বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া যায় না

ঢাকা, সোমবার   ০১ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৮ ১৪২৭,   ০৮ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া যায় না

মীর সাখাওয়াত সোহেল ডেইলি-বাংলাদেশ

 প্রকাশিত: ১৬:২৩ ১৩ জুন ২০১৮   আপডেট: ১৬:৫৬ ৩১ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ইচ্ছে ছিল, হবেন সাতারু। তাই বিশ্বখ্যাত সাতারু ব্রজেন দাশ ছিল তার অনুসরণীয়। কারণ ওই সময় ব্রজেন ছিল তরুণ প্রজন্মের আইডল। তাই কোমরবেধে নেমেও পড়েন অনুশীলনে। বেশ কয়েকবার পুরস্কারও পেয়ে যান। কিন্তু ইচ্ছে শক্তি পরাজিত হয় রাজনীতির কাছে। মানুষের জন্য কিছু করার মানবিক তাগিদে চাপা পড়ে সাতারু হওয়ার খায়েস। জড়িয়ে যান ছাত্র রাজনীতিতে। জীবনের মোড় ঘুরে যায় ভিন্ন পথে। মানুষটির নাম অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু। এই মানুষটির কাছে বঙ্গবন্ধু তার জীবনের অংশ। তিনি বিশ্বাস করেন, যারা বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন বা তার সহচার্য পেয়েছেন, তারা কখনোই আদর্শচ্যুত হতে পারে না।

অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু। পাবনা-১ আসনের (বেড়া-সাথিয়া) এমপি। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। স্বপ্ন ছিল সাঁতারু ব্রজেন দাশের মত হবেন কোনো একদিন। কিশোর বয়স থেকেই আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। করেছেন ছাত্রলীগের রাজনীতি। রাকসুর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। মুজিব বাহিনীর হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, খেটেছেন জেল। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়েই চলমান তার রাজনৈতিক জীবন। তৃণমূল পর্যায়ে বেড়া-সাথিয়ায় আওয়ামী লীগকে সুসংহত করেছেন একক প্রচেষ্টায়। এক এগারোর সময় শেখ হাসিনার প্রতি অনুগত থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শেই বেচে থাকতে চান তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গে একান্ত আলোচনায় ওঠে আসে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা, রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক, সাফল্য-ব্যর্থতার বিষয়গুলো।

ডেইলি বাংলাদেশ: শুনেছি ব্রজেন দাশের মত সাতারু হওয়ার ইচ্ছা ছিল আপনার…?

শামসুল হক টুকু: আমাদের সময় ব্রজেন দাশ ছিলেন তরুণ প্রজন্মের ক্রেজ। কিশোর-যুবকদের কাছে তিনি ছিলেন আইডল। তাই স্বপ্ন পেয়ে বসে আমার। ইচ্ছে জাগে ব্রজেনের মতো সাতারু হওয়ার। শুরু করি সাতার অনুশীলন। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় পর্যায়ে বেশ কয়েকবার পুরস্কারও পেয়েছি। পরেতো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। আর সে কারণে বাদ পড়ে অনুশীলন। ছিন্ন হয় ইচ্ছে। ছিটকে পড়ে স্বপ্ন। মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদে জড়িয়ে যাই রাজনীতিতে।

ডেইলি বাংলাদেশ: ছাত্রলীগে যোগ দিলেন কিভাবে?

শামসুল হক টুকু: খুব ডানপিটে ছিলাম। ১৯৬৪ সাল, তখন স্কুলের ছাত্র। তখনই আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে মিছিলে যেতাম। ঐ বছর আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুলে (বেড়া বিপিনবিহারী হাই স্কুল) আট আনা বেতন বাড়ানো হয়। সবাইকে নিয়ে প্রতিবাদ করি বেতন বৃদ্ধির। আন্দোলনের কারণে স্কুল থেকে জোর করে টিসি দেয় আমাকে। পরে সাথিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ১৯৬৫ সালে বেড়া কলেজে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করি। ১৯৬৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কমার্স ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হই। ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে বাড়তে থাকে ঘনিষ্ঠতা। ১৯৬৮-৬৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের পক্ষে রাকসুতে সহ ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয় আমাকে। বিপুল ভোটে জয় লাভ করি। ভালো শ্লোগানদাতা ও সাতারু হিসেবে আমাকে অনেকেই চিনতো। ছয় দফা আন্দোলন ও ৬৯ এর গণঅভ্ভুত্থানের সময় আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে জড়াই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি আন্দোলনেও শরিক ছিলাম।

১৯৭০ সালে জিন্নাহ হলের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৭৩-৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র লীগের সভাপতি নির্বাচিত হই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই ১৯৭৩-৭৪ মেয়াদে। ঐ সেশনেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ৫ জনের একজন সহ সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করি।

মুক্তিযুদ্ধে….

দেখেন ৭১ এ আমি ও আমার দুই ভাই আবদুল খালেক ও আবদুল বাতেন সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। খালেক মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। আমি দেরাদুনে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই। পাকিস্তানি হানাদাররা আমাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। আমার মা, অন্যভাইরা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন বলেই তাদের লক্ষ্য ছিল আমাদের বাড়ির দিকে।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা..

এটা আমার জীবনের চরম মুহুর্ত। স্বাধীনতার পর পাবনার নগরবাড়ি ঘাট পরিদর্শনে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিনই প্রথম ওনার সান্নিধ্য পাই। জাতির পিতাকে যারা দেখেছেন, যারা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তারা কি কখনো তাঁর আদর্শের রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হতে পারেন?

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ করায়, তৎকালীন সরকার গ্রেফতার করে আমাকে। সে সময় ২ বছর জেলে ছিলাম।

ডেইলি বাংলাদেশ: মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার পরিবার-আত্মীয় স্বজনের ভূমিকা কেমন ছিল?

শামসুল হক টুকু: আমরা আওয়ামী পরিবার। আমার দুই ভাই সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বড় ভাই বদিউল আলম বেড়া বণিক সমিতির সভাপতি ছিলেন। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত বেড়া থানা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আর্থিকভাবে প্রচুর সাহায্য করেছেন তিনি। এছাড়া আত্মীয় স্বজনের সবাই আওয়ামী লীগের চিন্তাভাবনার সঙ্গে আছে, থাকবে।

ডেইলি বাংলাদেশ: এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। শোনা যায়, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাঈদের সঙ্গে আপনার দ্বন্দ্ব আছে। আসলে বিষয়টি কি?

শামসুল হক টুকু: কি বলব। ওনার (অধ্যাপক আবু সাঈদ) সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আছে আদর্শিক দ্বন্দ্ব। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার একজন সৈনিক হিসেবে কাজ করছি। এলাকায় দলকে সংগঠিত করে যাচ্ছি। ওনার এক এগারোর ভূমিকা সবারই জানা আছে। বলতে লজ্জা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচনে গোপনে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে মাঠে নামেন তিনি।

ওনার ভাই প্রফেসর ড. আবু সালেহ জামায়াত নেতা। আত্মীয় স্বজনের অনেকেই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি আওয়ামী লীগ সেজে দলের নেতাকর্মীদের বিভ্রান্ত করছেন। আমার মতে, এসব বিভ্রান্তি বাদ দিয়ে তিনি (আবু সাঈদ) যদি আগের ভুলত্রুটির জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে (বয়স বিবেচনা না করে) ক্ষমা চান তবেই মঙ্গল।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন কেউ কেউ?

শামসুল হক টুকু: যারা অভিযোগ এনেছেন তাদের ধন্যবাদ জানাই। আমি জানা মতে কোনো অন্যায় করিনি। আমার সম্পদের হিসাব আয়কর বিভাগসহ সরকারি সংস্থাগুলো সবাই জানে।

ডেইলি বাংলাদেশ: প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, দুবার এমপি। সফলতা ব্যর্থতা আপনাকে কি ভাবায়?

শামসুল হক টুকু: কাজ করতে গেলে দু’টোই থাকে। এটা স্বাভাবিক। আগেও এলাকার উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলাম, এখনও আছি। এ সরকারের আমলে যে উন্নয়ন হয়েছে তা আর কোনো সময়ে হয়নি। এ সময়ই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, জঙ্গিবাদ দমন হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এলাকার উন্নয়নে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা পালন করে যাচ্ছি। ওনার একজন সৈনিক হিসেবেই কাজ করে যাব।

তৃনমূল আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করে যাচ্ছি, সরকারের উন্নয়নের সুফল এলাকাবাসীর কাছে পৌছে দিচ্ছি।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনার জীবনে চাওয়ার বা পাওয়ার তো কমতি নেই নিশ্চয়, এখন আপনার চাওয়া কি?

শামসুল হক টুকু: রাজনৈতিক জীবনে বরাবরই বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করেছি। জীবনের শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মানুষ হিসেবে থাকতে চাই। এ আদর্শের মশাল শেখ হাসিনার হাতে। তার হাতকে শক্তিশালী করতে চাই।

ডেইলি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ

আপনাকেও ধন্যবাদ।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএস/এলকে/টিআরএইচ