Alexa বই পড়লেই শাস্তি মাফ!

ঢাকা, শুক্রবার   ২৩ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৮ ১৪২৬,   ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

বই পড়লেই শাস্তি মাফ!

 প্রকাশিত: ১১:৩১ ২৮ এপ্রিল ২০১৮   আপডেট: ০৮:১৫ ২৯ এপ্রিল ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

অপরাধ করলেই পড়তে হবে বই, দিতে হবে পরীক্ষা। এ কি শাস্তি নাকি কাজ-কর্ম ও নীতি-নৈতিকতায় উৎসাহ। কর্মীদের জন্য এমন ব্যতিক্রমী শাস্তি চালু করেছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ছোট-খাটো অপরাধে সতর্কতামূলক শাস্তি সাধারণ কর্মীদের দায়-দায়িত্বে সজাগ করছেন বিমানবন্দরের এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এতে করে কর্মীদের ভুলও অনেকাংশে কমে এসেছে। কেবল অপরাধ করলেই নয়, সময় পেলে কাজের ফাঁকে ইচ্ছেমতো বই পড়তে পারেন তারা।

নব আনন্দে সাদরে গ্রহণ করে নিচ্ছেন এ শাস্তি, পড়ছেন বই। ‘শাস্তি’ কঠিন এ শব্দটি যে অনেক সময় হতে পারে অনেক আনন্দের, তা হয়তো কারোই জানা ছিল না। না জানারই কথা, শাস্তি কি কখনও আনন্দের হতে পারে? নিশ্চয় না। তবে কখনও কখনও শাস্তি হতে পারে আনন্দের। এটি বানোয়াট কথা মনে হলেও, শতভাগ সত্য শাহজালাল বিমানবন্দরে চালু হওয়া শাস্তি- বই পড়, পরীক্ষা দাও এ কর্মসূচিতে। পরীক্ষায় পাস করলে শাস্তির উপহারও বই। এমন ইতিহাসের জন্ম দিলেন শাহজালালের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ ইউসুফ।

বই শিক্ষার উপকরণ, জ্ঞানচর্চারও বড় মাধ্যম। বইয়ের বদৌলতে কেউ হন বিদ্বান, আবার বই বর্জন করে কেউ হন মূর্খ। বইয়ের সাহায্যে শিক্ষিত হয়ে ব্যবসা বা চাকরি করে অর্থ আয় ছাড়াও জীবন-জীবিকা ও সম্মান অর্জন করা আধুনিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কথা হলো ‘অপরাধ দমনে বইয়ের ব্যবহার’ সেটা হয়তো ভাবেননি কেউ। কিন্তু এই বই-ই এবার অপরাধীকে বাঁচিয়ে দেবে। বিষয়টি অদ্ভুত মনে হলেও বইয়ের গুরুত্ব মনে করে বাস্তবে তার প্রয়োগ করেছেন এক মহতী মানুষ। নিয়েছেন এ মহৎ উদ্যোগ।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসার পর থেকে নানাভাবে অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে দেখেছেন মোহাম্মদ ইউসুফ। কিন্তু তাতে সংশোধন তেমন চোখে পড়েনি। তাই অনেক রকম ভাবনা থেকেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শাস্তি যদি হয় বই পড়া, তাহলে জ্ঞানের পরিধি বেড়ে যাবে, হয়তো বা আর কখনও করবে না এ অপরাধ। এখন কথা হলো এ পর্যন্ত কতজন শাস্তি পেয়েছেন? আর কতজন নিজেকে সংশোধন করতে পেরেছেন তা দেখার বিষয়? 

শাস্তি পরিমাপ দেখে বই পড়ার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। যেমন এক সপ্তাহে বই পড়েই শাস্তি থেকে খালাস পাওয়া! কোন উপায় নেই, দিতে হবে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা, করতে হবে পাশ। না হলে আবারও পড়তে হবে বই। বিমানবন্দরে যে ব্যক্তি অপরাধ করে ধরা পড়বেন, তাকে এক সপ্তাহের সময় দিয়ে একটি বই পড়তে দেয়া হয়। বইটি পড়া শেষ হলে, ওই বইয়ের বিষয়ে দিতে হয় মৌখিক পরীক্ষা। তাতে সন্তোষজনক ফলাফল পেলে, তাকে অভিযোগ থেকে দেয়া হয় অব্যাহতি। অন্যথায় ফলাফল খারাপ হলে, শাস্তিস্বরূপ ধরিয়ে দেয়া হয় আরেকটি বই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শাহজালালে প্রতিদিন হাজারো যাত্রীর আনাগোনা। ইমিগ্রেশন চেকিংসহ নানা নিয়ম-কানুন। তাই শিফট অনুযায়ী যাত্রী সেবায় নিয়োজিত প্রায় ১৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। এতো সবের মধ্যে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় অনেকেই করছেন ভুল।

এমনিতেই বিমানবন্দরে নানা দুর্নীতি ও অপকর্মের অভিযোগ আছে দায়িত্বে থাকা অনেক কর্তা ব্যক্তিসহ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। বাদ নেই ক্লিনারও। দেখা গেছে, তাদের বেশিরভাগই দৈনিক মজুরিভিত্তিক পারিশ্রমিকে নিয়োগপ্রাপ্ত। কর্মচারীদের অনেকে ছোট-খাটো অপরাধও করে থাকেন কখনও কখনও। ধরাও পড়েন কেউ কেউ। কেউবা চাকরি হারান, কেউ হন সাময়িক বরখাস্ত। এতে বিপাকে পড়তে হয় সংশ্লিষ্টদের।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের নতুন এ উদ্যোগের নাম ‘টুকিটাকি টু বইপড়ানি’। এ প্রজেক্টের আওতায় মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে কবিতা, উপন্যাস, ছড়া, ছোট গল্প ও গোয়েন্দা কাহিনীর মতো বইও রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য- বই পড়ার নেশা ধরিয়ে দেয়া, অপরাধবিমুখতা জাগিয়ে তোলা।

পড়া শেষে বইটি ফেরত দেয়া যাবে না। অপরাধী নিজেই বইটির মালিক হবেন। নিয়ে যাবেন নিজ বাসায়, রাখবেন সযতনে। ছেলেমেয়েসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও যেন বাসায় বই দেখে কখনও না কখনও পড়তে আগ্রহী হন।

একজন ট্রলিম্যান নিজ দায়িত্ব পালনে ট্রলির বিনিময়ে যাত্রীর কাছ থেকে বকশিস নিচ্ছেন ১০০-২০০ টাকা, যা নির্ঘাত অপরাধ। এমনই একজনের খোঁজ মেলে সরেজমিনে। নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ট্রলিম্যান বলেন, আমি একদিন এমন অপরাধ করে ফেলি এবং ধরাও পড়ে যাই। ম্যাজিট্রেট স্যার আমাকে শাস্তিস্বরূপ একটি বই পড়তে দেন এক সপ্তাহের জন্য। বলে দেন সাত দিন পর পরীক্ষা দিতে হবে। আমার অনেক ভালো লেগেছে এমন উদ্যোগে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমরা বই পড়ি না বললেই চলে। তাই অন্তত শাস্তি মনে না করে স্যারকে ধন্যবাদ জানাই তিনি আমাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে দেয়ার জন্য।

কথা হয়, উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি কর্মরত আছেন বেশ বড় একটি দায়িত্বে। নাম না প্রকাশের শর্তে তিনি বলেন, আপনারাও জানেন বিমানবন্দরে ছোট বড় নানা অপরাধ হয়ে থাকে। আমি নিজেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম। শাস্তিস্বরূপ পেয়েছি স্বাধীনতা সম্পর্কিত বই। সেখান থেকে ৭১ এ ঘটে যাওয়া নানা অজানা ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারি। আমি অনেক আনন্দিত এবং গর্বিত শাস্তি নামধারী এ সংশোধনী উদ্যোগে।

জামান মিয়া (ছদ্মনাম) পেশায় বাংলাদেশ বিমানের একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। গত ৫ মার্চ এক বিদেশি নাগরিকের ব্যাগের ট্রলি বহন করেছিলেন। বিনিময়ে পেয়েছেন ৫০ ডলার বকশিস। বিষয়টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের চোখে ধরা পড়ে। তাকে ডেকে আনা হয় কার্যালয়ে। দেয়া হয় তার পছন্দমত একটি ছোট গল্পের বই। সপ্তাহখানেক পর তাকে প্রশ্ন করা হয়, একাত্তরে কী ঘটেছিল? জামানের উত্তর, আমার ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল স্যার। জামানের উত্তরে ফের বইটি ভালোভাবে পড়ে আসতে বলা হয়। এবার তিনি ঠিকভাবেই পড়ে আসেন এবং একাত্তরে কী ঘটেছিল, রাজাকার কী, বাঙালিরা সেই সময় কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল-নানা বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পান। উত্তীর্ণ হন পরীক্ষায়। উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন বই।

বিমানবন্দরের অনেক কর্মচারী এখন সামান্য অপরাধে থাকেন তটস্থ। অপরাধ করে ধরা পড়লে তো বই পড়তে হবেই, সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কাছেও হতে হবে বিব্রত। এ ভয়ে অনেক কর্মচারী এখন প্রায় অপরাধবিমুখ বলে জানান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, প্রজেক্ট টুকিটাকিকে নানা জনে নানাভাবে দেখছেন। অনেকে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে বই পড়াকে শাস্তি হিসেবে দাঁড় করে দিচ্ছেন। তাই বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, বই পড়া কোনোভাবেই শাস্তি হতে পারে না। পৃথিবীর কোথাও এমন আইন নেই। বরং বই পড়া অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। শাস্তি কমিয়ে দিতে পারে। ব্রাজিল এবং ইতালিতে এমন আইন আছে।

দেখা যাক, কী কী অপরাধে দেয়া হচ্ছে বই পড়ার শাস্তি।

১।যাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ

২।ইমিগ্রেশন কার্ড পূরণে যাত্রীদের কাছ থেকে বকশিস নেয়া

৩।যাত্রীদের ট্রলি নিয়ে হয়রানি বা তাদের কাছ থেকে টাকা আদায়

৪।নির্দিষ্ট সীমারেখা বা জোন অতিক্রম করা

৫।মানি এক্সচেঞ্জের জন্য যাত্রীদের ডাকাডাকি করা ইত্যাদি।

এ বিষয়ে বর্তমান পরিস্থিতি জানতে প্রশ্ন ছিল, এ উদ্যোগ কি অপরাধীদের শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে?

টুকিটাকির উদ্যোক্তা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, বড় কোন অপরাধে কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। জেল জরিমানা অব্যাহত আছে। যে অপরাধে আগে শুধু সতর্ক করা হত, সেগুলো সংশোধনে বই পড়ার নিয়ম চালু করা হয়েছে। 

এ পর্যন্ত কতজনকে সংশোধন করা গেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এক মাসেরও কম সময়ে প্রায় অর্ধ-শতাধিক কর্মচারী এর আওতায় এসেছেন। শুরুতে প্রতিদিন দুই-তিনজন অনিয়মে অভিযুক্ত হলেও, প্রজেক্ট টুকিটাকি শুরুর পর এখন সে হার কমছে।

ইউসুফ আরো বলেন, লুকিয়ে বই পড়া অনেকের কাছে বাড়তি চাপ। হঠাৎ হাতে বই দেখলে সহকর্মীরা বুঝে ফেলছে, বাসার লোকজনও বুঝতে বাকি থাকছে না, সে কোন অন্যায় করে ধরা পড়েছে। তিনি জানান, যারাই এই শাস্তির আওতায় এসেছেন তারাই বই কিনে দিয়েছেন।

কীভাবে এ উদ্যোগ শুরু হলো, জানতে চাইলে ম্যাজিস্ট্রেট ইউসুফ বলেন, শুরুতে ম্যাজিস্ট্রেটদের নিজ উদ্যোগে কিছু বই কেনা হয়। পরবর্তীতে দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মচারীরা শাস্তি হিসেবে যেসব নতুন বই জমা দিচ্ছেন তাতেই সমৃদ্ধ হচ্ছে লাইব্রেরি।

তিনি আরো বলেন, শুধু অনিয়ম নয়, কোন কর্মচারী ভালো কাজ করলেও পুরস্কার হিসেবে দেয়া হচ্ছে বই।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ থেকেই যাচ্ছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীসহ অনেকের মধ্যে যদি কেউ একেবারেই পড়াশোনা না জানেন কিংবা কেবল স্বাক্ষর সর্বস্ব হয়, তারা পড়বে কিভাবে?  উত্তর একেবারেই সহজ। তারা পড়বে না, পড়া শিখবেন। তাদের জন্য বাল্যশিক্ষা পর্যায়ের বই-পুস্তকও রাখা হয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এলকে

Best Electronics
Best Electronics