বন্ধ হচ্ছে না পুলিশের বিতর্কিত সোর্স কালচার 

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৭ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৪ ১৪২৬,   ১৩ শা'বান ১৪৪১

Akash

বন্ধ হচ্ছে না পুলিশের বিতর্কিত সোর্স কালচার 

শফিকুল বারী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫০ ২ মার্চ ২০২০   আপডেট: ০৬:৫৭ ৩ মার্চ ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

বিস্তর অভিযোগের পরও বন্ধ হচ্ছে না পুলিশের বিতর্কিত সোর্স কালচার। এতে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এ বাহিনীর। উপর মহল থেকে বারবার এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়ার পরও কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের সোর্স নির্ভরতার সুযোগ নিচ্ছে সোর্সরা।

তারা পুলিশের নাম ভাঙ্গিয়ে করছে মাদক ব্যবসা- এমনকি চাঁদাবাজি। অপরাধীদের ধরিয়ে দিয়ে সহযোগিতার পরিবর্তে উদ্ধারকৃত মাদক পুনরায় বিক্রি করছেন তারাই। 

জানা যায়, গত কয়েক বছরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ৮ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারসহ (ডিসি) সংশ্লিষ্টদের বেশ কয়েকবার চিঠি দেয়া হয়, তথাকথিত সোর্স কালচার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। বিভিন্ন থানায় ডিসিরা কঠোর নির্দেশও দেন এ বিষয়ে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএমপির এক ডিসি ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে অতিষ্ট হয়ে তিনি তার ডিভিশনে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। যদি কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে বা গাড়িতে সোর্সকে ঘুরতে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, যত মামলা হয় তার ৯০ ভাগ মামলার রহস্যই পুলিশ নিজেরা উদ্ধার করে। ১০ ভাগেরও কম সোর্সদের সহায়তা নেয়া হয়। কিছু অসাধু কর্মকর্তা এসব সোর্স কাম মাদক ব্যবসায়ীকে প্রশ্রয় দিচ্ছে- এ অভিযোগ তিনি স্বীকার করেন।  

ডিএমপির মিরপুর থানার সোর্স চোরা সুজন নিজেকে এসআই দাবি করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজী করছেন। ভাষানটেক ও কাফরুল থানার পুলিশ সোর্স শাওনের বিরুদ্ধেও রয়েছে একই অভিযোগ।

চাঁদা না পেয়ে অনেককে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগ আছে ভাষানটেক থানার সোর্স সুমন মিয়ার (৩৫) বিরুদ্ধে। এছাড়া ভাষানটেক, কচুক্ষেতের মাদক সম্রাট ইমু, মাহমুদা আক্তার ও সুজন ইয়াবা ব্যবসা করছে নির্বিঘ্নে। তাদের সহযোগিতা করছে সোর্স শাওন ও চোরা সুজন। 

রাজধানীর কদমতলী-শ্যামপুর এলাকায় টাক্কু রশিদের সোর্স হিসেবে রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। তিনি নিজেকে র‌্যাব-পুলিশ-ডিবির সোর্স পরিচয় দেন। তার বিরুদ্ধে মাদক বিক্রি ও জুয়ার বোর্ড চালানোসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। 

তার শ্যালিকা পাগলি ওয়াসা রোডের বৌ-বাজার রেললাইনে হেরোইন বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কদমতলী থানাধীন ওয়াসা এলাকায় সোর্স ইউনুস মাদক বিক্রেতা বিল্লালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। চোরাই মোবাইল ফোনের ব্যবসা করেন আকবর ফর্মা। এক সময়ের টোকাই কামাল এখন পুলিশের সোর্স হিসেবে এলাকার সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করছেন। কদমতলী থানা এলাকার মুরাদপুর এলাকার সোর্স কামাল ও সোহেলের মাদক ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতা ও তার ভাগ্নে।

বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় র‌্যাবের সোর্স হিসেবে পরিচিত আলম। রেললাইন এবং ট্রেন কেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে আলমের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। চলন্ত ট্রেনে ছিনতাই করে যাত্রীকে ফেলে দেয়ার একটি ঘটনায় কারাগারে ছিলেন আলম।

সূত্র জানায়, লালবাগ থানার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি সোর্স অসীম ও তার সহযোগীরা হাজারীবাগ এলাকার সুইপার কলোনিতে মাদক ব্যবসা করছেন। অপরদিকে লালবাগ থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সাহাবুদ্দিন ওরফে বুদ্দিন বর্তমানে মতিঝিল ও সূত্রাপুর থানার সোর্স বলে নিজেকে পরিচয় দেন। ১৯৯৮ সালে ভ্যান রফিক হত্যাকাণ্ডের আসামি সাহাবুদ্দিন। শাহবাগ থানায় তার বিরুদ্ধে দু’টি মাদক মামলা রয়েছে। লালবাগের বেড়িবাঁধ এলাকার জামাই ইদ্রিস অপহরণ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। তার দ্বিতীয় স্ত্রী সাহিদা নিউমার্কেট থানার তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। 

খিলগাঁও থানা পুলিশের সোর্স ওহাব গোরান এলাকার ছাপড়া মসজিদের পাশে আদর্শবাগের গলিতে ইয়াবা ও ফেনসিডিল ব্যবসা চালান। 

কামরাঙ্গীরচর এলাকায় পুলিশ সোর্স আজমল প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চালাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও মাদক মামলা রয়েছে। ২০০৯ সালে নিউ পল্টন জুয়েলারি দোকানে ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পুলিশ সোর্সের খাতায় নাম লেখান তিনি।

শাহ আলী ও দারুস সালাম থানা পুলিশের এক সোর্সের স্ত্রীও বড় মাপের মাদক ব্যবসায়ী। নাজু নামের ওই মাদক সম্রাজ্ঞী মিরপুরের দিয়াবাড়ি বটতলা এলাকায় ব্যবসা করছেন।

সোর্সের দৌরাত্ম এতই বেশি যে, গত ২০১৬ সালের ৩ ফ্রেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহআলীতে চাঁদার দাবিতে প্রতিদ্বন্দ্বী মাদক বিক্রেতা (চায়ের ব্যবসার আড়ালে) বাবুল মাতুব্বরকে পুলিশের সামনেই পুড়িয়ে মারে পুলিশের সোর্স দেলোয়ার, আয়ুব আলী ও রবিনসহ কয়েকজন। এ ঘটনায় ৫ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়। প্রত্যাহার করা হয় থানার ওসিকেও। 

পরবর্তীতে বাবুলের ছেলে রাজু জানান, সোর্স দেলোয়ারের হাতে সবসময় হাতকড়া দেখে তারা সবাই তাকে পুলিশই ভাবতেন। 

বনানী থানা পুলিশের সবচেয়ে পুরনো সোর্স শহীদ ওরফে ফর্মা শহীদ। শুধু মাদক ব্যবসাই নয়, তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্রবহন ও ব্যবহার, হুমকি-ধামকি দিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মহাখালী টিএন্ডটি বস্তি। 

এ ছাড়া বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তালিকাভুক্ত তথাকথিত মাদক ব্যবসায়ী সোর্সের মধ্যে রয়েছে- গুলশানের নাদিম ও ফর্মা স্বপন, বনানীর শহীদ, ধানমন্ডি-কলাবাগানের মিন্টু, নাজির, ফাতেমা ও লাল চান, শাহবাগের ফর্মা কাদের। 

নিউমার্কেট এলাকার নাদিম ও কাইল্যা বাবু, মোহাম্মদপুরের হানিফ,রাসেল ও জয়নাল, রমনা এলাকার হেরোইনচি স্বপন, মালেক, খলিল ও আক্তার, সবুজবাগে বজলু মিয়া। 

কাফরুলের বাবু, সুমন, মোশারফ, শাহীন, খ্রিস্টান বাবু ও আলমগীর, মিরপুরের সাইফুল, দেলোয়ার, তারেক, রাজু ও রহমান, পল্টনের মরিয়ম, আজমল ও খলিল।

ডেমরার বাবু সেলিম, যাত্রাবাড়ীর শাহিন শাহে আলম, আলতাফ, মাসুম, সুমন, সালাম ও ফর্মা সিরাজ, শ্যামপুর, কদমতলী ও গেন্ডারিয়া এলাকার সোহাগ, আমির, সোহেল, শিপন, জাহাঙ্গীর,ভাগিনা রবিন, নজরুল,  লালু, রহিম ও আলী।

কামরাঙ্গীরচর এলাকার মাদক মামলার আসামি সিডি মিন্টু, সোহেল, আরিফ ও আশরাফ, হাজারীবাগের জসিম, রনি, শাহজাহান ও ওয়াসিম, পুরান ঢাকার ইয়াবা ঝিলু, ফেন্সি রমজান, জামান, মনোয়ারা, সেলিম, লিটন,কানাই, সামসু, জাহাঙ্গীর, শাকিল, সাব্বির,বাবলু, সফিক, সুজন ও মাসুদ। 

এক সোর্স বলেন, আমরা পুলিশ না, কিন্তু সব সময় পুলিশের সঙ্গে থাকার কারণে এবং পুলিশকে ফোন করলেই চলে আসে বলে স্থানীয় জনসাধারণ বিশ্বাস করে আমরাও পুলিশ।

এসব বিষয়ে ডিএমপির শাহ আলী থানার ওসি মো. সালাউদ্দিন মিয়া ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, সোর্সরা পুলিশের নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যায় বলে শোনা যায়। আইনে সোর্সের বিষয়ে বলা আছে। নির্দিষ্ট কিছু ঘটনায় গুপ্তচর নিয়োগের বিধান রয়েছে। তবে সোর্স যদি পরিচয়ই দেয় তাহলে সে সোর্স রইলো কিভাবে। সোর্স তার পরিচয় প্রকাশ করলে তথ্য পাবে কিভাবে। কেউ কি সোর্সের পরিচয় উল্লেখ করে? সাক্ষ্য আইনের ১২৫ ধারায়ও এ বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। তবে আমার এলাকায় এমন কেউ নেই। 

তিনি আরো বলেন, অপরাধী সে যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
 

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএএম/আরএ