‘ওমা, ডাক্তার কই? এ তো মেয়ে!’

ঢাকা, শুক্রবার   ০৩ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২০ ১৪২৬,   ০৯ শা'বান ১৪৪১

Akash

‘ওমা, ডাক্তার কই? এ তো মেয়ে!’

আঁখি আক্তার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩০ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৭:৩১ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

উনবিংশ শতাব্দীতে চার দেয়ালের বাইরে বের হওয়া নারীদের জন্য ছিল দুঃসাধ্য। সেই শতাব্দীর মেয়ে হয়ে চলমান প্রথা ভাঙেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। হয়ে ওঠেন বাংলার প্রথম নারী চিকিৎসক। সাফল্যের পথটা মসৃন ছিল না তার, ছিল কাঁটায় ভরা। রক্তচক্ষু দেখিয়েছে তৎকালীন সমাজ। সেই রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অনেকটা পথ একাই হেঁটেছেন কাদম্বিনী।

চিকিৎসক হয়েও কাদম্বিনীকে সইতে হয়েছে শত অবহেলা। সমাজের মানুষের ধারণা ছিল, একটা মেয়ে কিভাবে ডাক্তার হয়? নেতিবাচক ধারণা ভেঙে বারবার আঙুল তোলা মানুষগুলোর মন জয় করেছেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী।

একটা গল্প আছে- বড় বাড়ির সবার আদরের মেয়ে অসুস্থ। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার আনতে ছুটল গাড়ি। গাড়ি থেকে যখন কাদম্বিনী নামলেন, বাড়ির সবাই বলে উঠল, ‘ওমা, ডাক্তার কই? এ তো মেয়ে!’

এমনই হাজারো বাধাবিঘ্ন আর শফলতার গল্প আছে কাদম্বিনীর জীবনে। সেসব গল্পই জানবেন ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকরা-

কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ১৮ জুলাই ১৮৬১ সালে বিহারের ভাগলপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ব্রজকিশোর বসু। কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর জাতীয়তা ব্রিটিশ ভারতীয়।  

ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ২ জন নারী স্নাতকের একজন ছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় চিকিৎসা শাস্ত্রে শিক্ষিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী চিকিৎসক ছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তিনি পাশ্চাত্য চিকিৎসায় ডিগ্রী অর্জন করেন এবং আনন্দীবাঈ যোশীর সঙ্গে তিনিও হয়ে ওঠেন ভারতের প্রথমদিককার একজন নারী চিকিৎসক।

কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর জীবনী

কাদম্বিনী গাঙ্গুলীব্রাহ্ম সংস্কারক ব্রজকিশোর বসুর কন্যা কাদম্বিনীর জন্ম বিহারের ভাগলপুরে হলেও, তার মূল বাড়ি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালের চাঁদসি-তে। তার বাবা ভাগলপুর স্কুলের প্রধানশিক্ষক ছিলেন। ব্রজকিশোর বসু অভয়চরণ মল্লিকের সঙ্গে ভাগলপুরে নারীদের অধিকারের আন্দোলন করেছিলেন। তারা নারীদের সংগঠন ভাগলপুর মহিলা সমিতি স্থাপন করেছিলেন ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে। এই ঘটনা ছিল ভারতে প্রথম।

কাদম্বিনী তার পড়াশোনা আরম্ভ করেন বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে। এরপর বেথুন স্কুলে পড়ার সময়ে তিনি ১৮৭৮ সালে প্রথম নারী হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাস করেন। তার দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে বেথুন কলেজ প্রথম এফ.এ (ফার্স্ট আর্টস) এবং তারপর অন্যান্য স্নাতক শ্রেণি আরম্ভ করে। কাদম্বিনী এবং চন্দ্রমুখী বসু বেথুন কলেজের প্রথম গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে। তারা বি.এ পাস করেছিলেন। তারা ছিলেন ভারতে এবং সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট।

গ্র্যাজুয়েট হবার পর কাদম্বিনী দেবী সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি ডাক্তারি পড়বেন। ১৮৮৩ সালে মেডিকেল কলেজে ঢোকার পরেই তিনি তার শিক্ষক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে বিয়ে করেন। দ্বারকানাথ বিখ্যাত সমাজসংস্কারক ও মানবদরদী সাংবাদিক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। যখন তিনি বিয়ে করে তখন ৩৯ বছর বয়েসের বিপত্নীক, কাদম্বিনীর বয়স তখন ছিল একুশ। কাদম্বিনী ফাইন্যাল পরীক্ষায় সমস্ত লিখিত বিষয়ে পাস করলেও প্র্যাকটিক্যালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অকৃতকার্য হন । ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে তাকে জিবিএমসি (গ্র্যাজুয়েট অফ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ) ডিগ্রি দেয়া হয়। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় নারী, যিনি পাশ্চাত্য চিকিৎসারীতিতে চিকিৎসা করবার অনুমতি পান। তাছাড়া মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন তিনি সরকারের স্কলারশিপ পান, যা ছিল মাসে ২০ টাকা।

তিনি পাঁচ বছর মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করে বিলেত যান। বিলেত যাবার আগে ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কিছুদিন লেডি ডাফরিন মহিলা হাসপাতালে মাসিক ৩০০ টাকা বেতনে কাজ করেছিলেন।

কাদম্বিনী গাঙ্গুলী১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বোম্বে শহরে কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশনে প্রথম যে ছয় জন নারী প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন, কাদম্বিনী ছিলেন তাদের অন্যতম একজন। পরের বছর তিনি কলকাতার কংগ্রেসের ষষ্ঠ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন। কাদম্বিনী ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম মহিলা বক্তা। কাদম্বিনী গান্ধীজীর সহকর্মী হেনরি পোলক প্রতিষ্ঠিত ট্রানসভাল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি এবং ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মহিলা সম্মেলনের সদস্য ছিলেন।

১৯১৪ সালে তিনি কলকাতায় সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই অধিবেশন মহাত্মা গান্ধীর সম্মানের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। কাদম্বিনী চা বাগানের শ্রমিকদের শোষণের বিষয়ে অবগত ছিলেন। তিনি তার স্বামীর দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেন। তার স্বামী আসামের চা বাগানের শ্রমিকদের কাজে লাগানোর পদ্ধতির নিন্দা করেছিলেন। কবি কামিনী রায়ের সঙ্গে কাদম্বিনী দেবী ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে বিহার এবং ওড়িশার নারীশ্রমিকদের অবস্থা তদন্তের জন্য সরকার দ্বারা নিযুক্ত হয়েছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবন

আট সন্তানের মা হওয়ার জন্য সংসারের জন্যও তাকে বেশ সময় দিতে হত। তিনি সূচিশিল্পেও নিপুণা ছিলেন। বিখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ ডেভিড কফ লিখেছেন, "গাঙ্গুলির স্ত্রী কাদম্বিনী ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে স্ফয় এবং স্বাধীন ব্রাহ্ম নারী। তৎকালীন বাঙালি সমাজের অন্যান্য ব্রাহ্ম এবং খ্রিস্টান নারীদের চেয়েও তিনি অগ্রবর্তী ছিলেন। সব বাধার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ হিসেবে নিজেকে জানার তার এই ক্ষমতা তাকে সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা জনগোষ্ঠীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত করে। "

সামাজিক বাধা

কাদম্বিনী গাঙ্গুলীতিনি হিন্দু রক্ষনশীল সমাজের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। পেশা জীবনেও বহু ব্যাপারে বাংলার প্রথম নারী হিসেবে রেকর্ড করা কাদম্বিনীকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তাকে পরোক্ষ ভাবে বেশ্যা বলেছিল এক সম্পাদক মহেশচন্দ্র পাল। তখনকার বঙ্গবাসী নামে সাময়িক পত্রিকার ডাকসাঁইটে সম্পাদক মহেশচন্দ্র পাল একটি কার্টুন ছেপে ডা. কাদম্বিনীকে ‘স্বৈরিণী’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ কাদম্বিনী নাকি মোটেই ঘরোয়া নন। ঘর-সংসারের দিকে, ছেলেমেয়ের দিকে তার নাকি মন নেই, নিষ্ঠাও নেই। এতগুলো সন্তানের মা হওয়া সত্ত্বেও তিনি নাকি মাতৃধর্ম পালন করছেন না। এর ওপর আবার সমাজসেবা, স্বদেশী করে বেড়াচ্ছেন, সভাসমিতি করছেন বাইরে। সুতরাং বঙ্গবাসী পত্রিকায় একটা কার্টুন এঁকে দেখানো হলো, বারবণিতা ডা. কাদম্বিনী স্বামী দ্বারকানাথের নাকে দড়ি দিয়ে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ছেড়ে দেবার পাত্রী নন কাদম্বিনী কিংবা তার স্বামী। মামলা হলো। বঙ্গবাসী পত্রিকার সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালের ১০০ টাকা জরিমানা আর ৬ মাসের জেল হলো। সেই সময় এই ধরনের মামলা করা, বিশেষ করে একশক্তিশালী পুরুষ কাগজের সম্পাদকের বিরুদ্ধে কোনো নারীর মানহানির মামলা করাটা মোটেই সহজ ছিল না।

চিকিৎসক হিসেবে একদিন এক রোগী দেখতে তার বাড়ি যান কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। গাড়ি থেকে নামার পর ওই বাড়ির লোকজন বলছিলো 'ডাক্তার কই? এ তো মেয়ে! সমাজের এই ধরনের মন্তব্যের শিকারও হতে হয়েছিল তাকে। এক কথায় অনেক বাধা অতিক্রম করেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার প্রথম নারী চিকিৎসক।

মহীয়সী নারী কাদম্বিনী গাঙ্গুলি ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তার হাত ধরেই আজকের চিকিৎসাসেবা প্রদানের সুযোগ হয়েছে অগণিত নারীদের। নিজেকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখেছে নারীরা। প্রমাণ করতে শিখেছে পুরুষের চাইতে নারীরা কোনো অংশেই কম নয়। বরং নারী-পুরুষের সমান চেষ্টাই সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ/এআর