ফেসবুকের অন্ধকার

ঢাকা, রোববার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৬ ১৪২৭,   ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

ফেসবুকের অন্ধকার

 প্রকাশিত: ১৬:১৮ ৪ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৭:৫৮ ৪ মার্চ ২০২০

আফরোজা পারভীন
আফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিভি`তে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

আজকাল খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে যিনি ফেসবুক ব্যবহার করেন না। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে ফেসবুকের ব্যবহারর ব্যাপক। সে ব্যাপকতা আবির্ভাব না হয়ে প্রাদুর্ভাবের পর্যায়ে চলে গেছে। কেন প্রাদুর্ভাব বললাম সেটা পরে বলছি।

বয়স্কজন, যারা ফেসবুক ব্যবহার করতে জানেন না, প্রযুক্তি সম্পর্কে অতটা দক্ষ নন তাদের একটা অংশ হতাশায় ভোগেন ফেসবুক না থাকায়। এমন অনেকের দেখা আমি পেয়েছি। অনেকে নাতি-নাতনিকে দিয়ে একাউন্ট খুলিয়ে নিয়েছেন। নিজে কিছু পোস্ট দিতে পারেন না। তবে লাইক কমেন্ট করতে পারেন। অনেকে শুধু লাইক দিতে পারেন, তাতেই খুশি।

দেশে যখন কম্পিউটার এলো আমরা স্বামী লতিফ তখন দেড়লক্ষ টাকা দিয়ে একটা কম্পিউটার কিনেছিল। লতিফ পদার্থবিদ্যার উজ্জ্বল ছাত্র ছিল। বিজ্ঞানী হবার স্বপ্ন দেখত। পাশ্চাত্যে জন্মালে বিজ্ঞানী হতো এ বিশ্বাস আমার বদ্ধমূল। প্রযুক্তি ওর হাতে অনায়াসে খেলা করত। যুগের তুলনায় একশ বছর অগ্রবর্তী মানুষ ছিল। ও কম্পিউটার কিনে আনলে আমি খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। বাসার সোফাসেট তখন ভেঙে পড়ছে, কোনো সৌখিন দ্রব্য নেই। এসময় ও নিয়ে এল কম্পিউটার। এ কম্পিউটার দিয়ে আমি কী করব! লতিফ হেসে বলেছিল, এটাই তোমার সর্বক্ষণের সঙ্গী হবে। তাই হয়েছে।

তারপর কত কম্পিউটার এলো, গেলো। ল্যাপটপ এলো, পামটপ এলো। আমি নিজে টোকাতে টোকাতে কম্পোজ করতে শিখলাম। আমার লেখা একশ ষোলটা বইয়ের মধ্যে অল্প কিছু বই ছাড়া অধিকাংশই নিজে কম্পোজ করা। কিন্তু ওই কম্পোজটুকুই। কম্পিউটারের বহুবিধ ব্যবহারের কোনোটাই আমি জানতাম না। লতিফ হেসে ছেলে মেয়েকে বলত, ‘তোমাদের মা একজন ভালো টাইপিস্ট।’

আমি রেগে যেতাম। কিন্তু কথা সত্য ছিল। এইত বছর সাতেক আগেও ফাইল খুলতে পারতাম না, মেল করতে পারতাম না। ছেলে-মেয়ে বার বার ফাইল খোলা শেখাতো আর আমি ভুলে যেতাম। মেইল করার জন্য কখন ছেলে মেয়ে আসবে তাদের অপেক্ষায় বসে থাকতাম। কখনো কখনো অফিসের কর্মচারীদের সাহায্য নিতাম। নিজে নিজে করতে গিয়ে কত সময় কত লেখা যে হারিয়ে ফেলেছি তার শেষ নেই। যখন কাউকে পেতাম না, কান্না পেত। কাঁদতামও।

আজ আমি লেখা হারিয়ে গেলে ড্রাইভে না খুঁজে মেল থেকে নামাই। আমার ছেলে মেয়ে হেসে বলে, আব্বু থাকলে মজা করে বলত, ‘হায় হায় আমাদের কী হবে। তোমাদের মা মেল থেকে লেখা নামাচ্ছে।’

এখনো আমি বহু কিছু পারি না। তবে যেটুকু পারি তাতে চলে যায়। আর না পারলে ছেলে মেয়ের সাহায্য নিই। সাহায্য করার জন্য লতিফকে আর পাই না। সে এখন অনন্তলোকে প্রযুক্তি নিয়ে খেলা করছে।

এদেশে ফেসবুকের চল হবার পর প্রথম যে কজন ফেইসবুক খুলেছিল তার একজন লতিফ। আমার পক্ষে ফেসবুক একাউন্ট করা অসম্ভব ছিল। কিন্তু খুব ইচ্ছে করত। আমি যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক; আমার পিএ আনোয়ার একটা একাউন্ট খুলে দিয়েছিল। সেটা ঠিকমতো চালাতে পারতাম না।

২০১৪ সালে চলে গেল লতিফ। নিঃসঙ্গতার কঠিন দিনরাতে ফেসবুক আমার আশ্রয় হয়ে উঠল। টিপতে টিপতে তখন কিছুটা ব্যবহার করতে শিখেছি। সে সময়টাতে এই সামাজিক মাধ্যম অনেক স্বচ্ছ ছিল। যারা এখানে ছিলেন তাদের অধিকাংশই রুচিশীল শিক্ষিত মানুষ। তাদের সঙ্গে মতামত আদান-প্রদান করে ভালো লাগতো। সমৃদ্ধ হতাম।

শুরুতে কেন প্রাদুর্ভাব বলেছিলাম সেটা বলি। দিন যত গেল ফেক আইডি বাড়তে থাকলো। ছেলেরা মেয়ে হলো, মেয়েরা ছেলে। অশ্লীল ভিডিওতে সয়লাব হয়ে গেল। তারপর এটা হয়ে গেল সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে গেল পুরোপুরি বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যম।

ফেসবুক নিয়ে আমার প্রথম তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাটা বলি। কলকাতার এক লেখক বন্ধুর কাছ থেকে আমার টাইম লইনে একটা অশ্লীল ছবি এলো। আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। ওই বন্ধুকে আমি ভীষণ পছন্দ করতাম, যদিও কখনো তাকে দেখিনি। তার লেখা আমার খুব ভালো লাগতো। তার কাছ থেকে এই অশ্লীল ছবি পেয়ে আমার কান্ডজ্ঞান তিরোহিত হলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে কঠোর মন্তব্য করলাম। ভদ্রলোক জানালেন বটে তার একাউন্ট হ্যাক হয়েছে। কিন্তু আমার ওই মন্তব্য মেনে নিতে পারলেন না, সরি বলার পরও। কারণ আমিও যেমন তার ভক্ত ছিলাম তিনিও আমার ভক্ত ছিলেন। কোনোরকম বিচার বিবেচনা না করে আমার এই মন্তব্য তাকে ভীষণ আহত করল। সে কথা জানিয়ে দিয়ে আমাকে বন্ধু তালিকা থেকে বিদায় করে দিলেন। তবে বিদায়ের আগে পায়রা উড়িয়ে গেলেন। ইঙ্গিতটা এমন যে, ফেসবুক থেকে বিদায় হলে তবে বন্ধু রয়ে গেলে। ব্যথাটা আমার রয়ে গেছে। ভুলতে পারব বলে মনে হয় না।

ফেসবুক নিয়ে দ্বিতীয় তিক্ত অভিজ্ঞতাটা বলি- আমার একজন খুব প্রিয় বন্ধু আছে। আব্দুল মতিন। বিচিত্রায় কাজ করতেন, বাফার নৃত্য শিল্পী। একটা নাচ-গানের একাডেমি চালান। একদিন ফেসবুকে আছি এমন সময় মেসেজ এলো, ‘খুব বিপদে পড়েছি। ৫০০০ টাকা পাঠান। বিকেলে দিয়ে দেব।’ আমি বললাম, ‘বাসায় কেউ নেই। বিকেলে পাঠাই।’ উনি লিখলেন, ‘বিকেল হলে হবে না, এখনই দরকার।’ কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন। আমি বহু বছর ধরে মতিন ভাইকে চিনি।

তার আত্মসম্মানবোধ প্রবল। এমন কাকুতি মিনতি করার লোক তিনি নন। একথাটা আমার বার বার মনে হচ্ছিল। কিন্তু লজ্জায় ফোন করতে পারছিলাম না যদি উনি লজ্জা পান; ভেবে। আমি বহু কষ্টে একজনকে ডেকে বিকাশে টাকা পাঠিয়ে ওনাকে ফোনে বললাম, টাকা পাঠিয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে উনি বললেন, ‘করেছেন কী, আমার একাউন্ট হ্যাক হয়েছে। আমার নাম করে আরো অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। আমিতো আপনাকে মেসেজও করেছি।’ এ ঘটনা পুলিশকে জানালে পুলিশের অফিসার হেসে বলল, ‘জিডি করে লাভ হবে না। কদিন আগে একইভাবে আমার কাছ থেকেও টাকা নিয়ে গেছে।’ বুঝলাম, ‘বাপেরও বাপ আছে।’ এর নাম প্রযুক্তি, এর নাম ফেইসবুক।

এরপর কত অভিজ্ঞতা যে হলো। এইত আজ সকালে আমার এক পুরোনো ড্রাইভারকে ব্লক করলাম। না করে উপায় ছিল না। আমি আমার জেনা-জানা যে কেউ রিকোয়েস্ট পাঠালেই একসেপ্ট করি। সে আমার ড্রাইভার হোক, পিয়ন হোক আর দারোয়ান হোক। এই ড্রাইভার রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল দিন দশেক আগে। আজ সকালে দেখি অশ্লীল ভিডিও এসেছে ম্যাসেঞ্জারে। সে কি নিজে পাঠিয়েছে না কোনোভাবে এসেছে আমি জানি না। কিন্তু যে ভিডিও এসেছে এরপর আর ওকে ফ্রেন্ডলিস্টে রাখা সম্ভব না। ব্লক করে খারাপও লাগছে। লতিফ যখন চিরদিনের মতো আমাদের ছেড়ে চলে যায় তখন এই ড্রাইভারটা ছিল। অনেক কর্তব্য করেছিল।

অফুরান ভালো দিক আছে ফেসবুকের। ছেলেবেলার বন্ধুদের খুঁজে পেয়েছি এই ফেসবুকের মাধ্যমে। আমার শ্রীলঙ্কার বন্ধু ড. অনীল জয়সিংহে যে এখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডাক্তার হয়েছে, অনেকগুলো অন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে নিয়েছে সেও জেনেছি এই ফেসবুকের মাধ্যমে।

নুসরাত হত্যা, রিফাত হত্যা, পাপিয়া কাণ্ড, ক্যাসিনো কাণ্ড, বালিশ কাণ্ড এমন অসংখ্য কাণ্ড এই সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা জেনেছি। রথি-মহারথীদের কুকীর্তি এই ফেসবুক আমাদের সামনে এনে দিয়েছে। প্রতিকার হয়ত হয়নি, কিন্তু প্রতিবাদ হয়েছে। জনগণ তাদের মতামত প্রকাশ করতে পেরেছে। ফুলের মতো পবিত্র বলে যাদের জানতাম তাদের চরিত্রের পঙ্কিল দিকগুলো ফেসবুকের কল্যাণেই জেনেছি আমরা। এমন অনেক ভালো দিক অছে। শিক্ষণীয় বহু কিছু আছে।

কিন্তু খারাপের পাল্লাই যেন ভারি। সবার আগে বলতে চাই আসক্তির কথা। ফেনসিডিলের চেয়েও ভয়াবহ এ আসক্তি। আমার এক আত্মীয় একটা কলেজের অধ্যাপক। সে সারাক্ষণ পড়ে থাকে ইউটিউব আর ফেসবুক নিয়ে। তার বাড়িতে গেলে বেশিরভাগ সময় টেলিভিশনের রিমোট খুঁজে পাওয়া যায় না। আর ভাগ্য ভালো হলে রিমোট যদিওবা পাওয়া যায় সে রিমোটে ব্যাটারি থাকে না। কারণ সে টিভি দেখে না, তার বাড়ির কেউ দেখে না। সবাই সারাক্ষণ মোবাইল টিপছে। ঘরে ঘরে একই অবস্থা। হয় ফেসবুক, না হয় ইউটিউব, না হয় হোয়াটসআপ অথবা ইমো। আগে তবু টেলিফোনে গলার স্বর শোনা যেত। এখন ম্যাসেঞ্জার চ্যাট চালু হওয়ায় সে স্বরটাও আমরা হারিয়েছি।

শেষ কথা বলব। ফেইসবুক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। সেই মাধ্যমটিকে সুস্থ স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দ রুচিশীল রাখা ব্যবহারকারীদের দায়িত্ব। প্রচার প্রপাগান্ডা করতে হবে শালীনতার সঙ্গে। সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছড়ানো মোটেও কাম্য নয়। কাম্য নয় ব্যবসায়ের নামে অনলাইনে খারাপ জিনিস পাঠিয়ে দেয়া। মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে বা মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে ফেইসবুকে পোস্ট দেয়া যেমন উচিত নয়, তেমন উচিত নয় খালি গায়ের ছবি পোস্ট দেয়া। হাজার পদের খাবার-দাবারের ছবি দেয়াও উচিত নয়। মনে রাখা দরকার ফেসবুক যারা করেন তাদের অনেকেরই অতশত খাবার খাওয়ার সামর্থ্য নেই। আর বেশি পদের খাবার খাওয়াতে কোনো কৃতিত্বও নেই। ফেসবুককে সুন্দর রাখার ক্ষেত্রে লেখকদের দায়িত্ব অনেক বেশি। তারা সমাজের সচেতন অংশ। এবারের বইমেলায় তারা যেভাবে নিজেদের বইয়ের প্রচার করলেন তা রীতিমতো লজ্জার। কেউ বললেন, মেলা কাঁপিয়েছে তার বই, কেউ বললেন পাঠকরা গিয়ে তার বই না পেয়ে দলে দলে ফিরে আসছে। এতে আর যাইই হোক আত্মসম্মান থাকে না।

ফেসবুক যারা ব্যবহার করছেন তাদের বলি, এই জায়গাটিকে পরিচ্ছন্ন রাখুন। যাকে যা বলা যায়, যার সাথে যা আচরণ করা যায় সেভাবেই বলুন, সেভাবেই আচরণ করুন। নিজের পরিচয়ে একাউন্ট খুলুন। যোগাযোগ করুন সৎভাবে, রুচিশীলতার সঙ্গে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর