Alexa বন-পাহাড়ের দেশে

ঢাকা, শুক্রবার   ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২১ ১৪২৬,   ০৮ রবিউস সানি ১৪৪১

বন-পাহাড়ের দেশে

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৯:০০ ৩০ নভেম্বর ২০১৯  

ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

“আমার হাতের তালুতে আকাশ
রাতের গভীরে ঢাকা সপ্তর্ষি
কে আমাকে খুঁজে পাবে?” – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছোটবেলা থেকেই বনে ও পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে আমার। আদিম মানুষদের মতো। একদম প্রাগৈতিহাসিক আমাজন রেইন ফরেস্টের মতো হবে সেই বন। ঢুকলে আর বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না কোনোদিন। আর পাহাড়গুলো হবে আমাদের বাড়ির উঠোন থেকে দৃশ্যমান দূরদিগন্তের ওপারের গারো পাহাড়ের মতো। এই নিবিড় বন-পাহাড়ের ভেতরে পথ হারিয়ে আমি ঘুরতে থাকবো অনন্তকাল!

ইচ্ছেটার সুত্রপাত একজন বালকের তীব্র ব্যক্তিগত ঔৎসুক্য ও স্বাধীনতার অপ্রতুলতা থেকে। আমাদের বাড়ির কাছেই ঝাড় কাটা নদী। নদী পেরিয়ে মেঠোপথ ধরে নয় মাইল গেলেই মেলান্দহ বাজার রেল স্টেশন। এখান থেকে লোকাল ট্রেনে করে আট মাইল দূরে জামালপুর শহর। পাশেই ব্রহ্মপুত্র নদী। ডিঙি নৌকায় করে ব্রহ্মপুত্র পেরুলেই শেরপুর। শেরপুরের উত্তরে ঝিনাইগাতি থানা। এই থানার শেষ সীমান্ত বাংলাদেশেরও সীমান্ত। এখানেই গারো পাহাড়। বিস্তৃত হয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ভেতরে। আমাদের বাড়ির উঠোন থেকে বর্ষাকাল এবং শীতকাল ভিন্ন অবশিষ্ট সকল ঋতুতেই গারো পাহাড়ের গাঢ় নীলাভ রিজলাইন দৃশ্যমান। এতো কাছে! অথচ শুধুমাত্র আমি শিশু হবার কারণেই সেখানে যাবার কোন স্বাধীনতা নেই আমার।

আবার ধরুন যেমন, প্রতিদিন আমাকে স্কুলে যেতে হতো। কিন্তু ঐ সময়ে আমি খোলা প্রান্তরের ভেতরে দৌড়াদৌড়ি করতে অথবা ঘুড়ি উড়াতে পারতাম। সূর্য ডুবে যাবার পূর্বেই আমাকে বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করতে হতো। অতঃপর হারিকেনের কাঁচের চিমনি পরিস্কার করে একান্ত বাধ্যগতের মতো সন্ধ্যার অব্যবহিত পরেই পড়তে বসতে হতো। হারিকেনের টিমটিমে মৃদু আলোতে। অন্যথা হলে বকা এমনকি চড় থাপ্পড়ও ছিলো নৈমিত্তিক। অথচ পৃথিবীর সকল বালকদের মতো আমার অন্তর্গত স্বত্বা ছিলো পরাধীনতার ঘোর বিরোধী। আমার ইচ্ছে করতো গোধূলির আলো মিলিয়ে যাবার পরও খোলা মাঠের ভেতরে শুয়ে থাকতে। তৃণ শয্যায় চিৎ হয়ে সন্ধ্যা তারা এবং আরো গভীর রাতে সপ্তর্ষিমন্ডল অথবা কালপুরুষ অবলোকন করতে। অথবা নিদেনপক্ষে উঠোনের প্রায়ান্ধকারে ঘুরে বেড়ানো জোনাকিদের সঙ্গ দিতে। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ শিশুর মতনই আমার এই ন্যূনতম মানবিক স্বাধীনতাগুলো ছিলনা।

সুতরাং রাতের বেলায় পরিবারের সবাই যখন গভীর ঘুমে অচেতন, তীব্র অভিমানে আমি খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতাম। ইচ্ছে হতো সিদ্ধার্থের মতন বেরিয়ে যাই একদিন রাতের আঁধারে। আর কখনোই ফিরে না আসার জন্যে।

১৯৮৫/৮৬ সাল। আমি একজন পূর্ণ যুবক। ছয় বছর ক্যাডেট কলেজে পড়ার পর বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার। জল, স্থল, অন্তরীক্ষে যাবার শপথ নিয়েছি আমি। অথচ আমার জীবনে স্বাধীনতা আসেনি। বন বা পাহাড় কোথাও যাওয়া হয়নি আমার এখনো। পূর্বে আমি নিয়ন্ত্রিত হতাম পরিবার দ্বারা। বর্তমানে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি প্রতিষ্ঠান দ্বারা। ইউনিটে আমার দায়িত্ব কোয়ার্টার মাস্টারের। চাল, ডাল, চিনি, তেল আর মাছ মাংশের হিসাব রাখতেই প্রাণান্তকর অবস্থা।

তবে সেই রবীন্দ্র সংগীতের মতন বসন্তের মাতাল সমীরণে সত্যি সত্যিই আমার জীবনে বনে যাবার সুযোগ এসেছে। একটা অবিচ্ছিন্ন-নিবিড় বন-পাহাড়ের জীবনের! সেনাবাহিনী সদর দপ্তর থেকে রাজধানী ঢাকা হতে বিচ্ছিন্ন করে আমাকে সংযুক্ত করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জোনের একটা রাইফেল ব্যাটালিয়নের সাথে (বর্তমানে বিজিবি ব্যাটালিয়ন) অনূর্ধ্ব এক বছর সময়কালের জন্যে।

আমার এই আনন্দ যাত্রা শুরু হল রাঙ্গামাটি সদর হতে। গভীর নিশীথে। অর্ধ রাত এবং পুরো একদিন দল বেঁধে পায়ে হেঁটে পেট্রোলিং করার মধ্য দিয়ে। গন্তব্য বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী নতুন স্থাপিত কাউন্টার ইন্সারজেন্সি অপারেশন ক্যাম্পে (সিআইও ক্যাম্প)।ক্যাম্পটির নাম দেয়া হয়েছে ‘দশরথ’ ক্যাম্প। ‘রামায়ণ’ এ উল্লেখিত রাম, লক্ষণ এবং ভরতের পিতা রাজা দশরথ।

চট্টগ্রাম শহর থেকে অদূরে সীতাকুণ্ডের কাছে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ওপরে একটা মন্দির আছে। নাম চন্দ্রনাথ মন্দির। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুসারে অন্যতম বিখ্যাত শক্তিমন্দির। সত্য যুগে দক্ষ যজ্ঞের পর সতী দেহত্যাগ করলে মহাদেব তার মৃতদেহ নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। তখন বিষ্ণু দেব সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর মৃতদেহ ছেদন করেন। এতে তার দেহখন্ডসমূহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত হলে এ সকল স্থানসমূহ শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিতি পায়। হিন্দু পবিত্র গ্রন্থসমূহ অনুসারে সতীর দক্ষিণ হস্ত পতিত হয়েছিল সীতাকুণ্ডের আশেপাশে। সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ মন্দির তাই তীর্থযাত্রীদের জন্য এক পবিত্র স্থান।এর পুরনো নাম ছিলো ‘সীতার কুন্ড মন্দির’। ১৯৪৭ সনে ইংরেজদের কর্তৃক ভারত বিভক্তি উপমহাদেশকে ভারত এবং পাকিস্তান দুই খণ্ডে এবং ১৯৭১ সনে পাকিস্তান পুনঃ বিভক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটলে তিন দেশের মধ্যে সতীর শরীরের দেহাংশ সমুহ ভাগ হয়ে পড়ে।

‘সংখ্যা তত্ত্ব’ সম্পর্কে আমার ধারণা নেই বললেই চলে। তবুও ‘তিন’ সংখ্যাটিকে আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়! জেরুজালেমের ওপরে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল ইহুদী, খৃস্টান এবং মুসলমান এই তিন ধর্মের মানুষ। তিন ধর্মের মানুষেরাই জেরুজালেমকে পবিত্র স্থান মনে করে। এই জেরুজালেম নিয়ে পৃথিবীতে অযুত সংখ্যক ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। আমার প্রায়ই মনে হয় ধর্ম মানুষের মধ্যে অনেক মানবিকতার বিকাশ ঘটালেও ধর্মকে কেন্দ্র করেই সুযোগসন্ধানী বা সুবিধাবাদীরা যুগে যুগে মানুষের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি করার প্রয়াস পেয়েছে। ধর্ম মানুষের দুর্বলতম স্থান। এই দুর্বলতম স্থানকেই সবসময়ে শক্তিশালীরা, সুবিধাবাদীরা সবাই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহার করতে উন্মুখ হয়ে থেকেছে। ধর্ম কেন্দ্রিক যুদ্ধে পরাজিত হয় একটা শক্তিই। মানবিকতা। মানব জগতের চালিকাশক্তি।

দশরথ ক্যাম্পের নাম শুনে আমি যুগপৎ ভাবে অবাক হয়েছিলাম এবং হয়তবা মজাও পেয়েছিলাম। বন-পাহাড়ের প্রতি বাল্যকাল থেকে আমার আকর্ষণ থাকলেও সত্য যুগের বিপরীতে কলি যুগে এসে এর প্রকৃতি কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। রামায়ণে দশরথের নির্দেশে তার দুই পুত্র রাম এবং লক্ষণ সীতাকে নিয়ে বনবাসে গমন করেছিলেন। কিন্তু আমাদের সময়ে দশরথরাই যান বনবাসে। মনে হয়েছিল আমার রাজধানী ছাড়ার মতন রাম, লক্ষণ, ভরত, সীতা সবাইকে অযোধ্যার রাজবাড়িতে রেখে রাজা দশরথ নিজেই বাণপ্রস্থে গমন করে এই নিবিড় বনভূমিতে এসেছেন। তাঁর সমস্ত রাজ্যপাল ছেড়ে। বৃদ্ধ পিতামাতার ‘ওল্ড হোম’–এ যাবার মতন!

ইউনিট অধিনায়ক মেজর হুমায়ুন এবং উপ অধিনায়ক ক্যাপ্টেন সাইফ এর নেতৃত্বে যথারীতি মধ্যরাতের পর লিঙ্ক পেট্রোল শুরু করে পথিমধ্যে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্পের সাময়িক আতিথেয়তা গ্রহন করতে করতে দুপুরের আগে আন্দরমানিক ক্যাম্পে পৌঁছলাম। লাঞ্চ করে পুনরায় পদব্রজে উঁচু নিচু সবুজ পাহাড়গুলোকে অতিক্রম করে দশরথ ক্যাম্পে পৌঁছাতেই সূর্য ডুবে গিয়েছিল পাহাড়ের অপরদিকে। পথিমধ্যে আমি দেখেছি পাহাড়ের অপরুপ সৌন্দর্য। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন পাহাড়ের পর পাহাড়ের সারি। দুই সারি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে জঙ্গলের বুকে গভীর ক্ষতচিহ্নের মতো বিসর্পিত রেখায় বয়ে যাওয়া ঝর্ণার স্বচ্ছ জল। ঝর্ণার দুপাশ ঘিরে ঘন-বিন্যস্ত ঝোপের ভেতর বুনো ফুলের গন্ধ। এলিফেন্ট গ্রাসের সবুজ ঢেউয়ে আবৃত সমস্ত চরাচর!

আমার ক্যাম্পের উচ্চতা পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ৩০০ ফুটেরও বেশি। পাশাপাশি কয়েকটা উঁচু পাহাড়ের মাথা বা টিলার ওপরে ক্যাম্পটা স্থাপন করা হয়েছে। আমার কুঁড়ে ঘরটা সবচেয়ে উঁচু টিলার ওপরে। এখান থেকে ক্যাম্পের অন্যান্য টিলার ওপরে স্থাপিত লোকেশনগুলো ছাড়াও সমস্ত বিশ্বচরাচর পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব!প্রতিটি টিলা আবার পরস্পর সংযুক্ত হয়েছে প্রতিটা থেকে আসা রিজলাইন দিয়ে। কেন্দ্রে কোম্পানি সদর দপ্তর। কেন্দ্র থেকে একটা রিজলাইন উত্তরের দিকে প্রবাহিত হয়ে গোলাকৃতি হেলিপ্যাডে যেয়ে মিলেছে।

হ্যালিপ্যাডের চারপাশ ঘিরে থাকা পাহাড়গুলোর মাথা রঙ-বেরঙের গাছপালায় ছেয়ে থাকে। আমি প্রতিদিন সকালে এখানে দৌড়াতে আসি একাকী। যদিও আমার ক্যাম্পের উপ অধিনায়ক বি ডি আর জেসিও আমাকে বেশ কয়েকবার আমাকে নিষেধ করেছেন এখানে একাকী না আসার জন্য। নিরাপত্তাজনিত কারন দেখিয়ে বলেছেন, “স্যার, আপনি দৌড়াতে গেলে আপনার রানার এবং আরও দুই তিন জনকে সাথে নিয়ে যাবেন অস্ত্রসহ”। কিন্তু সকালের ওই সময়টাতে আমার একাকী থাকতেই ভাল লাগে। সকালের নরম আলোতে আমি হেলিপ্যাডের কেন্দ্রে যেয়ে দাঁড়াই। তখন একটু দূরেই আমার পায়ের নিচে সমস্ত গাছ গাছালির মাথা। রঙিন হয়ে আছে হাজারো বুনো ফুলের ছড়াছড়িতে। আমার মনে হয় ফুলরুপী এক নক্ষত্রের বাগানের ভেতরে আমি যিশু খ্রিস্টের মতন দাঁড়িয়ে আছি!

একটু পর সামনের রিজলাইনকে অপরূপ সোনালী আভায় রাঙিয়ে দিয়ে পূর্ব দিগন্তে উদীয়মান হয় দিবাকর। হলুদ নরম আলোয় ভরে যায় চারদিকের প্রকৃতি। প্রতিটা মুহূর্তকে মনে হয় প্রাচীন স্ফটিকের মতন উজ্জ্বল–মনোহর!

ক্যাম্প থেকে তিন লাইন পরস্পরের সমান্তরাল পাহাড়ের ওপারে উঁচু নীলাভ একটা পাহাড়ের পাদদেশে একটা ভারতীয় শহর। এই বিশাল চরাচরের মধ্যে ঐ শহরেই শুধুমাত্র বিদ্যুতের অস্তিত্ব আছে। বোঝা যায় শুধুমাত্র সূর্যাস্তের পর। রাতের অন্ধকারে মনে হয় হাজার হাজার জোনাকিরা খেলছে। আমার ছোটবেলার সেই অন্ধকার মাঠের ওপরে জোনাকির মেলার মতন। প্রতিদিন সকালে সূর্য বেড়ে ওঠার সাথে সাথে এই শহরটা কুয়াশার মতন অস্পষ্ট হয়ে যায়। তখন পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় এর ওপরের পিচের রাস্তার পারদের আঁকাবাঁকা স্রোত ছুটে চলেছে ক্ষুধার্ত কোন অজগরের মতো অনির্দেশ্য কোন গন্তব্যের পানে। যেন মুখ থেকে ছিটকে পালিয়ে যাওয়া শিকারের সন্ধানে তার এই অভিযান।

আমার ক্যাম্পের তলা দিয়ে প্রথমে ঝর্ণা সৃষ্ট একটা জলাভূমি। স্বচ্ছ জল। গ্রীক মিথলজির নার্সিসাসের মতন এই স্বচ্ছ জলের আয়নাতে নিজের মুখ দেখে নিতে পারেন। একটু দূরেই অনেকগুলো ছোট ছোট পাহাড় যাদের মাথা ঢেকে আছে ছেদহীন অরন্যে। এই বিশাল অরন্যে বসবাস করে চিতাবাঘ, চিত্রল হরিন, শম্বর হরিন। হয়ত নীলগাইও !

প্রতিদিন আমাকে স্নান করতে নামতে হয় ক্যাম্পের নিচের ঝর্ণাতে। এই ঝর্ণাটা প্রবাহিত হয়ে এসেছে আমার ক্যাম্পের মাথার দিক থেকে অদৃশ্য কোন উৎস হতে। এর প্রবাহটা নিচের দিকেই প্রবল। এই ঝর্ণার জলেই আমি প্রতিনিয়ত অবগাহন করি। ঝর্ণার ঠিক উলটোদিকের পাহাড়ের পাদদেশে একটা কাল রঙের অতিকায় প্যান্থার সকাল বিকাল বিচরন করে। এর কারণে আমাদেরকে পানি সংগ্রহ অথবা স্নান করার জন্যে দল বেঁধে নীচে নামতে হয়।সশস্ত্র এস্কর্ট নিয়ে।

আমার ক্যাম্প আর সামনের পাহাড়ের মাঝখানে জলজ ‘ডেড গ্রাউনড’। এ ধরনের ভূমির উপস্থিতি দূরত্ব সম্পর্কে আপনার ভেতরে ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করতে পারে।মধ্যবর্তী দূরত্বকে প্রকৃত দূরত্বের চেয়ে কম মনে হতে পারে। ফলে আমরা প্যান্থারটিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লেও গুলি তার সামনের স্বচ্ছ জলের ভেতরেই পতিত হয়। কখনই প্যান্থারের ধার-পাশ পর্যন্ত পৌছায়না। ফলে প্যান্থার আমাদের গুলির বিপরীতে কোন প্রতিক্রিয়াই প্রদর্শন করেনা।মাঝে মধ্যে অবজ্ঞা ভরে আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকায়। আমাদের নিক্ষিপ্ত গুলির শব্দই পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে হতে আমাদের কাছে ফিরে আসে!

দুই-একবার প্যান্থারটাকে শিকার করার জন্য পেট্রোল নিয়ে বের হয়েছিলাম। কিন্তু জলাভূমি অতিক্রম করে ওটার ধারে কাছে পৌঁছানোর আগেই ওটা তালেবান জঙ্গিদের মতন প্রতিবারই গহীন অরন্যের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। আবার কোন নিরাপদ মুহূর্তে পুনঃ প্রত্যাবর্তনের জন্য!

আমি প্রায় প্রতি জ্যোৎস্না রাতেই পেট্রোল নিয়ে ক্যাম্প থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে যাই। আমার দুধারে শালের বন আর জংলী কলার গাছগুলো কাঁপতে থাকে ভূতের মতন। জ্যোৎস্নার আলোয় এদেরকে অলীক মনে হয়। অন্ধকারে পাশের পাহাড়ের ওপরে বুনো হরিণগুলো আমলকী গাছের নীচে সারারাত ধরে আমলকী খায়। আমরা পাশ দিয়ে যাবার সময়ে মাঝে মধ্যে মাথা তুলে আমাদের দিকে তাকায়। তবে বেশির ভাগ সময়ে ভ্রুক্ষেপই করেনা আমাদের দিকে।

একটু পর পর ঝর্ণা পার হতে হয়। ছোট ছোট ঝর্ণা। সবাই ডাকে ছরা বলে। তির তির করে স্বচ্ছ জল বয়ে যায় এদের ভেতর দিয়ে। জলের পরিমান খুবই কম। হাটুঁ পর্যন্তও ডুবেনা। হেঁটেই পার হওয়া যায়। কিন্তু বৃষ্টি বাদলের দিনে এই ছরা গুলোই ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করে। তখন এর প্রবল স্রোতকে এড়িয়ে সাঁতার কেটেও পার হওয়া অসম্ভব। ঘণ্টায় বিশ ত্রিশ মাইল বেগে দুর্দান্ত স্রোতে প্রবল শব্দ করে জল নেমে আসতে থাকে তখন এই ছরা গুলোর ভেতর দিয়ে। অনেকটা স্বপ্ন থেকে হঠাৎ-জাগা নির্ঝরের বজ্র-গর্জনের মতন। ঝর্ণার স্বপ্নভঙ্গের কলরোল তখন মাইল মাইল দূর থেকেও কানে আসে! পাখির কাকলীর মতন।

মাঝে মধ্যে রাতে প্রবল চাঁদ ওঠে। অর্ধতন্দ্রায়, অথবা পরিপূর্ণ স্বপ্নের মধ্যেই আমি দেখি। হয়তবা ক্যাম্পের অন্য সকলেও দেখে যে, চাঁদের আলোয়, জল-কল্লোলে আর বনের মর্মরে সমস্ত পৃথিবীটাই অবাস্তব হয়ে গেছে। আমরা কেউই অবাক হই না! কারণ আমরা সবাই জানি এমন একটা আশ্চর্য পটভূমিতে সবই সম্ভব। সবই স্বাভাবিক। পাশের পাহাড় থেকে কানে ভেসে আসে হরিনের মিষ্টি ডাক। অথবা বিরহের আর্তনাদ।

এমন অপরূপ বন-জ্যোৎস্নায় হরিণ সম্ভবত তার হরিণীকেই সন্ধান করে ফিরছে। যেমন করে আমরা পুরো দেশবাসী নিরন্তর খুঁজে ফিরি হিংসা- হানাহানিমুক্ত স্বদেশ!

লেখক: মেজর (অবসরপ্রাপ্ত), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ