম উল্লেখ করা হয়। 

সেই সময় অভিযোগে ফজলুর রহমান বলেন, সন্তানদের কান্না ও আর্তনাদ শুনিয়ে তাদের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা করে দাবি করছে জিম্মিকারীরা। টাকা পরিশোধ না করলে তার সন্তানদের সাগরে ফেলে দেয়ার হুমকি দেয়। এরপর তদন্তে নামে র‌্যাব। 

২০১৫ সালের ২২ মার্চ অভিযান চালিয়ে টাঙ্গাইল থেকে ২ জনকে গ্রেফতার করার পর তারা চট্টগ্রামে থাকা তাদের অন্য সহযোগীদের নাম প্রকাশ করে। পরে চট্টগ্রাম পৌঁছে আরো ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্যমতে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের উদ্দেশে কক্সবাজারের উখিয়ার খুনিয়া পালং এলাকায় জড়ো করা ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় আরো দুই মানব পাচারকারীকে। এরপর তাদের আরো ২ সহযোগীকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। মামলার তদন্তে এ পর্যন্ত মোট ১৮ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এছাড়া লিবিয়ায় ২৬ জন বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার পর মাঠে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। এরই মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানব পাচারে জড়িত অনেককে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বিদেশে পলাতক মানব পাচারকারী চক্রকে ধরতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেয়া হবে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হবে।

সিআইডির এই কর্মকর্তা আরো বলেন, নিরীহ মানুষের জীবনের বিনিময় যে অর্থ-সম্পদ মানব পাচারকারীরা গড়েছে, এই সম্পদ তারা ভোগ করতে পারবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএএম