বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা আজও বিশ্বনন্দিত

ঢাকা, শুক্রবার   ০৫ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৩ ১৪২৭,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা আজও বিশ্বনন্দিত

 প্রকাশিত: ১৬:০৬ ১২ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৬:০৭ ১২ জানুয়ারি ২০২০

পরিচিতি ও কাব্যচর্চা দুই বাংলায়। মূলতঃ কবি হলেও উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও পাঠকমহলে জনপ্রিয়। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই কলকাতায়। কর্পোরেটের চাকরি ছেড়ে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ বেশ দেরিতেই। কিন্তু অগ্রগমন দ্রুত। এরইমধ্যে ১০ টি গদ্য ও উপন্যাস এবং ৪ টি কবিতা সংকলন প্রকাশিত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলতাফ, হুমায়ূন ও বঙ্গবন্ধুর কলকাতার জীবন অবলম্বনে লেখা উপন্যাস ‘মহানির্মাণ’।

কূটনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ ডিপ্লোম্যাসি'র উদ্ভব ঘটেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ হতে। গ্রিক  ‌‌'ডিপ্লোমা' শব্দটি থেকে 'ডিপ্লোম্যাসি' শব্দটির সৃষ্টি বলে ধারনা করা হয়। ডিপ্লোমা শব্দটি গ্রিক ক্রিয়াশব্দ 'ডিপ্লোন' থেকে এসেছে। ডিপ্লোন মানে হচ্ছে- ভাজ করা। বাংলা কূটনীতি শব্দটি সংস্কৃত শব্দ 'কূটানীতি' থেকে আগত। প্রথম মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের উপদেষ্টা চাণক্য কৌটিল্য’র নাম থেকে কূটানীতি শব্দটির উদ্ভব।  

আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ভারতীয় ভূখণ্ডে এক অনন্য কূটনীতিকের জন্ম হয়, যার নাম চাণক্য বা কৌটিল্য। তিনি তার প্রণীত কিছু নীতিকে রাজনীতির প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কূটনীতি হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিদ্যার একটি শাখা যেখানে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক চুক্তি বা আলোচনা সর্ম্পকিত কলা কৌশল অধ্যয়ন করা হয়। সাধারণ অর্থে কূটনীতি হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত সরকারি কার্যক্রম। তাই একজন মানুষকে আমরা যে অর্থে ‘কূট’ বলি তার সঙ্গে এই ‘কূটনীতি’ শব্দটি কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়। বর্তমান যুগে কূটনীতিতে বাস্তবিক অর্থে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাজকর্মকে সমান গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রত্যেক কূটনীতিককেই তার রাজনৈতিক সম্পর্কের দিকটির সঙ্গে একই গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও ধারণ করতে হবে। রাজনৈতিক সম্পর্ক যেমন অর্থনৈতিক সম্পর্ককে দৃঢ় করতে পারে, তেমনি অর্থনৈতিক সম্পর্ক একটি শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। কূটনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে সংঘাতময় উত্তপ্ত পরিস্থিতিকেও শান্ত করে তোলা যায়। কূটনীতি হলো সেই বিষয় যা কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ওই ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্ববর্তী কারণ এবং পরবর্তী সময়ে ওই ঘটনার রেশ ধরে ভবিষ্যতে কী ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে তার অনুমাননির্ভর কার্যকারণ নীতি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারা। সেই কারণে একজন রাজনীতিককে যথেষ্ট পরিমাণ কূটনৈতিক ধীশক্তির অধিকারী হতে হয়। একেই বলে কূটনৈতিক প্রজ্ঞা। কূটনীতির ভাষা আলাদা। এই ভাষা মানুষকে স্বস্তি দেয়, দেখায় আশার আলো।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত অসংখ্য কূটনৈতিক অর্জন প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলেই প্রথমে বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ওয়ালিউর রহমানের একটি মতামত মনে পরে যায়। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘একাত্তরে রিফিউজি হয়ে যখন জার্মানিতে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করতাম অন্য দেশে যাওয়ার সময় আমাদের কার্ড দেখে বলতো তোমরা শেখ মুজিবের দেশের লোক, তোমাদের কোনো ভিসা লাগবে না।’ এটা একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অর্জন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করা প্রবাসী সরকারের কূটনীতিকদের সঙ্গে ওইসব দেশের আচরণ ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ ও সমানে-সমানে। এক্ষেত্রে স্বাধীনতাপ্রত্যাশী বাংলাদেশ বা পূর্ব পাকিস্তানের পরিচয়ের চেয়ে বেশি কাজ করেছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। এমনকি একটি দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভিসার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো বঙ্গবন্ধুর পরিচয়কে। পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে মুক্ত হয়ে বিশেষ বিমানে পরের দিন ভোরে লন্ডন পৌঁছেন বঙ্গবন্ধু। ৮ তারিখ সন্ধ্যায় তিনি বৈঠক করলেন তত্কালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে। লন্ডন থেকে দেশে ফিরলেন দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি। দিল্লিতে স্বল্পকালীন যাত্রাবিরতির সময় বঙ্গবন্ধুকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেয় ভারত সরকার। সেদিনের সেই ঐতিহাসিক সংবর্ধনায় উপস্থিত ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীসহ মন্ত্রিপরিষদের অনেক সদস্য ও লাখো ভারতবাসী। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েই তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমরা একটি ছোট রাষ্ট্র, আমাদের সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে এবং কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়।’ এ ঘোষণাতেই বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী কূটনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় মেলে।  

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক শিক্ষা হয় অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে। চোখের সামনে কূটনৈতিক দাবাখেলার মাধ্যমে দেশভাগ দেখেছেন। কাজেই তার কূটনৈতিক দর্শন ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও প্রখর হয়ে উঠেছিল প্রথম থেকেই। তিনি ক্ষমতায় এসেই শুধু আলোচনার মাধ্যমে তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটা ছিল তার রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রথম কূটনৈতিক সাফল্য। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বঙ্গবন্ধু ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টনের ফর্মুলা নির্ধারণে জোরদার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং গঙ্গার পানির ৪৪ হাজার কিউসেক ভাগ পাওয়ার সম্মতি তিনি আদায় করেন বাংলাদেশের পক্ষে। পানি বণ্টনের এ উদ্যোগের ফলে ১৯৬৮-৬৯ সালের ১১ হাজার শক্তিচালিত পাম্পের স্থলে ১৯৭৪-৭৫ সালে পাম্পের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬ হাজার। এতে সেচের আওতাধীন জমির পরিমাণ এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬ লাখ একরে উন্নীত হয়। গঙ্গা নদীর প্রবাহ থেকে অধিক পানি প্রাপ্তি, সেচ ব্যবস্থার প্রসার, ভর্তুকি দিয়ে অধিক হারে উন্নত বীজ, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, অতিরিক্ত খাসজমি প্রাপ্তি ২৫ বিঘা জমির ওপর দেয় কর মাফ এবং মূল্য সমর্থনমূলক সচেতন ও কৃষকবান্ধব নীতির ফলে কৃষি ক্ষেত্রে অগ্রগতির যে ধারা সূচিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সময়ে, তার ফলস্বরূপ আজো এ দেশের কৃষি ক্ষেত্রে শক্তিশালী ধারা বজায় রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু সরকারের সফল কূটনৈতিক পদচারণা ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের ক্যারিশমায় স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আইএমএফ, আইএলও, আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন, ইউনেস্কো, কলম্বো প্ল্যান ও গ্যাটের সদস্যপদ লাভ করতে সক্ষম হয়। একই বছরের ৮ আগস্ট বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে আবেদন পাঠায়। দুদিন পর বঙ্গবন্ধু নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যকে বাংলাদেশকে সমর্থনের জন্য অনুরোধ করে বিশেষ পত্র লেখেন। ২৩ আগস্ট যুক্তরাজ্য, ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়া এক মিলিত প্রস্তাবে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্তির জন্য নিরাপত্তা পরিষদকে জোরালো সুপারিশ করে। ওই প্রস্তাবে চীনের ভেটো প্রদান সত্ত্বেও ৩০ নভেম্বর ১৯৭২ সাধারণ পরিষদ প্রস্তাবটি সুপারিশ করে। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম স্বাধীন দেশ হিসেবে সদস্যপদ পেয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।

বঙ্গবন্ধু সবসময়ই শোষিতদের পক্ষে কথা বলতেন। তাকে তুলনা করা হতো হিমালয়ের সঙ্গে। তিনি আফ্রিকায় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন; অবসান চেয়েছেন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় বিদেশি শাসনের। বঙ্গবন্ধু যেমন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন, তেমনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সাইপ্রাস সরকারকে উত্খাতের নিন্দাও করেছেন। ভিয়েতনামে আমেরিকার বোমাবাজি বন্ধের দাবিও জানায় বাংলাদেশ তার আমলেই। তিনি নিজে যেমন বাংলাদেশের উন্নয়নের মিশন নিয়ে ভ্রমণ করেছেন বিভিন্ন দেশ, তেমনি বাংলাদেশেও এসেছেন বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, সরকারপ্রধানরা। ১৯৭৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়ার্ল্ডহেইম গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। যুগোস্লাভিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসেন ২৫ মার্চ। বঙ্গবন্ধু ২৬-৩১ জুলাই প্রেসিডেন্ট জোসিপ ব্রোজ টিটোর আমন্ত্রণে যুগোস্লাভিয়া সফর করেন। সফরকালে প্রেসিডেন্ট টিটো ন্যাম ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ব্যাপারে পূর্ণ সমর্থন জানান। বঙ্গবন্ধু অটোয়ায় ২-১০ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে যোগদান উপলক্ষে কানাডা সফর করেন। তিনি ৫-৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত চতুর্থ ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। ওই সময় তিনি বাদশাহ ফয়সাল, প্রেসিডেন্ট টিটো, প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন, প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফি, প্রধানমন্ত্রী স্লথ প্রমুখ ব্যক্তির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। ১৮ অক্টোবর সাতদিনের এক সফরে টোকিও গমন করেন বঙ্গবন্ধু। ওই বছর তিনি স্বল্প সময়ের জন্য মালয়েশিয়া সফরেও গিয়েছিলেন। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রনায়ক টুঙ্কু আব্দুর রহমান তাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেন।

১৯৭৪ সালের মার্চে বাংলাদেশে এক সংক্ষিপ্ত যাত্রা বিরতিকালে আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ারি বুমেদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে আসেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট ইউ নে উইন। ১২ মে পাঁচদিনের সফরে বঙ্গবন্ধু ভারত যান। ওই সময় দুই দেশের মধ্যে সীমানা চিহ্নিতকরণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেনেগালের প্রেসিডেন্ট লিওপোল্ড সেংঘর ২৬-২৯ মে বাংলাদেশ সফর করেন। ১ জুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ভুটানের রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুকের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি পাঁচদিনের সফরে ঢাকা আসেন ১৫ জুন। ওই মাসেই বাংলাদেশ সফর করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নগুয়েন হু থু ঢাকায় এক সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেন। এর সবই ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের কূটনৈতিক মিশনের ফল।

জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে জুলাই ১৯৭৫, মাত্র সাড়ে তিন বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ৫০টির মতো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের সফরসহ বিভিন্ন পর্যায়ে শতাধিক সফর অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের সফল কূটনৈতিক তত্পরতায়। ওই স্বল্প সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার নানা বিষয়ে ৭০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। অনেক দেশ ও সংস্থা যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন, সুইডেন, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বুলগেরিয়া, বেলজিয়াম, আলজেরিয়া, নেদারল্যান্ডস, জাতিসংঘ, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি, আইডিএ, ইউএনএইচসিআর প্রভৃতি বাংলাদেশকে কোটি কোটি ডলারের বিভিন্ন ধরনের ঋণ, সাহায্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদান করে এবং স্বীকৃতি প্রদান করে আরো বিভিন্নমুখী সহযোগিতার। এ সময় বাংলাদেশ এডিবি, আইসিএও, ইকাফ ও এফএওর সদস্যপদ লাভ করে।

১৯৭৪ সালের মে মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি পরিষদের তিনদিনের এশিয়া কনফারেন্সে বঙ্গবন্ধুকে শান্তির জন্য ‘জুলিও কুরি’ স্বর্ণপদকে ভূষিত করা হয়। সদ্য স্বাধীনতা অর্জন করা একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের এ পুরস্কার অর্জন নিঃসন্দেহে বিরাট ব্যাপার। বঙ্গবন্ধুর সময়েই ১০ জুলাই পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য একটি প্রস্তাব পাস করে। এই সেই পাকিস্তান, যারা এ দেশের ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করে রক্তের হোলি খেলায় মত্ত হয়েছিল ’৭১-এ; তারাই বৈশ্বিক চাপে পড়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করে সে দেশের সংসদে। এসবই সম্ভব করেছিলেন বঙ্গবন্ধু তার জীবদ্দশায়। তিনি জীবিত থাকতেই সৌদি আরব, সুদান, ওমান ও চীন ছাড়া বিশ্বের সব রাষ্ট্রই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার অ্যালেক ডগলাস–হিউম ১৯৭২ গোড়ায় বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। স্যার অ্যালেক তার কাছে উপমহাদেশ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চান এবং একটি প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবটি হলো, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে লন্ডনে একটি বৈঠকের মধ্যস্থতা করতে চায়। তখন বঙ্গবন্ধু স্যার অ্যালেককে জানিয়ে দেন, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছার কোনো প্রশ্নই আসে না। স্যার অ্যালেকের সঙ্গে আলোচনায় তিনি এ কথাও পরিষ্কার করেন যে জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে চীন যদি নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দেয়, তাহলে বাংলাদেশ সরকার তার বন্ধুদেশগুলোর কাছে পাকিস্তানের সদস্যপদ বাতিলের দাবি তুলবে। তার ভিত্তি হবে এটাই যে সাবেক পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই বাংলাদেশে বাস করে। আর সে কারণে বাংলাদেশ একটি উত্তরাধিকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে বর্তমানের বাংলাদেশ এখনও বঙ্গবন্ধুর কূটনীতিকেই অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোথাও অবনত না হয়ে কোন দেশের নীতির কাছে প্রভাবিত না হয়ে শিরদাঁড়া উঁচু করে এগিয়ে চলেছে। তাই এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বাংলাদেশ ক্রমেই এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হয়ে উঠেছে যার সূত্রপাত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাতে। মধ্যবর্তী বন্ধ্যাপর্ব অতিক্রম করে আবার তা ফুলেফলে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে তারই কন্যার কৃতিত্বে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর