Alexa বাংলায় ইসলাম প্রচারে মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী’র (রহ.) অবদান

ঢাকা, রোববার   ২০ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৪ ১৪২৬,   ২০ সফর ১৪৪১

Akash

বাংলায় ইসলাম প্রচারে মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী’র (রহ.) অবদান

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:১৪ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া কওমি মাদরাসা (ফাইল ফটো)

লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া কওমি মাদরাসা (ফাইল ফটো)

আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী একজন বাংলাদেশী ইসলামি চিন্তাবিদ, প্রখ্যাত আলেম, সমাজ-সংস্কারক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া কওমি মাদরাসাসহ গওহরডাঙ্গা কওমি মাদরাসা, ফরিদাবাদ কওমি মাদরাসা এবং বড় কাটারা কওমি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় নেতা।

ছবি: সংগৃহীত

জন্ম ও শৈশব: তিনি ১৩০২ বঙ্গাব্দের ২ ফাল্গুন গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের ঘোপেরডাঙ্গা (গওহরডাঙ্গা) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মুন্সি আব্দুল্লাহ ও মাতার নাম বেগম আমিনা। 

জন্মের তিন শত বছর আগে তার পূর্বপুরুষরা ইসলামের দাওয়াত নিয়ে সুদূর আরব দেশ থেকে এদেশে আগমন করেন। তার দাদা স্বাধীনতার বীর সেনানী হজরত সৈয়দ আহমদ বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহির সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের শরিক হয়ে ‘গাজী’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।

শিক্ষাজীবন: সদর সাহেব (রহ.) এর শৈশবে এ দেশে আদর্শ শিক্ষার ভালো কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র তো মোটেই ছিল না। তাই তার পিতা তাকে পাটগাতীর এক হিন্দু পণ্ডিতের পাঠশালায় পাঠাতে বাধ্য হন। এরপর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ও বরিশালের সুটিয়াকাঠী স্কুলে পড়াশোনা করে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। প্রাইমারি শিক্ষা শেষ করার পর তাকে যশোরের নওয়াপাড়ায় স্কুলে ভর্তি করানো হয়। সেখানে এক বছর পড়াশোনার পর সদর সাহেবকে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অ্যাংলো পারসিয়ান বিভাগে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। ছোটোবেলা থেকেই আরবি শিক্ষার প্রতি তার ছিল প্রবল ঝোঁক। তাই পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে একটু সময় পেলেই আরবি শেখার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন। কলকাতায় স্কুলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো চার জায়গায় চারজন মাওলানা সাহেবের কাছে তিনি আরবি পড়তেন। সদর সাহেব হুজুর ও তার পিতা উভয়েই ছিলেন সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ বিরোধী। উভয়ই চাইতেন যে কোনো মূল্যে এ দেশ থেকে ইংরেজদের তাড়াতে হবে। কিন্তু এক জায়গায় তাদের চিন্তায় বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। 

পিতা মনে করতেন ইংরেজদের সঙ্গে লড়তে হলে প্রথমে ইংরেজদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ভালোভাবে অর্জন করতে হবে। না হলে ইংরেজদের সঙ্গে পেরে ওঠা যাবে না। অন্যদিকে সদর সাহেব হুজুরের চিন্তা ছিল, প্রথমেই কোরআন হাদিসের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় বিদ্যা যা দরকার হয় তা শিখে নেয়া যাবে। তবে তিনি সর্বাবস্থায় পিতার আদেশকে শিরোধার্য মনে করতেন। তাই পিতার মন রক্ষার জন্য ১৯১৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং পাঁচটি লেটার পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর তার পিতা তাকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি করে দেন। ১৯২০ সালে সমগ্র ভারতে অসহযোগ আন্দোলনের কারণে সকল স্কুল কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি একে দীনি শিক্ষার বিরাট সুযোগ মনে করে দেওবন্দে চলে যান। 

থানভী (রহ.) এর দরবারে: তিনি যখন দেওবন্দের যান তখন মাদরাসার শিক্ষাবর্ষ প্রায় শেষ। তাই তিনি হজরত থানভী (রহ.) এর দরবারে দুই চিল্লা অবস্থান করেন। বিদায়ের সময় হজরত এর নিকট জিজ্ঞেস করেন, হুজুর! আমি কোন মাদ্রাসায় পড়ব? থানভী (রহ.) বললেন, দেওবন্দ মাদরাসায় ওপরের দিকের পড়াশোনা ভাল হয় আর সাহারানপুর মাদরাসায় নিচের দিকের পড়াশোনা ভাল হয়। এখন তোমার যেখানে সুবিধা হয় সেখানে গিয়ে পড়াশোনা করো। সদর সাহেব হুজুর তার পরামর্শ মোতাবেক প্রথমে সাহারানপুর মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং সেখানে চার বছর পড়ালেখা করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। এবং সেখান দীর্ঘ চার বছর পড়াশোনা করেন।

সুলুকের পথে: সাহারানপুর দেওবন্দ মাদরাসায় অধ্যয়নকালে তিনি তার আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য প্রতি বৃহস্পতিবার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে থানা ভবনে গমন করতেন এবং ইলমে শরিয়তের পাশাপাশি ইলমে মারেফাত শিক্ষা করতে থাকেন। আর প্রতি বছর রমজানের ছুটিতে (২০ শাবান থেকে ঈদুল ফিতর পর্যন্ত ৪০ দিন) আপন মুরশিদের কাছে অবস্থান করে রুহানি খোরাক অর্জন করতে থাকেন। এভাবে দীর্ঘ পড়াশোনার পর ১৯২৮ সালে দেশে ফিরে আসেন। দেওবন্দ থাকাবস্থায় তিনি কেবল পাঠ্যপুস্তক নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন না, বরং লাইব্রেরীর যাবতীয় বইপত্র অধ্যয়ন করার চেষ্টা করতেন এবং সবসময় লাইব্রেরী ও ক্লাসরুমেই পড়ে থাকতেন। তিনি যখন দেশে রওনা হন তখন এক বুজুর্গ বলেছিলেন, বাংলাদেশ একটি ইলমের জাহাজ যাচ্ছে।

কর্মজীবন: দেশে ফিরে হজরত ফরিদপুরী (রহ.) আপন ওস্তাদ শাইখুল হাদিস হজরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.) এর নির্দেশক্রমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদরাসায় সদরুল মুদাররিসিন পদে নিযুক্ত হন। সে সময় তার সহকর্মী হিসেবে ছিলেন ফখরে বাঙাল মাওলানা তাজুল ইসলাম, পীরজি হুজুর হজরত মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব ও হাফেজ্জী হুজুর হজরত মাওলানা মুহাম্মাদল্লাহ (রহ.)।
এরপর হিজরি ১৩৩৭ সালে বাগেরহাট জেলার অন্তর্গত গজালিয়া গ্রামে একটি মাদরাসা কায়েম করেন। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর চিন্তা করে দেখলেন যে, তার মহাপরিকল্পনা একটি ক্ষুদ্র গ্রামে থেকে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে না। তাই সাথীদের সঙ্গে পরামর্শ করে ঢাকায় চলে আসেন এবং অনেক মেহনতের পর ১৯৩৪ সালে বড়কাটারায় হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

বড় কাটারা মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর ১৯৩৭ সালে নিজগ্রাম গওহরডাঙ্গায় ‘খাদেমুল ইসলাম মাদরাসা’ নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর আবার ঢাকায় চলে আসেন এবং লালবাগ শাহী মসজিদকে কেন্দ্র করে ১৯৫৩ সালে ‘জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া’ নামে আরেকটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। বিখ্যাত লালবাগ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার ফরিদাবাদে ১৯৬৫ সালে ‘ইমদাদুল উলুম’ নামে আরেকটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

উচ্চতর ইসলামি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা: পৃথিবীবাসীর কাছে ইসলামের চির শাশ্বত বিধান পৌঁছানোর জন্য ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। যুগোপযোগী যুক্তি-প্রমাণ ও যুগজিজ্ঞাসার জবাব এবং ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডনের জন্য চাই সৃষ্টিধর্মী কাজের যোগ্যতা, ক্ষুরধার কলম ও দার্শনিক যুক্তি। তাই তিনি যুগ শ্রেষ্ঠ গবেষক বিশিষ্ট আলেমে দীন আল্লামা নূর মোহাম্মদ আজমী সাহেব এর পৃষ্ঠপোষকতায় ফরিদাবাদ মাদরাসায় ‘ইদারাতুল মাআরিফ’ নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন। উক্ত প্রতিষ্ঠান দাওরা ফারেগ আলেম ও অন্যান্য শিক্ষিত ছেলেদের ভর্তি করে অনুবাদ, রচনা, প্রবন্ধ তৈরি, যুগ জিজ্ঞাসার জবাব অনুসন্ধান এবং ইসলামি আইনের গবেষণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হত। আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী সাহেব উক্ত প্রতিষ্ঠান প্রথম পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। দুঃখজনকভাবে এ প্রতিষ্ঠানটি আর চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

খ্রিষ্টান মিশনারিদের মোকাবিলা: পাকিস্তান আমলে এ দেশে খ্রিষ্টান পাদ্রীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। নৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগে খ্রিস্টান মিশনারীরা তাদের জাল বিস্তার করতে তৎপর হয়। পাদ্রী পায়ার ‘শান্তি দীপের’ নামে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারে উদ্যোগী হলে আইয়ুব সরকার তাকে সাহায্য করে। সদর সাহেব হুজুর এর তৎপরতার বিরুদ্ধে খাদেমুল ইসলাম জামায়াতের শাখা সংগঠন হিসেবে ‘আঞ্জুমানে তাবলীগুল কুরআন’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে পাদ্রী পায়ারের বিরুদ্ধে খাদেমুল ইসলাম এর প্রচার সম্পাদক জনাব মাওলানা ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পাঠান এবং অল্পদিনেই পাদ্রীকে দেশ ছাড়া করেন। শিলছড়িতে ৬০ একর জমি নিয়ে ইসলাম মিশনের কাজ শুরু করেন। ময়মনসিংহের গারো এলাকায় ও দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খ্রিষ্টানদের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করেন।

কোরআনি মক্তব প্রতিষ্ঠা: সদর সাহেব হুজুর জাতিকে সার্বিকভাবে ইসলামের রঙে রাঙিয়ে তোলার জন্য একদিকে মাদরাসা, মসজিদ প্রতিষ্ঠা অপরদিকে প্রতিটি মসজিদকেন্দ্রিক কোরআনি মক্তব প্রতিষ্ঠা এবং কোরআনের সঙ্গে সঙ্গে প্রাইমারি সিলেবাসও তাতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা চালান। যাতে করে মানুষ মক্তব শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ছেলে মেয়েদের সাধারণ শিক্ষাও দিতে পারে। এজন্য হুজুরের অত্যন্ত আদরের শাগরেদের হজরত মাওলানা ক্বারী বেলায়েত সাহেব এর মাধ্যমে নূরানি প্রাইমারি শিক্ষা চালু করেন।

অপরদিকে সদর সাহেবের আরেক শাগরেদ হজরত মাওলানা আব্দুল ওয়াহাব এর মাধ্যমে ‘নাদিয়াতুল কোরআন’ নামে আরেক তরিকায় মক্তব প্রশিক্ষণ চালু করেছেন। এইভাবে ঘরে ঘরে কোরআনের আলো পৌঁছানোর জন্য হুজুর জীবনকে উৎসর্গ করে দেন।

কোরআন তহবিল প্রতিষ্ঠা: সদর হুজুর বলতেন দুনিয়ার সমস্ত জাতি তাদের ধর্মের জন্য নিজেরা এর একটি অংশ ব্যয় করে। বিশেষ করে খ্রিষ্টান জাতি তাদের মিথ্যা ধর্মের প্রচার এর জন্য প্রত্যেকে কমপক্ষে আয় এর দশভাগের একভাগ ব্যয় করে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মুসলিম জাতি কোরআনের নামে পয়সা ব্যয় করতে কুণ্ঠিত হয় এবং অনর্থক কাজে প্রচুর পয়সা অপব্যয় করে থাকে। তাই তিনি অন্য সমস্ত দীনি কাজের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক মুসলমানের ঘরে ‘কোরআন ফান্ড’ নামে একটি তহবিল গঠনের জন্য সবাইকে উৎসাহিত করতেন এবং কমপক্ষে টাকা প্রতি একপয়সা হলেও আল্লাহর কোরআনের খেদমতের নামে, দীনের প্রচার-প্রসার এবং তাবলিগ ও জিহাদি কাজের জন্য ব্যয় করতে বলতেন। এই লক্ষ্যে তিনি ঘরে ঘরে ‘কোরআন ফান্ড’ এর ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।

রাজনৈতিক জীবন: মুজাহিদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.) ছিলেন একজন বিরলপ্রজ আদর্শ রাজনীতিবিদ। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় স্বীয় পীর হজরত থানভী (রহ.) এর নির্দেশে আল্লামা সাব্বির আহমেদ উসমানি ও আল্লামা যফর আহমদ ওসমানীর নেতৃত্বে ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান কায়েম হওয়া পর্যন্ত সদর সাহেব হুজুর অবিভক্ত ভারতের অলিতে-গলিতে পাকিস্তানের সমর্থনে জনমত গড়ার আন্দোলনে সফর করেন এবং মিটিং মিছিল করে পাকিস্তান আন্দোলনকে প্রাণবন্ত করে তুলেন।

সিমলা মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক মহাসম্মেলন কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সদর সাহেব হুজুর ওই সম্মেলনে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দান করেন। জিন্নাহ তাতে মুগ্ধ হয়ে ওই মিটিংয়ে সদর সাহেবকে অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি উক্ত প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে নিজেই উদ্যোগী হয়ে খাজা নাজিমুদ্দিন সাহেবকে সভাপতি বানিয়ে দেন।

সদর হুজুর পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি পদ অলংকৃত করেছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় সীমান্ত রেফারেন্ডাম ও সিলেট রেফারেন্ডামে উলামায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে রাত-দিন মেহনত করে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। ফলে সীমান্ত প্রদেশ এবং সিলেট জেলা আল্লাহর রহমতে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯৪৭ সালের পর সদর সাহেব হুজুর পাকিস্তান মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্য নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং ১৯৫৪ নির্বাচনের সময় ইসলামি শাসনতন্ত্র কায়েমের ওয়াদা করায় হুজুর নির্বাচনে মুসলিম লীগকে সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে নেতাদের চরম দুর্নীতি এবং ইসলামি শাসনতন্ত্রের প্রতি গাদ্দারির কারণে মুসলিম লীগকে চিরতরে বর্জন করেন।

১৯৫১ সালে করাচিতে পাকিস্তানের ইসলামি শাসনতন্ত্র তৈরির জন্য চারদিনব্যাপী সর্বদলীয় উলামা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ২২ দফা আদর্শ প্রস্তাব রচনা ও পাশ করা হয়। এ ব্যাপারে সদর সাহেব বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের রাজনীতি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। চরম বিশৃঙ্খলার মাঝে আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসে এবং মার্শাল ল’ জারি করে। সদর সাহেব হুজুর আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী, ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। মিছিল-মিটিং, সভা-সমিতি, বই পুস্তক প্রণয়ন ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিবাদের ধারা অব্যাহত রাখেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খানকে সদর সাহেব হুজুরকে গ্রেফতার করার হুকুম দেন। আজম খান গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমে খবর নিয়ে জানতে পারেন সদর সাহেবকে গ্রেফতার করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটা বুঝতে পেরে তিনি এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন।

রচনাবলী: সদর সাহেব হুজুর ভাবতেন, মক্তব মাদরাসা পড়াশোনার মাধ্যমে তো অল্পসংখ্যক মানুষ দীন লাভ করে। কিন্তু এর বাইরে বিপুল সংখ্যক মুসলমানের মাঝে ইসলামি চেতনা, তাহজীব-তমুদ্দুন কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে? ওই যুগে বাংলা ভাষায় ইসলামি বইপত্র ছিল খুবই অপ্রতুল। তাই বাংলা ভাষায় ইসলামের প্রচার-প্রসারের জন্য বেশকিছু মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন। পাশাপাশি থানভী (রহ.) এর নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকারী কিছু কিতাবও অনুবাদ করেন। তাঁর রচিত কিতাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১. বাইয়াতনামা. ২. তাওবানামা. ৩. ইলমের ফজিলত. ৪. নামাজের ফজিলত. ৫. জিকিরের ফজিলত. ৬. নামাজের অর্থ. ৭. রোজার ফজিলত. ৮. তেজারতের ফজিলত ইত্যাদি। তার রচিত মোট ৫১টি পুস্তিকা তিন খণ্ডে সংকলিত হয়ে বিশ্ব কল্যাণ পাবলিকেশন্স থেকে বেরিয়েছে।

তার অনূদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে-১. বেহেশতী জেওর (১১ খণ্ড) ২. তাবলীগে দীন. ৩. ফুরুউল ঈমান. ৪. হায়াতুল মুসলিমীন. কাসদুস সাবীল. ৬. মোনাজাতে মাকবুল. ৭. তালীমুদ্দীন ইত্যাদি।

ইন্তেকাল: ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় মুসলিম বিশ্বের অন্যতম চিন্তাবিদ, মুজাহিদে আযম, সদরুল উলামা, মুর্শিদে কামেল, আলহাজ হজরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী অগণিত ভক্তকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। মহান আল্লাহ তায়ালা কর্মবীর এই সাধক আলেমের কবরকে নূর দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।

সংকলন: নুসরাত জাহান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে