Alexa বালিশ কাণ্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে ফমেকের দুর্নীতি

ঢাকা, শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৬ ১৪২৬,   ২১ মুহররম ১৪৪১

Akash

বালিশ কাণ্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে ফমেকের দুর্নীতি

হারুন আনসারী, ফরিদপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:৩০ ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের দুর্নীতি যেন রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বালিশ ক্রয়ের দুর্নীতিকেও হার মানিয়েছে।

রূপপুরে ছয় হাজার টাকায় বালিশ কেনা হয়েছিল। আর ফমেকে আইসোলেশন কক্ষের পর্দা কেনা হয়েছে ৩৭ লাখ টাকায়।

শুধু তাই নয়, আমেরিকার তৈরি ভিএসএ অনসাইড অক্সিজেন জেনারেটিং প্লান্টে খরচ দেখানো হয়েছে পাঁচ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

বৃহস্পতিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে এসব যন্ত্রপতির খোঁজ নিতে গেলে, দুর্নীতির চিত্রগুলো চোখের সামনে উঠে আসে।

একটি অক্সিজেন জেনারেটিং প্লান্টের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, এ যন্ত্রটি হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের পেছনে পশ্চিম পাশের একটি কক্ষে স্থাপন করা হয়েছে। ওই কক্ষটি তিন বছর ধরে তালা দিয়ে রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্লান্টটি দেখানোর সময় তালা কেটে ওই কক্ষে ঢুকতে হয়েছে। তবে যন্ত্রটি সচল রয়েছে কিনা তা জানা যায়নি। এছাড়া কয়েকটি যন্ত্র খুঁজেই পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনায় অনিয়ম এবং আর্থিক ঘাপলার হয়েছে জানিয়ে এ বিষয়ে তদন্ত করে দুদককে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন হাইকোর্ট। ওই সময় হাসপাতালে ৫১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার ১৬৬টি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে মেসার্স অনিক ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি ৪১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিল পেলেও ১০ কোটি টাকা যন্ত্রপাতির দাম বেশি দেখানোসহ বিভিন্ন অসংগতির কারণে আটকে দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালের ১ জুন অনিক ট্রেডার্স হাইকোর্টে রিট করে।

মন্ত্রণালয়ের স্বাস্ব্য সেবা বিভাগের সচিব ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কাছে অনিক ট্রেডার্সের সরবরাহ করা ১০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতির একটি তালিকা চেয়ে পাঠান। হাসপাতালের পরিচালক কামদা প্রসাদ সাহা ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ওই ১০ কোটি টাকার বিপরীতে দামসহ ১০টি আইটেমের যন্ত্রপাতির একটি তালিকা দেন।

তালিকাটি মিলিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিন পরিদর্শন করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়, পাঁচ কোটি ২৭ লাখ টাকার ভিএসএ অনসাইড অক্সিজেন জেনারেটিং প্লান্টটি তিন বছর ধরে তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচে হাসপাতাল সার্টেইন সিসটেম ফর আইসিইউ/সিসিইউ বেডস কোরিয়া খাতে ১৬টি শয্যার জন্য সাড়ে ১২ হাত দৈর্ঘ্য ও সাড়ে চার হাত প্রস্থের আধুনিক পর্দা কেনা হয়েছে। প্রতিটি পর্দা ক্রয়ে খরচ দেখানো হয়েছে দুই লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৫ টাকা করে। তবে যন্ত্রপাতি থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারি না থাকায় তিন বছর ধরে সিসিইউ ইউনিটটিতে কোনো কার্যক্রম নেই।

ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বে নিয়োজিত সিনিয়র স্টাফ নার্স রাজিয়া সুলতানা জানান, তিনি প্রতিদিন এ কক্ষটি খোলেন এবং দেখাশোনা করে আবার বন্ধ করে দেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিবেদন অনুযায়ী আমেরিকান তিনটি ডিজিটাল প্রসেসর সিস্টেমের দাম দেখানো হয়েছে ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা। প্রকৃত পক্ষে প্রসেসর সিস্টেমগুলো কোরিয়ার তৈরি। যন্ত্রপাতিগুলো ব্যবহার করাও হচ্ছে না।

এছাড়া আমেরিকান ভ্যাকুয়াম প্লান্টের দাম দেখানো হয়েছে ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু এটি পুরনো দন্ত বিভাগে স্থাপন করা হয়েছে। এ কক্ষটিও খোলা হয় না এবং যন্ত্রটিও ব্যবহার করা হয় না।

২৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার আমেরিকান বিআইএস মনিটরিং সিস্টেম মেশিনটি অপারেশন থিয়েটারে স্থাপন করা হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে এটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে স্টোর কিপার আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেছেন, মেশিনটি আছে। হয়তো অন্য কোনো নামে কোথাও পড়ে আছে।
এ দুর্নীতিতে আমেরিকান চারটি থ্রি হেড কার্ডিয়াক স্টেথিসস্কোপের দাম দেখানো হয়েছে এক লাখ ১২ হাজার পাঁচশ টাকা। ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার আমেরিকান দুটি ফাইবার অপটিক ল্যারিনগোসস্কোপ সেট রয়েছে গাইনি ওটি এবং জেনারেল ওটিতে।

ওই সময় ১৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় কেনা কোরিয়ান ছয়টি টোমেটিক স্কাব সিস্টেম অপারেশন থিয়েটারে এবং তিন লাখ টাকায় ১০টি চাইনিজ শাকর্শন মেশিন অপারেশন থিয়েটারের জন্য কেনা হয়। চার লাখ ৮৭ হাজার পাঁচশ টাকা খরচে আমেরিকার তৈরি ২০টি ড্র সিস্টেম ইকুইপমেন্ট আইসিইউ ওয়ার্ডে স্থাপন করা হয়েছে। ওয়ার্ডটি চালু না থাকায় এসব কোনো কাজে লাগছে না।

২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ উন্নয়ন ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয় সংক্রান্ত প্রকল্পের অধীনে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়। ওই সময় ফমেক হাসপাতালের পরিচালক ছিলেন আ.স.ম জাহাঙ্গীর চৌধুরী, এ.বি.এম শামসুল আলম, মো. ওমর ফারুক খান, গণপতি বিশ্বাস শুভ, আবুল কালাম আজাদ। তাদের মধ্যে ওমর ফারুক খান মারা গেছেন।

সাবেক পরিচালক গণপতি বিশ্বাস শুভ জানান, তিনি পরিচালক থাকা অবস্থায় যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি। আদালতে কোনো বিষয়ে মামলা হয়েছে কি না বা আদালত কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন কি না তা জানা নেই।

আ.স.ম জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, যেসব যন্ত্রপাতি কেনার কথা বলা হচ্ছে তা প্রকল্পে যুক্ত ছিল না। এসবের দায়ভার প্রকল্পের উপর কেন বর্তাবে তা আমার বোধগম্য না।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক কামদা প্রসাদ সাহা বলেন, আদালতের নির্দেশনা পাইনি। পেলে নির্দেশনা মেনে চলবেন। দুদক তদন্ত করলে সহযোগিতা করবো। ১০ কোটি টাকার যেসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে তার মূল্য বেশি দেখানো হয়েছে বলে আমার ধারণা। বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর