ঢাকা, শনিবার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ১০ ১৪২৫,   ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪০

মিডাসের সোনালী স্পর্শ

সালমান আহসান নাঈম

 প্রকাশিত: ১৮:৫৬ ৭ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৮:৫৬ ৭ অক্টোবর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

গ্রিক মিথলজি অনুযায়ী এশিয়া মাইনরের ফ্রিজিয়া রাজ্যের রাজা ছিলেন কিং মিডাস। একজন রাজার ভোগ-বিলাসে যা কিছু দরকার সবকিছুই মিডাসের ছিল। বিশাল এক প্রাসাদে অত্যন্ত আভিজাত্যের সঙ্গে বাস করতেন এই রাজা। কিন্তু শাসক হিসেবে ছিলেন অপরিপক্ক এবং অবিবেচক। এমনকি তার খামখেয়ালিপনায় দেবতারা প্রায়ই অসন্তুষ্ট হতেন। নানা রকম ভোগ-বিলাস, মহাভোজ এবং মদ সুরায় বুঁদ হয়ে তিনি এবং তার কন্যা দিন অতিবাহিত করতেন।

দেবতা ডায়োনিসাসের প্রতি মিডাসের দূর্বলতা ছিলো। কারণ ডায়োনিসাস ছিলেন মদ ,উৎসব, ক্রীড়া-অনুষ্ঠানের দেবতা। একদিন সভাসদসহ বাগানে ঘুরছিলেন মিডাস। হঠাৎ দেখলেন বোকা কিসিমের আলুথালু্ এক বৃদ্ধ উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মিডাস খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন তিনি হচ্ছেন ডায়োনিসাসের অভিভাবক এবং সঙ্গী সাইলেনাস। মিডাস তাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করলেন এবং খুব ভালো ব্যবহার করলেন। মোটকথা তার যত্নআত্তির কোনো কমতি রাখেননি মিডাস। সাইলেনাসের প্রতি আতিথেয়তা দেখে ডায়োনিসাস অত্যন্ত খুশি হয়ে মিডাসের একটি ইচ্ছা পূরণ করতে চাইলেন। মিডাস চারপাশে তাকিয়ে তার বিশাল প্রাসাদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মনি মুক্তা দেখে স্বর্ণের অভাব বোধ করলেন এবং ভাবলেন তার আরো সোনা চাই! তিনি ডায়োনিসাসের কাছে আর্জি জানালেন,"এমন ক্ষমতা চাই যেন যা-ই স্পর্শ করবো সেটাই সোনায় পরিণত হয়। ডায়োনিসাস তৎক্ষণাৎ কিং মিডাসের স্পর্শে সবকিছু সোনা হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দিয়ে দিলেন।

সাইলেনাসকে নিয়ে গান গাইতে গাইতে চলে গেলেন ডায়োনিসাস। মিডাস তখন প্রবৃত্ত হলেন প্রাপ্ত ক্ষমতার সত্যতা পরীক্ষা করতে। কাছেই ছিল একটি অলিভ গাছ, মিডাস সেই গাছ স্পর্শ করতেই পাতা ডাল শাখা-প্রশাখাসহ গাছটি মুহূর্তের মধ্যে সোনায় পরিণত হল। মিডাস বুঝতে পারলেন ডায়োনিসাস তার সঙ্গে প্রতারণা করেননি। খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন মিডাস। যা-ই ধরেন তাই সোনায় পরিণত হতে লাগলো। তিনি তার পানপাত্র স্পর্শ করেন সেটা সোনা হয়ে যায়, প্রাসাদের স্তম্ভ স্পর্শ করেন সেটা সোনা হয়ে যায়। একে একে পুরো প্রাসাদটিই স্বর্ণের দ্যুতিতে চকচক করতে লাগলো। মিডাস এই দৈব ক্ষমতা প্রাপ্তি উপলক্ষে বিশাল ভোজের আয়োজন করলেন। ভোজের সময় ক্ষুধার্ত মিডাস আঙ্গুর নিয়ে খেতে লাগলেন তখন তার দাঁত প্রায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ার মতো অবস্থা, কারণ ইতিমধ্যে আঙ্গুরগুলো সোনায় পরিণত হয়েছে। পাশেই রাখা পাউরুটির টুকরা উঠিয়ে নিলে সেগুলোও মুহুর্তেই শক্ত সোনা হয়ে যায়।

হতাশায় পর্যুদস্ত মিডাস যখন তার আরামদায়ক বিছানায় বালিশে মাথাটা ঠেকালেন, পর মুহূর্তে আবিষ্কার করলেন বালিশটা সোনার ধাতব পদার্থে পরিণত হয়েছে। ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠে কন্যাকে ডাকলেন। মিডাসের কন্যা মেরিগোল্ড রাজ্যের অতি রূপবতীদের একজন। মিডাস জীবনের চাইতেও মেয়েকে বেশি ভালোবাসতেন। কন্যাকে দেখে চরম একটি ভুল করে ফেললেন মিডাস, হাতের স্পর্শে রূপবতী মেরিগোল্ড প্রতিমা চেহারার স্বর্ণের মূর্তি হয়ে গেল! প্রচন্ড অনুতপ্ত হয়ে দেবতা ডায়োনিসাসের সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগলেন মিডাস এবং এই ক্ষমতা সরিয়ে নিতে অনুরোধ করলেন। তখন ডায়োনিসাস বললেন, সারডিস শহরে যাও, যে নদীর উপরে শহরটি তৈরি তার উৎসস্থল সন্ধান করো। সেই উৎসস্থলে গিয়ে অবগাহন করলেই অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে, তোমার মেয়েও আগের মত ফিরে আসবে!

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলেন মিডাস। ক্ষুধার্ত, পরিশ্রান্ত, বিধ্বস্ত মিডাস পেক্টোলাস নদীর উৎসস্থলে পৌঁছালেন। ছেঁচড়িয়ে মিডাস কোনোক্রমে নদী পর্যন্ত গেলেন। মাথা এবং শরীর নদীতে ডুবিয়ে দিলেন। প্রতিমুহূর্তে আশঙ্কা করছিলেন নদীর পানিও এই বুঝি সোনায় পরিণত হবে, কিন্তু সেটা হলো না। বরং তিনি অনুভব করলেন এক অবারিত স্বাধীনতা আর অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তির আনন্দ! মিডাস দেখতে পেলেন তার ডুবন্ত হাত থেকে সোনার দানা ছড়িয়ে ছিটিয়ে নদীর তলদেশে মিলিয়ে যাচ্ছে! সেই থেকে প্যাক্টোলাস নদীর উৎসস্থল সোনার জন্য বিখ্যাত হয়ে গেল।  

মিডাস ফিরে এসে তার কন্যা এবং প্রাসাদকে আগের মতোই আবিষ্কার করেন। তিনি ডায়োনিসাসের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকলেন। মিডাস চরম শিক্ষা পেলেন এই ঘটনা থেকে। কিন্তু শিক্ষার যেন শেষ নেই তার। ভোগ-বিলাসের জীবন থেকে বিদায় নিয়ে মিডাস সাধারণ জীবন-যাপন করতে লাগলেন আর বেশিরভাগ সময় কাটাতে লাগলেন গ্রাম্য গানের দেবতা প্যানের সঙ্গে। কিছুদিন পর মিডাস আবারো একটি বড় ধরনের ভুল করে বসলেন, দেবতা অ্যাপোলোর চাইতেও প্যানের সুরের প্রশংসা করে। অ্যাপোলো ছিলেন সুর এবং সূর্যের দেবতা, সামান্য এক রাজার উদ্ধত্য তার সহ্য হলো না। তিনি ভাবলেন একমাত্র গাঁধার কানই তার সুরের মর্মার্থ বুঝতে পারবে না তাই তিনি মিডাসের কান দুটোকে গাঁধার কানের মতো করে দিলেন।

ভুল বুঝতে পেরে গাঁধার মতো কান দুটো বড় টুপির নিচে লুকিয়ে রাখতে লাগলেন। শুধুমাত্র তার নাপিত-ই সেই কানগুলোকে দেখতে পেল। নাপিত সেগুলোর গোপনীয়তা রক্ষা করবে বলে রাজার কাছে কঠিন প্রতিজ্ঞা করল। কিন্তু নাপিত সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারলো না, গভীর রাতে দূরের একটি মাঠে গিয়ে সেখানে গর্ত করে মুখ এনে বলে ফেললো "আমাদের রাজার গাঁধার কান।" অনেকদিন নিজের ভেতরে রাখা এই কথা বলে নাপিত হালকা বোধ করলো, তারপর গর্তটি মাটি চাপা দিয়ে চলে আসলো সেখান থেকে। এরপর শীত চলে গিয়ে এলো বসন্ত কাল। সেই মাঠে গাছপালা জন্মালো ফুলে ফুলে শোভিত হতে লাগলো। মৃদু বাতাসে যখন গাছগুলো দুলে উঠতো, তাদের আওয়াজ শোনা যেত। তারা যেন বলতো "আমাদের রাজার গাঁধার কান"। যা গাছপালার নিচের মাটিতে সমাধিস্থ করে গিয়েছিলেন মিডাসের সেই নাপিত। ধীরে ধীরে এই কথা সমস্ত রাজ্যে ছড়িয়ে পড়লো।

হাতের সোনালী স্পর্শ এবং গাঁধার কান নিয়ে রাজা হিসেবে তখনকার দিনে মিডাসের তেমন কদর ছিল না। অন্যান্য রাজাদের প্রজারা যেমন বিশাল বিশাল মূর্তি আর উপাসনালয়ের মাধ্যমে তাদের মনে রেখেছিল, মিডাসের প্রজারা তাকে একটু ভিন্নভাবেই মনে রেখেছে, "পেক্টোলাস নদীর তলদেশের দ্যুতিময় প্রবাহে কিংবা ফ্রিজিয়ান হাওয়ার মর্মর ধ্বনিতে।"

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড