ঢাকা, শনিবার   ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৩ ১৪২৫,   ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪০

বিখ্যাত সব চুরি

জুনায়েদ হোসেন

 প্রকাশিত: ১৪:০৩ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৩:৪৫ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সিনেমাতে প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায় বুদ্ধিদীপ্ত কিছু চোর প্রবল সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্য থেকেও অমূল্য সব বস্তু চুরি করে। যা বাস্তবে একদমই অসম্ভব বলে মনে হবে।তবে এ অসম্ভবকে সম্ভব করে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে এমনই কিছু চালাক, ধোকাবাজ ও বুদ্ধিদীপ্ত চোর।ব্যাংক ডাকাতি, হীরা জহরত চুরি, জাদুঘরের মূল্যবান বস্তু চুরি করে তারা বিস্মিত করেছে বিশ্ববাসীকে।আজ এমনই কিছু চোর সম্পর্কে জেনে নিন যারা অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন-

সোসাইটি জেনারেল ব্যাংক রোবারি

সোসাইটি জেনারেল ব্যাংকের সুয়ারেজ লাইন

সালটা ১৯৭৬, অন্য সব দিনের মত দু’দিন সাপ্তাহিক  ছুটির শেষে  ফ্রান্সের জেনারেল ব্যাংক খোলা হয়।কিন্তু ব্যাংকের প্রায় লকারগুলো অন্য সব দিনের মত সুরক্ষিত ছিল না।ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাংকের প্রায় ৪০০ তালাবদ্ধ লকার খোলা অবস্থায় দেখে যেগুলো ছিল একদমই খালি।পরর্বতীতে হিসেব করে দেখা যায় প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলারের অর্থ সেখান থেকে গায়েব।যা কিনা এখনকার হিসেবে এক অকল্পনীয় অঙ্কের অর্থ।এটা ছিল ফ্রান্সের ইতিহাসের সব থেকে বড় ব্যাংক ডাকাতি। সব থেকে মজার বিষয় হচ্ছে চুরির পর ডাকাতরা দেয়ালে লিখে রাখে "উইদাউড ওয়েপন্স,নো হার্টস,নো ভায়োলেন্স"। তখন  ফ্রান্সের পুলিশের ঘুম প্রায় হারাম হয়ে যায়।সকলেরর মনে একটাই প্রশ্ন এত ভালো সুরক্ষা ব্যাবস্থার পরেও কিভাবে ডাকাতরা ভেতরে ঢুকলো?তবে এর উত্তর পাওয়াটা এত সহজ ছিল না।অনেক খোঁজাখুঁজির পর প্রথম ব্রেকথ্রু পাওয়া যায় ডাকাত দলের একজনের প্রেমিকার কাছ থেকে।পুলিশের ব্যাপক চাপের মুখে সত্য কথা বলে দেয় মেয়েটি এবং তার দেয়া তথ্যের অনুসরণ করে পুলিশ ডাকাতদের ধরতে সক্ষম হয়।

সোসাইটি জেনারেল ব্যাংকের লকার

এই চুরির মাস্টারমাইন্ডে ছিল আলবার্ট ইস্পাজিয়ারি, তাকেও ধরে ফেলে পুলিশ।তিনি ছিলেন একজন প্রাক্তন সেনাবাহিনীর সদস্য। অবসরের পর সাধারনভাবেই জীবন-যাপন করছিলেন কিন্তু তিনি ছিলেন খুবই উচ্চাকাঙ্খিত।সব সময় ধনী ব্যাক্তিদের মত জীবন যাপনের স্বপ্ন দেখতেন। সে সময় মানুষের ধারণা ছিল ব্যাংকের লকারের কাছে পৌঁছানো অসম্ভব। কারণ এর লকারটি ছিল মাটির নিচে আন্ডারগ্রাউন্ডে।আর সেজন্য আলবার্ট চুরির জন্য মাটির নিচের রাস্তাকেই বেছে নেন। আলবার্ট একদল প্রফেশনাল গ্যাংস্টার ভাড়া করেন এবং ব্যাংকের সুয়ারেজ লাইন ধরে সুরঙ্গ খুড়তে শুরু করেন।তাদের এ সুরঙ্গ লকারের কাছে যেতে প্রায় দুই মাস লেগেছিল।এরপর দু’দিনের ছুটির মধ্যে তারা ডাকাতি সম্পন্ন করে।ডাকাতির আগে আলর্বাট তার টিম মেম্বারদের কফি আর এলকোহল থেকে দূরে থাকতে বলেন এবং টানা দশ ঘন্টার একটা লম্বা ঘুম দিতে বলেছিলেন।আলর্বাট পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে যায় তারপর তাকে পুলিশ আর ধরতে পারেনি। ৫০ বছর পর আলর্বাট এর মৃত দেহ তার মায়ের ঘরের সামনে পাওয়া যায়।

ফ্রাঙ্ক উলিয়াম এভাগনেইল

মাঝে ফ্রাঙ্ক উলিয়াম এভাগনেইল

১৯৪৮ সালের ২৭ সে এপ্রিল এমন একজন মানুষের জন্ম হয় যে কিনা পরবর্তীতে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রড প্রোটেকশন সিস্টেমকে নাকানি চুবানি খাওয়ায়।মাত্র পনেরো বছর বয়েসে সে প্রথম প্রতারণা করে যার শিকার হয় তার বাবা।এভাগনেইল তার বাবার ক্রেডিট কার্ড থেকে যে টাকা চুরি করে তা বুঝতে তার বাবার প্রায় একমাস সময় লাগে।ফ্রাঙ্কের ভিতর পারসুয়েশন বা কথা বলে মানুষকে সম্মহিত করার এক বিশেষ ক্ষমতা ছিল।যাতে করে মানুষ খুব সহজেই তাকে বিশ্বাস করে ফেলত আর প্রতারণার শিকার হত।মাত্র ২১ বছর বয়সে সে ৮ টি নকল পরিচয় বানায় এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংক একাউন্ট খোলে চেক জালিয়াতি করে।ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে কখনো খুঁজে পায়নি।কীভাবেই বা পাবে, তার সকল পরিচয়ই তো ছিল নকল।তিনি মানুষকে নানাভাবে ধোঁকা দিয়েছিলেন কখনো ডাক্তার বেশে কখনো বা উকিলের বেশে।তার যখন বিমান ভ্রমণের ইচ্ছে জাগে তখন তিনি ভূয়া পাইলটের লাইসেন্স বানিয়ে হয়ে যান পাইলট।শেষমেষ চেক জালিয়াতির অপরাধে তার ১২ বছরের জেল হয়।জেলে থাকা অবস্থায় তাকে ফ্রড প্রোটেকশন সিস্টেমে কাজ করার একটি সুযোগ করে দেয় এফবিআই।তিনি ৫ বছরের মাথায় জেল থেকে ছাড়া পান। বর্তমানে এফবিআই এর হয়ে মার্কিন ফ্রড প্রোটেকশন সিস্টেমকে আরো ডেভেলপ করছেন।তাকে নিয়ে তৈরি হয় বিখ্যাত হলিউড সিনেমা 'ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান'।ব্যাপক ব্যাবসাসফল এ সিনেমাটিতে দেখানো হয় কীভাবে চোর থেকে তিনি হয়ে ওঠেন একজন এফবিআই কর্মকর্তা।

ডেন কুপার

ডেন কুপার

৪ নভেম্বর ১৯৭১ সাল। এদিন মার্কিন পোর্টল্যান্ড আরিগান থেকে ওয়াশিংটনে যাওয়ার জন্য ২টি টিকিট কিনেন ডেন কুপার নামক এক ব্যাক্তি।বিমানটি আকাশে উড়তেই ৪০ বছর বয়সী ডেন কুপার একজন এয়ার হোস্টেসকে হাত ইশারা করে ডাক দেন। এয়ার হোস্টেস কাছে যেতেই কুপার তার স্যুট হালকা খুলে দেখান তার কাছে বোম রাখা আছে এবং এয়ার হোস্টেসকে তার পাশের সিটে বসে পড়তে বলেন।এটি ছিল যুকাতরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম বিমান হাইজ্যাক।কুপার দুই লাখ ইউএস ডলার মুক্তিপন দাবি করেন। যা বর্তমান ডলারের হিসেবে ১ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলার।বিমানটি সিআটল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করানো হয় এবং কুপারের চাহিদা মত দুই লাখ ইউএস ডলার ও চারটি প্যারাশুটের ব্যাবস্থা করে দেয়।এরপর কুপার সমস্ত যাত্রীদের ছেড়ে দেয় কিন্তু বিমানটিকে পুনরায় উড়ানোর নির্দেশ দেন।উড়ন্ত অবস্থায় বিমানের সকল স্টাফদের ককপিটে বন্দী করে প্যারাশুট নিয়ে বিমান থেকে লাফ দেয়।পুলিশ পুরো শহর তল্লাসী শুরু করে কিন্তু কুপারের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।কোথায় গিয়েছিল কুপার?আমরা যে নামে তাকে চিনি সেটা কি তার আসল নাম?এসব কোনো প্রশ্নের উত্তর আজ পর্যন্ত মেলেনি।এটি ছিল ইতিহাসের সব থেকে ভয়ানক ও সফল বিমান হাইজ্যাক।আর তিনি এখনো ডি বি কুপার নামে ইন্টারনেটে বিখ্যাত।

গ্রান্ড মিউজিয়াম আর্ট থেফট

গ্রান্ড মিউজিয়াম

১৮ মার্চ ১৯৯০ সালের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের ইসাবেল গ্রান্ড মিউজিয়াম এ দু’জন পুলিশ আসে এবং মিউজিয়ামের দু’জন গার্ডকে চুরির অপরাধে গ্রেফতার করা হয়।তাদের মিউজিয়ামের বাহিরে বেঁধে রেখে পুলিশ দু’জন মিউজিয়ামের ভিতরে প্রবেশ করে।গার্ড দু’জন ঐখানে ততক্ষণ বন্দি ছিল যতক্ষণ না তারা বুঝতে পারে মিউজিয়ামে ডাকাত পড়েছে।আর ডাকাতরাই তাদের বেঁধে রেখে মিউজিয়ামের ভিতর ডাকাতি করছে।বিলিয়ন ডলারের একটি ছবি পুলিশধারী চোররা চুরি করে এবং তাদের আজ পর্যন্ত কোনো হদিস মেলেনি। মিউজিয়ামে হওয়া আধুনিক যুগের এটি সবচেয়ে বড় চুরি।

হেরি উইনস্টোন রবারি

হেরি উইনস্টোন

ডিসেম্বর ৪, ২০০৮ সালে প্যারিসের বিশ্ব বিখ্যাত জুয়েলারি স্টোর হেরি উনসোনে অন্যসব দিনের মতই রাতে দোকান বন্ধের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল।এই দোকান থেকে নাম করা অভিনেত্রীগণ জুয়েলারি কিনে থাকেন।ঠিক ওই সময়ে তিনজন সুন্দরী রমনী ও একজন ভদ্রলোক দোকানে আসেন।দোকান বন্ধের সময় প্রবেশ তারা করলেও তাদের জন্য কিছু সময় খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের অলঙ্কার দেখানো শুরু করে দোকানী।কিন্তু হঠাৎ করে একজন মহিলা তার ব্যাগ থেকে ৩৫৭ ক্যালিভার পিস্তল বের করে এবং অপরজন তার হাতে হ্যান্ড গ্রেনেড নেয়।তখন হেরি উইনস্টোন দোকান কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে তারা আসলে কেউ মহিলা নয় সবাই ছিল পুরুষ।ওই দিন হেরি উইনস্টোনে কোনো ছিচকে চোর হানা দেয়নি বরং ডাকাতি করতে গিয়েছিল সার্বিয়ার কুখ্যাত ডাকাত দল 'পিং প্যানথার'।তারা সমগ্র বিশ্বে ১২ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ ডাকাতি করেছে।তারা এতটাই দক্ষ তাদের কাজে যে ঐ দিন মাত্র ১৫ মিনিটে ১০৮ মিলিয়ন ডালারের জুয়েলারি চুরি করে নেয়! এবং আজ পর্যন্ত তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস