Alexa বাংলার ভেতরেই এক টুকরো তিব্বত!

ঢাকা, রোববার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

বাংলার ভেতরেই এক টুকরো তিব্বত!

ভ্রমণ প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১৭ ২৪ আগস্ট ২০১৯  

চিত্রে যেন ‘মিনি তিব্বত’

চিত্রে যেন ‘মিনি তিব্বত’

‘তিব্বত’ তো খুব কাছেই, ওপার বাংলায়! সেখানকার পর্বতের গুহায় এখনো ভিড় জমায় ছোট লামাদের দল। উপত্যকা ভাসিয়ে প্রতিদিনই পর্বতের গুহা থেকে মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি ভেসে আসে। সবুজ চাদরে মোড়া ঢেউ-খেলানো মাঠে দাঁড়িয়ে আটটি বৌদ্ধস্তূপ। সেখানে রোদ এসে পড়ে, দাগ রেখে যায় বৃষ্টির জল। আর, নীল সোয়েটার পরা আকাশের এক কোণে রোজ সকালে ঘুম ভাঙে কাঞ্চনজঙ্ঘার।

গল্প নয়, সত্যি। ভারত আর নেপাল সীমান্তে অবস্থিত ‌চিত্রে নামক গ্রামটি, সেখানেই মেলে তিব্বতের আবহ। গ্রামটির উচ্চতা ৮,৩৪০ ফুট। মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু যাওয়ার সময়ই পড়ে এই গ্রামে। পায়ে হেঁটে ঘণ্টা দেড়েক সময় লাগে। প্রতিদিন অসংখ্য ট্রেকার এখানে আসেন, বিশ্রাম নেন। এরপর আবার হাঁটা শুরু করেন টংলু কিংবা টামলিং-এর উদ্দেশ্যে। চিত্রে এই ক্ষণিকের পরিযায়ীদের সঙ্গই পায় আজীবন। খুব বেশি মানুষ বসবাস করেন না এই গ্রামে। করলে বুঝতেন, এ এক আশ্চর্য জায়গা! একবার এখানে থাকলে তার নেশা কাটানো যে কতটা মুশকিল!

কী আছে এই ছোট্ট গ্রামটিতে? কেন এখানেই নতুন বসত গড়েছিলেন তিব্বতের কয়েকটি পরিবার? সেই কথা জিজ্ঞেস করলে উপত্যকা উজাড় করে হাসেন ফিনজো, জিগমে ও ডোমারা। প্রত্যেকেরই শিকড় তিব্বতে। ১৯৬০ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার দিনগুলোয় ছিন্নমূল হয়েছিলেন তাদের পূর্বপুরুষরা। তাদেরই অন্যতম ছিলেন ফিনজোর বাবা নামগিয়াল ভুটিয়া। তিনিই প্রথম তার পরিবার নিয়ে এসে ঘর বানান চিত্রেতে। তারপর, একে একে আরো চারটি পরিবার। গড়ে ওঠে ছোট্ট এক তিব্বতি মহল্লা। সেই সংস্কৃতি, স্থাপত্য। ধীরে ধীরে এখানেই তৈরি হয় বিখ্যাত তিব্বতি পর্বতের গুহা এবং স্কুল।

চিত্রে

চিত্রে যেন শিকড় হারানোর ক্ষত ভুলিয়ে দিয়েছিল সেই মানুষগুলোকে। প্রকৃতি অনেক আদরে এঁকেছে এই উপত্যকা। দু’পাশে পাহাড়ের ঢেউ আর গুরাস-রানি চাঁপের বন। দূরে বরফের চুড়া। এখানেও সেই জুড়িয়ে দেয়া ঠাণ্ডা হাওয়া ভেসে আসে অতি শীতের দেশ থেকে। এই হাওয়া কি তিব্বতের সেই ফেলে আসা গ্রামের খবর জানে? আপার ও লোয়ার চিত্রে ভ্যালিতে তখন নিজেদের নতুন শিকড় গাঁথার ইতিহাস লিখছিলেন নামগিয়ালরা। কিন্তু, ছিন্নমূল মানুষদের ইতিহাস তো এত সহজ হয় না। দেশ কী, শিকড় কোথায়—এই প্রশ্ন বারবার হানা দেয় স্বপ্নে। নামগিয়ালদের নাগরিকত্ব বদলায়। নতুন দেশ একভাবে আপনও করে নেয় তাদের। কিন্তু, সংস্কৃতির অভ্যাসটা মুছে ফেলা যায় না। তা তো জন্মদাগের মতো।

সান্দাকফু এখন পর্যটনকেন্দ্র। তিব্বতের স্বাদ নিতে অনেকেই ছুটি পেয়ে ছুটে আসেন। তৈরি হলো ট্রেকার্স হাট। পর্যটকের ঢল এখন এই পাহাড়ের বাঁক-পথ, এমনকি চিত্রেও। ইতোমধ্যে, তৈরি হয়েছে চিত্র পর্বতের ‍গুহা। দার্জিলিং, কালিম্পং-এর প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এখানে পড়তে আসে বৌদ্ধ পরিবারের সন্তানরা। সেই পাঠ কঠিন সংযমের, তপস্যার। সূর্যের আলো দেখাও মানা। কিছুক্ষণের জন্য চিত্রেয় কাটালে বোঝাই যাবে না, এই গুহাতেই পাঠ নিচ্ছে তিনশ’ জন কিশোর। যাদের অনেকেই এরপর বিভিন্ন লামা হিসেবে নিযুক্ত হবে। কেউ কেউ অবশ্য উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেবে বাইরে, এমনকি বিদেশেও।

কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলে চিত্রে থেকে

চিত্রেয় এখন সাকুল্যে পাঁচটি পরিবারের বাস। তাদের মধ্যে চারটি তিব্বত থেকে আসা। এখানে আছে সকলের প্রিয় মানুষ ডোমা। এই উপত্যকায় একটি চায়ের দোকান চালায় সে। পরিবারের অন্যরা থাকে স্লোভাকিয়ায়। ঘরের দেয়ালে পরিবারের ছবি টাঙানো। সকালের প্রাতঃরাশ, চা, ডিম-টোস্ট, নুডলস, মোমো এমনকি চাইনিজ খাবারও চাইলেই বানিয়ে দেবে ডোমা। পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করলে গল্প জুড়বে আপনার সঙ্গে। মনখারাপ করে না? পাহাড়ে তো মেঘ আসে, তারপর রোদ। ঝলমল করে ওঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা। ডোমার উচ্ছল হাসি চারিয়ে যাবে আপনার ভেতরেও।

কীভাবে যাবেন?

ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি জংশন রেলওয়ে স্টেশন। সেখান থেকে গাড়িতে মানেভঞ্জন ৮৪ কিলোমিটার। মানেভঞ্জন থেকে চিত্রে ৩ কিমি। হেঁটে ওঠাই ভালো। তবে, গাড়িও মিলবে। বর্ষা বাদে যে কোনো সময় যেতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, শীতে বোনাস হিসেবে বরফ মিলতে পারে উপত্যকায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে