Alexa বলিউডে শাহরুখ খানের ২৭ বছর

ঢাকা, শনিবার   ২০ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৫ ১৪২৬,   ১৬ জ্বিলকদ ১৪৪০

বলিউডে শাহরুখ খানের ২৭ বছর

নুরুল করিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১৯ ২৭ জুন ২০১৯  

শাহরুখ খান

শাহরুখ খান

‘অতি-অভিনেতা’ কিংবা ‘অভিনয় জগতের ঈশ্বর’—তাকে আপনি যে কোনো বিশেষণ দিতে পারেন। তিনি যে একদা রাজা, সর্বদাই রাজা! তিনি যে শাহরুখ খান। গত ২৫ জুন, হিন্দি চলচ্চিত্র অঙ্গনে দীর্ঘ ২৭ বছরের গৌরবময় যাত্রা সম্পন্ন করলেন তিনি।

বলিউড যাত্রা ও ২৭ বসন্ত

শাহরুখ খানে বলিউড অভিষেক হয় ১৯৯২ সালে। ‘দিওয়ানা’ শিরোনামের ওই সিনেমায় রিষি কাপুরের সঙ্গে দ্বিতীয় প্রধান নায়কের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি। প্রথম সিনেমাতেই ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। এমনকি সে বছর সেরা উদীয়মান অভিনেতা হিসেবে ‘ফিল্মফেয়ার’ পুরস্কার লাভ করেন। যারা এই সিনেমা দেখেছেন, তাদের হয়তো এখনো মনে মনে আছে ‘বাইক চালানোর’ দৃশ্যটির কথা! ২৭ বছর পর ফের একবার সেই দৃশ্যকেই চোখের সামনে আনলেন কিং খান। বাইক চালিয়ে বলিউড স্মৃতি রোমন্থন করলেন শাহরুখ। এটাই তো খান সাহেবের স্বকীয়তা!

শাহরুখ বলেন, ‘আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আমার ২৭ বছরের জার্নির জন্য। যদিও সময়টা আমার জীবনের অর্ধেক। প্রত্যেকবার আমার ফ্যানেদের আনন্দ দিতে চাই। কখনো পারি, কখনো ব্যর্থ হই। সেই মোটরসাইকেলে পর্দায় এসেছিলাম, তখন থেকে এখনো পর্যন্ত আমার পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ।’

‘দিওয়ানা’ দিয়ে শুরু করলেও শাহরুখ খানের প্রধান চরিত্রে প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ‘চমৎকার’। অন্যদিকে একই বছর তার তৃতীয় ছবি হিসেবে মুক্তি পায় ‘রাজু বান গায়া জেন্টলম্যান’ ছবিটি, যেখানে তিনি জুহি চাওলার সঙ্গে অভিনয় করেন। ততদিনে বলিউড পাড়ায় তার অভিনয়ের বেশ জোর গুঞ্জন চলছে। তার অভিনয়ে নতুনত্ব যেমন- ঠোট কাঁপানো, আবেগপূর্ণ দৃশ্যে চোখের কম্পন, কথা বলার সময় বিশেষ ভঙ্গীতে গলার স্বর পরিবর্তন, সবই বড় পর্দায় তাকে নিয়ে যেত গতানুগতিক ধারার বাইরে।

‘দিওয়ানা’ সিনেমার একটি দৃশ্যে শাহরুখ

‘ডর’ এবং ‘বাজিগর’, এরপর...

শাহরুখ খানের ফ্যান ক্লাব গঠন শুরু হয় ১৯৯২ সাল থেকেই। স্বকীয়তার কারণে অল্পতেই অসংখ্য ভক্ত হয়ে যায় তার। একজন চমৎকার অভিনেতা হিসেবে শাহরুখ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ১৯৯৩ সালে। ওই বছরই তিনি ‘ডর’ এবং ‘বাজিগর’ এর মতো বক্স অফিস হিট করা ছবি করেছেন। ‘এন্টি হিরো’ হিসেবে কাজ করলেও তিনি অন্যান্যদের চেয়ে বেশি প্রশংসা পেয়েছিলেন!

‘ডর’ এর জন্য তিনি সেরা ‘ভিলেন’ এর নমিনেশন পান ফিল্মফেয়ারে। তবে বাজিগরে তার অসাধারণ অভিনয় তাকে এনে দেয় ক্যারিয়ারের প্রথম সেরা অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। ‘দীপা সাহির’ সাথে ‘মায়া মেমসাব’ ছবিতে একটি বিতর্কিত দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য একই বছর অনেক সমালোচনাও শুনতে হয় খানকে। ১৯৯৪ সালে তিনি ‘আনজাম’ ছবিতে আরো একবার এন্টি হিরো হিসেবে আবির্ভূত হন এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জেতেন।

এরপর কী হল? শাহরুখ চাইলে দেশের সেরা ‘ভিলেন’ হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা চাননি। প্রেমিক পুরুষ হতে চেয়েছিলেন। হয়েছেনও, নিজ গুণে, নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে। ‘কাভি হা কাভি না’ ছবিতে প্রেমিকের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের রোমান্টিকতার পরিচয় দেন বলিউডে। ১৯৯৫ সালে রাকেশ রোশানের পরিচালিত ‘করন অর্জুন’ সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। বলা যায় এই ছবিতেই কপাল খুলেছে তার। সে বছরই তার অভিনীত আরেকটি সিনেমা মুক্তি পায়, আদিত্য চোপড়া পরিচালিত ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’। ছবিটিতে শাহরুখ খান অভিনয় করেন ‘রাজ’ আর কাজল অভিনয় করেন ‘সিমরান’ চরিত্রে। মুক্তি পাবার সঙ্গে সঙ্গেই ছবিটি বক্স অফিস মাত করে ১২২ কোটি ভারতীয় রুপি আয় করে ছবিটি। সমালোচকদের প্রশংসার এতটাই গাঢ় ছিল যা বলার অপেক্ষা রাখে না।

‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে` সিনেমার একটি দৃশ্যে শাহরুখ ও কাজল

‘ফ্লপ’ শাহরুখ ও তার ‘কামব্যাক’

হটাৎই ধস নেমে আসে শাহরুখের ক্যারিয়ারে। সালটি ছিল ১৯৯৬ সাল। ‘অশোকা’, ‘বাদশাহ’, ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’র মতো ছবিগুলো বক্স অফিসে একের পর এক ফ্লপ হচ্ছিলো। তবে পরের বছরই যশ চোপড়া পরিচালিত ছবি ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ ছবি দিয়ে দূর্দান্ত ভাবে ফিরে আসেন শাহরুখ। তৃতীয় সেরা অভিনেতার জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও পেয়েছেন ১৯৯৭ সালে।

এরপরই ‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়’, ‘কাভি খুশি কাভি গাম’, ‘মোহাব্বাতে’, ‘কাল হো না হো’ এর মতো বক্স অফিস কাঁপানো ছবি উপহার দিয়েছেন একে একে। ২০০১ সালে তার অভিনীত এবং সঞ্জয় লীলা বানসালী পরিচালিত ছবি ‘দেবদাস’ ছিলে সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছবি। ছবিটি দশটি ফিল্মফেয়ার জেতে এবং শাহরুখকে তার অসাধারণ অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ারসহ একাধিক পুরস্কার এনে দেয়। তাছাড়া ছবিটি সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে সম্মানজনক ‘বাফটা’ পুরস্কার পায় (বিদেশী ভাষার ছবি হিসেবে)।

‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়’

শেষ সময় যখন ‘দুঃসময়’

শাহরুখ যখন ঠিক ২০১০ সালের কোটা পার করলেন, তখন থেকেই ‘দুঃসময়’ শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের। এটা অবশ্যই শেষ সময় বলা যায় না। কারণ আমরা বিশ্বাস করি শাহরুখ মৃত্যুর আরে দিন পর্যন্তও অভিনয় করবেন। কারণ অভিনয় তার ‘রক্ত’! তবে বর্তমান সময়ে নামের দোহাই দিয়ে সিনেমা চললেও ‘রাওয়ান’, আর ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ এর মতো ছবিগুলোকে শাহরুখ খানের ছবি মনে হচ্ছিল না। ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’, ‘দিলওয়ালে’ ও ‘ডিয়ার জিন্দেগি’ নিয়েও অনেকেই কঠোর সমোলচনা করেছে ‘ইনিই কী শাহরুখ?’

এরপর করলেন ‘ফ্যান’। সেটা শাহরুখের নাম বেছেও চালাতে পারেন নি হল মালিকরা। ১২ বছর পর তার প্রথম ছবি হিসেবে (প্রধান চরিত্রে) বক্স অফিসে ফ্লপ হয়। অসাধারণ অভিনয় করেও দুর্বল গল্পের ছবিতে কাজ করার জন্য তিনি সমালোচনার স্বীকার হন। অন্যদিকে বক্স অফিসে তার রাজত্ব চলে যায় তার সবচেয়ে বড় দুই প্রতিযোগী বলিউডের অপর দুই খান, সালমান খান এবং আমির খান এর কাছে। এতে অনেকেই তাই তার ক্যারিয়ারের শেষ দেখছেন।

‘ডিয়ার জিন্দেগি’ সিনেমায় শাহরুখ ও আলিয়া

এখন কী করছেন তিনি?

তবে যাই হোক ‘শাহরুখ ছন্দে’ শাহরুখকে ফের বড়পর্দায় দেখতে মুখিয়ে আছেন লাখ লাখ ভক্তরা। কিন্তু কবে যে তিনি শুটিংয়ে ফিরবেন, দিনক্ষণ জানাচ্ছেন না। কিং খানের সর্বশেষ সিনেমা ‘জিরো’। আনন্দ এল রাই পরিচালিত এই ছবি বক্স অফিসে সুপারফ্লপ হয়েছিল। এরপর আর সিনেমা করতে ‘হৃদয়ের সাড়া’ পাচ্ছেন না বলিউডের বাদশাহ। শাহরুখের হাতে বেশ কয়েকটি প্রকল্প এলেও কোনো সিনেমার সঙ্গেই এখনো চুক্তি করেননি। এই মহাতারকা বললেন, আপাতত কোনো সিনেমার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছে নেই তার। নিজের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চান তিনি।

সম্প্রতি একটি বিনোদন পোর্টালকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ৫৩ বছর বয়সী শাহরুখ খান বলেছেন, ‘আপাতত আমার হাতে কোনো সিনেমা নেই। কোনো সিনেমায় কাজ করছি না। সাধারণত যেটা হয়, কোনো সিনেমা শেষ হওয়ার পর নতুন সিনেমায় কাজ শুরু করতে আমার তিন-চার মাস লাগে। কিন্তু এবার তেমনটা অনুভব করছি না। আমার মন সাড়া দিচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে, এর চেয়ে সিনেমা দেখা, গল্প শোনা, আরো বেশি বই পড়া উচিত। আমার সন্তানরা এখন কলেজ পর্যায়ে... আমার মেয়ে কলেজে যাচ্ছে, ছেলের লেখাপড়া শেষ হওয়ার পথে। আমি চাই পরিবারকে অধিক সময় দিতে।’

কিং খানকে নিয়ে লিখতে গেলে তো হয়তো কয়েক’শ বার লোডশেডিং হবে। কখনো বা কল করতে হবে ব্রডব্যান্ড অফিসে, ‘ভাই ইন্টারনেট লাইন চলে গেছে!’ এতো ঝামের দরকার কী! তারচেয়ে ভালো মনে মনেই লিখে রাখি মহারাজার গল্পগুলো। তার ভক্তরা বিশ্বাস করেন, তিনি রাজা ছিলেন, তার রাজত্ব এখনো আছে এবং যতদিন তিনি থাকবেন ততদিনই থাকবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে