Alexa বনবিবির বটগাছের ডাল কাটলেই বিপদ!

ঢাকা, শনিবার   ১৬ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রাহায়ণ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

বনবিবির বটগাছের ডাল কাটলেই বিপদ!

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৩ ২৬ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৩:৪৪ ২৬ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বনবিবির বটতলা। যার সৌন্দর্য প্রকৃতি প্রেমীদের মন কাড়ে। এই বটতলাকে ঘিরে রয়েছে কয়েক’শ বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। বনবিবির বটতলা পাখির কল-কাকলিতে মুখরিত থাকে সব সময়। সাড়ে তিন একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মূল মহীরুহ ঘিরে তাই তৈরি হয়েছে জীবন্ত গাছের খুঁটি। সব মিলিয়ে ডাল-পাতায় ছাওয়া গোলঘরের রূপ নিয়েছে বটগাছটি।

সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার গেলেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের উপজেলা দেবহাটা। এর প্রাণকেন্দ্রেই আছে হাজার বছরের এক বটবৃক্ষ। স্থানীয়ভাবে এই স্থানটি বটতলা কিংবা বনবিনি তলা নামে পরিচিত। এই বটগাছটির বিশেষত্ব হলো বিস্তৃত এই বটগাছের প্রকৃত গোড়া খুঁজে পাবেন না। কেননা গাছের শাখা-প্রশাখা শিকড় থেকে বিরাট রূপ ধারণ করেছে।

প্রচলিত ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই এলাকায় ব্রিটিশ আমলে জমিদারদের বসবাস ছিলো। উপজেলা সদর থেকে টাউনশ্রীপুর পর্যন্ত মাত্র সাড়ে ৩ কিলোমিটারের মধ্যে ছিল ১৮ জন জমিদারের বসবাস। এই টাউনশ্রীপুরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় পৌরসভা ছিলো। যার নাম ছিলো টাউনশ্রীপুর মিউনিসিপ্যালিটি। ধারনা করা হয়, ব্রিটিশ আমলে বা তার বহু আগে এই বটগাছের জন্ম। তবে কীভাবে জন্ম তা আজো অজানা। তবে ধারনা করা হয় এই গাছটি ৩০০ বছরের প্রাচীন।

অসংখ্য ডালপালা ছড়িয়েছে গাছটিজানা গেছে, অতীতে সাধু-সন্ন্যাসীরা এখানে ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা করতেন। আবার অনেকে মনের কামনা পূরণে নির্জনে এসে বনবিবিকে মনের কথা শোনাতেন। তবে কালের বিবর্তনে এখন আর কোনো সাধু-সন্ন্যাসী এসে এখানে বসে না। থাকে না কেউ ধ্যানে মগ্ন। বনজীবীদের বিশ্বাস, বাদাবনের রক্ষক বনবিবির সঙ্গে ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে এই বিশাল বটের। এর পাতায় পাতায় মিশে আছেন বনবিবি। তিনি বনজীবীদের কাছে স্বমহিমায় পূজিত লোকজ দেবী। 

লোকজ বিশ্বাস 
 
জনশ্রুতি রয়েছে, কয়েক’শ বছর আগে সেখানে জঙ্গল ছিলো। বনে যাওয়ার আগে বনবিবিকে স্মরণ করতো সবাই। সেই থেকেই বনবিবির বটতলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে জায়গাটি। অনেকে বিশ্বাস করেন, বনবিবিকে স্মরণ করে বনে গেলে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। পরবর্তীতে মানুষের লোকজ বিশ্বাসে তৈরি হয় বনবিবির শক্ত ভিত। বনজীবীদের কাছে তিনি অরণ্যের দেবী রূপে পূজিতা। লোক বিশ্বাসে তিনি কখনো মুরগির রূপ ধারণ করেন, কখনো হন বাঘ। 

সুশ্রী, লাবণ্যময়ী ভক্তবৎসলা এই দেবীর কারো ওপরে কোনো আক্রোশ নেই। বনের সমস্ত সৃষ্টিতে তার মমতা মাখা। তিনি ভালোবাসেন মানুষ ও প্রকৃতিকে। তিনি সুন্দরবনের জেলে, বাউয়ালি বা কাঠুরে আর মৌয়াল বা মধু সংগ্রহকারীদের রক্ষাকত্রী। তিনি হিন্দুর বনদুর্গা বা বনদেবীর মুসলমানি রূপ। বনজীবীদের ধারণা, বাঘ ও ভূত-প্রেতের মতো অপশক্তির ওপরে কর্তৃত্ব করেন বনবিবি। তাই গভীর বনে কাঠ, গোলপাতা, মধু ও মোম সংগ্রহ বা মাছ ধরতে যাওয়ার আগে বনবিবির উদ্দেশ্যে শিরনি দেন ক্ষীর বা অন্ন।

বনবিবির বটে গজিয়ে ওঠা খেজুর গাছবনবিবির বটতলা সম্পর্কে এলাকাবাসীর মতে, বাপ-দাদার মুখে শুনা এই বনবিবির বটতলার ইতিহাস। কয়েক’শ বছরেরও অধিক বয়সী এই বট গাছ। ছোটবেলা থেকেই নাকি তারা দেখে আসছে প্রতিবছরই পহেলা মাঘে সেখানে হাজুত মেলা বসে। সব ধর্মের মানুষের আগমন ঘটে বনবিবির বটতলায়। অনেকের বিশ্বাস থানে দুধ ঢাললে সবারই মঙ্গল হয়।

এছাড়াও প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বনবিবির বটতলায় পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম পড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন নববর্ষ উৎযাপন করার জন্য। নাচ, গান ও আনন্দে মেতে ওঠেন সবাই। শুধু হাজুত মেলা বা নববর্ষ উদযাপন নয়, সৌন্দর্য উপভোগের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ প্রতিদিন বেড়াতে আসেন বনবিবির বটতলায়। 

জনশ্রুতি আছে, বিশাল এই গাছ নিয়ে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে। এর একটি হলো- যিনি এর ডাল কাটবেন, তিনি বিপদে পড়বেন। দীর্ঘদিন কেউ ডাল না কাটায়, বেড়েছে এর আকার-আয়তন।

বনবিবির বটগাছবনবিবি

বনবিবির জহুরানামায় বলা হয়েছে, তিনি বেরাহিম নামে এক আরবদেশী’র কন্যা। বেরাহিমের স্ত্রী গুলাল বিবি সতীনের প্ররোচনায় সুন্দরবনে পরিত্যক্তা হন। সেখানে তার গর্ভে বনবিবি ও শাহ জাঙ্গুলী জন্ম নেন। কালক্রমে তাদের শক্ত আসন তৈরী হয় সুন্দরবনের লোকজ বিশ্বাসে। এই বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে চলে আসছে বাঘ রূপী  আরেক মানুষ দেবতা দক্ষিণ রায় আর পরোপকারী গাজী পীরের নাম।

বলা হয়ে থাকে, দুই লোভী চাচা ধনে আর মনে তাদের ভাতিজা দুখেকে বাঘরূপী দক্ষিণ রায়ের হাতে তুলে দেন। তবে বনবিবির নির্দেশে তার ভাই শাহ জাঙ্গুলী শিশুটিকে উদ্ধার করে মায়ের কোলে ফেরত পাঠান। আর দক্ষিণ রায় ও গাজীকে ধরে নিয়ে যান বনবিবির কাছে। প্রকৃত ঘটনা জানতে পেরে, দক্ষিণ রায়ের সঙ্গ ছেড়ে বনবিবির পক্ষ নেন গাজী। বনবিবির বটে গজিয়ে ওঠা খেজুর গাছ। যশোরের ব্রাক্ষ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের অধীন ভাটির দেশের রাজা দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে বনবিবির যুদ্ধ হয়। পরাজিত হয়ে সন্ধি করেন দক্ষিণ রায়।

বনবিবিকে নিয়ে মঙ্গল কাব্যের ঢংয়ে রচিত হয়েছে বনবিবির জহুরানামা নামে বিখ্যাত পুঁথিকাব্য। আরবী জহুরা বা হিন্দি জহুর শব্দের অর্থ কৃতিত্ব বা অলৌকিক শক্তি। আর ফারসি নামাহ শব্দের অর্থ পুস্তক বা নথিপত্র। এই কাব্যে বনবিবির অলৌকিক কীর্তিকলাপের বিবরণ পাওয়া যায়। প্রথমাংশে বনবিবির জন্ম-বৃত্তান্ত, মক্কা থেকে ভাটির দেশে আগমন ও প্রভাব বিস্তারের কাহিনী বর্ণিত। দ্বিতীয় ভাগে ধনাই-দুখের পালায় বনবিবির পূজা প্রবর্তনের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। তবে আল্লাহ-রাসূল, মক্কা, পীর-পিরানী ইত্যাদি শব্দ জুড়ে আখ্যানকাব্যটিকে দেয়া হয়েছে ইসলামীকরণের ছোঁয়া। 

শঙ্খচিল ছবির দৃশ্যএখানে বনবিবির নামে পরিচিত বিশাল বটের আশপাশে কোনো বাড়িঘর নেই। মানিক পীরের মাজার নামে একটা আধা পাকা স্থাপনা আছে বটগাছের নিচে। পৈত্রিক সূত্রে গাছটির মালিকানা পেয়েছিলেন হাজারী পোদ্দার নামের এক ব্যক্তি। তিনি গাছটিসহ জমি তার মেয়ের নামে লিখে দেন। মেয়েকে বিয়ে দেন রাখাল চন্দ্র দের ছেলে ডা. মহাদেব চন্দ্রের সঙ্গে। বর্তমানে গাছটির মালিক তার ছেলে তপন কুমার দে। তিনিও জানেন না গাছটির জন্ম সাল বা জন্মের রহস্য। যা আজো সবার  অজানা। তার মতে, বটসহ গাছের আশেপাশের জমির মালিক ছিলেন তার বাবা। তার কাছেও জানা ছিলো না এ রহস্য।

বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্র ‘শঙ্খচিল’র শ্যুটিংও হয় এই বটতলায়। সব মিলিয়ে বটবৃক্ষটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় যে কেউ। গবেষণার জন্যও আসেন অনেকে। বট গাছটির বিস্তৃত শাখা-প্রশাখায় দর্শনার্থীরা তাদের স্মৃতিচিহ্ন লিখে রাখেন। কেউবা লিখেন প্রিয়জনের নাম, কেউবা বাঁধেন লাল সুতা। বনবিবির বটতলা পুলকিত করে মনকে। বটের ছায়ায় প্রশান্তি পায় সকলে। যেন বনবিবির বটতলা হাতছানি দিয়ে ডাকছে। 

বনবিবির পূজা দক্ষিণ বাংলার আবহমান সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুন্দরবন লাগোয়া অঞ্চলে যেসব স্থানে বনবিবির পূজা হয় সেগুলোর মধ্যে মংলা থানার বানিশান্তা সংলগ্ন ঢাংমারি গ্রাম অন্যতম। স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে বনবিবির মোট মন্দির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। পশুর নদীর পশ্চিম পাড়েই কেবল তিন শতাধিক স্থানে প্রতি জানুয়ারিতে বনবিবির পূজা হয়।

লোকজ দেবী বনবিবিসাতক্ষীরায় শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ লাগোয়া মালঞ্চ নদীর উভয় পাড়েই বনবিবির মন্দির দেখা যায়। সম্প্রতি সেখানকার পানখালী চুনা জেলেপাড়াতে নতুন এক পাতা ঘরে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব মন্দিরের কোথাও কোথাও কেবল বনবিবি থাকলেও, অনেক স্থানেই তার সঙ্গে শাহ জাঙ্গুলী, গাজী আউলিয়া, শিশু দুখে, তার দুই চাচা ধনে ও মনে, বাঘ রূপী দক্ষিণ রায়, কালু, ভাঙ্গড় ও মানিক পীর প্রমুখের প্রতিমা পূজিত হতে দেখা যায়। 

তবে এই বটতলায় কেবল বনবিবিরই একচ্ছত্র আধিপত্য। ইতিহাসের সঙ্গে লোককথার যতই অসংগতি থাক, বনবিবি দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো বনজীবীর মনে এখনো ভক্তি, শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের স্তম্ভ হয়ে আছেন। 

যেভাবে যাবেন বনবিবির বটতলায়

বাংলাদেশের যে কোন জায়গা থেকে সাতক্ষীরা এসে, খুব সহজেই ভ্রমণ করা যায় বনবিবির বটতলায়। সাতক্ষীরা বাস স্ট্যান্ড থেকে সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জের বাসে চড়ে নামবেন সখিপুর মোড়ে (ভাড়া ২৫-৩০ টাকা)। সেখান থেকে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে সরাসরি পৌঁছানো যায় দেবহাটা উপজেলার বনবিবির বটতলা।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস