Alexa প্রাচ্যের ভেনিসের বুকে লাল গীর্জা ও জীবনানন্দ দাশ

ঢাকা, শনিবার   ১৬ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রাহায়ণ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

প্রাচ্যের ভেনিসের বুকে লাল গীর্জা ও জীবনানন্দ দাশ

সাহিদা আফরিন মিথিলা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:২৯ ২৬ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ২৩:৫৯ ২৬ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ঘুরতে কে না ভালোবাসে। ভ্রমণপ্রেমীদের ঘুরতে যাবার জন্য কখনো বাহানা খুঁজতে হয়না, মন চাইলেই তারা বেরিয়ে পড়ে ঘুরতে।

ভেনিস নগরীর নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। কখনো সেখানে ঘুরতে যেতে ইচ্ছে জাগেনি?

চলুন আজ তাহলে ঘুরে আসি ভেনিস নগরী থেকে।

কি ভাবছেন, আমি ইতালির ভেনিস নগরীর কথা বলছি?

আমি আসলে বলছি আমাদের দেশের বিভাগীয় জেলা শহর বরিশাল নগরীর কথা, যাকে প্রাচ্যের ভেনিস বলা হয়।

বরিশালের দর্শনীয় স্থানগুলো সম্পর্কে জানার পর আপনাকে এখানে ঘুরতে আসতেই হবে। এখানকার প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং শত বছরের ঐতিহ্যকে বহন করে বেড়ায় এমন সব স্থাপনা দেখার ইচ্ছা আপনাকে এখানে নিয়ে আসবে।

তাই বলা যায়, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ যথার্থই বলেছিলেন,

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে।’

বরিশালের একটি অন্যতম স্থাপনার নাম ‘অক্সফোর্ড মিশন গীর্জা’। বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের বিভাগীয় শহর বরিশালের বগুড়া রোডে (জীবনানন্দ সড়ক) অবস্থিত এই গীর্জা। গীর্জার মূল ফটকের উপর বড় অক্ষরে লেখা আছে গীর্জার আরেকটি নাম ‘এপিফানী গীর্জা বাংলাদেশ’। নামটিকে গীর্জার কেতাবি নাম বলা যায়। তবে অন্য সব নামকে ছাড়িয়ে ‘লাল গীর্জা’ নামটি পেয়েছে বেশি পরিচিতি।

গীর্জাটি লাল ইট দিয়ে তৈরির ফলে স্থানীয়দের কাছ এটি ‘লাল গীর্জা’ নামে পরিচিত। 

যদিও মূল গীর্জাটি পুরোটা লাল ইট দিয়ে তৈরি তবে এর আঙিনাতে রয়েছে সবুজের সমারোহ।

বিভিন্ন বৈচিত্র এবং শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্যে নির্মিত এই গীর্জাটি উচ্চতার দিক থেকে এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম গীর্জা। এশিয়ার সবচেয়ে বড় ঘন্টাটিও রয়েছে এই গীর্জাতে। প্রতিদিন সাত বার প্রার্থনার পূর্বে বেজে ওঠে ঘন্টাটি।

৩৫ একর জমির উপর গীর্জাটি অবস্থিত। চার পাশে উঁচু দেয়াল দিয়ে বেষ্টিত লাল গীর্জাটি মোট ৪০ টি খিলানের উপর দাঁড়িয়ে আছে। গীর্জার আঙিনার ভিতরে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে মোট ১৩ টি পুকুর। গীর্জার দক্ষিণ দিকে রয়েছে শানবাধানো একটি বড়পুকুর। পুকুরের পানিতে গীর্জা ভবনের ছবির প্রতিবিম্ব দেখা যায়। যা সৃষ্টি করে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য।

আঙিনার ভিতর পুকুরগুলো ছাড়াও রয়েছে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হোস্টেল, ফাদার ও সিস্টারদের আবাসন। এছাড়াও রয়েছে পাঠাগার এবং হাসপাতাল। গীর্জার চারদিকের সীমানা ঘিরে রয়েছে অসংখ্য পাম গাছের সারি। এছাড়াও আরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গাঢ় সবুজ আঙিনা, বৃক্ষশোভিত উদ্যান, মাঠ, ফুল ও ঔষধি বাগান।

 

গীর্জা নির্মাণের ইতিহাস

গীর্জাটি নির্মিত হয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। নদ-নদীর এই শহরটি তখন বিভিন্ন মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সেই আকর্ষণেই তখন ইউরোপীয় বিভিন্ন খ্রিষ্টান মিশনারি এখানে এসে ভিড় জমাতে শুরু করে। তেমন একটি মিশনারি হল অক্সফোর্ড মিশন। তাদের উদ্দ্যোগেই নির্মিত হয় লাল গীর্জাটি।  

গীর্জাটি কিভাবে নির্মাণ করা যায় সেটা নিয়ে ছিল বেশ আলোচনা। গীর্জাটি প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই গীর্জাটির নকশা কেমন হবে সেটা নিয়ে ভাবনাচিন্তায় মগ্ন ছিলেন ফাদার স্ট্রং এবং সিস্টার এডিথ।

অবশেষে গীর্জাটির মূল নকশা ফাদার স্ট্রং নিজেই করেন। নকশাটি স্কেচের মাধ্যমে কাগজে ফুটিয়ে তোলেন সিস্টার এডিথ।

ফাদারের করা নকশাকেই অনুসরণ করে বরিশালের প্রাণকেন্দ্রে নির্মাণ করা হয় গীর্জাটি। গীর্জাটি নির্মাণ করেন ইংল্যান্ডের স্থপতি ফিলিপ থিকনেস ও প্রকৌশলী ফ্লেডরিক ডগলাস।

১৯০৩ সালে গীর্জাটির প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হবার পর ওই সালেরই ২৬ জানুয়ারি গীর্জাটি উদ্বোধন করা হয়। একই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘এপিফানী গীর্জা ভগ্নি সমাজ।’ ফাদার স্ট্রংয়ের তদারকিতে গীর্জার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলতে থাকে। গীর্জার পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হয় ১৯০৭ সালে।

 

গীর্জার ভবনের বর্ণনা

মূল গীর্জা ভবনটি গ্রীক স্থাপত্যশিল্পের আদলে তৈরি। ভবনটির উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে চার বা পাঁচ তলা বিশিষ্ট ভবন এটি। বাস্তবিক অর্থে ভবনটি মাত্র এক তলা বিশিষ্ট।

গীর্জাটির মূল আকর্ষণ হলো এর বিশাল ও নান্দনিক প্রার্থনা কক্ষটি। কক্ষটির ভেতরের ছাদ কাঠ দ্বারা আচ্ছাদিত। কক্ষের মেঝেতে রয়েছে সুদৃশ্য মার্বেলের টালি। মূল বেদির উপরে রয়েছে একটি বড় ক্রুশ ।

গীর্জার ভিতরে আরো আছে পাথরের তৈরি চৌবাচ্চা, ব্যাপ্টিজম বাথ বেসিন। গীর্জায় প্রবেশের মূল দরজা দক্ষিণ দিকে। তবে বাকি তিন দিকেও কয়েকটি দরজা রয়েছে। ভবনটির উপরে পূর্ব দিকে রয়েছে কালো গম্বুজ।

লাল গীর্জার নির্মাণকাজে ব্যবহৃত প্রায় সব উপাদানই ছিল বাংলাদেশি। দেশীয় মাটি দিয়ে তৈরি আস্তনে পোড়া লাল ইট দিয়ে নির্মিত হয়েছিল ভবনটি। গীর্জার ভিতরের চারটি বেদির মার্বেল পাথরগুলি আনা হয়েছিল কলকাতা থেকে। আর ক্রুশটি আনা হয়েছিল বেথেলহাম থেকে।

১১৬ বছর পুরোনো এই গীর্জাটি দেখতে এখনো নতুনের মতো। উল্লেখ্য যে, গীর্জাটি তৈরির পর থেকে এর কোনো সংস্কার করানো হয়নি। এখন গিয়ে গীর্জাটি যেভাবে দেখতে পাবেন সেটি গীর্জার আদি ও অকৃত্রিম রূপ। নির্মাণকালে এটি তৈরি করা হয়েছিল এমনভাবে যাতে কোনো প্রলয়ংকারী প্রাকৃতিক দুর্যোগও এর কোনো ক্ষতিসাধন না করতে পারে।

১৯৬০ ও ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বরিশাল অঞ্চলের ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি অসংখ্য ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় কিন্তু তখনও গীর্জাটি অক্ষত ছিল।

মূল গীর্জার পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে একটি টাওয়ার। যার নাম বেল টাওয়ার। সেখানে রয়েছে গীর্জার অফিসকক্ষ এবং সেই বিশাল সুদৃষ্ট ঘন্টাটি যা দিনে সাতবার ভক্তদের প্রার্থনার জন্য আহ্বান করতে বাজানো হয়।

কথিত আছে যে, এই সুবিশাল ঘন্টাটি স্থাপনের যাবতীয় খরচ ফাদার স্ট্রং নিজে বহন করেছিলেন। ফাদার স্ট্রং ছিলেন তখনকার সময়ের একজন নামকরা ক্রীড়াবিদ। বিভিন্ন খেলায় সম্মানী হিসেবে পাওয়া অর্থ দিয়ে তিনি এই ঘন্টা স্থাপন করেন।

লাল গীর্জাটি বিখ্যাত হবার পিছনে রয়েছে আরেকজন বিশেষ মানুষের নাম। একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি যার নাম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে এই গীর্জার ইতিহাসের সাথে। বলছি রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কথা।

১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন কবি। কবি জীবনানন্দ দাশ ছিলেন একজন কাল ও ইতিহাসচেতন কবি। তিনি ইতিহাসচেতনা দিয়ে অতীত ও বর্তমানকে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কসূত্রে বেঁধেছেন। তার প্রথম লেখায় নজরুল, সত্যেন্দ্রনাথ ও মোহিতলালের কাব্যধারার প্রভাব থাকলেও তার দ্বিতীয় কাব্য থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন মৌলিক ও ভিন্ন পথের অনুসন্ধানী।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গ ও রূপকথা তার কাব্যে অসাধারণ ভাবে ফুটে উঠেছে। গ্রামবাংলার সৌন্দর্যকে এতোটা সুন্দরভাবে তার কাব্যে ফুটিয়ে তোলার জন্য তাকে ‘রূপসী বাংলার কবি’ বলা হয়। 

কবির নিজ বাড়ির দূরত্ব এখান থেকে খুবই কম। গীর্জা থেকে হেঁটে যাওয়া যায় কবির বাড়িতে। কবির নামেই নামকরণ করা হয়েছে বগুড়া রোডের নাম যার বর্তমান নাম ‘জীবনানন্দ সড়ক‘। কবির জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে বরিশালের লাল গীর্জায়। কবি এই গীর্জার হোস্টেলেই  থাকতেন। গীর্জার প্রাঙ্গন, পুকুর, গাছপালা সবকিছুতে মিলিয়ে আছে কবির স্মৃতিচিহ্ন।

এই গীর্জারই একজন সেবিকার মেয়ে ছিলেন মনিয়া। যাকে আমরা কবির প্রথম প্রেমিকা হিসেবে জানি। অনেকের মতে, এই গীর্জাতেই কবির মনিয়ার সাথে প্রথম দেখা হয়। কবি মনিয়া এবং লাল গীর্জার কথা যখন একত্রে বলা হচ্ছে তখন মনে পড়ছে একটি কবিতার কিছু লাইন।

আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি এই ঘাসে

বসে থাকি; কামরাঙা লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো

গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে-আসিয়াছে শান-অনুগত

বাংলার নীল সন্ধ্যা-কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে;

এই লাইনগুলো জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতা থেকে নেয়া। কবি এই কবিতাটি তার প্রথম প্রেমিকা মনিয়া’কে নিয়েই লিখেছিলেন। ধারণা করা হয় লাল গীর্জার প্রকৃতির রূপের সাথে মিলিয়েই তিনি মনিয়াকে নিয়ে কবিতাটি লিখেছেন।

লাল গীর্জার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আরেকজন বিশেষ ব্যক্তির নাম। তিনি হলেন লুসি হেলেন ফ্রান্সিস হল্ট। ১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের সেন্ট হ্যালেন্সে এই মানবদরদীর জন্ম। তিনি ১৯৬০ সালে একটি মিশনের কাজে বাংলাদেশে আসেন। কথা ছিল দুই বছর পর নিজ দেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি তার ভালোবাসা তাকে এদেশ ছেড়ে যেতে দেয়নি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষীও হয়েছেন তিনি। ৩০ বছর বয়সে তিনি অক্সফোর্ড মিশন গীর্জায় যোগদান করে। এখন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেই আছেন।

২০০৪ সালে অবসর গ্রহণের পর সিস্টার হল্ট ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে, তিনি বরিশালের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান এবং এখানেই সমাহিত হতে চান।

বাংলাদেশ সরকারের কাছে তার এই আবেদন পৌছান তিনি। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পান।

বাংলাদেশের সকল ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর  মধ্যে লাল গীর্জাও একটি। এই লাল গীর্জা শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন নয়। এটি ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন ও বটে। সঠিক যত্ন পেলে এই নিদর্শনটিও কখনো তার অস্তিত্ব হারাবে না বলে আশা করা যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী/আরএ