ফায়ারফাইটার সোহেল রানা:  বীরকে সালাম 

.ঢাকা, শুক্রবার   ২৬ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ১২ ১৪২৬,   ২০ শা'বান ১৪৪০

ফায়ারফাইটার সোহেল রানা:  বীরকে সালাম 

 প্রকাশিত: ১৬:১৭ ১২ এপ্রিল ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

সিংগাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ফায়ারম্যান সোহেল রানা। তার বীরত্ব নিয়ে অনেক প্রশংসাবাক্য উচ্চারিত হচ্ছে। বিশিষ্টজনেরা শোক প্রকাশ করেছেন তার মৃত্যুতে। হয়ত তার পরিবারকে কিছু আর্থিক অনুদানও দেয়া হবে। তার বীরত্বের জন্য কোন খেতাবও দেয়া হতে পারে।  

কিন্তু তাতে সোহেল রানার কী আসে যায়? প্রথমত, সে তো এসবের কিছুই জানতে পারল না। দ্বিতীয়ত, তার পরিবারেরই বা কী আসে যায়।  সে পরিবারের প্রথম সন্তান। বাবা-মা অসুস্থ। তিন ভাইবোন । সবার লেখা পড়া, সংসারের দায়িত্ব, বাবা মায়ের চিকিৎসার ভার সবই তার উপরে ছিল। তার অনেক স্বপন ছিল, স্বপ্ন ছিল বাবা মায়ের। ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছিল, পুরোনো ঘর ভেঙে নতুন ঘর বানাবার স্বপ্ন ছিল। ভাই- বোনের স্বপ্ন ছিল, তারা লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হবে। নিজেদের পায়ে দাঁড়াবে। আর এ স্বপ্নের উৎসমুখ ছিলো সোহেল রানা। এফ আর টাওয়ারের সর্বগ্রাসী আগুন তাদের সব স্বপ্ন ধূলিস্মাৎ করে দিলো। 

প্রাণশক্তির এমন অপচয় দেখতে আমার ভালো লাগে না। বলতে পারেন, অপচয় কোথায়? অগ্নিদগ্ধ মানুষের উদ্ধারকাজে লিপ্ত ছিল সে। অনেকগুলো প্রাণ বাঁচিয়েছে বা বাঁচাতে সাহায্য করেছে। তাছাড়া এটা তার কাজ, তার ডিউটি। মানছি, সে অনেকগুলো প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করেছে । কিন্তু তারও তো একটা প্রাণ। ফায়ারম্যান বলেই কি তাঁর বাঁচার অধিকার নেই?  এদেশে কজন মানুষ কটা ডিউটি পালন করে থাকে? সৎভাবে ডিউটি পালন  করলে তো রাজউকের ১৭ তলার অনুমোদন পাওয়া বিল্ডিং ২৩ তলা হতো না। সেই অননুমোদিত অংশে পানি গ্যাস বিদ্যুৎ সংযোগ হতো না। রাজউক আর সিটি কর্পোরেশনের নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় জায়গা ছেড়ে বিল্ডিং হলে বনানীর ওই বড়লোকদের এলাকার চেহারা বস্তির মতো হতো না। অপরিসর রাস্তার কোন্দরে কোন্দরে ফুটপাতের ব্যবসা জমে উঠত না। আর সবার বড় কথা, জরুরী বেরিয়ে আসার সিঁড়িগুলো বন্ধ থাকতো না। সিঁড়িগুলো কেন বন্ধ ছিল, কে বন্ধ রেখেছিল, কার নির্দেশে বন্ধ ছিল, বন্ধ সিঁড়ির রহস্য কি এসব কী উদ্ঘাটনের চেষ্টা হয়েছে?  অনেকগুলো দিন পেরিয়ে গেছে,  আগুন কেন লাগল সে কারণটা আজও জানা গেল না। এটা মোটেও আশার কথা নয়। 

এক একবার এমন এক একটা বড়  ধ্বস নামে আর আমরা নড়ে চড়ে বসি। রানা প্লাজা ধ্বসে যাওয়ায় আমরা নড়ে বসি। ভাবি, এবার একটা বড়  চেঞ্জ আসবে। এধরনের সব বিল্ডিং ভেঙে ফেলা হবে, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে, চকবাজারে  আগুন লাগলে ভাবি, আর এসব ঘটবে না । এবার একটা পাকাপোক্ত ব্যবস্থা হবে। 

কিন্তু আমাদের এই তৎপরতা মাত্র অল্প কিছুদিনই বেঁচে থাকে। তারপর নতুন ঘটনার অন্তরালে হারিয়ে যায়। বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুনের ঘটনায় ২৭ জন মানষের মৃত্যু আমাকে বিস্মিত করেছে । পরিস্থিতি যা ছিল, তাতে শত শত লোক মারা যাবার কথা। যে যাইই বলুক, খুঁত বের করার চেষ্টাই করুক, একথা না বললেই নয় যে,  ফায়ার সার্ভিস প্রশংসনীয় কাজ করেছে । আশ পাশের  কিছু মানুষ জান দিয়ে লড়েছে আগুন থেকে আক্রান্তদের রক্ষা করার জন্য। পাঁচিল বেয়ে উঠে উঠে মানুষ নামিয়ে এনেছে। তাদের নাম সেভাবে পত্র পত্রিকায় আসেনি, যা আসা উচিৎ ছিল। পত্রিকা আর ফেসবুকে তাদের কথা এসেছে যারা ছবি আর সেলফি তোলায় ব্যস্ত ছিল।  এসব থাকে, থাকবেই। এসব এড়িয়ে মানুষের কাজের দিকটাতে আমাদের দৃষ্টি দেয়া দরকার। সৎ কাজকে উৎসাহিত করা দরকার। 

এফ আর টাওয়ার দুর্ঘটনায় কিশোর নাইমকে নিয়েও অনেক নাটকীয়তার জন্ম হয়েছে। নাইম একটা ফুটো পাইপের ওপর বসে ছিল যাতে পানি বেরিয়ে না যায়। হয়ত কেউ তাকে বসতে বলেছিল বা সে নিজেই বসেছিল। সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, তার যেটুকু সাধ্য সে করেছিল। আটকে পড়া মানুষগুলোর জন্য তার উদ্বেগ ছিল, উৎকন্ঠা ছিল। তার এই বসে থাকার ছবিটা ভাইরাল হয়। আনন্দবাজার পত্রিকা তাকে নিয়ে কভার স্টোরি করে। প্রশংসার জোয়ারে ভাসতে থাকে নাইম। আমেরিকা প্রবাসী এক ভদ্রলোক তার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেয়া আর তাকে ৫০০০ ডলার প্রদানের ঘোষণা দেন। আর তারপরই দৃশ্যপট বদলে যায়। আমরা দেখি নাইমকে টেলিভিশনের পর্দায় সাক্ষাৎকার দিতে।  সে বলে, এ টাকা পেলে সে এতিমখানায় দেবে। কারণ খালেদা জিয়া এতিমের টাকা মেরেছে। পরে অবশ্য  অন্য এক সাক্ষাৎকারে সে জানিয়েছে,  এ কথা তাকে কেউ শিখিয়ে দিয়েছিল। তার মা বলেছে, তাকে একজন ২০০০ টাকা দিয়ে একথা বলিয়েছে। শিখিয়ে দিয়েছিল এটা নিশ্চিত। নইলে ওই কিশোরের এসব জানার কথা না, বোঝারও কথা না। কথা হতে পারে সে কেন ২০০০ টাকা নিয়ে এ কথা বলল? তাহলে সেতো লোভী। তার মা-ও জানতো। তাহলে সেও লোভী। গরীব মানুষ কড়কড়ে দুহাজার টাকা হাতে পেয়েছে,  কী হবে না হবে চিন্তা না করেই বলে দিয়েছে। লোভ করাটা ঠিক হয়নি নিশ্চয়ই,  কিন্তু চিন্তা করলে বোঝা যাবে ওই পরিবেশে থাকলে এতে খুব একটা অস্বাভাবিকতাও নেই। একটা ছোট্ট গরীব ছেলেকে নিয়ে কেন এই রাজনীতি। ও ৫০০০ ডলার পেলে কার কী ক্ষতি। কারো ব্যক্তিগত লাভের জন্য এটা করে থাকলে সেতো ন্যাক্কারজনক, রীতিমতো অপরাধ। 

এসব কথা বলবে কে? নাইমের মতো অসংখ্য শিশু কিশোর বস্তিতে থাকে। কখনও খায় , কখনও খাবার পায় না। লেখাপড়ার সুযোগ নেই।  বেশিরভাগ শিশু কিশোর আস্তে আস্তে অপরাধ জগতে ঢুকে যায়। ওরা কখন জন্মায়, বড় হয়, বেড়ে ওঠে, মারা যায় কেউ খবর রাখে না। 

সোহেল রানা মই দিয়ে উঠে মানুষ  উদ্ধারের কাজ করছিল । একসময় তার পা মইয়ে আটকে যায়। সে মই থেকে পড়েও যায়। পাসহ শরীরের অনেকগুলো অংশ ভেঙে যায়। পেটেও প্রচন্ড আঘাত পায়। এখানকার চিকিৎসায় উন্নতি না হওয়ায় মাননীয় প্রধানন্ত্রীর নির্দেশে তাকে সিংগাপুরে পাঠানো হয়। কিন্তু সিংগাপুরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরাও তাঁকে বাঁচাতে পারল না।

আমাদের দেশে যারা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত তারা কতটা কম ঝুঁকিতে দায়িত্ব পালন করতে পারে সে বিষয়টা গভীরভাবে ভেবে  দেখা প্রয়োজন। আমি বিশেষভাবে বলতে চাই,  ফায়ার সার্ভিস আর ফরেস্টের বনপ্রহরীদের কথা। আগুন  আর জীবজন্তুর সাথে লড়াই করা কঠিন। তাই তাদের চাকুরিক্ষেত্রে ঝুঁকিভাতাসহ সুযোগ সুবিধা যেমন বাড়ানো দরকার, তেমনি দেখা দরকার তাদের জীবনের নিরাপত্তার দিকটাও। 

ফায়ারম্যান সোহেল রানাকে সালাম জানাই। সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে ভুলে যাবেন না। আশপাশের যে মানুষেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধারকাজ করেছে তাদের কথাও দেশবাসীকে জানান। আর বনানীর আগুন লাগাকে  কেন্দ্র করে গঠিত তদন্ত কমিটিকে দ্রæত রিপোর্ট দিতে বলুন । একশন নিন। দোষিদের শাস্তি দিন। আমাদের দেশে যে কোন বড় অপরাধ বা দুর্ঘটনার পেছনে রাঘব বোয়ালরা থাকে। ধরা পড়লে জাল কেটে  বেরিয়ে যাবার কৌশল তারা জানে। তাই সাজা কমই হয়, হয়ও না। এবার যাতে জাল না কাটতে পারে সেটা দেখুন। কঠিন শাস্তি দিন।  তাতে অন্তত যারা জীবন দিলো তাদের পরিবারগুলি কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর