বদলে যাওয়া বদলে দেয়া কিছু বিলিয়নিয়ারের গল্প (পার্ট- ১)

.ঢাকা, শুক্রবার   ২৬ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ১২ ১৪২৬,   ২০ শা'বান ১৪৪০

বদলে যাওয়া বদলে দেয়া কিছু বিলিয়নিয়ারের গল্প (পার্ট- ১)

অনন্যা চৈ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:১০ ১৪ এপ্রিল ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

শূন্য থেকে বিলিয়নিয়ার হতে কত কী করতে হয়, সেটা সাধারণ মানুষেরও বুঝতে কষ্ট হবে না। আমাদের মতো প্রত্যেকেই নিজের জীবনে আর্থিক নিশ্চয়তা খুঁজি, হতে চাই বিলিয়নিয়ার। সব মানুষের স্বপ্ন অনেক বড় কিন্তু সে স্বপ্ন ছুঁতে পারে কজন? সে জন্য নিজের অবস্থান থেকে প্রত্যেককেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে কেউ তার চাহিদার বিকাশ ঘটাতে পারে আবার কেউ জীবিকার তাগিদ মেটাতে পারে আবার কেউ পথিমধ্যে থমকে দাঁড়ায়। কারণ চাওয়া-পাওয়ার মিল সব সময় এক থাকে না। কাউকে ব্যর্থতার গ্লানি সহ্য করতে হয়। তবে এমন কিছু মানুষ এই পৃথিবীতে আছে, যাদের স্বপ্ন ছিল তবে তারা সে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন।

মূলত সফলতার জন্য শুধু পরিশ্রম নয়, বরং ভাগ্যও ভালো থাকতে হয়। কিন্তু ওপরওয়ালা সে ভাগ্য ক'জনের নামে লিপিবদ্ধ করেছেন! যাইহোক, ভাগ্য- দুর্ভাগ্য এসব নিয়ে লিখতে চায় না, আজ পাঠকদের জানাতে চায় এমন কিছু ব্যক্তির অবস্থান যারা পরিশ্রম ও ভাগ্যের বলে ছুঁয়েছেন প্রত্যাশার স্বর্ণ শিখর। 

আজ জানাতে চায় জিরো থেকে হিরো হওয়া কিছু বিলিয়নিয়ারদের গল্প, যারা নিজেদের নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। চলুন দেখে নেয়া যাক, কারা আছেন আজকের তালিকায়-

ল্যারি এলিসন: ল্যারি এলিসন। সফটওয়্যার জগতে এক অনন্য নাম। মূলত অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক মার্কিন ব্যবসায়ী ল্যারি এলিসন। তার নিট সম্পদের পরিমাণ ৬০.২ বিলিয়ন ডলার। ওরাকল করপোরেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী তিনি। তবে জীবনের একটা সময় তিনি ছিলেন কারো দত্তক নেয়া সন্তান। ১৯৪৪ সালের ১৭ আগস্ট নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে এক সিঙ্গেল মাদারের কোলে জন্ম হয় মার্কিন ব্যবসায়ী ল্যারির। 

সন্তান লালনে সক্ষম না থাকায় মা নিজের সন্তানকে দত্তক দেন বোনের কাছে। কিন্তু সিকাগোয় (জায়গার নাম) থাকা সে বোনের ঘরেও এলিসনের ভাগ্যে বিপত্তি নেমে আসে। দত্তক নেয়া মায়ের অকাল মৃত্যুতে স্কুল ছাড়তে হয় তাকে। জীবিকার তাগিদে খুবই কষ্টকর আর কম বেতনের চাকরিই খুঁজে নিতে হয় তাকে। কিন্তু ভাগ্য ভালো থাকলে ঠেকায় কে? ভাগ্য ও পরিশ্রম দিয়ে আজ তিনি জয় করেছেন পুরো বিশ্ব। হয়েছেন সফল ব্যবসায়ী ও বিলিয়নিয়ার।
 
সেলডন অ্যাডেলসন: আরেক সফল ধনী ব্যক্তি সেলডন অ্যাডেলসন। একটা সময় আশ্রয় না পেয়ে খালি মেঝেতে ঘুমিয়েছেন তিনি। তবে বর্তমানে কয়েকজন ধনীর তালিকায় তার অবস্থান অনেক ভালো। তার নিট সম্পদের পরিমাণ ৩৮.১ বিলিয়ন ডলার। 

শেলডন অ্যাডেলসন আজকের এই দিনে লাস ভেগাস, ম্যাকাও এবং সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন হোটেলের মালিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের আজকের ক্যাসিনো মুঘল তিনি। সেখানে তাকে জুয়ার সম্রাট বলে চেনে অনেকে। এর আগে, ১৯৩৩ সালে ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনে জন্ম নেয়া সেলডন অ্যাডেলসনের অর্থাভাবে লেখাপড়া চালানোও সম্ভব ছিল না। এক কথায় ড্রপআউট ছিলেন তিনি। বাবা ছিলেন একজন সামান্য আয়ের মানুষ। বিভিন্ন আলোচনায় জানা গেছে, তার বাবা ছিলেন একজন ক্যাব ড্রাইভার আর মা ক্যাটারিংয়ের দোকান চালাতেন। ‘ব্লুমবার্গ বিজনেসউইক’ সূত্রে জানা যায়, মাত্র ১২ বছর বয়সে এই বিলিয়নিয়ার সংসারে রোজগার বাড়াতে খবরের কাগজ বিক্রি শুরু করেন। এমনকি ছোট কোম্পানির প্রচারণা ও বিজ্ঞাপনে কাজ করতেন তিনি। এরপর আসতে আসতে আজকের বিলিয়নিয়ার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।
 
লি কা: লি কা। তার নাম শুনেছেন নিশ্চয়? তিনিও বর্তমানে ৩৩.১ বিলিয়ন ডলারের মালিক। তবে তার অতীত ছিল পুরোপুরি বিষাদময়। বাবার মৃত্যুর পর লি কা আর পড়ালেখা করেননি। তবে বর্তমানে ব্যবসায়িক কর্মদক্ষতার কারণে হংকংয়ে সুপারম্যান হিসেবে পরিচিত এই লি কা-শিং। এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ ধনী তিনি।

বর্তমানে হংকংয়ের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দাঁড়িয়েছে তার ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে রয়েছে ইন্টারনেট সেবা ও সুপার মার্কেট চেইনশপ। ৫০টির বেশি দেশে রয়েছে লি কার ফ্লাগশিপ প্রতিষ্ঠান সিকে হাচিসনের বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ। এর আগে, জীবনের শুরুতে ১৯৫০ সালে প্লাস্টিকের ফুল বিক্রির মাধ্যমে তার ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়। এই লি কা-শিং ১৯৪০ সালে নিঃস্ব হাতে দেশ থেকে পালিয়ে হংকংয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আরো অবাক হবেন জেনে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি হারিয়েছিলেন বাবাকে। তখন থেকেই পরিবারের সব বোঝা নিজের কাঁধে চাপিয়ে আজ এই পর্যন্ত পৌঁছেছেন এই লি কা।
 
পিনাল্ট: পিনাল্ট। খুব ছোট বয়সে তিনিও বাবাকে হারিয়েছেন। আর তাকে হারানোর পর হাইস্কুলের গণ্ডি পার করতে পারেননি পিনাল্ট। বর্তমানে তার নিট সম্পদের পরিমাণ ৩২.৭ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বিলাসবহুল পণ্যের মুঘল ধরা হয় ফ্রাঙ্কোইস পিনাল্টকে। একজন সফল ব্যবসায়ী ও শিকারি কৌশলের জন্য বিশ্বের কাছে তিনি ব্যাপক সমাদৃত। 

পিনাল্টের এই পর্যায়ে আসার পিছনের কারণ, যখন বাজারে বিপর্যয় চলে তখন তিনি ছোট সংস্থাগুলোকে নিজের কোম্পানির অধীনে কিনে নেন। এরপর তিনি বিলাসবহুল পণ্যের গ্রুপ পিপিআর শুরু করেন। তার অধীনে রয়েছে বিশ্বখ্যাত গুছি, স্টেলা ম্যাককার্টনি, আলেকজান্ডার ম্যাককুইন এবং ইয়েভেস সেন্ট লরেন্টসহ বিলাসী পণ্যের ব্র্যান্ড। বর্তমানে তিনি এই ফ্যাশন কনগ্লুমারেট কেয়ারিংয়ের চেয়ারম্যান। তবে শুরুতে স্কুল ড্রপআউট হওয়ার পর প্রথমে ব্রিটেন অঞ্চলে কাঠের ব্যবসা শুরু করেন এই পিনাল্ট। কিন্তু তার দূরদর্শিতা ও পরিশ্রম তাকে আজ এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। 

ডেল ভিঞ্চি: তাকে অনেকেই না চিনলেও তার ব্যবসায়ীক পণ্য কম বেশি সকলেই ব্যবহার করেন। ডেল ভিঞ্চি একজন নগণ্য পরিবার থেকে বেড়ে উঠা সন্তানের নাম। তিনি শুরুতে এতিমখানায় বড় হন। তবে বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ ২৩.৫ বিলিয়ন ডলার। 

মূলত শৌখিন মানুষের কাছে তার ব্র্যান্ডেড পণ্য নিত্য দিনের সঙ্গী। তিনি রে-বান আর ওকলি ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা। পুরো পৃথিবীর কাছে তার ব্র্যান্ড দুটি এতটাই জনপ্রিয় যে, বিশ্বের কত শত সানগ্লাস ফ্যাক্টরি এই নাম চুরি করে নিজের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তার কোন হিসাব নেই। কিন্তু এই ব্র্যান্ডের ভক্তরা ঠিকই খুঁজে বের করেন আসল কোম্পানির পছন্দসই সানগ্লাসটি। বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করা সানগ্লাস ব্র্যান্ডের মালিক লিওনার্দো ডেল ভিঞ্চিও। 

এর আগে, ১৯৩৫ সালে জন্ম নেওয়া এই ডেল ভিঞ্চির বয়স যখন সবে পাঁচ তখন সৎমায়ের অত্যাচারে বাড়ি ছাড়তে হয় তাকে আর বেছে নিতে হয় থাকার জন্য এতিমখানা। একটু বড় হওয়ার পর প্রথম কাজ হিসেবে একটি ফ্যাক্টরিতে যোগ দেন। যেখানে অটোপার্টস আর চশমার ফ্রেম তৈরি করতেন তিনি। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই ঝুঁকি নেন একটি ফ্যাক্টরি নিজের নামে দাঁড় করানোর। আর সেই ফ্যাক্টরিই বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সানগ্লাস আর চশমার ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। 

লক্ষ্মী মিত্তাল: লক্ষ্মী মিত্তাল। ব্রিটেনে বসবাসকারী ভারতীয় ধনকুবের এই ব্যক্তি। তবে আগে তিনিও বিত্তহীন ঘরের সন্তান ছিলেন। বর্তমানে তার নিট সম্পদের পরিমাণ ১৭.৮ বিলিয়ন ডলার। তিনি বিশ্বের বৃহত্তম ইস্পাত প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আর্সেলরমিত্তালের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এর আগে, তার শুরুর জীবন ছিল বিষাদময়। তিনি ভারতের রাজস্থানে এক বিত্তহীন ঘরে ১৯৫০ সালের ১৫ জুন জন্ম নেন। এরপর তার পরিবার কলকাতায় চলে আসেন। সেখানে বাবা মহন লাল মিত্তাল একটি ইস্পাতের ব্যবসা গড়ে তোলেন। মূলত বাবার কাছেই তার ব্যবসার হাতেখড়ি। টানাটানির সংসারে স্নাতক করা ছেলে লক্ষ্মী মিত্তাল যুক্ত হন বাবার ব্যবসায়। এরপর ১৯৭৬ সালে ইন্দোনেশিয়ায় ইস্পাত কারখানা গড়ে তোলেন এই ধনীর দুলালী। তারপর থেকে কয়েক দশক ধরে রাজত্ব করে আসা ইস্পাত কোম্পানিটি এখন বিশ্বের সেরার স্থান দখল করে আছে। 

রোমান: দক্ষিণ রাশিয়ায় দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি রোমান। মাত্র ২ বছর বয়সে তার জায়গা হয় এতিমখানায়। সেখানে পড়াশোনা এবং ১৯৮৭ সালে খেলনা বানানোর কোম্পানি দিয়ে তার ব্যবসায়িক জীবনের শুরু। তবে বর্তমানে তার নিট সম্পদের পরিমাণ ১১.৫ বিলিয়ন ডলার। মূলত ধনী ফুটবল ক্লাব মালিকদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন তার টিম রোমান আব্রাহিমোভিচ। ২০০৩ সালে চেলসির মালিকানা গ্রহণের পর প্রতিটি দল বদলের মৌসুমে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ করাটাকে নিয়মই বানিয়ে ফেলেছেন এই রাশিয়ান। 

বর্তমানে বিশ্বের বাঘা বাঘা ফুটবল তারকার ঘাঁটি কিন্তু তার ক্লাবে। ২০০৪-০৫, ২০০৫-০৬, ২০০৯-১০ মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগ ও ২০১১-১২ মৌসুমের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জেতে তার ক্লাব। 

এছাড়া এ তালিকায় আরো আছেন জ্যান, রালফ লরেন, স্টিফেন, শাহিদ খান ও অপরাহ উইনফ্রে। তাদের নিয়ে আরেকটি আলোচনা নিয়ে আসব। সে পর্যন্ত চোখ রাখুন ডেইলি বাংলাদেশের ফিচার পাতায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই