Exim Bank Ltd.
ঢাকা, মঙ্গলবার ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৪ পৌষ ১৪২৫

ফরাসি বিপ্লব

মেহেদী হাসান শান্তডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
ফরাসি বিপ্লব
ছবি: সংগৃহীত

নাগরিকদের কি কি অধিকার থাকা উচিত? নাগরিকদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব কার? কোন ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়? জনগণের সকল চাহিদা পূরণের জন্য কি রকম রাজনৈতিকব্যবস্থা চাই? আজ থেকে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় আগে এই প্রশ্নগুলোই ফরাসি জাতিকে নাড়িয়ে দেয়। আর তখনই ফরাসি বিপ্লবের সূচনা।

অষ্টাদশ শতকের শেষ লগ্নে সমগ্র ইউরোপ এক বড় ধরনের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। এই বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনকে আখ্যায়িত করা হয় 'এনলাইটমেন্ট' নামে। মুক্তবুদ্ধির সেই বিপ্লবের কান্ডারি ছিলেন তখনকার ইউরোপের শিল্পী ও দার্শনিকরা। তারা যুগ যুগ ধরে প্রচলিত রীতি-নীতি ও ধর্মীয় গোঁড়ামির উপরে উঠে যুক্তিবাদ ও মানবপ্রেমের প্রচার করতেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জাগরণ এ বিপ্লবে অন্যতম ভূমিকা রাখে। ওই সময়টাতে ইউরোপে ছাপাখানার প্রসার ঘটে। প্রগতিশীলদের চিন্তাভাবনা ও ধ্যান-ধারণা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে বেশ সহজে মধ্যবিত্তদের কাছে পৌঁছে যায় এবং তাদেরকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক সচেতন করে তোলে। ইউরোপবাসী আরো দেখতে পায়, বিপ্লবের মাধ্যমে কিভাবে মার্কিনরা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের নাগপাশ ছিন্ন করে এক স্বাধীন প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।

অন্যদিকে, ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ও সমৃদ্ধশালী দেশ ফ্রান্সে তখনো চলছে প্রাচীনপন্থী এক শাসনব্যবস্থা। এই শাসনতন্ত্রে নাগরিকদের তিনটি ভাগে ভাগ করা হয় এবং সে অনুযায়ী তাদের অধিকার ও সুযোগ সুবিধা দেয়া হতো। প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগে ছিলেন যথাক্রমে ক্যাথলিক ধর্মগুরু এবং অভিজাত শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ। রাজা ষোড়শ লুই এর ছত্র-ছায়ায় থেকে তারা শাশ্বত অধিকার এবং বিশেষ সুযোগ-সুবিধা লাভ করতেন। তৃতীয় ভাগে ছিলেন মধ্যবিত্ত বনিক এবং কারিগর সম্প্রদায়ের লোকেরা, সেই সঙ্গে ছিলেন তখনকার ফ্রান্সের প্রায় ২০ লাখ কৃষক; যারা বিশাল ফরাসি জাতির খাদ্য ও অন্যান্য চাহিদার জোগান দিতেন। তবে তাদের কোনো ক্ষমতাই ছিল না।

শুধুমাত্র তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকদেরই কর দিতে হতো এবং রাজা ছাড়াও প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ বা শ্রেণীর নাগরিকরা খেটে খাওয়া মানুষের দেয়া করে ভাগ বসাতেন। ফসল মন্দার বছরগুলোতে কর পরিশোধ করে দরিদ্র কৃষকদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। কিন্তু তাতে রাজা ও তার সহচর ধর্ম প্রচারক এবং অভিজাত শ্রেণীর কি আসে যায়! দুর্ভিক্ষের সময়েও সম্পদের পাহাড়ে চড়ে তারা বিলাসবহুল জীবন যাপন করতেন। কিন্তু মার্কিন বিপ্লবে পৃষ্ঠপোষকতা করার ফলে এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে চলমান দীর্ঘ দিনের যুদ্ধ পরিচালনার খরচ যোগাতে গিয়ে ফ্রান্স তখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। ভোগবিলাসে মত্ত শাসক শ্রেণী এ ব্যাপারে ছিল একেবারেই উদাসীন। পরিবর্তন তখন হয়ে ওঠে সময়ের প্রয়োজন।

অর্থনীতির ধস থামাতে রাজা লুই এই পর্যায়ে অর্থমন্ত্রী হিসেবে জাক নেকারকে নিযুক্ত করলেন। নেকার তখন বিদ্যমান কর ব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নিলেন এবং সরকারের সমুদয় আয় ব্যয়ের হিসাব জনগণের সামনে অবমুক্ত করলেন। এসব কাজ তাকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দিলো। কিন্তু রাজার সুবিধাবাদী উপদেষ্টারা অর্থমন্ত্রীর এসব পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে বসে। সমস্যা সমাধানে বদ্ধপরিকর রাজা তখন স্টেট জেনারেলদের একটি সভার আহ্বান করলেন। ১৭৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফ্রান্সে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য একটি অ্যাসেম্বলি গঠন করে তিন শ্রেণীরই প্রতিনিধিদের মত নেয়ার জন্য ডাকা হল। যদিও তৃতীয় এস্টেটের সদস্য সংখ্যা ছিল ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার ৯৮ শতা়ংশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠি থেকে মাত্র একজনকেই অ্যাসেম্বলিতে রাখা হল।

অনুমেয়ভাবেই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রতিনিধি অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা বহাল রাখার পক্ষে মত দিলেন। জনগণ যখন বুঝতে পারল তাদের প্রতি বৈষম্যের ইতি ঘটার কোনো আভাস পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তারা নিজেরাই একটি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি গঠন করলো, ফ্রান্সের জন্য সম অধিকারের ভিত্তিতে নতুন একটি সংবিধান রচনার ঘোষণা দিলো। রাজা লুই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রতিনিধিদেরকে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সঙ্গে কথা বলার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তার আগেই তিনি তার জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী জাক নেকারকে পদচ্যুত করলেন। রাজার এই হঠকারী সিদ্ধান্ত আক্রোশের জন্ম দিলো। হাজার হাজার মানুষ প্যারিসের রাস্তায় নেমে এলেন। ফরাসি সেনাবাহিনীর অনেক সৈনিক তাদের সমর্থন দিলেন। সবাই একত্র হয়ে তারা বাস্তিল দুর্গ আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন।

উল্লেখ্য বাস্তিল দুর্গ ছিল ফরাসি রাজপরিবারের শৌর্যবীর্যের প্রতীক এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে পূর্ণ এক বিশাল অস্ত্রাগার। বিপ্লব শুরু হয়ে গেল পুরোদমে। সারাদেশে তা ছড়িয়ে পরলো সংক্রমণের মত। সামন্ততন্ত্রের মূলোত্পাটন করা হলো। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ধারণা নিয়ে এলো- রাষ্ট্রের জনগণ হিসাবে কোনো রকম বৈষম্য ব্যতিরেকে সবাই সবার ব্যক্তিগত অধিকার ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে, সরকারের দায়িত্ব হবে শুধুমাত্র রাষ্ট্র ও জনগণকে প্রতিরক্ষা ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান।

সুবিধা করতে না পেরে অভিজাত শ্রেণীর অনেক লোক বিদেশে পালিয়ে গেল। তারা বিদেশী শাসকদের অনুরোধ জানালো ফ্রান্স আক্রমণ এবং সেখানে পূর্বের মত শাসন কায়েম করার জন্য। অন্যদিকে, রাজা লুই সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধান থাকলেও তিনি বিপ্লবের ফলে নতুন সৃষ্ট ফ্রান্সে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। ১৭৯১ সালে বিদেশে পালাতে গিয়ে ধরা পড়লেন। রাজার এই পলায়ন প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষের মন থেকে রাজার প্রতি বিশ্বাস একেবারেই মুছে দিলো। পুরো রাজপরিবারকে কারা বন্দি করা হল এবং রাজা লুই এর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হলো। একতরফা আদালত রাজা ও রানীকে জনসমক্ষে গিলোটিনে শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেন। শুধু রাজা বা রাজপরিবারই নয়, রাজ্যে সুবিধা পাওয়া সকলকেই প্রায় বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আর এর মাধ্যমে হাজার বছর ধরে চলা ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। ফরাসি বিপ্লব পেল তার প্রথম বৃহৎ "সফলতা"র দেখা, যা পরবর্তীতে এগিয়ে চলল আরো বেগবান হয়। জন্ম নেয় "আধুনিক" ফ্রান্স।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
ঈশা আম্বানিকে শ্বশুরের আকাশ ছোঁয়া উপহার!
ঈশা আম্বানিকে শ্বশুরের আকাশ ছোঁয়া উপহার!
ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘পিথাই’
ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘পিথাই’
জনসম্মুখে পুরুষ নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল!
জনসম্মুখে পুরুষ নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল!
বিয়ে হতে না হতেই গর্ভবতী প্রিয়াঙ্কা!
বিয়ে হতে না হতেই গর্ভবতী প্রিয়াঙ্কা!
কাতলায় সাবধান! হুঁশিয়ারি গবেষকদের
কাতলায় সাবধান! হুঁশিয়ারি গবেষকদের
সানি লিওনের সঙ্গে হিরো আলম!
সানি লিওনের সঙ্গে হিরো আলম!
বই পড়ানো ইউসুফ এখন দুদকে!
বই পড়ানো ইউসুফ এখন দুদকে!
৮৩ জিবি পর্ন ভিডিও উদ্ধার, কারাদণ্ড
৮৩ জিবি পর্ন ভিডিও উদ্ধার, কারাদণ্ড
সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদে মুশফিকুর রহিম!
সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদে মুশফিকুর রহিম!
আইপিএলের চূড়ান্ত নিলামে দুই বাংলাদেশি
আইপিএলের চূড়ান্ত নিলামে দুই বাংলাদেশি
গিন্নিকে বিয়ে করলেন কপিল শর্মা
গিন্নিকে বিয়ে করলেন কপিল শর্মা
২০১৯ নিয়ে অন্ধ নারীর ভয়ঙ্কর ভবিষ্যদ্বাণী!
২০১৯ নিয়ে অন্ধ নারীর ভয়ঙ্কর ভবিষ্যদ্বাণী!
২ তারিখ খালেদা জিয়াকে বের করে আনবো
২ তারিখ খালেদা জিয়াকে বের করে আনবো
বিবাহবার্ষিকীতে শাওনের আবেগঘন স্ট্যাটাস
বিবাহবার্ষিকীতে শাওনের আবেগঘন স্ট্যাটাস
যাদের টাকায় নির্বাচন করবেন হিরো আলম
যাদের টাকায় নির্বাচন করবেন হিরো আলম
নতুন মিরজাফর ড. কামাল-কাদের
নতুন মিরজাফর ড. কামাল-কাদের
নৌকার প্রচারণায় একঝাঁক তারকা
নৌকার প্রচারণায় একঝাঁক তারকা
শরীর দেখিয়ে সানিকে টক্করের চ্যালেঞ্জ পাকিস্তানি মডেলের!
শরীর দেখিয়ে সানিকে টক্করের চ্যালেঞ্জ পাকিস্তানি মডেলের!
ক্ষমতায় গেলে বেকার যুবকদের ভাতা দেয়া হবে : হিরো আলম
ক্ষমতায় গেলে বেকার যুবকদের ভাতা দেয়া হবে : হিরো আলম
শিশিরকে আবারো গাড়ি উপহার সাকিবের!
শিশিরকে আবারো গাড়ি উপহার সাকিবের!
শিরোনাম :
আবারো নির্বাচিত হলে প্রায় দেড় কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে আওয়ামী লীগ আবারো নির্বাচিত হলে প্রায় দেড় কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে আওয়ামী লীগ জামায়াতের ২২ নেতার প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে দেয়া আবেদন তিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির আদেশ হাইকোর্টের জামায়াতের ২২ নেতার প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে দেয়া আবেদন তিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির আদেশ হাইকোর্টের ঢাকাসহ সারাদেশে ১০১৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন ঢাকাসহ সারাদেশে ১০১৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন মুম্বাইয়ে হাসপাতালে আগুন; শিশুসহ নিহত ৮, আহত শতাধিক মুম্বাইয়ে হাসপাতালে আগুন; শিশুসহ নিহত ৮, আহত শতাধিক