Alexa বাংলাদেশ-ভুটান বিদ্যুৎ বাণিজ্য হতে পারে উন্নতির সোপান 

ঢাকা, সোমবার   ১৮ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৩ ১৪২৬,   ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

বাংলাদেশ-ভুটান বিদ্যুৎ বাণিজ্য হতে পারে উন্নতির সোপান 

 প্রকাশিত: ১৬:০৯ ৯ নভেম্বর ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত, ভুটান, মায়ানামার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ বহুদিন ধরেই ছিল জোটবদ্ধ ও একটি ব্লক।

এশিয়ার মধ্যে চীন পাকিস্তান আরেকটি ব্লক। কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে এই জোটগুলিতে ভারত ও চীন সুযোগ পেলেই দাদাগিরি করে। ফলে এই দুই রাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে দুটি ছোট রাষ্ট্র যখনই কোনো পারস্পরিক বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেয় এই দুই দেশ চট করে লাফিয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ভুটানের বাণিজ্যিক সম্পর্কস্থাপনে ভারতের এই নীরব প্রভাব অবশ্যই একটি ভাবার মত বিষয় বই কী।

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার পর ভুটানের রাজা বাংলাদেশের সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির কাছে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। নতুন দেশকে সারা বিশ্বে পরিচয় করানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ভুটানই প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ভারত পরেরদিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ভুটান ও বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে বাণিজ্য উন্নয়নের পদক্ষেপ হিসেবে একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর থিম্ফু তে আনুষ্ঠানিক সফরের সময় এই চুক্তিটি নবায়ন করা হয়। ভুটানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ রফতানি, এরপর পর্যটন এবং ফল রফতানি। ভুটানের মানুষের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা মাত্র ৫০০ মেগাওয়াট। তবে ভুটান বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ৩ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। বাকি বিদ্যুৎ ভারতে রফতানি করে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায়। ভারত বর্তমানে ভুটানের অনেকগুলো পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে বাস্তবায়ন করছে। তার সেভেন সিস্টার খ্যাত কয়েকটি রাজ্যের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাচ্ছে ভুটান থেকে বিদ্যুৎ কিনে। হিমালয় থেকে নেমে আসা অসংখ্য নদীর স্বচ্ছ পানির প্রবাহ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে ভুটান।

আগামী বছরের মধ্যে ভুটানে উৎপাদনে যাবে আরো তিনটি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২০২০ সালের মধ্যে ভুটানে আরো ১০ হাজার মেগাওয়াট পানিবিদ্যুৎ  উৎপাদন করবে ভারত। এ বিষয়ে চুক্তিও সই হয়েছে নয়াদিল্লি ও থিম্পুর মধ্যে। ভারতের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভুটানের বিদ্যুৎ উৎপাদন দাঁড়াবে ১২ হাজার মেগাওয়াটে। অবশ্য ৩০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে তাদের। নিজেদের চাহিদা না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সেই বিদ্যুৎ রফতানি করতে চায় ভুটান। এই বিদ্যুৎ কিনতে উৎসাহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার কারণে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। সরকারের পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২১-এ বিদ্যুৎ আমদানি বেড়ে দাঁড়াবে ২ হাজার মেগাওয়াট, ২০২৫-এ ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ২০৩০ সালে ৫ হাজার মেগাওয়াট আর ২০৩৫ সালে ৭ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালে দাঁড়াবে ৯ হাজার মেগাওয়াট। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ যৌথভাবে ভুটানের বিভিন্ন পানিবিদ্যুৎ  প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চাইছে। কিন্তু ভুটান ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র, তাকে মূলত ভারতের ওপর দিয়ে বাইরে বের হতে হয়। ১৯৪৯ সালের ভারত ভুটান চুক্তি অনুযায়ী ব্যবসা-বাণিজ্যের সব সুযোগ এককভাবে তাদের ভারতকে দিতে হবে। তার ওপরে ভুটানের ঋণগ্রস্ততা এখন বিশাল আর এর পরিমাণ ভুটানের জিডিপির ১১৮%। আর এই মোট ঋণের ৬৪% এর দাতা, ঋণ-মহাজন হল ভারত। ২০১৩ সালের সালের ভুটানের নির্বাচনের আগের দিন ততকালীন মনমোহন সরকার ভুটানে ভারতের সরবরাহ করা তেল গ্যাস জ্বালানির ওপর থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। সেবার এতে ভারতমুখি দল পিডিপির জয়লাভ আর প্রতিদ্বন্দ্বি ডিপিটি দলের হারের কারণ মনে করা হয়। আর ডিপিটি দলের উপর ভারতের এমন বিরাগ ও সাজা দিবার কারণ তার নেতা ২০১২ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাত করেছিল। তাই ভারতের মনোভাব বাংলাদেশের এই উদ্যোগের প্রতি ঠিক কি সেটা জানা খুব জরুরি।  দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আর্থ-সামাজিক বেশিরভাগ সূচকে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির দেশ হলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দক্ষতার সূচকে অনেকটাই পিছিয়ে। তাই এ সম্ভাবনার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতের সিদ্ধান্তের ওপর। বছর কয়েক ধরেই ভুটানের কুড়ি ও সংঘর উপনদীর মিলিত স্থানে দার্জিলং বা রোপতাসন পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগে বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এক হাজার ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার এ প্রকল্পে বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটান যৌথভাবে বিনিয়োগ করলে অভিন্ন নদী অববাহিকায় পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের এক মডেল হবে। তাই এ ব্যাপারে ভুটান শতভাগ আগ্রহী হলেও ভারতের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। সে কারণেই গত ১২ এপ্রিল ঢাকা সফরে এসে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং পূর্ণ সম্মতি জানিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন।

জাতিসংঘের সব আইনে অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা অববাহিকাভিত্তিক করার নিদের্শনা থাকায় বিশ্বের বহু দেশ সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তুললেও বাংলাদেশ ও উজানের দেশগুলোর মধ্যে এ ব্যবস্থাপনা আজও গড়ে ওঠেনি। ২০১১ সালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার যে ফেমওয়ার্ক স্বাক্ষরিত হয় তাতে অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দিকনির্দেশনায় অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অঙ্গীকার আছে। তবে গত আট বছরে এ ব্যাপারেও কোনো উন্নতি হয়নি। ভারত কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে। শুধু বাংলাদেশই ভারত থেকে সীমিত বিদ্যুৎ কিনছে। এক্ষেত্রে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা কেন হবে না? এক্ষেত্রে ভুটান থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ আমদানি করা গেলে দাম কম পড়বে। আর সে বিদ্যুৎ সরকারের অঙ্গীকারের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু ভুটানে পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশ অংশীদারত্ব পেলে বাংলাদেশে বেশি দামে বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ হারাতে পারে ভারত। এজন্যেই টালবাহানা করছে ভারত।

এই মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক বাংলাদেশের। কারণ বাংলাদেশ বেশ কিছু জায়গায় ভারতের নির্ভরতার জায়গা। ভারতের ‘দাদাগিরি’র অ্যাটিটিউড কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা থেকে তারা নিজেদের বিরত রেখেছে। ২০১৫ সালে  সেপ্টেম্বরে ভারতের অপছন্দকে আমলে না নিয়ে নেপাল তার নতুন কনষ্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেওয়ায়, ভারত জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ সব পণ্যের ভারতের উপর দিয়ে নেপালে আমদানির সব সড়ক ভারত অবরোধ করে রেখেছিল দীর্ঘ ছয়মাস ধরে। সে এক দুর্বিসহ অবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো ব্যাপারে ভারত সম্প্রতি নাক গলায়নি। এটা অবশ্যই দেশের সরকারে কূটনৈতিক সাফল্য। কিন্তু এই পানিবিদ্যুৎ  প্রকল্পে এই কূটনৈতিক তৎপরতা দেখানো অবিলম্বে প্রয়োজন। কারণ বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে টালমাটাল ভারতকে কিছু সুবিধা দিতে হলেও তা দিয়ে অবিলম্বে এই বিদ্যুৎ সরাসরি আনার ব্যবস্থা করতে হবে যা হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্যে একটি কূটনৈতিক মাস্টার স্ট্রোক।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর