ফারহানা রহমানের কবিতা

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

ফারহানা রহমানের কবিতা

কবিতা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:২২ ২ মে ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নেরুদার সাথে 

পাহাড়ের সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম ফেনিল ঢেউয়ে আর    
চিলের সমুদ্রে।

মত্ত জলরাশির খেলায় পাখিদের ভিড়     
উত্তাল সফেদ জলরাশি আর তার সঙ্গে লক্ষকোটি প্রাণী 
ভেসে ওঠে, আবার অতলে মিলিয়েও যায়। ওখানেই ইস্লা 
নেগ্রা, নেরুদার বাড়ি। ইস্লা নিগ্রা অবস্থানকালে নেরুদার    
একদিন ব্রাজিলের রাজনীতিবিদ, সামরিক বীরপুরুষ 
এবং কমিউনিস্ট নেতা লুই কারলোস প্রেস্তেশের সাথে  
সাক্ষাতের জন্য নিমন্ত্রণ আসে।

পেঁয়াজের খোসার মতোই     
স্বচ্ছ শাদা, অবিশ্বাস্য প্রাণপ্রাচুর্যের অধিকারী একজন  
মানুষ প্রেস্তেশ। তিনি এক মহিমান্বিত জার্মান নারীকে স্ত্রী 
হিসেবে মর্যাদা দেন। কারাবাসে অবস্থানকালে প্রেস্তেশের  
জার্মান পত্নীকে নাৎসি বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়। তাঁকে 
নাৎসিরা শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখে। পরে এক শহীদখানায়  
স্থানান্তর করে। কিছুদিন পরে নাৎসিদের কারাগারে তিনি 
একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। যাকে প্রেস্তেশের বীরমাতা 
দোনা লেওকাদিয়া দুঃখকষ্ট, নির্যাতন সহ্য করে বের করে  
এনে প্রেস্তেশের হাতে তুলে দেন। এরপর দশ বছরের 
যন্ত্রণাদায়ক কারাবাস শেষে একদিন প্রেস্তেশের মুক্তি 
হয়। বাবার হাতটি শক্ত করে ধরে রাখে শিশুটির হাত 
 অথচ জার্মান বন্দীশালায় কন্যার জন্মদানের পরেই 
 নাৎসিরা প্রেস্তেশের স্ত্রীর মাথা, দেহ থেকে ছিন্ন করে ফেলে...

***

মেহিকোর পথে 

মেহিকোর রুক্ষ কঠিন রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন মহামতি এলুয়ার। একদিন এই রাস্তাতেই তিনি তার প্রিয়তমা দমিনিক  লেমোর্টকে খুঁজে পান। দমিনিক ছিলেন এমনি এক প্রাণোচ্ছল নদী, যার স্বচ্ছ জ্বলে লুকিয়ে    থাকতো অমূল্য ঐশ্বর্য। তিনি যেন একখণ্ড হীরে, মহামূল্যবান স্পর্শ। স্ত্রীর মৃত্যু তাকে নিঃসঙ্গ, বিষণ্ণ করে তোলে। ফ্রান্সের যে মাটি তার মাথায় পরিয়েছিল শিরোমাল্য, পল এলুয়ার তাকে ছেড়ে চলে যান মেহিকোতে। যদিও পলের সুদীর্ঘ দেহটি শুধু জল আর পাথর দিয়েই তৈরি। যাকে জড়িয়ে ধরেই বেড়ে ওঠে সুপ্রাচীন দ্রাক্ষলতা। ফোটে ফুল, পাখিরা সেখানে বাঁধে নীড়। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে ভেসে আসে স্বচ্ছ সংগীত, সুরের বন্যা। তার কবিতার সুর মিশে আছে মধ্যাহ্নের সূর্যে আর স্বর্গের প্রেমেতে। অথচ ফ্রান্সের সর্বনাশা দিনটিতে তিনি তার হৃদপিণ্ড একটানে বের করেই মাটিতে পুতে দেন।     
আর তারপর সেখানে এমনি এক তীক্ষ্ণ অগ্নিময় আভা ছড়িয়ে পড়ে যে তার দাউ দাউ আগুনে নিষ্পত্তি হয়েছিলো ফ্রান্সের সেদিনকার সেই সর্বনাশা সংগ্রাম।  
***

রাফায়েল আলবের্তি 

একদিন তুমি বলেছিলে, কবিতা তো শান্তির জন্যই
আটা থেকে তৈরি হয় রুটি আর শান্তি থেকে জন্ম হয় কবিতার

তাই যুদ্ধ ও আগুন লাগানোর দল,
দাঙ্গাবাজ আর নেকড়ের দল
কবিকে পুড়িয়ে মারার জন্যই
পৃথিবীর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মরে।

যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েই
বায়রন প্রাণ দিয়েছিল গ্রিসে
তরবারিবিদ্ধ পুশকিনের নিষ্প্রাণ দেহটি পড়েছিল খোলা উদ্যানের মধ্যে

ফ্যাসিস্টরা খুন করে মহত্তম কবি ফেদেরিকো লোরকাকে,
এসবের মধ্যেও তো তুমি বেঁচে ছিলে আলবের্তি
যদিও তোমাকে বহুবার বহুভাবে মারার চক্রান্ত করা হয়েছিল
গ্রানাদায়, বাদাহোসে মৃত্যুফাঁদ পাতা হয়েছিল
এমনকি তোমার গ্রামের বাড়িতেও হানা দিয়েছিল নেকড়ের দল

মাদ্রিদের রাস্তায় চলতে চলতেই
জনতার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হারিয়ে গেছ তুমি,
জন্মেছিলে সমুদ্রের সংগীতের মধ্যে
তাই তো তোমার কবিতায় ছিল
শীতকালে ফোটা লাল গোলাপের মতোই মাধুর্য

সেই গোলাপের উজ্জ্বল্যের আভা
ছড়িয়ে পড়তো এস্পানিয়ার রাস্তায়
যেখানে চলতো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ
তুমি বলেছিলে, বিড়ালের জীবনের মতোই
কঠিন প্রাণপ্রাচুর্য সম্পূর্ণ কবিতার মৃত্যু নেই
কবিতাকে হয়রানি করা যায়

টেনে-হিঁচড়ে, থুতু ছিটিয়ে মশকরা করা যায়
জেলে ভরে রাখা যায়, হয়তো বা নির্বাসনেও দেওয়া যায়
গুলি চালিয়ে জখম করা যায়, তবু কবিতা কখনো মরে না।

বরং সে তার সৌন্দর্যকে দিকদিগন্তে ছড়িয়ে দিয়েই
নবান্নের হাসি নিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএস