ফেসবুকে সেলফি ও অন্যান্য

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭,   ১১ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

ফেসবুকে সেলফি ও অন্যান্য

 প্রকাশিত: ১৬:৪২ ১৯ মে ২০২০   আপডেট: ১৭:২৭ ১৯ মে ২০২০

আফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিভি`তে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

আমাদের জীবনের অনিবার্য অনুষঙ্গ এখন ফেসবুক। বিভিন্ন বয়স শ্রেণি পেশা গোত্র লিঙ্গের মানুষ ফেসবুকে যুক্ত। দেশ বিদেশের অনেক সেলিব্রেটি যেমন ফেসবুকে আছেন তেমনই আছেন অনেক সাধারণ মানুষ। তারা দিনের কিছুটা সময় ফেসবুকে লিখে বা ছবি দেখে কাটান। কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মেসেঞ্জার হোয়াটসআপে কথা বলেন। সময়টা বেশ কেটে যায়।

করোনা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুক সংশ্লিষ্টতা বেড়েছে। মানুষ এখন বাইরে যেতে পারছে না। অধিকাংশ মানুষ ঘরবন্দি। কাজেই ফেসবুক তাদের বড় একটা আশ্রয়। 

কিন্তু ফেসবুক খুললে নানারকম সমস্যা, বিভ্রান্তির মধ্যে আমাদের পড়তে হয় প্রতিনিয়ত। পড়তে হয় ফেসবুকের ব্যবহার না জানা  সংক্রান্ত জটিলতার কারণে। আমাদের জীবনযাপনের যেমন নিয়মকানুন আছে, তেমনি ফেসবুক ব্যবহারেরও নিয়ম কানুন আছে। আমরা কিভাবে চলব, কিভাবে কথা বলব, কার সঙ্গে কেমন আচরণ করব, কিভাবে খাবো, সমাজে কিভাবে আচরণ করব এমন প্রতিটি বিষয়ই যেমন নিয়মাচারে বাধা ফেসবুকও তাই। আমরা সেই নিয়ম কানুনগুলো মানি না বলে ফেসবুক নিয়ে এত আপত্তি, এত কথা, এত অভিযোগ। দু’চারটি সাধারণ বিষয় উল্লেখ করলেই বিষয়টি বোঝা যাবে।

যেমন ধরুন কারো নিকটজনের মৃত্যু, অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা সম্বন্ধে কেউ লিখেছেন। তখন আপনার মন্তব্যটি হবে সহানুভূতিসম্পন্ন। আপনি সামাজিক মানুষ হলে যা করতেন এখানেও তাই করবেন। লিখবেন, সমবেদনা, শোক জানাই বা এ জাতীয় কিছু। কিন্তু আপনি না পড়েই বা না বুঝেই লিখতে পারেন না ‘নাইস’, ‘সুন্দর’ বা ‘বাহ্’। অথবা ধরুন কারো বিয়েবার্ষিকী, জন্মদিন বা প্রমোশনের খবর লেখা হয়েছে। আপনি তাকে অভিনন্দন দেবেন, শুভকামনা জানাবেন। কিন্তু লিখতে পারেন না ‘সমব্যথী’ বা ‘শোকাহত’ সে পড়ে বা না পড়ে যাই হোক। তারপর ধরুন আপনি যখন তখন একজনের ম্যাসেঞ্জারে লিখেই যাচ্ছেন, তাকে একটার পর একটা এটাচমেন্ট পাঠিয়েই যাচ্ছেন। উনি কোনো সাড়া দিচ্ছেন না। আপনি তাকে লিখছেন ‘আপনি কথা বলেন না কেন’ ইত্যাদি। এরপরও উনি কথা বলছেন না তখন আপনি তাকে কল দিতে থাকলেন দিন নেই রাত নেই। এ ধরনের মানুষের যোগ্যতা নেই ফেসবুক ব্যবহারের। অথবা কেউ হয়তো আপনার সঙ্গে ভদ্রতা করে দু কথা বলেছে। পরদিনই আপনি তাকে প্রেম নিবেদন করলেন আর তারপর দিন একটা নোংরা ছবি পাঠালেন। এসব হচ্ছে হরহামেশা। 

ফেসবুকে খালি গায়ে, মৃতব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি পোস্ট দেয়া নিয়মিত ব্যাপার। এটা যে কত অশালীন তা যারা দেয় তারা বোঝে না। খাবারের ছবি পোস্ট দিন কিন্তু এটা যদি নিয়মিত হয়ে যায় তা মোটেও ভালো দেখায় না। 

আজকাল ফেসবুকজুড়ে অদ্ভুত এক ভাষার ছড়াছড়ি। এই অদ্ভুত না সাধু না চলিত না আঞ্চলিক ভাষা অনেক আগেই আমাদের চলচ্চিত্র নাটককে গ্রাস করেছে এখন আগ্রাসন চলছে ফেসবুকে। আমি জানি না যারা এ ভাষায় লেখেন তারা কি শুদ্ধ বাংলা জানেন না নাকি এই ভাষায় লেখা স্মার্টনেস মনে করেন নাকি কৌতুক করে লেখেন। যদি কৌতুক হয়ে থাকে বলব, কৌতুকের মাত্রা বাড়াবাড়ি রকম হয়ে যাচ্ছে। 

যেমন বিতিকিচ্ছিরি ভাষা তেমনই শব্দ। আমরা কখনই সাধারণ্যে লিখিন বা লেখা যায় ভাবিনি এমন সব শব্দ বিভিন্ন বয়সী পুরুষ নারী লিখে যাচ্ছেন অনায়াসে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নাম, সেগুলির ক্রিয়া প্রক্রিয়া এই ফেসবুক নামের বিশ্বহাটে প্রতিনিয়ত লিখিত হচ্ছে। 

আবার কে কতটা লিখতে পারে তাও জানেন না অনেকে। মধ্যবয়সী  লোকজন এমন সাজ দিয়ে এমন সব কথা লিখছেন যা মোটেও মানানসই নয়। যিনি লিখছেন তিনি যদি নারী হন তাহলে তো কথাই নেই। সঙ্গে সঙ্গে ঢোলে বাড়ি দিয়ে উঠছে অসংখ্য পুরুষ। মন্তব্যের জোয়ারে ভেসে সেই নারী ভাবছেন কাজ একখানা করে ফেলেছি। তিনি জানেন না এই জাতীয় লাগামহীন নারীদেরই ওই জাতীয় পুরুষেরা পছন্দ করেন। 

আবার পারিবারিক কেচ্ছা ঢেলে দিচ্ছেন কেউ কেউ। স্বামী স্ত্রীর বনিবনা হচ্ছে না, মা ছেলে মেয়ের, বউমার সঙ্গে বনিবনা হচেছ না, শ্বশুর শাশুড়ি দজ্জাল, স্বামী ঘরের কাজে সাহায্য করে না, ছেলে সংসারে টাকা দেয় না এমন সব কাহিনি ঢেলে দিচ্ছেন ফেসবুকে। যেন ফেসবুক সবকিছুর সমাধান করে দেবে। যেন ফেসবুক এক পরম ত্রাতা। মাঝখান দিয়ে যে ঘরের কথা বিশ্বশুদ্ধ মানুষ জেনে যাচ্ছে সেদিকে কারো মাথা ব্যথা নেই। 

শিক্ষকরা লেখার সময় ভুলে যাচ্ছেন তার ফ্রেন্ডলিস্টে ছাত্র আছে। ছাত্ররা ভুলে যাচ্ছেন তার লিস্টে আছেন শিক্ষক। রাজনীতিবিদ ভুলে যাচ্ছেন তার পোস্ট পড়ছেন ভোটাররা। 

এ এক চরম অরাজক কান্ড! ফেসবুকে প্রেম পীরিতির কথা বাদই দিলাম কিন্তু এ সব বহুবিধ কাণ্ডজ্ঞানহীন আর অপকর্মে সয়লাব ফেসবুক। যে কোনো খবর পেলেই হলো। যাচাই বাছাই করার দরকার নেই। ঢেলে দিচ্ছে ফেসবুকে। জীবিত মানুষকে মেরে ফেলছে, মরা মানুষ জীবিত হয়ে যাচ্ছে। বিবাহিতজন হয়ে যাচ্ছে অবিবাহিত, অবিবাহিতজন বিবাহিত। তালাক হবার আগেই কোনো কোনো দম্পতির ডিভোর্সের খবর ফেসবুকের কল্যাণে অনেকে জেনে যাচ্ছে। অথচ তাদের ডেভোর্সের কোনো সম্ভাবনাই নেই। 

এই করোনাকালে ফেসবুকে মানে ভিডিও কনফারেন্সি, চ্যাটিং, লাইভ অনুষ্ঠান। সংখ্যায় ঠিক কতজন প্রতিদিন এই অনুষ্ঠান করছেন আমার জানা নেই। এটা সময় কাটাবার একটা ভালো মাধ্যম। কিন্তু কখনো কখনো কোনো কোনো সঞ্চালক, কোনো কোনো বক্তার কথা শুনে হোচট খাচ্ছি। আসলে যে কোনো কাজ করার আগেই প্রিপারেশন দরকার। বিশেষ করে সারা পৃথিবীর মানুষ যখন দেখতে পারে তখন তো প্রস্তুতি অতি আবশ্যক। 

শেষ কথায় আসি । আধুনিক প্রযুক্তির একটি বড় বিষয় সেলফি তোলা। দিনরাত পৃথিবীব্যাপী অসংখ্য সেলফি তোলা হচ্ছে। বেশিরভাগই একক সেলফি। কখনো সঙ্গে দু’চারজন থাকে। এই সেলফিতে সয়লাব ফেসবুক। সেলফি মানে নিজেকে দেখা, বার বার দেখা। আমরা গ্রিক পুরাণের নার্সিসাসের কথা জানি। নার্সিসাস শুধু নিজেকেই ভালবাসতো। নিজের রূপ সম্পর্কে সে ছিল প্রচণ্ড অহংকারী। কোনো রূপসী নারী এমনকি পরীরাও তাকে ভালোবাসতে চাইলে সে ঘৃণাভরে তাদের প্রত্যাখ্যান করত। নিজেকে ভালবাসতে বাসতে একদিন জলাশয়ের পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে তার প্রেমে পড়ে যায়। বুঝতে পারে না ওটা তার নিজেরই প্রতিবিম্ব। সে ওই প্রতিবিম্বকে  ভালবাসতে চায়, জড়িয়ে ধরতে চায়। পারে না। আর ওই জলাশয়ের পাড়ে বসে থাকতে থাকতে একসময় সে মৃত্যুবরণ করে। 

প্রতিটি মানুষ নিজেকে ভালবাসে। নিজেকে যে ভালবাসে না সে অন্যকে ভালোবাসতে পারে না। কিন্তু উৎকট আত্মপ্রেম কাম্য নয়। ফেসবুকে আমরা উৎকট আত্মপ্রেমের প্রকাশ দেখি। ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এই মাধ্যমে মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়ে। একজন থেকে হাজারজনের সাথে পরিচয় হয়। নিয়ম মেনে ফেসবুক ব্যবহারের মাধ্যমে সে পরিচয় শুভ, সৃজনশীল কাজে লাগুক এটাই চাওয়ার।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর