বাস্তব চরিত্রের মতো দেখতে যে অভিনয়শিল্পীরা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২০ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৭ ১৪২৬,   ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

বাস্তব চরিত্রের মতো দেখতে যে অভিনয়শিল্পীরা

 প্রকাশিত: ০২:৩০ ২১ জুলাই ২০১৮   আপডেট: ০২:৩০ ২১ জুলাই ২০১৮

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

বায়োপিক। প্রখ্যাত অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের জীবন নিয়ে রাজকুমার হিরানী পরিচালিত, রনবীর কাপুর অভিনীত বায়োপিক সঞ্জু মুক্তি পাবার পর থেকেই উপমহাদেশের সিনেমা দর্শকরা বায়োপিক জ্বরে আক্রান্ত। বায়োপিকে অভিনয়ের সময় অভিনেতারা চেষ্টা করেন বাস্তবের মানুষটার কতখানি কাছাকাছি নিজেকে নিয়ে যাওয়া যায়।

এজন্য কেউ কেউ সাহায্য নেন মেথড অ্যাক্টিংয়ের। কেউ আবার আশ্রয় নেন মেকাপের। কিন্তু কোনো কোনো অভিনেতা চরিত্রের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন একদম সহজেই। যেন ঐ চরিত্রটি করার জন্যেই জন্ম হয়েছে তার। হলিউডের এমনই কয়েকজন বায়োপিক অভিনেতাদের নিয়ে আলোচনা করবো, যাদের দেখে মনে হয়েছে সিনেমার কোনো অভিনেতা নয়, বরং বাস্তব মানুষটিকেই দেখা যাচ্ছে রুপালী পর্দায়।

স্টিফেন হকিং চরিত্রে এডি রেডমেইন – দ্য থিওরি অব এভরিথিং (২০১৪)


এই ছবিতে তরুন ব্রিটিশ অভিনেতা এডি রেডমেইন অভিনয় করেছেন দুরারোগ্য ব্যাধি অ্যামিওট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিসে আক্রান্ত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের চরিত্রে। চরিত্রটি পেতে কোনো গুণপরীক্ষা বা অডিশন দিতে হয়নি। এরপরেও মাসের পর মাস স্টিফেন হকিংয়ের বিভিন্ন ডকুমেন্টারি এবং ভিডিও ক্লিপিংস দেখে দেখে নিজেকে প্রস্তুত করেন রেডমেইন। দু’জনের মধ্যকার শারিরীক গড়নের মিল আশ্চার্যজনক। এর সাথে হকিংয়ের জড়িয়ে আসা বাচনভঙ্গিও রপ্ত করেছিলেন মুন্সিয়ানার সঙ্গে।

মুভিটি মুক্তি পাবার পর অন্য অনেকের মত উপভোগ করেন স্বয়ং হকিং। এবং দেখার পর বারংবার পরিচালকের কাছে ই-মেইল পাঠিয়ে রেডমেইনের অভিনয়ের প্রশংসা করেন। তিনি জানান কয়েকটি দৃশ্য দেখে তার মনে হয়েছে তিনি যেন নিজেকেই পর্দায় দেখছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই অসাধারণ অভিনয়ের জন্যে পেয়ে যান সে বছরের সেরা অভিনেতার অস্কার পুরষ্কার।

জিম মরিসন চরিত্রে ভাল কিল্মার- দ্য ডোরস (১৯৯১)

১৯৮৮ সালের উইলো ছবিতে কিল্মারকে দেখেই পরিচালক পলিভার স্টোন ঠিক করে ফেলেন, দ্য ডোরস ব্যান্ডের দলনেতা জিম মরিসনকে নিয়ে যে বায়োপিকটি বানাবেন, তাতে মূল চরিত্রে অভিনয় করবেন কিল্মার। এর কারণ ছিল দু’জনের চেহারা এবং স্বাস্থ্যের মারাত্মক মিল। মুভিতে সুযোগ পেয়েই কমিয়ে ফেলেন ওজন। গাইতে শেখেন জনপ্রিয় ব্যান্ডটির পঞ্চাশটিরও বেশি গান। সাহায্য নেন মেথড অ্যাক্টিংয়ের। ঠিক জিম মরিসনের মতই পোশাক পরা শুরু করেন, তার মতই ব্যবহার করতে শুরু করেন। সোজা কথা জিম মরিসন হিসেবেই জীবন যাপন করতে থাকেন। তাও একদিন দু’দিনের জন্য নয়, শ্যুটিং শুরুর আগে পুরো এক বছরের জন্য এমন চলতে থাকে। মজার ব্যাপার হল তার গান গাওয়ার সময় জনপ্রিয় ব্যান্ডটির অন্য সদস্যরা বুঝতেই পারছিলেন না ওটা মরিসনের রেকর্ড করা কন্ঠ নাকি কিল্মারের গলা।

আব্রাহাম লিংকন চরিত্রে ড্যানিয়েল ডে লুইস- লিংকন (২০১২)

আব্রাহাম লিংকন এমন এক সময়ের মানুষ ছিলেন যখন একজন রাস্ট্রপতির প্রতিদিনকার জীবনযাত্রা লিপিবদ্ধ করা হতো না। তাই তার চরিত্রে ডে লুইসের অভিনয়ের সম্পর্ক স্থাপন করাটা কিছুটা মুশকিল। কিন্তু মেথড অ্যাক্টিংয়ের কিংবদন্তি ডে লুইসের দরকার ছিল অল্প কয়টি  আর্কাইভ ছবি এবং কিছু স্মৃতি কথা। তাতেই পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন আমেরিকার ষোড়শ রাস্ট্রপতিকে। অসাধারন অভিনয়ের জন্য জিতে নেন সেরা অভিনেতার অস্কার পুরষ্কার। আর সেজন্য তার সঙ্গে ছিল নিজের অসাধারণ অভিনয় প্রতিভা, আর সঙ্গে একটু খানি নকল দাঁড়ি।

চার্লি চ্যাপলিন চরিত্রে রবার্ট ডাউনি জুনিয়র- চ্যাপলিন (১৯৯২)

হলিউড ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র চার্লি চ্যাপলিনের ক্যারিয়ার ছিল প্রায় ৭৫ বছরের। তার মধ্যে সবচেয়ে সোনালী সময়টা পার করেছেন নির্বাক ছবির তারকাভিনেতা হিসেবে। এখনকার দর্শকদের কাছে আয়রন ম্যান নামে পরিচিত ডাউনি জুনিয়র চার্লির চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন। আর এর পেছনে বেশি ভূমিকা ছিল ডায়লগবিহীন দৃশ্য গুলোতে চ্যাপলিনের হুবহু অনুকরণ। অঙ্গবিন্যাস থেকে শুরু করে চ্যাপলিনের সিলুয়েট পর্যন্ত সবকিছুকেই নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল পর্দায়। এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য টেনিস খেলা থেকে বেহালা বাজানো সবই শিখেছেন ডাউনি জুনিয়র। তার ফলাফলও ছিল দারুণ।

মেরিলিন মনরো চরিত্রে মিশেল উইলিয়ামস- মাই উইক উইথ মেরিলিন (২০১১)

মেরিলিন মনরো ছিলেন একজন অদ্বিতীয় তারকা। কিন্তু বাস্তবের মেরিলিন এবং পর্দার মেরিলিনের মধ্যকার মিল ছিল চোখ কপালে তোলার মত। আর দশটা বায়োগ্রাফিকাল ড্রামার মত ছিল না এই মুভিটি। মনরোর জীবনের বড় কোন পর্যায় নয়, বরং দ্য প্রিন্স এন্ড দ্য শো গার্ল মুভির শ্যুটিংয়ের কেবল সাতদিনের জীবনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন উইলিয়ামস। একই সাথে নিজের ব্যক্তিগত সহকারীর সঙ্গে বিতর্কিত প্রেমের ঘটনাও দেখা যায় মুভিটিতে। মুভিটির মাধ্যমে মেরিলিনের জীবনের অনেক গুলো দিক তুলে ধরেছেন উইলিয়ামস। অভিনেত্রী, প্রেমিকা এবং গায়িকা, সব চরিত্রেরই দেখা মেলে পর্দার মেরিলিনের মাঝে। অসাধারণ অভিনয়ের জন্য উইলিয়ামস জিতে নেন সেরা অভিনেত্রীর গোল্ডেন গ্লোব পুরষ্কার।

রে চার্লস চরিত্রে জেইমি ফক্স – রে (২০০৪)

কিংবদন্তি গায়ক রে চার্লসের চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে সেরা অভিনেতার অস্কার জেতেন জেইমি ফক্স। আর এ জন্যে তিনি অনুপ্রেরণা নেন স্বয়ং রে চার্লসের কাছ থেকেই। চরম দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করা রে চার্লস ছিলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। কোনটিই তাকে ইতিহাসের পাতায় জায়গা নেওয়া থেকে আটকাতে পারে নি। তাইতো এই কিংবদন্তির চরিত্রে অভিনয়ের সময় নিজের প্রতিভার সবটুকু ঢেলে দেন ফক্স। নিজেকে যে সোউল মিউজিকের এই অগ্রদূতের চরিত্রের ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছিলেন ফক্স। যদিও চার্লসের গান নিজের গলায় গাওয়ার স্পর্ধা দেখাননি ফক্স। বরং চার্লসের চলন বলন বাচনভঙ্গী সবকিছুকেই হুবহু পর্দায় তুলে ধরেছেন তিনি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী চার্লসের চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে আঠা দিয়ে নিজের চোখের পাতা আটকে রেখে রিহার্সেল করতেন ফক্স। শিখেছিলেন ব্রেইল পদ্ধতির পড়াশোনাও। আর পিয়ানো বাজানোর শিক্ষাটা নিয়েছিলেন স্বয়ং কিংবদন্তি চার্লসের কাছ থেকেই।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএ