বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্পের ইতিহাস ও ভারতে প্রবেশ
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=133651 LIMIT 1

ঢাকা, রোববার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ৫ ১৪২৭,   ০১ সফর ১৪৪২

Beximco LPG Gas

বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্পের ইতিহাস ও ভারতে প্রবেশ

 প্রকাশিত: ১৭:২২ ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

অমিত গোস্বামী
পরিচিতি ও কাব্যচর্চা দুই বাংলায়। মূলতঃ কবি হলেও উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও পাঠকমহলে জনপ্রিয়। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই কলকাতায়। কর্পোরেটের চাকরি ছেড়ে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ বেশ দেরিতেই। কিন্তু অগ্রগমন দ্রুত। এরইমধ্যে ১০ টি গদ্য ও উপন্যাস এবং ৪ টি কবিতা সংকলন প্রকাশিত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলতাফ, হুমায়ূন ও বঙ্গবন্ধুর কলকাতার জীবন অবলম্বনে লেখা উপন্যাস ‘মহানির্মাণ’।

১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকায় তৎকালীন ডিআইটি ভবনে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাদাকালো সম্প্রচার। 

‘ওই যে আকাশ নীল হলো আজ/ সে শুধু তোমার প্রেমে’—ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া গানটি দিয়েই তো অনুষ্ঠানমালার প্রচার শুরু। এরপর কত শত অনুষ্ঠান। সাদাকালো থেকে রঙিন জগতে প্রবেশ।

ঢাকার রামপুরার বিটিভি ভবনে টেলিভিশন জাদুঘরে ঢুকে আমরা যখন একের পর এক ছবির মুখোমুখি- মনে হলো, বোধ হয় ফ্রেমের পর ফ্রেম-ছবি দিয়েই তৈরি হয়েছে এই জাদুঘর। বহুব্রীহি নাটকের আফজাল হোসেন ও আসাদুজ্জামান নূর; মুস্তাফা মনোয়ার প্রযোজিত সেই বিখ্যাত রক্তকরবীর পাত্রপাত্রীরা, জাদুঘরে আপনার সামনে ফ্রেমবন্দী হয়ে আছেন সাদাকালো যুগের আনোয়ার হোসেন, লায়লা হাসান ও সৈয়দ হাসান ইমাম; দেখে নিতে পারেন কলকাতার বিখ্যাত গণসংগীতশিল্পী সলিল চৌধুরী ও তার পরিবারকে—তাদের গান করার দৃশ্য; ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের প্রবাদপ্রতিম উপস্থাপক ফজলে লোহানী—তিনিও আছেন; ওই যে মন-হরণ করা অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্নের অপলক চাহনির ছবি, তার মানে কোনো একসময় অড্রে হেপবার্নও এসেছিলেন বিটিভিতে? উত্তর হলো হ্যাঁ। এখানে আরো পাওয়া গেল নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালামকে—বিটিভিতে এসে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন তিনি, সেই দৃশ্য। জাদুঘরের এক স্থানে দেখা গেল ফ্রেমবন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ১৯৭৫ সালের ১৮ মে রামপুরা টিভি ভবন দেখতে এসেছিলেন তিনি, ছবিটি সেই সময়কার। এভাবে কত মুখ, কত চরিত্র—বিটিভিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান যাঁরা করেছেন, যেসব বিশিষ্টজন এসেছেন এখানে—সবাই ছবি হয়ে আছেন জাদুঘরে। নানা সময়ে বিটিভির সম্প্রচারকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রও—ভিএইচ টিভি ট্রান্সমিটার, ক্যানন স্কুপি ১৬ এমএস মডেলের ১৬ এমএম নিউজ ফিল্ম ক্যামেরা, রোলেক্স এইচ ১৬ রিফ্লেক্স মডেলের ১৬ এমএম ফিল্ম ক্যামেরা, সি পি-১৬ মডেলের সিনেমা প্রোডাক্টস সাউন্ড ক্যামেরা—সত্তর দশকের সাদাকালো যুগে ব্যবহৃত এই যন্ত্রাংশের পাশাপাশি দেখা মিলল আশির দশকের রঙিন যুগের যন্ত্রপাতি। যেমন কে সি-৫০ মডেলের রঙিন ক্যামেরা, ভিডিও টেপ রেকর্ডার, অডিও ডিস্ক প্লেয়ার, পোর্টেবল মনিটর প্রভৃতি। একটি কাচের বাক্সে দেখতে পাই হাতে লেখা সংবাদের পাণ্ডুলিপি,‘রাজধানীতে বুলগেরিয় চলচ্চিত্র উত্সব শুরু হয়েছে’—এই খবরে চোখ রাখতে না রাখতেই আমাদের ডাক দেন নাট্যকার মমতাজউদ্দীন আহমদ, সেলিম আল দীন ও হুমায়ূন আহমেদ। তাদের হাতে লেখা নাটকের পাণ্ডুলিপিগুলো নিশ্চিতই আজ ইতিহাসের স্মারক।

মুক্তিযুদ্ধে টেলিভিশনের ভূমিকা– আমরা জানি যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি যে যুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ, উদ্দীপনা ও সাহস জুগিয়েছে, জুগিয়েছে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে অনুপ্রেরণা এবং হানাদার জল্লাদ বাহিনীকে সর্বক্ষণ রেখেছে ভীতসন্ত্রস্ত তা হলো মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।  আর এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা ধরনের অপ-প্রচার চলছিল এবং তার বিরুদ্ধে জবাব দেয়া হয়েছে একমাত্র স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। এই বেতার কেন্দ্রটিও ছিল আর একটি সেক্টর যেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবরই  প্রচারিত শুধু হতো না, অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধকেও পরিচালিত করত এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। কিন্তু বিটিভি? যা ছিল সরকারী নিয়ন্ত্রাধীন প্রচার মাধ্যম? ডিআইটির টেলিভিশন কেন্দ্রে প্রায় ১০০ পাকিস্তানি সেনা পাহারায় থাকতো। সবসময় নজরদারিতে ছিলেন টেলিভিশনের কর্মী আর কলাকুশলীরা। এর মাঝেই কৌশলে দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করার কাজে, যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন তারা। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ শুরু করেছিলেন তত্কালীন টেলিভিশন করপোরেশনে পাকিস্তান ঢাকার সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী। অসহযোগ আন্দোলন থেকেই টেলিভিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বীরোচিতভাবে অসহযোগ করেছিলেন। কৌশলে অনুষ্ঠান প্রচার, নাটক প্রচার প্রভৃতি ছিল। তবে টেলিভিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবচেয়ে সাহসিকতার কাজ ছিল ২৩ মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবসে পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে প্রচার না করা। এটি ছিল অসম সাহসিকতার প্রকাশ।

২৩ মার্চ, ১৯৭১, সকাল। অফিস যাবার জন্য ঘর থেকে বেরিয়েছেন পাকিস্তান টেলিভিশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। পথে দেখতে পেলেন দু’একটি সরকারি ভবন ছাড়া কোন বাড়িতে পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে না। মনে মনে কিছু একটা ভাবলেন তিনি। শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার এক নিবন্ধে লিখেছেন, যেহেতু প্রোগ্রাম ম্যানেজার ছিলাম, তাই সব অনুষ্ঠান আমার নির্দেশ অনুযায়ী চলতো। আমরা ঠিক করেছিলাম সারাদেশের মানুষের মনের কথা আমরা টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানে তুলে ধরবো। অফিসে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে পাকিস্তানের পতাকা দেখাবো না। কিন্তু সে কথা কারো সঙ্গে আলোচনা করিনি। শুধু ইঞ্জিনিয়ার সালাউদ্দিনকে বললাম। আর একজন ঘোষক রাখতে হবে। মাসুমা খাতুন খুব সাহসের সঙ্গে বললেন, এ কাজ তিনি করতে পারবেন। সাড়ে দশটায় অনুষ্ঠান বন্ধ করা হতো। আমার সিদ্ধান্ত ছিল, ২৩ মার্চ চ্যানেল বন্ধ হবে না। রাত বারোটার পরে আমরা অনুষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেব। তাহলে আমাদের পতাকা দেখাতে হবে না।

সেদিন রাতে সাড়ে নয়টা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত একনাগাড়ে বেজেছিল শিল্পী ফাহমিদা খাতুনের গাওয়া ‘আজ বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি’ গানটি। রাত বারোটা এক মিনিটে অনুষ্ঠান ঘোষিকা মাসুমা খাতুন ঘোষণা করলেন, ‘এখন সময় রাত বারোটা বেজে এক মিনিট। আজ ২৪ মার্চ ১৯৭১। আজকের অনুষ্ঠানের এখানেই সমাপ্তি।’ ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। সেদিন ঢাকা টেলিভিশনে পাকিস্তানের পতাকা দেখানো হয়নি। এই ঘটনার পর শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর টেলিভিশন ভবনে ঢুকতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় চলে যান। যুদ্ধ শেষ হলে ফিরে আসেন দেশে।

ছবি: সংগৃহীত

৭ মার্চের ভাষন ও বিটিভি – অনেকের ধারনা এই যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষন বিটিভি’তে প্রচারিত হয় নি। এটা ভুল ধারনা। রেডিওতে প্রচার বন্ধ করা হলেও সাতই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি টেলিভিশনের সংবাদে প্রচার করা হয়েছিল। টেলিভিশনের সাহসী কর্মীদের বদৌলতে অসহযোগ আন্দোলন, পাকিস্তানীদের নির্যাতন, ছাত্রদের কর্মসূচি সবকিছুই ঢাকা কেন্দ্রের সংবাদে প্রচারিত হতো। এ প্রসঙ্গে বিটিভির সাবেক উপ-মহাপরিচালক ফারুক আলমগীর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, আমি সেইসময়ের ঘটনাগুলো নিয়ে প্রতিবেদন লিখতাম আর চিত্রগ্রাহক মুনীর আলম মির্জা বাদল ইএফপিতে ধারণ করতেন। সেই মার্চের বাদলের ধারণকৃত ফুটেজ সব সংগ্রহে ছিল। সেগুলো পরে পাকিস্তান সরকার রাওয়ালপিন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ট্রায়াল-এর সাক্ষ্য হিসেবে নিয়ে যায়। এরপর আর সেসবের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

একাত্তরে টেলিভিশনের অনেক কর্মীই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে যারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করেন তাদের মধ্যে জামিল চৌধুরী, মুস্তাফা মনোয়ার, মুস্তাফিজুর রহমান অন্যতম। পরে পাকিস্তান থেকে কর্মী এনে টিভি সমপ্রচার চালু রাখা হয়। ১৭ ডিসেম্বর টিভি স্ক্রিনে ভেসে ওঠে নতুন টেপ ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচার হওয়া প্রথম নাটকটি ছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। ‘বাংলা আমার বাংলা’ নামের এ নাটকটির রচনায় ছিলেন ড. ইনামুল হক এবং প্রযোজনায় ছিলেন আবদুল্লাহ-আল-মামুন। 

শেখ মুজিব হত্যা ও টেলিভিশন -  ১৯৭৫ সালের এই দিনে ভোরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সকালে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়েছিলেন বিটিভির তৎকালীন ক্যামেরাম্যান জিয়াউল হক। তিনি ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সিনিয়র ক্যামেরাম্যান। সেখানে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের লাশ দেখে তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না এটি সত্য ঘটনা। মর্মান্তিক সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জিয়াউল হক বলেন, আমি তখন নিজের শরীরে নিজেই হাত দিয়ে দেখেছি, এ কোনো দুঃস্বপ্ন নাকি সত্যি ঘটনা! দেখে বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে, একটি জাতির পিতা, একটি রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, এভাবে সিঁড়িতে পড়ে আছেন! কী নির্মমতা! কী নৃশংসতা!

জিয়াউল বলেন, প্রথমে বাড়ির সিঁড়িতে প্রবেশ করে দেখি- শেখ কামালের লাশ পড়ে আছে। তারপর বঙ্গবন্ধুর। এরপর বেগম শেখ মুজিব, শেখ জামাল, সুলতানা, রোজী ও শেখ রাসেলের। শেষোক্ত তিন জনের লাশ একসঙ্গে ছিল। আমার তখন মনে হয়েছে, তাদের অন্য কোথাও হত্যা করে এখানে এনে জড়ো করা হয়েছে। শিশু রাসেলের মৃতদেহটি সুলতানা ও রোজীর শাড়িতে অনেকটাই ঢাকা পড়েছিল। জামালের বুকে ও চোখে বুলেটের আঘাত, তবু মনে হচ্ছিল মুচকি হাসছে। বেগম মুজিবের মুখ ছিল খোলা, তার ব্যবহৃত মুক্তার মালাটি পড়েছিল মুখের সামনে। চারপাশে রক্ত আর রক্ত। রক্ত আর লাশ ডিঙিয়ে শেখ জামালের ছবি তুললাম। উহ! এখনো গা শিউরে ওঠে! সহ্য করার মতো নয়! খুবই হৃদয়বিদারক। আমি তখন বোলেক্স ১৬ মিমি ক্যামেরা ব্যবহার করতাম। আমার বয়স তখন মাত্র ৩০ বছর। সেই বয়সে এমন সব ছবি তোলা আমার জন্য ছিল খুবই তিক্ত-বেদনাদায়ক।

বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রদর্শিত ভিডিও ফুটেজে বঙ্গবন্ধুর লাশ সিঁড়িতে পড়ে থাকার যে দৃশ্য দেখা যায়- বিরল সেই দৃশ্যটি ধারণ করেছিলেন জিয়াউল হক। ৪৫ সেকেন্ড ব্যাপ্তি ছিল সেই ভিডিওটির। সেই ভিডিও ধারণ করতে গিয়েও তাকে কম ঝুঁকি নিতে হয়নি। অনেক যুক্তিতর্কের পর তৎকালীন সেনা কর্মকর্তারা তাকে ভিডিও করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তাদের আচার-আচরণে জিয়াউল হকের মনে এমন আশঙ্কাও জেগেছিল যে, হয়তো ভিডিও করার পর ফুটেজটি রেখে তাকে হত্যা করা হবে, এ সংক্রান্ত কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না রাখার জন্য। তবু তিনি ঝুঁকি নিয়েছিলেন।  সেই ঘটনার কথা তুলে ধরে জিয়াউল বলেন, হত্যার দিন ভোরে বিটিভির তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) জামিল চৌধুরী বাসায় টেলিফোন করে বলেন, আপনার বাসায় তো ক্যামেরা আছে। আর্মির লোক আসছে, আপনাকে ৩২ নম্বরের ছবি তুলতে হবে। পরদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির যাওয়ার কথা ছিল বলে বাসাতেই ক্যামেরা নিয়ে এসেছিলাম। ক্যামেরা নিয়ে বের হয়ে দেখি, বাসার সামনে উর্দি পরা লোকজন সাঁজোয়া যান নিয়ে অপেক্ষা করছে। গাড়িতে করে ৩২ নম্বরে যাওয়ার পর দেখি, বাড়ির প্রবেশমুখে মহিউদ্দিন, হুদা স্টেনগান নিয়ে দাঁড়িয়ে। পাশেই তাদের লিডার কর্নেল রশীদ। তারা জানালেন, ক্যামেরা চালানো যাবে না। বঙ্গভবনের অনুমতি লাগবে। বঙ্গভবনে গেলাম। গিয়ে দেখি, মিলিটারি সেক্রেটারির রুমে বঙ্গবন্ধু সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর। আমাকে দেখে বললেন, কেন এসেছেন? বললাম, বঙ্গবন্ধুর ছবি তুলব। তিনি অশালীন ভাষায় বললেন, লাশের ছবি তুলতে হবে না। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ছবি তোলার পর দেখা যাবে। বললাম, স্যার এটা কেমন কথা! ছবি তো তোলা প্রয়োজন। বুদ্ধি করে তাৎক্ষণিক একটি যুক্তি দেখালাম। বললাম, স্যার, ভারত যদি বলে যে বঙ্গবন্ধু নিহত হননি! চাইলে তো ছবিও দেখাতে পারবেন না। ডকুমেন্টের জন্য অন্তত ছবি তোলা প্রয়োজন। যুক্তিটি তার মনে ধরল, রাজি হলেন। তখন প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। দ্রুত ৩২ নম্বরে গিয়ে ছবি তুলি। ছবি তোলার পর কর্নেল রশীদরা ক্যামেরা থেকে রিলটি খুলে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরল ওই ফুটেজটি সংগ্রহ করেন। পরে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে মাদ্রাজ থেকে ফুটেজটি ডেভেলপ করে আনি। বিটিভিতে এর কপি ছিল। সেটি কোথায় আছে, তা বলতে পারবেন সালাউদ্দিন জাকি। 

রঙিন টেলিভিশন, স্বৈরাচারী শাসন ও বিটিভি - ১৯৮০ সালে বিটিভির রঙিন সম্প্রচার শুরু হয়। আমূল বদলে যায় টেলিভিশনের প্রচার পদ্ধতি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রতি বছর ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা আয়োজন শুরু হয় এ সময়ে। সে সময়ে ভারতেও রঙিন টেলিভিশন আসেনি। দেশের জনগনের তুমুল সমালোচনাকে বৃদ্ধাংগুষ্ঠ দেখিয়ে বাংলাদেশে রঙিন টেলিভিশনের সূত্রপাত ঘটান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়ায়ূর রহমান। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন ৩০ মে ১৯৮১ সালে। বিচারপতি আবদুস সাত্তার দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দাযি়ত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০ নভেম্বর ১৯৮১ থেকে ১৯৮২ সালের ২৩ মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তদানিন্তন সেনা-প্রধান এরশাদের এক সামরিক অভ্যুত্থানে বিচারপতি আবদুস সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সকালে এরশাদের অনুগত একদল সামরিক অফিসার বঙ্গভবনে গিয়ে বন্দুকের মুখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পুরোপুরি দখল করে নেন। সেদিন এরশাদ বেতার টিভিতে দেয়া ভাষণে বলেছিলেন, ‘জনগণের ডাকে সাড়া দিতে হইয়াছে, ইহা ছাড়া জাতির সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।’ 

একথা অনস্বীকার্য যে প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে বিটিভি ক্রমে ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চলে চুড়ান্ত জনপ্রিয় হয় তাদের নাটক ও সংগীতের মাধ্যমে। কিন্তু এরশাদের শাসনামলে আমরা বিটিভির পরিবর্তণ দেখলাম।

১৯৮৫ সালের একটা ঘটনা বলি। তখন সাতক্ষীরা রিলে স্টেশনের দৌলতে কলকাতায় বাংলাদেশের সরকারি টিভি চ্যানেলের সব অনুষ্ঠান আমরা দেখতে পেতাম। ১৬ ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসে ভারতের দূরদর্শনে এমনিতেই অনেক কিছু হয়। আমাদের আশা ছিল বাংলাদেশে দূরদর্শনে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক ডকুমেন্টারী দেখাবে। অনেক আশা নিয়ে ১৬ ই ডিসেম্বর আমরা বাংলাদেশ টিভির সামনে বসেছলাম।
অহ-কোথায় কি। টিভিতে দেখায় শুধু জেনারেল এরশাদের কবিতা। বাংলাদেশে তখন এরশাদের ডিক্টেটরশিপ। এই এরশাদ মুক্তিযোদ্ধাও নন। একাত্তরের যুদ্ধে তার পোস্টিং ছিল পাকিস্তানে। ফলে পাকিস্তান সরকার তাকে গ্রেফতার করে। ১৯৭৩ সালে সিমলা যুক্তির জন্য মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে আসেন। তাকে মিলিটারীতে উচ্চ পজিশনে পুনঃবাসন দেন শেখ মুজিব নিজে।

অথচ এই এরশাদ নিজের ডিক্টেটরশিপের সময়,এই ১৬ ই আগস্ট বিজয় দিবসে টিভিতে শুধু কবিতা চালাত-সাথে যুদ্ধের ফটো ভিডিও। দেখে মনে হতে পারে জাস্ট এরশাদের শব্দের জোরে স্বাধীনতা এসেছে। ওই সময় বাংলাদেশের মুক্তযুদ্ধের চর্চা প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। শুধু তাই না। যদিও বা কখনো সখনো মুক্তযুদ্ধের সিনেমা আসত বাংলাদেশ টিভিতে- সেখানে সিনেমার চরিত্ররা যদি কখনো সখনো মুজিবের নাম মুখে আনতেন, সেখানে অডিও সাইলেন্স করা হত। এই সময়টাতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস মোছার সব চেষ্টা হয়েছে জঘন্য ভাবে।

নব্বইয়ের দশক ও বেসরকারি চ্যানেলের আবির্ভাব-  ১৯৯২ সাল থেকে বিটিভি সহ বাংলাদেশের সামগ্রিক টেলিভিশন সম্প্রচার ব্যবস্থায় ব্যপক পরিবর্তন আসে। ৯২ সালের মাঝামাঝি কোনো একসময় বিটিভিতে ঘোষণা এল, তারা অনুষ্ঠানের সময়সীমা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং পরীক্ষামূলকভাবে তিনদিন অনুষ্ঠান বিকাল পাঁচটার পরিবর্তে তিনটা থেকে শুরু হবে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে বিটিভি সকালবেলা তিনঘণ্টা (সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে এগারটা) মার্কিন নিউজ চ্যানেল সিএনএন এর অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে। এটাই বাংলাদেশের মানুষের প্রথম কোন বিদেশি চ্যানেল দর্শন। বাংলা চ্যানেল প্রথমবারের মত স্যাটেলাইটে যায় এটিএন এর মাধ্যমে।

৯৭-৯৮ সালের কোনো একসময় তারা ভারতীয় চ্যানেল এটিএন মিউজিকের সন্ধ্যার একঘণ্টার স্লট কিনে নেয় এবং তাদের নিজস্ব সিনেমার গান ইত্যাদি প্রচার শুরু করে। এর কিছুদিন পর তারা নিজেরাই এটিএন নাম দিয়ে পূর্ণাঙ্গ চ্যানেল স্থাপন করে। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর ১ তারিখে সম্প্রচার শুরু করে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল আই। এরপরে একুশে টেলিভিশনের আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার শুরু হয় ২০০০ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে। সংবাদ পরিবেশনে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের পাশাপাশি উপস্থাপনায় আনে নতুনত্ব, যা দর্শককে দেয় ভিন্নধর্মী তথ্য-বিনোদন উপভোগের স্বাদ। ২০০১ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সরকারের রোষানলে পড়ে আইনি মারপ্যাঁচে একুশে টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয় ২০০২ সালের আগস্ট ২৯। বরং তখনই দেশে বিপুলভাবে বিকশিত হতে থাকে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের সম্প্রচার। এই সময়ে সংবাদ সম্প্রচার করে দ্রুত দর্শকপ্রিয়তা পায় এটিএন বাংলা, চ্যানেল আই ও এনটিভি। এই ধারায় ২০০৫ ও ২০০৬ সালে সম্প্রচারে আসে বাংলাভিশন, বৈশাখী টিভি, চ্যানেল ওয়ান, আরটিভি, দেশটিভি, দিগন্ত ও ইসলামী টিভি। এই সময়েই আবার স্যাটেলাইট মাধ্যমে সম্প্রচারের অনুমোদন পায় একুশে টেলিভিশন। ২০০৭ সালের এপ্রিলে সম্প্রচার শুরু করে দেশের প্রথম ২৪ ঘণ্টা সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল সিএসবি নিউজ। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালের অক্টোবরে একই দিনে ১০টি বেসরকারি টেলিভিশনকে লাইসেন্স দেয়। এগুলো হলো- ৭১ টিভি, মোহনা টিভি, চ্যানেল নাইন, সময় টিভি, গাজী টিভি বা জিটিভি, ইনডিপেনডেন্ট টিভি, এটিএন নিউজ, মাইটিভি ও বিজয় টিভি। পরের বছর ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, এপ্রিলে এসএ টিভি, জুনে এশিয়ান টিভি, অক্টোবরে গান বাংলা টিভি, ডিসেম্বরে দীপ্ত বাংলা এবং ১ অক্টোবর চ্যানেল বায়ান্ন’র লাইসেন্স দেয়া হয়। ২০১৪ সালের মার্চে সম্প্রচার শুরু হয় ২৪ ঘণ্টা সংবাদভিত্তিক চ্যানেল যমুনা টেলিভিশনের। আর ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই সম্প্রচার শুরু করে সংবাদভিত্তিক চ্যানেল নিউজ টোয়েন্টিফোর। একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে যাত্রা শুরু করে আর একটি সংবাদভিত্তিক চ্যানেল ডিবিসি নিউজ। ২০১৭-এর সেপ্টেম্বরে বাংলা টিভি এবং একই বছর ৫ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম শিশুতোষ টেলিভিশন চ্যানেল দুরন্ত। ২০১৮ সালের মার্চে খবর ও বিনোদনে ব্যতিক্রম আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই যাত্রায় যোগ দেয় টেলিভিশন চ্যানেল নাগরিক। সম্প্রতি পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু করেছে আরেকটি বিনোদনভিত্তিক টেলিভিশন আনন্দ টিভি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে অনুমোদিত বেসরকারি টেলিভিশনের সংখ্যা ৪১টি। আরো অনেক দরখাস্ত এখনো সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে আছে বলে জানা গেছে।

ভারতীয় চ্যানেল ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন- ভারতীয় দুটি বাংলা চ্যানেল বাংলাদেশে ব্যাপক সমাদৃত। ‘জি বাংলা’ ও ‘স্টার জলসা’। এরা বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য স্যাটেলাইটে  আলাদা ‘বিম’ ডাউনলিংক করে বাংলাদেশে প্রচার করছে। এতে ওই দুটি টিভি চ্যানেলের খরচ কম পড়ছে। মাত্র তিন লাখ টাকায় তারা বাংলাদেশে তাদের চ্যানেল ডাউনলিংক করতে পারছে। এর বিপরীতে এই দুটি চ্যানেল বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশি যেসব প্রতিষ্ঠান ভারতের দর্শকদের দেখার জন্য, অর্থাৎ ভারতে প্রচারের জন্য তাদের বিজ্ঞাপন ‘জি বাংলা’ ও ‘স্টার জলসা’য় প্রচার করছে, তাদের সেই বিজ্ঞাপন ভারতে দেখা যাচ্ছে না। তারপরও শুধু বিজ্ঞাপনের মূল্য কম থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান ভারতীয় দুটি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকদের হিসাব অনুযায়ী, ভারতীয় বাংলা চ্যানেল ‘জি বাংলা’ ও ‘স্টার জলসা’ এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন পেয়েছে। বাংলাদেশে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন বাজার বছরে প্রায় এক হাজার কোটি থেকে ১২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে চালু ২৭টি টিভি চ্যানেলের অর্ধেকই লোকসান গুনছে। বিজ্ঞাপনের অভাবে দুই-তৃতীয়াংশ চ্যানেল অনেকটা যুদ্ধ করে টিকে আছে। একে আইন দিয়ে আটকানো মুশকিল। বাংলাদেশের চ্যানেলগুলির ভারতে সম্প্রচারে এগিয়ে আসতে হবে। কারন ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এখলাসউদ্দিন ভূঁইয়া বাংলাদেশে ভারতের টিভি চ্যানেলের প্রচার নিষিদ্ধ করার দাবিতে রিট আবেদন করেন। পরবর্তীতে তিনি রিটটি প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু আইনজীবী শাহিন আরা লাইলীকৃত রিট প্রসঙ্গে মহামান্য বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও জে বি এম হাসানকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ রায় দেন যে এধরনের কোন নিষেধাজ্ঞা এই চ্যানেলগুলির ওপরে আরোপ করা হবে না। অর্থাৎ ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল চলছে, চলবে। গত বছর ভারত সরকারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান ভারতে দেখানোর ক্ষেত্রে ভারত সরকারের কোনো আইনি বাধা নেই। ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে যে কেউ ভারতে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল ডাউনলিংক করতে পারবে।’

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘ভারতীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ও ভারতে কোনো বাংলাদেশি চ্যানেল ডাউনলিংকের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। কোনো কোম্পানি যদি বাংলাদেশি চ্যানেল ডাউনলিংক করতে চায়, তা হলে ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নীতিমালা অনুযায়ী সর্বতোভাবে সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেল ভারতে ডাউনলিংকের জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করেনি।’

এবার প্রশ্ন বাংলাদেশের চ্যানেল মালিকরা তাদের চ্যানেল ভারতে সম্প্রচার করতে কতটা উদ্যোগী? এক ফোঁটাও নয়। তাদের ২০১১ সালে তৎকালীন ভারতীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী উপদেশ দিয়েছিলেন যে আপনারা আপনাদের দেশের সরকারে মাধ্যমে আপনাদের চ্যানেলকে রিজিওনাল বা প্রাদেশিক চ্যানেল (যেহেতু বাংলায় সম্প্রচারিত হবে) হিসেবে অভিহিত করে একটা আবেদন করুন, আমরা নতুন আইন করে আপনাদের সম্প্রচারের অনুমতি দেব। তৎকালীন ইউপিএ সরাকারের সঙ্গে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারের সখ্যতা সম্পর্কে আমরা অবগত। আবেদন করলে অবশ্যই হয়ে যেত। কিন্তু সেই আবেদন ভারত সরকারের কাছে তখন আসেনি।

এবারে আসি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রসঙ্গে। দু’দেশের চ্যানেল দু’দেশে প্রচারিত হলে যেটা হত তাকে বলা হয় সাংস্কৃতিক সংপৃক্ততা। অর্থাৎ দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে। আজ পোশাকে, কথায়, সংগীতে, আচরনে এমন কি ধর্মীয় যাপনে ভারতীয় প্রভাব বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে গিলে নিয়েছে। আইন করে বা নিষেধাজ্ঞা জারি করে একে ঠেকানো যায় না। পালটা প্রচারে অর্থাৎ ভারতে পালটা চ্যানেল সম্প্রচারে এই সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন সম্ভব। দায় কিন্তু শুধু চ্যানেল মালিকদের নয়। দায় সরকারেরও।

ভারতীয় টিভির আকাশে বিটিভি– ভারতে বিটিভি দেখা যাচ্ছে দূরদর্শনের পর্দায়। এখানে এমনিতেই কেউ সরকারি চ্যানেল দেখে না, সেখানে বিটিভি সে চ্যানেলে এনে লাভ কী হলো!   এরশাদ আমলে বিটিভিকে বলা হতো সাহেব বিবি গোলামের বাক্স। বিটিভি বহুদিন থেকে প্রচার-প্রচারণার মধ্য দিয়ে এমন একটা চরিত্র ধারণ করেছে যে, তা থেকে কোনোভাবেই বের হয়ে আসতে পারছে না। নাটক সিনেমাসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানের মানও এতো উন্নত না যে সেটা দেখে এই মুহুর্তে আকৃষ্ট হবে। চ্যানেল আই সহ বেশ কিছু প্রাইভেট চ্যানেল মোবাইলের মাধ্যমে দেখা যায়। বাংলাদেশের মূল আকর্ষণ টেলিফিল্ম ও নাটক। ইউটিউবে সহজেই দেখা যায়। কাজেই কী দরকার বিটিভি দেখার। ভারতের খোলা বাজারে অন্য চ্যানেলগুলি আসার ক্ষেত্রে যে যে প্রতিবন্ধকতা ছিল সেটা কেটেছে। এবারে আসুক তারা। বিজ্ঞাপনী শর্তগুলি মেনে চললেই ঝামেলা নেই। কাজেই এই যাত্রাকে প্রারম্ভ হিসেবে ধরে নেয়া যায়। প্রত্যাশায় থাকবে ভারতীয় বাঙালিরা। তবে আর্থিক শর্তপূরণে বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টরের যে দুর্ণাম ছিল এখন সেটা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছেন তারা। এই ক্ষেত্রটায় সুনাম বজায় রাখলে এপারের বাজার বাংলাদেশের চ্যানেলগুলির হয়ে উঠবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর