বনদস্যুদের কবলে রেমা-কালেঙ্গা, গাছ কেটে সাবাড়!

ঢাকা, শনিবার   ০৪ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২১ ১৪২৬,   ১০ শা'বান ১৪৪১

Akash

বনদস্যুদের কবলে রেমা-কালেঙ্গা, গাছ কেটে সাবাড়!

জাকারিয়া চৌধুরী, হবিগঞ্জ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:৪৯ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চল (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চল (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

দেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক পাহাড়ি বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গা। সুন্দর বনের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বন এটি। যা হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত।

প্রাকৃতির অভয়ারণ্যে এই বনাঞ্চলটিতে দিন দিন বেড়েই চলেছে বনদস্যুদের দাপট। বনদস্যুদের ক্ষমতা এতটাই যে দিনে দুপুরে বনাঞ্চল থেকে কেটে নিচ্ছেন বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। এতে একদিকে উজার হচ্ছে বনাঞ্চল অন্যদিকে পরিবেশ হারাতে বসেছে ভারসাম্য। একই সঙ্গে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। 

অভিযোগ রয়েছে বন বিভাগ ও সরকারি দলের কতিপয় কিছু নেতাদের ছত্রছায়ায় বনদস্যুরা দীর্ঘদিন ধরে এ কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। তবে বিষয়টি অস্বীকার করছে বন কর্তৃপক্ষ।

তারা বলছে, এখন আর রেমা কালেঙ্গা বনাঞ্চল থেকে কোনো গাছ কাটা বা পাচার হচ্ছে না। আর কারো বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। 

বন বিভাগ সূত্র জানায়, ১৯৪০ সালের দিকে প্রায় ১৭৯৫ হেক্টর আয়তনের এই বনাঞ্চলটি বিস্তার লাভ করে। তবে রেমা কালেঙ্গা এই বনাঞ্চলটি অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় ১৯৮২ সালে। ১৯৯৬ সালে এ বনের সম্প্রসারণ করা হয়। বনবিভাগের কালেঙ্গা রেঞ্জের চারটি বিটের (কালেঙ্গা, রেমা, ছনবাড়ী আর রশিদপুর) মধ্যে রেমা, কালেঙ্গা আর ছনবাড়ী বিস্তীর্ণ জঙ্গল নিয়ে রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য গঠিত।

এতে রয়েছে একাধিক পাহাড় ও টিলা। এখানকার উঁচু পাহাড়গুলো প্রায় ৬০ থেকে ৬৭ মিটার উঁচু। এই বনাঞ্চলটিতে রয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ শতকেরও অধিক প্রজাতির গাছপালা। এরমধ্যে সেগুন, মেহগনি, আকাশী, চাপালিশসহ মূল্যবান গাছ রয়েছে এই বনে। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উজার হতে বসেছে এই বৃহৎ বনাঞ্চলটি। বনদস্যুরা প্রকাশ্যে কেটে নিচ্ছেন এই বনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। 

রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চল (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)সরেজমিনে বনের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, একদল বনদস্যু দিনের বেলা প্রকাশ্যেই পাহাড়ের ওপর গাছ কাটছেন। আবার অন্য কয়েকজন দ্রুত গাছগুলো কেটে সারিবদ্ধ করে রাখছেন। পরে সারিবদ্ধ গাছের টুকরোগুলো ট্রাক্টরের মাধ্যমে পাচার করা হচ্ছে।

স্থানীয় বেশ কয়েকজন জানান, প্রতিনিয়তই এভাবে গাছ কেটে পাচার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না কেউ। আবার কেউ যদি কথা বলে তবে তাদের উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, নুহ বাহিনীর প্রধান নুহ, হোসেন বাহিনীর প্রধান হোসেন ও মনা মিয়াসহ স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি গাছ পাচারের ঘটনার সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতাও জড়িত রয়েছে গাছ পাচারের ঘটনায়। যদিও তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস দেখাননি কেউ। এছাড়াও পাচারকারীদের সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদেরও। 

আহমদ মিয়া নামে এক ব্যক্তি জানান, রেমা কালেঙ্গা বানাঞ্চলটি যেন এখন বনদস্যুদের স্বর্গ রাজ্যে পরিণত হয়েছে। দস্যুরা দিনে-দুপুরে গাছ কেটে প্রকাশ্যে ট্রাক্টরের মাধ্যমে পাচার করছেন। বন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীরা দেখেও না দেখার ভান করছেন। এমন করে চলতে থাকলে একদিন হয়তো এই বনাঞ্চলটি ধ্বংস হয়ে যাবে। এছাড়াও বিপন্ন হয়ে যাবে রেমার প্রাকৃতিক পরিবেশ। এখানে থাকবে না কোনো পশু-পাখি আর সাপ-বিচ্ছু। তাই প্রাকৃতিক এই অভয়ারণ্যটি বাঁচিয়ে রাখতে এখনই সংশ্লিষ্টদের নজর দিতে হবে। 

শিক্ষিকা নাছিমা আক্তার জানান, চা-বাগানের ভেতরে অবস্থিত একটি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। স্কুলে আসা যাওয়ার পথে প্রায় দেখে যায় ট্রাক অথবা ট্রাক্টরে করে প্রকাশ্যে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই রেমার প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে।

গাজীপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম জানান, পূর্বে রেমা কালেঙ্গা বন বিট থেকে যেভাবে গাছ পাচার হত এখন তা আগের মত হয় না। তবে এই বনবিট থেকে গাছ পাচাররোধ করতে হলে বন কর্তৃপক্ষকে আরো সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং তাদের কর্ম তৎপরতা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। 

রেমা-কালেঙ্গা বনাঞ্চল (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)রেমা-কালেঙ্গা বন বিটের রেঞ্জ অফিসার মো. আলাউদ্দিন জানান, আমি এই বিটে যোগদানের পর থেকে অনেক অভিযান পরিচালনা করেছি। বনদস্যু নুহ ও হোসেনসহ একাধিক দস্যুদের আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। তারা বর্তমানে জেল-হাজতে রয়েছেন। এছাড়াও এই বন থেকে কোনো গাছ পাচার হয় না। আমরা সার্বক্ষণিক বনের চারপাশ নিয়মিত টহলসহ পর্যবেক্ষণ করছি।

চুনারুঘাট বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মারুফ হোসেন জানান, আমি এই এলাকায় নতুন এসেছি। বন থেকে গাছ পাচার হয় এ বিষয়টি জানা নেই। যদি এমন হয়ে থাকে তা হলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এছাড়াও বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি এ ঘটনায় জড়িত থাকে তাদেরও ছাড় দেয়া হবে না। পাচারকারীদের সঙ্গে কোনো আপোষ নেই। যিনিই জড়িত থাকুন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম