Alexa বাঙ্কেরাম থেকে প্রফেসর জিয়াউর রহমান আজমি হয়ে উঠার গল্প

ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ জানুয়ারি ২০২০,   মাঘ ১১ ১৪২৬,   ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

ঈমানজাগানিয়া সাক্ষাৎকার

বাঙ্কেরাম থেকে প্রফেসর জিয়াউর রহমান আজমি হয়ে উঠার গল্প

শেষ পর্ব

জাকের আজমি নদবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৫৪ ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

(পূর্ব প্রকাশের পর) এই আয়াত পাঠ করার পর যখন তিনি তার ব্যাখ্যা করেন তখন আমি স্তম্ভিত হই। এখানে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া পৃথিবীর সকল উপায় ও ভরসাকে মাকড়সার জালের মতো চরম দুর্বল ও বুনিয়াদহীন বলা হয়েছে।

আরো পড়ুন>>> ঈমানজাগানিয়া সাক্ষাৎকার বাঙ্কেরাম থেকে প্রফেসর জিয়াউর রহমান আজমি হয়ে উঠার গল্প  পর্ব-১

আল্লাহর এই বাণী আমার পুরো অস্তিত্বকে আন্দোলিত করে। আমি সিদ্ধান্ত নিই পৃথিবীর সকল আশ্রয় ছেড়ে একমাত্র আল্লাহকেই আমি গ্রহণ করব। ওই মজলিসেই আমি আমার উস্তাদকে বলি এখনই আমি মুসলমান হতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে আমি নামাজ সম্পর্কিত আমার উপযোগী কোনো বইয়ের সন্ধান চাই। তিনি আমাকে রামপুর এদারায়ে আল হাসানাত থেকে প্রকাশিত হিন্দি ভাষায় লিখিত ‘নামাজ কীভাবে পড়বেন’ নামক বইটি আমার হাতে তুলে দেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমি নামাজ শিখে নিই। মাগরিবের পূর্বে আবার আমি আমার উস্তাদের কাছে যাই। তার হাতে হাত রেখে ইসলাম কবুল করি। তার পেছনে মাগরিব নামাজ আদায় করি। এটাই আমার জীবনে প্রথম নামাজ। ওই নামাজের আত্মিক অনুভূতির কথা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।

ইসলাম কবুল করার পর তার ঘোষণা পর্যন্ত যেতে বেশ কয়েক মাস সময় লাগে। মুসলমান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে মানসিক অস্থিরতা পেয়ে বসে। মূলত এটা ছিল একটা স্বাভাবিক ঘটনা। ইসলাম কবুল করার কয়েক মাস পর যে বাস্তবতার মুখোমুখি আমাকে হতে হয়েছে এটা ছিল তার প্রারম্ভিকা। আমার মানসিক অস্থিরতার ফলে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন আমার পুরোটা সময় দিয়ে সাইয়েদ মওদুদি সাহেবের বইপত্র পড়তে থাকি। আমার সহপাঠী বন্ধুদেরকে ওইসব বিষয় বলতে থাকি। যখন নামাজের সময় হতো আমি গোপনে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতাম। কোথাও একান্তে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে নিতাম। এভাবে চার মাস কেটে যায়। কিন্তু আমার এ কর্মকাণ্ড গোপন থাকবার কথা না।

আজমগড়ে আমি আমার এক আত্মীয়ের কাছে থাকতাম। তার ছেলে ছিল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমার জীবনের এই পরিবর্তন তার নজরে পড়ে। শুরুর দিকে আমাকে বুঝাবার চেষ্টা করে। সতর্ক করবার চেষ্টা করে। এই ধর্ম বদলের কারণে আমি আমার বাবা মা থেকে একসময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব। আমার আত্মীয় স্বজনের কাছেও আমার ঠাঁই হবে না। কিন্তু আমার অবস্থা তখন সংশোধন যোগ্য ছিল না। আমার বাবা থাকতেন কলকাতায়। অবশেষে তারা আমার বাবাকে পত্র লিখে দ্রুত আজমগড় চলে আসার জন্যে অনুরোধ জানায়। পত্র পাওয়া মাত্র আমার বাবা ছুটে আসেন। তারপর ক্রমাগত আমি যে সকল অবস্থার মুখোমুখি হই তা আমার কাছে মোটেও অনাকাক্সিক্ষত ছিল না। আমি বরং মনে মনে তার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম।

আমার বাবা আজমগড় আসার পর সরাসরি আমার মুখোমুখি বসেননি। তিনি বরং প্রথমে আমার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারপর তিনি অনুমান করেছেন আমাকে হয়তো কোনো জিন-ভূতে পেয়েছে। তারপর তিনি বিভিন্ন পদ্ধতি ও পুরোহিত দিয়ে আমাকে চিকিৎসা করতে শুরু করেন। অথচ বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি পণ্ডিত ও পুরোহিতদের কাছ থেকে যা কিছু নিয়ে আসতেন আমি বিসমিল্লাহ পড়ে খেয়ে ফেলতাম। যাই হোক ওসবে আমার কোনো চিকিৎসা হয়নি। অবশেষে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে কলকাতা নিয়ে যাবেন। ইসলামি আন্দোলনের সদস্যদেরকে তিনি মনে করেছেন আমার রোগের উৎস। ভেবেছেন কলকাতা চলে গেলে তাদের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ থাকবে না।

কিন্তু এত সহজে কী বিশ্বাসের বাঁধন ছিড়ে ফেলা সম্ভব? দেখা গেছে কলকাতা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আন্দোলনের কর্মীদেরকে খুঁজে বের করি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আর এতে করে বাইরে গিয়ে আমার নামাজ পড়ারও সুযোগ হয়ে যায়। বিষয়টি যখন জানতে পারেন তখন তিনি রীতিমতো বেকুব বনে যান। আমাকে তখন সঙ্গে সঙ্গে এলাহাবাদে আমাদের এক আত্মীয়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। সেখানে যাওয়ার পর আবার শুরু হয় নানাভাবে বুঝানোর পাশাপাশি পদ্ধতি ও পুরোহিতের চিকিৎসা।

তারা আমাকে সোহাগের সঙ্গে বুঝাবার চেষ্টা করে হিন্দু ধর্ম ইসলাম ধর্মের তুলনায় পরিপূর্ণ একটি ধর্ম। আমি যখন তাদেরকে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করি তখন তারা তার উত্তর দিতে পারে না। অবশেষে বাধ্য হয়ে বলেন, ঠিক আছে তোমাকে যদি হিন্দু ধর্ম ছাড়তেই হয় তাহলে খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করো। মুসলমানদের তুলনায় খ্রিষ্টানরা স্বচ্ছল আর খ্রীষ্ট ধর্মও ইসলাম ধর্মের তুলনায় অনেক উত্তম। আমি তখন বলি আসলে মুসলমানদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নয়, আমি বরং ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলমান হয়েছি।

অবশেষে দীর্ঘ ঝারফুঁক এবং তর্ক বিতর্কের পর তারা ধরে নেন আমি চিকিৎসার অযোগ্য এক রোগী। বাবা আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। আমার পরিবারের লোকজন আগে থেকেই কেঁদেকেটে ক্লান্ত ছিল। আমাকে আলাদা এক ঘরে থাকতে দেয়া হয়। আন্দোলনের লোকদের সঙ্গে যেন আমি মেলামেশা না করি সে বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেয়া হয়। সেইসঙ্গে আমার মা আমার বোন এবং নারী আত্মীয় স্বজনরা আমাকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য অবিরাম কান্নাকাটি চালিয়ে যান। এরসঙ্গে ঝারফুঁক তো ছিলই। আর ফলাফল ছিল শূন্য।

অবশেষে বাধ্য হয়ে তারা কঠিন পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন। আমাকে চাপে ফেলার জন্যে প্রথমেই পুরো পরিবার অনশনের ঘোষণা দেন। এই ঘটনা ছিল আমার জন্যে অত্যন্ত কঠিন এবং চরম ধৈর্য সাপেক্ষ। আমার মা বাবা ভাই বোন কেউ কোনো খাবারে হাত দিচ্ছেন না। চোখের সামনে চরম ক্ষুধায় তারা নেতিয়ে পড়ছেন। আমার আল্লাহর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ এই কঠিন সময়েও তিনি আমাকে তার দ্বীনের ওপর অবিচল রেখেছেন। আমাকে ইসলাম থেকে সরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে গৃহীত তাদের এই কর্মসূচি ব্যর্থ হয়েছে।

আমাকে ইসলাম থেকে বিচ্চুত করবার জন্যে গৃহীত সকল কৌশল যখন ব্যর্থ হলো তখন তারা গ্রহণ করলেন জোর জুলুমের পন্থা। ইসলামের প্রথমকালের মহান ভাগ্যবান হজরত বেলাল, সুমাইয়া এবং আম্মার (রা.) যার মুখোমুখি হয়েছিলেন হাসিমুখে। তাদের জানার ভেতরে সকল চেষ্টা কৌশল যখন পরিপূর্ণরুপে ব্যর্থ হয় তখন আমার মা বাবার ভেতরেও পরিলক্ষিত হয় ব্যাপক পরিবর্তন। আমার মনে হয় কী আমার মতো প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হবে এমন আশঙ্কা যদি না থাকত তাহলে তারাও হয়তো ইসলাম কবুল করে বসতেন।

আন্দোলনের সহযোদ্ধাগণ ওই সময়ে আমাকে অনেক উপকার করেছেন। আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন। সেখান থেকে পাস করার পর সিদ্ধান্ত নিই আমি জামিয়া ইসলামিয়া মদিনা মুনাওয়ারায় ভর্তি হব। খুব সহজেই আমি ভর্তি হওয়ার সুযোগ লাভ করি। চার বছরের কোর্স কমপ্লিট করার পর বাদশাহ আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটি মক্কা মুকাররমায় মাস্টার্সে ভর্তি হই। সেখানে আমার গবেষণার বিষয় ছিল হজরত আবু হুরায় (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসসমূহের ধরন ও অবস্থান। আমার গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল ‘আবু হুরায়রা ফি দাউই মারবিয়্যাতিহি ওয়া ফি জামালি শাওয়াহিরিহি ওয়া ইনফিরাদিহি’। মাস্টার্সের ফাইনালে আমি মর্যাদার সঙ্গে উত্তীর্ণ হই।

তারপর আমি মক্কা মুকাররমায় রাবিতুল আলামিল ইসলামিতে যুক্ত হই। রাবেতায় থাকা অবস্থাতেই আল আজহার ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করি। সেখানে আমার পিএইচডির বিষয় ছিল হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকৃত বিচার ও ফায়সালাসমূহ। শিরোনাম ছিল ‘আকদিয়াতু রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’। আমার এই উভয় গবেষণাপত্র পরে প্রকাশিত হয়েছে।

ইসলাম গ্রহণ করার পর আমি উপলব্ধি করি ভয়ঙ্কর অন্ধকার থেকে আমি বেরিয়ে এসেছি সীমাহীন আলোর দেশে। এখানে এসে আমি জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের জীবন ও জীবনের মূল মর্ম উপলব্ধি করতে পারি। এও উপলব্ধি করতে পারি, ইসলাম এবং বর্তমান কালের মুসলিম সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা। আমার যতটুকু ধারণা অমুসলিমরা এইকালে ইসলাম কবুল করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা অনুভব করেন এটাই। সত্যিকার অর্থে ইসলামের প্রতিটি বিষয়ই পৃথিবীর যে কোনো সুস্থ্য মানুষের হৃদয় কেড়ে নেয়ার জন্যে যথেষ্ট। 
কিন্তু বর্তমান মুসলিম সমাজে সেই শক্তি পূর্ণরূপে বিকশিত খুব কম ক্ষেত্রেই। তারপরও আমি বলতে পারি, ইসলামের চলমান ভ্রাতৃত্ববোধ এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা আমাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে। একথা বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করব না আজকের এ পতিত কালেও মুসলমানদের সমাজে ‘সকল মুসলমান ভাই ভাই’ (হুজুরাত-১০) এর চিত্র যে শক্তির সঙ্গে বহমান তা আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে এক বিস্ময়। মুসলমান সমাজে সামাজিক সাম্য এখনো যতটুকু নজরে পড়ে পৃথিবীর তাবৎ সমাজ ব্যবস্থার বিচারে তা তুলনাহীন।

‘আল্লাহ তায়ালার কাছে তোমাদের মধ্যে সেই সর্বাধিক সম্মানিত যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে’ (হুজুরাত-১৩) এ বাণী হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়ে আরব্য আভিজাত্যের প্রেরণাকে তছনছ করে দিয়েছিল। বেলাল হাবশি আর সালমান ফার্সিকে আবু বকর এবং ওমরের পাশে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। পৃথিবীর এই নিদানকালেও মুসলিম সমাজব্যবস্থায় ওই আলো স্পষ্ট নজরে পড়ে। (ড. সাহেবের বক্তব্য শেষ)।

কে জানতো বলরিয়া গঞ্জের এক সংকীর্ণ গলিতে বসবাসকারী বাঙ্কেরাম একদা মুসলিম বিশ্বের মর্যাদাশীল বিদ্যাপীঠ মদিনা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হবেন এবং গবেষণা বিভাগের প্রধান হিসেবে অবসর গ্রহণ করবেন। তাছাড়া শুধুমাত্র আজম গড়ের সুনামই ছড়াবে না তার হাতে বরং তিনি হবেন মসজিদে নববীর হাদিসের শিক্ষক। এ পর্যন্ত উর্দু হিন্দি এবং আরবি ভাষায় তার বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘গঙ্গা সে জমজম তক’ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি তার ইসলাম গ্রহণের ইতিবৃত্ত সবিস্তারে তুলে ধরেছেন হিন্দি ভাষায়। ইসলামের জীবনবিধান সম্পর্কিত এক বিশালায়তন গ্রন্থ রচনা করেছেন যাকে অনেকটা ইসলামি জ্ঞানের বিশ্বকোষ বলা যায়। হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন মত সম্পর্কে তার বেশ কিছু বই রয়েছে।

তার লেখা দিরাসাত ফিল ইয়াহুদিয়্যা... গ্রন্থটি সৌদি আরবের ইউনিভার্সিটিগুলোতে উচ্চতর কোর্সে পাঠ্য তালিকাভূক্ত। এর বাইরেও আল জামিউল কামিল নামে তিনি বিশুদ্ধ হাদিসের একটি বিশাল সংকলন করেছেন। আল মিন্নাতুল কুবরা, আল মাদখাল ইলাস সুনানিল কুবরা লিল বাইহাকি ও তোহফাতুল মোত্তাকিন তার উল্লেখযোগ্য মর্যাদাশীল রচনা। দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা তাকে ভালো রাখুন।

ভাষান্তর: মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন
সংগ্রহ: মাওলানা ওমর ফারুক
সূত্র: আরমোগান, নভেম্বর-২০১৯ 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে