Alexa বনজ সম্পদ সুরক্ষায় সরকারের অবদান

ঢাকা, শুক্রবার   ১৯ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৪ ১৪২৬,   ১৫ জ্বিলকদ ১৪৪০

বনজ সম্পদ সুরক্ষায় সরকারের অবদান

 প্রকাশিত: ২০:২১ ২২ মার্চ ২০১৮  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

প্রাকৃতিক নিয়মেই উদ্ভিদ ও প্রাণী নিয়ে গঠিত যে জীববৈচিত্র্য তা একে অপরের সাহায্য নিয়ে যেমন বেঁচে থাকে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে অবদান রাখে অসামান্য।

বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল, সমতল ভূমি এবং উপকূলীয় এলাকায় আজও রয়েছে বেশকিছু বনাঞ্চল। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড় এলাকার বনে গর্জন, সেগুন, জারুল এবং গামারি জাতীয় বৃক্ষ পাওয়া যায়। দিনাজপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের বনাঞ্চলের নানা জাতের গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় অনেকটা সহায়তা করছে।

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমে খুলনা ও পটুয়াখালী জুড়ে অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন দীর্ঘকাল ধরে দেশের জীববৈচিত্র্য তথা পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ অবদান রেখেছে। প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের বন দেশের মোট বনভূমির প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়ে। এখানে প্রচুর সুন্দরী, গেওয়া এবং কেওড়া গাছ ছাড়াও রয়েছে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ ও নানা প্রজাতির বানর, যা এক বিরল দৃষ্টান্ত। প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবনের বিপুল পরিমাণ গাছপালা ও পশুপাখির ভূমিকা অপরিসীম। কারণ উপকূলীয় বনে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় বলে বাতাস আর্দ্র থাকে।

বনভূমি যে কোনো উৎস থেকে আসা পানিপ্রবাহের চাপ কমায় এবং ভূমিক্ষয় ও ভূমিধস থেকে দেশের মাটিকে রক্ষা করে। গাছপালা বায়ুমণ্ডলের উত্তাপ কমিয়ে দিয়ে বাতাসে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেয়। এমনকি বন যানবাহনের কালো ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বায়ুমণ্ডলকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। বনাঞ্চল বিশেষ করে ঝড়-ঝঞ্ঝা, সাইক্লোন, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়গুলো দেশের বিভিন্ন স্থানসহ উপকূলীয় এলাকার বিশাল একটি অংশ লণ্ডভণ্ড করে দেয়। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশে গাছপালা, পশুপাখিসহ মানুষের জানমালের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। বিশেষ করে দেশের অমূল্য সম্পদ সুন্দরবন উপকূলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকার বন বিনষ্ট হয়েছে। তবে সুন্দরবনের অবস্থানের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের বিশাল জনবসতি এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে।

দেশে বর্তমানে মোট ভূমির পরিমাণ ১ কোটি ৪০ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে ১২ লাখ হেক্টর রয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৯০ সাল থেকে ১০ বছর মেয়াদে সংরক্ষিত বনে গাছ কাটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বৃক্ষ কর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বহুবার। কোনোক্রমেই বনভূমি থেকে কোনো গাছ কাটা যাবে না, এমনকি ঝড়ের কবলে অথবা মড়কে আক্রান্ত হয়ে বনাঞ্চলে যেসব গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, সেগুলোও কেউ সংগ্রহে নিতে পারবে না। সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনের গাছ কাটার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের মেয়াদ আগামী ২০২২ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষ তথা বনের গুরুত্ব অপরিসীম। তাছাড়াও বন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনেক চাহিদা পূরণ করার জন্য অপরিহার্য। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বনজ সম্পদের সুরক্ষা, সর্বোত্তম ব্যবহার সুনিশ্চিত, বনের আচ্ছাদন বৃদ্ধি এবং বন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী সরকারি বন ও বন বহির্ভূত বৃক্ষ (গ্রামীণ বন) জরিপের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের বন অধিদফতরের এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগিতায় রয়েছে প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), ইউ এস এ আই ডি (USAID) এবং সিলভাকার্বন।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বনজ সম্পদ রক্ষা, বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ‘ফরেস্ট্রি মাস্টার প্লান’ প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামীতে দেশের মোট ভূমির ২০ শতাংশ বনায়নের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল। এ লক্ষ্যে বৃক্ষহীন অথচ বনভূমি হিসেবে চিহ্নিত ৭ লাখ ৫৮ হাজার একর জমিতে নতুন গাছ লাগানোর কথা হয়েছে। প্রতি বছরের মতো আষাঢ়-শ্রাবণে সারা দেশে অনুষ্ঠিত বৃক্ষমেলা শুরু হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা জাতের বনজ ও ফলদ গাছের চারা বিক্রি হবে। শহরে গ্রামের নার্সারিগুলোয় কলম-চারা কিনতে পাওয়া যাবে। মানুষ কিনে গাছের চারা লাগাবে। বাড়ির আঙিনায়, ভবনের ছাদেও রকমারি গাছ লাগাতে দেখা যাবে। মানুষের মাঝে গাছ লাগানোর উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। এ আগ্রহকে ধরে রাখতে হবে, বাড়াতে হবে গাছের সংখ্যা।

বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে পূর্ণবয়স্ক মানুষরা যদি প্রতি বছর একটি করে হলেও গাছের চারা বা কলম রোপণ করেন, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই গাছপালা, লতাগুল্ম বেড়ে ভরে যাবে দেশ, বনে বনে পাখি গান ধরবে, শ্যামলে ছেয়ে যাবে অপরূপ বাংলার পথ-প্রান্তর। জীববৈচিত্র্যের অফুরন্ত সম্ভার নিয়ে আবার হেসে উঠবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে