Alexa বাঙালির লোকবিশ্বাস-পার্বণে ভূত

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৬ ১৪২৬,   ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

বাঙালির লোকবিশ্বাস-পার্বণে ভূত

 প্রকাশিত: ১৬:১২ ২৭ অক্টোবর ২০১৯  

পেশাগত পরিচয়ে আহসান ইমাম শিক্ষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। করেন লেখালেখি এবং গবেষণা। বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম বিভাগে রয়েছে তার নিয়মিত অংশগ্রহণ

বাঙালির লোকজীবনে ভূতে বিশ্বাস অতি প্রাচীন। ভারতবর্ষে প্রাচীনকাল থেকেই ভূতকেন্দ্রিক লোকবিশ্বাস, সংস্কার লক্ষণীয়। খুব কম মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে, যিনি ভূতের গল্প শোনেননি। তাল গাছ, তেঁতুল গাছ, বেল গাছ, শিমুল গাছ, ঝোপ-জঙ্গল, এমনকি পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি ভূতের আস্তানা বলে কিছু লোক বিশ্বাস করেন। গা ছনছম করা ভূত-পেত্নীর গল্পে আকর্ষিত হয় আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা।

কালীপূজা এবং শিবপূজা মূলত ভূতকেন্দ্রিক সংস্কারের কথা মনে করিয়ে দেয়। কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুদর্শীর দিন পালিত হয় কালীপূজা।কালী তার সংগে ডাকিনী ও যোগিনীকে নিয়ে অপশক্তি তথা ভূত তাড়ানোর কাজটি করে থাকে এমন বিশ্বাস। অমাবস্যায় যেহেতু অন্ধকার নেমে আসে তাই বাঙালির ঘড়ে প্রদীপ জ্বলানোর ব্যবস্থা করা হয় যাতে অন্ধকার দূর হয় অর্থাৎ কোনো অশুভশক্তি যেন ক্ষতিসাধন না করে। প্রদীপের সাতটি মুখ জ্বালানো হয়। বিশ্বাস, সাতপুরুষ যারা মৃত তারা আলো খুঁজে পান। কালীপূজার সঙ্গে ভূত আজ লোকবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।

অপরদিকে, প্রতিবছর শিবপূজায় মূলত অশুভশক্তি তথা ভূত তাড়ানোর উদ্দেশ্যে, জনগোষ্ঠীর মঙ্গলকামনায় সারারাত ধরে পুরুষেরা অস্ত্র প্রদর্শন করে নাচগানের মাধ্যমে এবং শ্মশানে গিয়ে মৃত ব্যক্তির কঙ্কাল সংগ্রহের মাধ্যমে ভূতে বিশ্বাসজনিত লোকাচার পালন করে থাকেন। বিশেষ করে ধামরাই এলাকায় এই লোকাচার পালন করতে দেখা গেছে।

বাঙালির গল্পে, সিনেমায়, সাহিত্যেও ভূতের উপস্থিতি প্রাচীন। বিশেষ করে লোককাহিনিগুলোতে ভূত একটি বিশেষ অবস্থানে রয়েছে। ‘শাঁকচুন্নী’ গল্প এক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এছাড়াও অদৃশ্য বস্তুবাচক কিংবদন্তি যা রয়েছে সবটাই ভূতকেন্দ্রিক।

বাঙালির রীতি-ভূতচতুদর্শী এবং পাশ্চাত্যরীতি- Halloween প্রায় একই উদ্দেশ্যে পালিত হয়। এইদিন নাকি অশরীরী আত্মা যাদের দেখা যায় না তবে অনুভব করা যায়, তারা লোকসমাজে নেমে এসে মানুষের সঙ্গে মিশে যায়। আগেই বলা হয়েছে এই রীতি পাশ্চাত্যেও পালন করা হয়। এই রীতিমতে এদেশে বাঙালি হিন্দু সমাজ মনে করে কালীপুজার আগের রাত হল ভূতেদের রাত। এইদিনে ভূতদের আবির্ভাব হয়, তবে এটা বিশ্বাস করাও যায় আবার কেউ অবিশ্বাসও করতে পারে। তবে ভূতচতুর্দশী পালন বাঙালির একটা উৎসব, সংস্কার এবং লোকবিশ্বাস।ইংরেজিতে যাকে ‘FolkBelief’ বলা হয়। ভূতচতুদর্শী তিথি এমনই লোকবিশ্বাস। এইদিনে নানা প্রকারের ভূত আগমন করে বাড়ির আঙ্গিনায়।

ধারণা, মানুষের অপঘাতে মৃত্যুর পর আত্মা অশরীরীরুপে ঘুরে বেড়ায়। বাঙালির গল্পে নানারকম ভূতের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। যেমন, পেত্নী, শাঁকচুন্নী, মেছো, ভূত, চোরাচুন্নী, গেছোভূত, দৈত্য, মাথাকাটা ভূত ইত্যাদি। এই ভূতচতুদর্শীর দিন অর্থাৎ কালীপুজার আগের দিন মানুষের অমঙ্গল যাতে না হয় এবং গৃহে অপদেবতা যাতে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য বাড়ির আঙ্গিনায় প্রদীপ জ্বালানো হয়। এমন ধারণাও করা হয় যে, পূর্বপুরুষেরা এইদিন ইহলোকে আসেন। তাঁরা ইহলোকের আত্মীয়-স্বজনদের দেখতে আসেন। আর এ কারণেই বিশেষকরে হিন্দু বড়িতে রীতি অনুযায়ী খাবার-দাবারের আয়োজন করা হয়।ইহলোকে রেখে যাওয়া সন্তানদের মঙ্গল কামনা করেন এবং তাদের সুখ-শান্তি দেখার পর প্রদীপের আলো দেখে আবার অন্যলোকে ফিরে যান।

হিন্দু পুরাণ মতে, এইদিনে রাম চৌদ্দবছরের বনবাস থেকে অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন। অযোধ্যাবাসী প্রদীপ জ্বালিয়ে অযোধ্যা নগরীকে রামের ফিরে আসা উপলক্ষে আলোকিত করেছিলো। সেই থেকে এই প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা চলে আসছে।

সুতরাং কার্তিকের এই অমাবস্যায় প্রদীপ জ্বালানো, ভূত, কালীপুজা, আতসবাজি, ইত্যাদি বাঙালির লোকবিশ্বাস-পর্বণেরই অংশ।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর