Alexa বার্সার বুড়ো ম্যাজিশিয়ান

ঢাকা, শুক্রবার   ২৩ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৮ ১৪২৬,   ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

বার্সার ‘বুড়ো’ ম্যাজিশিয়ান

 প্রকাশিত: ১৪:০৯ ২৮ এপ্রিল ২০১৮   আপডেট: ১৪:১২ ২৮ এপ্রিল ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

সাধারণ একটি টি-শার্ট পড়ে অসাধারণ মানুষটি এলেন সাংবাদিকদের সামনে। ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করলেন। শুনে মনে হচ্ছিলো কথা বলতে মানুষটির প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে।

চোখ দুটিও লাল! কথা বলতে বলতে বার বার চোখ মুচ্ছিলেন। যেই কথাটি বললেন সেটি সম্পর্কে সবারই কম বেশি ধারণা ছিলো। তারপরও শুনতে ভালো লাগেনি। বিশ্বাস করতে চায়নি কেউই।

কিন্তু যা হওয়ার ছিলো সেটিই বলে গেলেন তিনি। এই মৌসুমের পর বার্সার জার্সি গায়ে আর মাঝমাঠ দাপিয়ে বেড়ানো হবে না আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার। বললেন, ‘বার্সেলোনায় এটিই আমার শেষ মৌসুম।’ আর সময় যেন থমকে গেলো কিছুক্ষণের জন্য।

তার খেলা দেখেই ফুটবলের প্রেমে পড়া মানুষ গুলো, লাল-নীল জার্সি গায়ে তার জাদু দেখে ফুটবলকে ভালোবাসতে শেখা মানুষগুলো চলে গেলেন ফ্ল্যাশব্যাকে।

চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ম্যাজিক।

৩৩ বছর বয়সী স্প্যানিশ মিডফিল্ডার বার্সায় যোগ দিয়েছেন ১৯৯৬ সালে ১২বছর বয়সেই। ১৮ বছর বয়সে তার অভিষেক হয় প্রধান দলে।

এরপর থেকে বার্সার হয়ে খেলে ফেলেছেন ৬৬৯ টি ম্যাচ। তার উপস্থিতিতে বার্সা জয় পেয়েছে ৪৫৬টি ম্যাচেই ড্র করেছে ১২৮টিতে আর হেরেছে মাত্র ৮৫টি ম্যাচে।

এই সময়ে ইনিয়েস্তা বার্সার হয়ে জিতেছে ৮টি লীগা ট্রফি, ৭টি সুপারকোপা, ৬টি কোপা দেল রে, ৪টি চ্যাম্পিয়নস লীগ, ৩টি উয়েফা সুপার কাপ ও ৩টি ক্লাব ওয়ার্ল্ডকাপ সহ মোট ৩১টি ট্রফি।

সব ঠিক থাকলে বার্সার হয়ে নিজের শেষ সিজনে ৯ম লীগ ট্রফিও তার হাতেই উঠছে এবার। এই দশকের তো বটেই ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মিডফিল্ডারদের তালিকায় ইনিয়েস্তার নাম উপরের দিকেই থাকবে।

মাঠে যখনই নামতেন ফুটবলের নামে জাদু দেখাতেন। কখনো প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে ছুটছেন কখনো ৩-৪ জন প্রতিপক্ষের ফাউলের শিকার হয়েও না পড়ে গিয়ে বলকে পা দিয়ে আগলে রাখছেন।

গোলপোস্টের সামনে গিয়ে নিজের নিশ্চিত গোলও পাস করে দিচ্ছেন মেসিকে গোলটি আরো বেশি নিশ্চিত করার জন্য।

ক্যারিয়ারে গোল করেছেন ৫৭টি আর অ্যাসিস্ট করেছেন ২০০টিরও বেশি। জাতীয় দলের হয়ে করেছেন স্পেনের ইতিহাসে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বকাপ জয়ী গোলটিই।

বার্সার মিডকে ধরে রেখেছেন তিনি বছরের পর বছর। অধিনায়ক হিসেবেও দলকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন সামনে থেকেই।

তিনি তো বার্সা ফ্যানদের নয়নের মণিই। তবে রাইভাল দল রিয়াল মাদ্রিদ এর খেলোয়াড় এবং ফ্যানরাও ইনিয়েস্তাকে সম্মান জানাতে কখনো কুন্ঠাবোধ করেননি।

মাদ্রিদ অনুরাগীদের মধ্যেও বার্সার কোনো খেলোয়াড় যদি অপরিসীম ভালোবাসা পেয়ে থাকেন তিনি হলেন ইনিয়েস্তা। এমনকি তার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে এল ক্লাসিকোতে হারতে থাকা অবস্থায়ও মাদ্রিদ সমর্থকেরা দাঁড়িয়ে সম্মান দিয়েছেন এই জাদুকর কে।

২০১৫-১৬ মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকোতে একটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্টের সাথে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ পারফর্ম্যান্সের মাধ্যমে বার্সার হয়ে খেলা মাত্র তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে ইনিয়েস্তা এই সম্মান টি পান বার্নাব্যুতে।

তার আগে কেবল ম্যারাডোনা ও রোনালদিনহো পেয়েছিলেন এই সম্মান।

বর্তমান সময়ে যেসব শিক্ষার্থীরা ফুটবলের অনুরাগী তাদের সবারই কৈশোর সময় কেটেছে ইনিয়েস্তাকে বার্সার জার্সি পড়েই খেলতে দেখে। বার্সা বলতেই যার নাম মনে পড়ে যার চেহারা চোখে ভেসে ওঠে তার নামই আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা।

এই লোকটিও বার্সাকে ভালোবাসেন মনে প্রাণে। বার্সা ছাড়া কখনো অন্য ক্লাবের হয়ে খেলবেন, এমনটা হয়তো কখনো ভাবেননি তিনি। তবে হয়তো এই ভালোবাসার বার্সার ভালোর জন্যই জায়গা ছেড়ে দিতে চাইছেন নতুন কারো জন্য।

পরিস্থিতি ও সময়ের রসিকতায় চলে যাচ্ছেন দূরে। কিন্তু এখনো যে হৃদয়ে রয়েছে বার্সেলোনা নামের ক্লাবটিই। আর তাইতো তিনি এখনও ভাবতে পারেন না বার্সার প্রতিপক্ষ হয়ে খেলার কথা।

তাই বার্সার বিপক্ষে খেলার ক্ষীণ সম্ভাবনা টুকুও রাখবেন না বলে নিজে দেশ এমনকি মহাদেশ ছেড়েই চলে যাচ্ছেন ইনিয়েস্তা।

সংবাদ সম্মেলনে নিজেই বলেছেন বার্সার প্রতিপক্ষ হয়ে তার খেলার কোনো সম্ভাবনা নেই, তাই তিনি ইউরোপের কোনো দেশের কোনো ক্লাবে খেলবেন না।

ধারণা করা হচ্ছে চীনের কোনো একটি ক্লাবেই হবে তার ভবিষ্যৎ। এই বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এখনো অনেক বিষয় গোছানোর প্রয়োজন আছে। তবে আমি আগেই বলেছি কখনোই বার্সার প্রতিপক্ষ হতে পারবো না তাই আমি ইউরোপে খেলবো না। বার্সাই আমাকে সব দিয়েছে।

তিনি কান্না ভেজা কন্ঠে আরো বলেছেন, আমার জন্য বার্সাকে বিদায় বলাটা খুবই কঠিন একটি কাজ। যেখানে আমি আমার সারাটা জীবন কাটিয়েছি। আমি বর্তমানে যা কিছু অর্জন করেছি তার সিংহ ভাগই বার্সা এবং লা মাসিয়ার অবদান।

তিনি আরো বলেছেন , আমি ক্লাবের ভেতরে ও বাইরে অনেকের সাথেই কথা বলেছি এবং আমি জানি কোচ এবং অন্য খেলোয়াড়েরা কি চান। তবে আমি সবসময়ই ক্লাবটির সাথে সৎ থাকার চেষ্টা করেছি।

তার ছিলো বার্সার সাথে আজীবনের কন্ট্রাক্ট। ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবার তিনি এই কন্ট্রাক্টে আবদ্ধ হন। কিন্তু তিনি হয়তো ক্লাবটিকে এতটাই ভালবাসেন যে এই ক্লাবের ভালোর জন্যেই সরে যেতে চাইছেন।

তার বয়স হয়েছে ৩৩। হয়তো আগের মতো এনার্জি বা ক্ষীপ্রতা নেই তার। আর এসবই বার্সার জন্য নতুন করে তাকে ছেড়ে মিডফিল্ড না সাজানোয় ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে আর তাই সরে যাচ্ছেন তিনি।

তবে এই বয়সেও ইনিয়েস্তা তার আগের মতো না হলেও বেশ ভালো পারফর্ম করে চলেছেন। আর তার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন শেষ কোপা দেল রে এর ম্যাচে দলের ৫-০ জয়ে অসাধারণ অবদান রেখে।

মাঝমাঠের খেলোয়াড় হয়েও মাঠের যেকোনো জায়গায় মানিয়ে নিতে পারেন, যেকোনো পরিস্থিতে নিজের সেরাটা দিতে পারেন, বের করে আনতে পারেন নিজের দলের অন্যদের সেরাটাও।

তাই তো এখনো তার গুরুত্ব এতটুকুও কমেনি দলে।



তবে তিনি কেন চলে যাচ্ছেন এর অনেক ধরণের ব্যাখ্যাই হতে পারে, কিন্তু ফুটবল অনুরাগী এবং ইনিয়েস্তা প্রেমীরা মেনে নিতে পারছেন না তার এই সিদ্ধান্ত।

পেপ গার্দিওলা সহ আরো অনেক কোচ, খেলোয়াড়ই ইনিয়েস্তাকে নিয়ে টুইট করে তাকে সম্মান জানিয়েছেন।
তার মাঠের জাদু, তার সরল হাসি আর বার্সায় তার শেষ চ্যাম্পিয়নস লীগ ম্যাচে তার চোখের পানি বর্তমানের যে কোনো ফুটবল অনুরাগীর মনে দাগ কেটে থাকবে আরো বহুদিন।

আর বার্সা সমর্থকেরা আরো ৫ ম্যাচ তাকে নিজেদের করে পাবেন আর হয়তো মনে মনে বলবেন -

‘যেতে নাহি দিবো হায়
তবু যেতে দিতে হয়
তবু সে চলে যায়।’

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics
Best Electronics