বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের প্রবর্তক 

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২২ ১৪২৭,   ১২ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

মাইকেল মধুসূদন দত্ত 

বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের প্রবর্তক 

বীরেন মুখার্জী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৩০ ২৫ জানুয়ারি ২০২০  

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ধীর, অলস ও একমাত্রিক জীবন-যাত্রার তাল-ছন্দ ভেঙে বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহ ও সংগ্রামের সূচনা করেন কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। 

ঊনিশ শতকের প্রথমভাগে বেঙ্গল নবজাগরণের সূচনালগ্নে, অকুণ্ঠচিত্তে নবজাগরণের ধর্ম স্বীকার করলেন রাজা রামমোহন রায় আর পণ্ডিত বিদ্যাসাগর হয়ে উঠলেন মানবমন্ত্রে সঞ্জীবিত। অপরদিকে ডিরোজিও সত্য-সুন্দর দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়ে নবজাগরণে সক্রিয়দের অন্তর্লোকে জ্বেলে দিলেন তীব্র আলো। এদের অন্যতম ঋত্বিক হিসেবে মধুসূদন দত্ত তেজ ও বীর্যের সম্মিলন ঘটিয়ে কাব্য রচনায় ব্রতী হলেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সমৃদ্ধ করে তুললেন বাংলা সাহিত্যভাণ্ডার।

বলা যায়, অহল্যা উদ্ধারের মত নির্জীব বাংলা সাহিত্যকে সব ধরনের কূপমণ্ডুকতা থেকে উদ্ধার করে তাতে প্রাণসঞ্চার করেন তিনি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ‘যুগত্রাতা’ হিসেবে তাকে তাই সহজেই শনাক্ত করা যায়। তার বিদ্রোহ আদর্শিক অর্থেই। কারণ নিরুত্তাপ, নিস্তরঙ্গ দেশি বাংলা ভাষায় তিনি যোগ করেছেন অদৃষ্টপূর্ণ আলো, হৃদয়ের অভাবনীয় তাপ আর আন্তর্জাতিকতার ঢেউ। একমাত্র মধুসূদন দত্তই অবলীলায় শিল্পের জন্য শিল্প বা কবিতার জন্য কবিতা চর্চা করেছেন।

উনিশ শতকের অবিভক্ত বাংলায় পাশ্চাত্য ভাষা, সাহিত্য ও রাজনীতির প্রভাব সমাজ-সাহিত্যে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। পাশ্চাত্য সাহিত্য-সমাজের ভাবাদর্শের সঙ্গে বাঙালির সামাজিক, রাজনীতিক, ধর্ম ও সাহিত্যাদর্শ সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও প্রকৃতিপ্রদত্ত শক্তি, প্রতিভা এবং অসাধারণ আত্মপ্রত্যয় নিয়ে সংস্কৃতির মেলবন্ধনের ঘটাতে এগিয়ে আসেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এ নবীন কবি বিদেশি সাহিত্য থেকে নানা উপকরণ সংগ্রহ করে মাতৃভাষাকে পরিপুষ্ট করলেন, গাম্ভীর্য ও ভাববৈচিত্র্যে বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করে তুলতে সচেষ্ট হলেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে এটাই বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, বাংলাভাষায় কেবল ‘বাঁশির মৃদুমধুর গুঞ্জরণ’ অথবা ‘বেণু-বীণানিক্কণ’ ধ্বনিত হয় না, প্রতিভাবান লেখকের হাতে এ ভাষা প্রস্ফুটিত পুষ্পের মতো ফুটে ওঠে।” তিনি প্রমাণ করেছেন- ‘বাংলাভাষা নির্জীব নয়, সজীব ভাবধারার বাহন হতে পারে, দৃঢ়তা ও সম্ভাব্যতায়। বাংলা ভাষা যে কোনো উন্নত ভাষার সমকক্ষ।’ তার সমকালে বাংলা গদ্যের শক্তি আবিষ্কার করেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার এবং পরে বঙ্কিমচন্দ্র; আর মধুসূদন আবিষ্কার করেন বাংলা কাব্য-সাহিত্যের অন্তর্নিহিত শক্তি। 

মাইকেলের এই আবিষ্কারের মূলে ছিল পশ্চিমের শক্তিশালী শিক্ষা ও সভ্যতার সংঘাত- যা নব্যশিক্ষিত বাঙালি যুবকদের চেতনায় নবযুগের উন্মেষ ঘটায়। এটি ছিল সাহস, সংস্কারমুক্ত ও বন্ধন ছিন্ন করার যুগ। মধুসূদন দত্ত এই যুগের ধর্মে আকৃষ্ট হয়ে তার ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। যে কারণে ইংরেজ বা ইউরোপীয় শিক্ষা তাকে প্রভাবান্বিত করলেও বাঙালি সত্তা তার মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। বিদেশি শিক্ষা ও সভ্যতার মূল ভাবাদর্শ যেমন রাজা রামমোহন রায় গ্রহণ করেছিলেন তেমনি একইভাবে সেই আদর্শের সঙ্গে বাঙালি মতাদর্শের সম্মিলনে তিনি ‘বাংলা কাব্যে’ অভাবনীয় যুগান্তর ঘটালেন। হোমার-মিলটন থেকে কাব্যরস সংগ্রহ করে রচনা করলেন বাংলা সাহিত্যে অমর কাব্যকর্ম। 

আধুনিক বাংলা কাব্য রচনায় ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ মাইকেল মধুসূদনের অমর কীর্তি। তার ছন্দ সৃষ্টি শুধু যে ভাষা ও ছন্দের একটা আমূল পরিবর্তনই এনে দিল তা নয়, এই নির্মিতির সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে গুপ্তযুগেরও অবসান সূচিত হয় বলে কাব্যবোদ্ধারা মনে করেন। তিনি গ্রিক মিথ ও মহাকাব্য এবং ভারতীয় পুরাণের সংমিশ্রণে রচনা করলেন সম্পূর্ণ আধুনিক ধারার মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ’। এই মহাকাব্য কবি প্রতিভার পূর্ণ বিকাশের সাক্ষ্যবহন করছে। তার অমিত্রাক্ষর ছন্দেরও পূর্ণ পরিণতি ঘটে এই মহাকাব্যের মধ্য দিয়ে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছন্দমুক্তি নিয়ে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। ছন্দমুক্তি সম্পর্কে তার দৃঢ়তা ও প্রত্যয় ধরা পড়ে ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে’র উৎসর্গপত্র মঙ্গলাচরণে। নতুন এ ছন্দ ব্যবহারের কৈফিয়ৎ হিসেবে তিনি লেখেন- ‘আমার বিলক্ষণ প্রতীতি হতেছে যে, এমন কোনো সময় অবশ্যই উপস্থিত হবে, যখন এদেশের সর্বসাধারণ জনগণ, ভগবতী বাগদেবীর চরণ হতে, মিত্রাক্ষর স্বরূপ নিগড় ভগ্ন দেখে চরিতার্থ হবেন।’ আধুনিক কাব্য সাহিত্যের বর্তমানের রূপ-ঐশ্বর্য কবির এই ভবিষ্যদ্বাণীর সফলতারই সাক্ষ্যবাহী হিসেবে পাঠকের অন্তরে জেগে থাকে। 

প্রকৃতির নেপথ্যে বিধানই যুগ-পরিবর্তনে নেপথ্য ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতির কার্য কখনো অসম্পূর্ণ থাকে না, প্রকৃতির এটাই নিয়ম। মধুসূদন দত্ত অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন না করলেও অন্য কেউ হয়তো নিশ্চয়ই এটি করতেন। কিন্তু মধুসূদনের প্রতিভার অন্যতম উপাদান ছিল বৈপ্লবিক মনীষী, তাই দুঃসাধ্য সাধন তার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। একটি জাতির ইতিহাসে যখন নতুন যুগের অভ্যুদয় ঘটে তখন অনেকেই এটি স্বীকার করতে চান না। মাইকেলের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। বিদ্যাসাগর, প্যারীচরণ সরকারের মতো পণ্ডিতরাও প্রথমে ভাষার এ বিপ্লবকে স্বীকার করতে ইতস্তত করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শ্রীঅরবিন্দ প্রমুখ বিশিষ্ট মনীষী মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর ছন্দ-প্রবর্তনের প্রচেষ্টার ব্যাপক প্রশংসা করেন। মধুসূদন সৃষ্ট ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’র উদ্ভাবন মধুসূদনকে যেমন যশের অধিকারী করেছে, তেমনি বাংলা সাহিত্যে বেজে উঠেছিল ছন্দের এক নব অভিযানের দুন্দুভি। কবি সমালোচক বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন-‘মাইকেলের যতি স্থাপনের বৈচিত্র্যই বাংলা-ছন্দের ভূত-ঝাড়ানো জাদুমন্ত্র। কী অসহ্য ছিল ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল’-র একঘেঁয়েমি, আর তার পাশে কী আশ্চর্য মাইকেলের যথেচ্ছ-যতির উর্মিলতা। যতিপাতের এ বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গেই যে ছন্দের প্রবহমানতা এসে অন্তহীন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিল।’ 
অমিত্রাক্ষর ছন্দের মতো, মধুসূদন ‘চতুর্দশপদী’ কবিতার প্রবর্তন করেন।

এ ছাড়া গীতিকবিতা, পত্রকাব্য, নাটক, রোমান্টিকতা, ভাষা ও ছন্দ নির্মাণে তিনি ছিলেন আধুনিক। সাহিত্যজীবনের শুরুতে বিদেশি অর্থাৎ ইংরেজি ভাষার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হলেও মাতৃভাষা বাংলাকেই আকুল আবেগে তিনি জড়িয়ে ধরেছেন। এ ভাষাকে নতুন গতিপথে চালনা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন মাতৃভাষার প্রতি তার মমতা কত গভীরে প্রোথিত। ‘বঙ্গভাষা’ শীর্ষক সনেটে তিনি স্বীকার করেছেন ‘মাতৃভাষা রূপ খনি পূর্ণ মনিজালে।’ মধুসূদনের প্রতিটি চতুর্দশপদী কবিতার পঙক্তিতে বাংলা ভাষা, দেশ, বাংলার প্রকৃতি ও বাঙালি ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্যের ইঙ্গিত বহন করে। ‘সাংসারিক জ্ঞান’ শীর্ষক চতুর্দশপদীতে কাব্যপ্রীতির পরিণতি ও তার প্রতিক্রিয়া তিনি ব্যক্ত করেছেন এভাবে- ‘কী কাজ বাজায়ে বীণা, কী কাজ জাগায়ে/সুমধুর প্রতিধ্বনি কাব্যের কাননে?/কী কাজ গরজে ঘন কাব্যের গগণে/মেঘরূপে, মনোরূপ ময়ূরে নাচায়ে?’ জীবনের অন্তহীন জটিলতা, জাগতিক টানাপড়েন আর আত্মসঙ্কটই কবিকে বাধ্য করেছে ‘কবি’র মতো প্রশ্নশীল সনেট রচনায়; যেখানে তিনি প্রকৃত কবির স্বভাব নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেছেন, ‘কে কবি- কবে কে মোরে? ঘটকালি করি,/শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন,/সেই কি সে যম-দমী?’ আবার নিজেই উত্তর দিয়েছেন, ‘সেই কবি মোর মতে, কল্পনাসুন্দরী/ যার মনঃ কমলেতে পাতেন আসন,/অস্তগামী-ভানু-প্রভাব-সদৃশ বিতরি/ভাবের সংসারে তার সুবর্ণ কিরণ।’ এই কবিতার প্রথম সর্গ আধুনিক কাব্য সমালোচকেরা ‘কবিতার সংজ্ঞা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে নির্দ্ধিধায় বলা যায়, মধুসূদন দত্ত বাংলা কবিতাকে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। ‘একই সঙ্গে তিনি ধ্রুপদী ও আধুনিক ধারার কাব্যচর্চা করেছেন। এই ধ্রুপদী আধুনিকতার সবরকম বৈশিষ্ট্যই যেমন মহাকাব্যে, তেমনি তার সনেটগুচ্ছেও অস্তিত্বমান।’ 

বলা যায় মধুসূদন সৃষ্ট সব সাহিত্যকর্মই আধুনিক। মধ্যযুগের বাংলা পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের শৃংখলে বন্দি বাংলা কবিতাকে মুক্ত করে তার উপর অমিত্রাক্ষরের (blank verse) বন্যাপ্রবাহ ছিল যেমন কবির নতুন সৃষ্টি, তেমনি সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা ও অপশক্তির বিরুদ্ধে তার শক্ত অবস্থান নির্ণয় করা যায়, ‘বুড়ো শালিখের ঘাড়ে রোঁ’ ইত্যাদি প্রহসনমূলক রচনার মধ্য দিয়ে। অথচ তিনি যখন ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যে রাবণের কণ্ঠে ঘোষণা দেন- ‘জন্মভূমি রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে?/যে ডরে ভীরু সে মূঢ় শতধিক তারে’; তখন এ উচ্চারণ শুধু একজন পরাক্রমশালী লঙ্কেশ্বর রাবণের থাকে না- হয়ে ওঠে এক দেশপ্রেমিক ভাগ্য বিড়ম্বিত কবির বাস্তবতা। 

আধুনিক ছন্দ সৃষ্টি ছাড়াও অন্তর্জীবন এবং অন্তরঙ্গ ভাবজগতের যে পরিচয় বিধৃত আছে তার সাহিত্যকর্মে, সে জন্যই তিনি সাহিত্যের আকাশে চিরদিন জেগে থাকবেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর