বাড়ির ছাদে বিমান বানিয়ে কোটিপতি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২১ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪২৬,   ১৫ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

বাড়ির ছাদে বিমান বানিয়ে কোটিপতি

 প্রকাশিত: ১১:৫৮ ৮ জুন ২০১৮  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের মুম্বাইয়ে বাড়ির ছাদে বিমান তৈরি করে রাতারাতি বিখ্যাত বনে গেল এক পাইলট। ভারতীয় পাইলট যাদব আমল বাড়ির ছাদে বিমান নির্মাণ করেন, তারপর বিমান নির্মাণের কারখানা স্থাপনের জন্য তার সঙ্গে ৫.৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে ভারতীয় সরকার।

২০০৯ সালে ভারতীয় মিডিয়ায় একটি খবর সয়লাব করে। বানিজ্যিক বিমানের এক পাইলট ঘোষণা করেন, তিনি নিজেই বাড়ির ছাদে বিমান নির্মাণ করতে চান। অনেকেই তা শুনে হাসাহাসি করে। একজন পাইলট কিভাবে বিমান নির্মাণ করতে পারে? বিমান নির্মাণের কঠিন সূত্রগুলো তো তার জানা নেই। এরোন্যাটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জ্ঞান ও তার থাকার কথা নয়। তখন কেউ পাত্তা দেয়নি। কিন্তু ৯ বছর পর ৪২ বছর বয়সী পাইলট যাদব তার স্বপ্ন পূরণ করেন। শুধু স্বপ্ন পূরণ নয়। মহারাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার তার সঙ্গে ৩৫০০ কোটি ভারতীয় রুপির চুক্তি করেন বিমান তৈরির কারখানার জন্য।

যাদব সিনিয়র কমান্ডার হিসেবে জেট এয়ারওয়েজ এ চাকরি করেন। সেখানে সে টুইন-ইঞ্জিন টাবারপ্রেপ প্লেন চালান। এবং সঙ্গে সঙ্গে বিমান নির্মাণের স্বপ্ন তার দীর্ঘদিনের। ১৯৯৮ সালে সে ১৬০ ডলার খরচ করে ট্রাকের ছয় সিলিন্ডার পেট্রোল ইঞ্জিন কিনেন তার প্রথম বিমান তৈরির জন্য। কিন্তু কিছু ভুলের জন্য তখন সে তার স্বপ্নের প্রকল্পটি স্থগিত করেন। বিমান আর নির্মাণ করা হল না তখন। কিন্তু সে আশা ছাড়েননি। পরের বছর আবার সে চিন্তা করেন নতুন করে শুরু করবে। প্রথমবারের থেকে আরো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং খানিকটা অভিজ্ঞ ও বটে আগের বারের থেকে। প্রথমবার করা ভুল গুলো আর করা চলবে না। এখন দরকার একটি নতুন ইঞ্জিন সঙ্গে আরো কিছু টাকা। কিন্তু বাধ সাধলো টাকার অভাব। বাবার কন্সট্রাকশন ব্যবসায় ধস নামে। টাকার যোগাড় হচ্ছে না। পরিবার তাকে উৎসাহ যোগাত। মা নিজের মঙ্গল সূত্র নেকলেস বিক্রি করে দিয়ে ছেলের হাতে টাকা গুঁজে দিল। মায়ের দেয়া টাকা আর অদম্য ইচ্ছে নিয়ে কাজে নেমে পরে যাদব। একটি ওয়ার্কশপ তৈরি করে হাতে নেন ছয় সিটের বিমান নির্মাণের কাজ। চার বছর ব্যয় করেন। প্রথমবারের করা ভুল গুলো শুধরে এবার সে স্বপ্ন পূরণের দিকে এগিয়ে যায়। নির্মাণও করেন একটি বিমান। প্রথমবারের থেকে উন্নত এবারের বিমান। সফলভাবে রাস্তায় বিমান পরীক্ষা করেন ও কিন্তু সরকার রেজিস্ট্রেশন করতে অস্বীকার করে। এবারও স্বপ্ন পূরণ হলো না।

কয়েক বছর পর সে জেট এয়ারওয়েজ এ পাইলট হিসেবে জয়েন্ট করে। বাবার নির্মাণ ব্যবসাও ভালো চলছিল তখন। যাদব নিজেও চাকরি করছে। হাতে টাকাও আছে। আরেকটা চেষ্টা করাই যায়। ২০০৯ সালে আবার সে তৃতীয়বারের মত কাজ শুরু করেন। এবার সে ঘোষণা দেয় নিজের পাঁচ তলা বাড়ির ছাদেই বিমান নির্মাণ করবেন তিনি। জেট এয়ারওয়েজ এর প্লেন উড়িয়ে বাসায় ফিরে বিশ্রাম না নিয়ে সিড়ি ভেঙে ছাদে উঠে স্বপ্ন পূরণে কাজ করত যাদব।
সাত বছর ধরে লেগে থাকেন তিনি। তার ছোট দল নিয়ে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শেষ করেন তিনি। তার তৈরি ছয় সিটের বিমান এখন উড়তে প্রস্তুত। যাদব বলেন তার নিজের অর্থের প্রায় ৮ লাখ ডলার ও পরিবারের কিছু সম্পত্তি বিক্রি করতে হয় তার এই বিমান নির্মাণের জন্য। তারপরও সে খুশি। বিমান তৈরি হয়ে গেল কিন্তু এটা তো সবাইকে জানানো দরকার ভারতীয়রা নিজেরাই সক্ষম বিমান নির্মাণের জন্য। তখন মুম্বাইতে ‘মেইড ইন ইন্ডিয়া’ শিরোনামে ভারতীয় সরকারের ক্যাম্পেইন চলছিল উদ্দ্যোক্তাদের কারখানা স্থাপনে আগ্রহী করতে। যাদব সেই সুযোগটি লুফে নেয়। তার বিমানটি পরিদর্শনের জন্য নিয়ে যান। কিন্তু অর্গানাইজাররা খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করে না। তারপর ও সে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে ক্রেনে করে তার বিমান অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে যায়। হতাশ করেনি ক্যাম্পেইন দেখতে আসা দর্শকরা। তার বিমানের সামনে ভিড় পরে যায়। তিনি ব্যাখা করেন তার নির্মিত বিমানে শক্তিশালী ইঞ্জিন আছে। এটি ৪০০০ মিটার উপর দিয়ে চলতে পারে। এবং একবার তেল নিয়ে এটি ২৫০০ কিলোমিটার উড়তে পারে। জনপ্রিয়তা পান তিনি ও তার বিমান। তা দেখে ২০১৭ সালে ভারতীয় সিভিল এভিয়েশনের ডিরেক্টর তার বিমানের রেজিষ্ট্রেশন দেয়। এটি এখন মুম্বাই এয়ারপোর্টে আছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে এটি আকাশেও উড়বে।

ভারত বর্তমানে পৃথিবীতে চতুর্থ বৃহত্তম বিমান চালনার বাজার। কিন্তু চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ভারতকে, এয়ারলাইন্সের বোয়িং, এয়ারবাস, এটিআর এবং এমব্রের মত বিদেশি বিমান প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি দ্বারা নির্মিত বিমানগুলি পরিচালনা করতে হয়। ভারতের রাষ্ট্র পরিচালিত কোম্পানী হুন্ডিৎসান এয়ারোনটিক্স লিমিটেড (এইচএল) বিমান নির্মাণ করতে সক্ষম, কিন্তু তা কেবল সামরিক বিমানের জন্য সীমিত। যাদবের উদ্ভাবন দেখে ভারতীয় সরকার সিদ্ধান্ত নেয় তারা যাদবকে কাজে লাগিয়ে ভারতে বিমান নির্মাণ শিল্প গড়ে তুলবে। ২০১৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি যাদবের থ্রাস্ট এয়ারক্রাফট কোম্পানির সঙ্গে মহারাষ্ট্র কেন্দ্রীয় সরকারের ৩৫০০ কোটি ভারতীয় রুপীর চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ভারত বানিজ্যিকভাবে বিমান শিল্প নির্মাণে এগিয়ে যায় যাদবের হাত ধরে। মুম্বাইয়ের ১৪০ কিলোমিটার উত্তরে পলগারের ৬৪ হেক্টর এলাকা জুড়ে তৈরি হবে বিমান উৎপাদন কারখানাটি। এই প্রকল্পের ফলে কর্মসংস্থান ঘটবে অনেক বেকার যুবকের।

বাড়ির ছাদের তৈরি করা বিমান থেকে যাদব এখন কোটিপতি। তার বিমান নির্মাণের স্বপ্ন পূরণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেশকেও এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে

Best Electronics