Alexa প্রাচীন আমলের গাঁথুনিতে আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া

ঢাকা, শনিবার   ২০ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৫ ১৪২৬,   ১৬ জ্বিলকদ ১৪৪০

বিউটি বোর্ডিং

প্রাচীন আমলের গাঁথুনিতে আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া

নুরুল করিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:১৫ ২৮ জুন ২০১৯   আপডেট: ১২:১৮ ২৮ জুন ২০১৯

বিউটি বোর্ডিং এর সর্ষে ইলিশ

বিউটি বোর্ডিং এর সর্ষে ইলিশ

বুড়িগঙ্গা নদীর কাছাকাছি অবস্থিত বাংলাবাজারের শ্রীশদাস লেনে মোড় নিলেই দেখা মিলবে পুরোনো একটি দোতলা বাড়ি। মাঝখানে প্রশস্ত উঠোন। ফুলের বাগান দিয়ে ঘেরা। বেশ আড্ডার জায়গা। হলুদ বর্ণের প্রাচীন আমলের গাঁথুনি আর আড্ডার আবহ্ মুহূর্তেই আপনাকে নিয়ে যাবে এক‘শ বছর পেছনে। এখানকার খাবারঘর, শোবারঘর, পেছনে সিঁড়িঘর সবই গল্পের বইয়ে লেখা প্রাচীন জমিদারবাড়ির বর্ণনার মতো।

বিউটি বোর্ডিং নিতে বলতে গেলে প্রথমেই উঠে আসে বাঙালি শিল্প সাহিত্যের ইতিহাস এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির গুণী ব্যক্তিদের আড্ডার কথা। অনেকের মতে এই বাড়ি ইতিহাসের ভিত্তিভূমি! না বলেই উপায় কী! বিউটি বোর্ডিং এর জন্মলগ্ন থেকেই এখানে আড্ডা দিতেন প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।

এখন হয়তো আগের সেই ইট-পলেস্তারা নেই। নেই দিন-রাত আড্ডায় ডুবে থাকা পুরোনো মানুষগুলোও। তাতে কী, গৌরব এবং গৌরবময় ইতিহাস তো হারায়নি! এখনো প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বিউটি বোর্ডিং-এ ছুটে যান প্রশান্তি খুঁজতে কিংবা একবার দেখতে। এখনো যে কেউ চাইলেই খুব অল্প খরচে একটি রুম নিয়ে সেখানে থাকতেও পারেন পুরো দিনরাত্রি।

বিউটি বোর্ডিং

এখানকার সর্ষে ইলিশ খুবই নামকরা। তাই দামটাও একটু বেশি। খেতে খেতে গল্প হলো বিউটি বোর্ডিংয়ের বর্তমান মালিক তারক সাহার সঙ্গে। সেখানেই জানতে পারলাম এটা আসলে একটা জমিদার বাড়ি ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর এই বোর্ডিং’র যাত্রা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণ ভাবে। তখন এখানকার চারপাশে ছিল ছাপাখানা। সেই সুবাদে শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকদের আনাগোনা ছিল সবসময়ই। 

আড্ডায় বেরিয়ে এলো আরো বেশ কিছু হাঁড়ির খবর। বিউটি বোর্ডিং চালু হবার আগে সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকা অফিস হিসেবে পরিচিত ছিল এই বিল্ডিং। এই পত্রিকা অফিসের সুত্র ধরেই মূলত এখানে জমে ওঠে শিল্পী সাহিত্যিকদের জম্পেশ আড্ডা। আর এখান থেকেই শুরু হয়-বাংলাবাজারকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চা। আড্ডাপ্রিয় বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষগুলোর প্রিয় গন্তব্যস্থল ছিল এই ঘুপচি গলির ছোট্ট দালানের বিউটি বোর্ডিং। ১৯৪৯ সালে কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা ছাপা হয় সোনার বাংলা পত্রিকায়। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাবার পর দালানের দোতলায় গড়ে ওঠে স্বল্প দামের আবাসিক হোটেল। প্রথমে এই হোটেলে শুধু চা-নাশতা পাওয়া যেত।

এখনো থাকার ঘর আছে? তারক সাহা বললেন, ‘লাগবে নাকি আপনার? অনেকে শখ করে এখনো থাকেন। আবার অনেকেই নিয়মিত থাকেন।’ জানা গেল এখানে মোট ২৫টি কক্ষ রয়েছে। দুই বিছানায়ালা কক্ষের চেয়ে এক বিছানায়ালা কক্ষই বেশি। এগুলোর ভাড়া ২৫০ থেকে শুরু করে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে এখানে দু-এক রাত কাটিয়ে আসতে পারে যে কেউ।

স্টিলের থালায় ভাত, ভর্তা ও আচার

এখানে এসে খাবারের চিন্তা করতে হবে না। তবে খাবার ঘরের পরিবেশ আপনার পছন্দ নাও হতে পারে। খাবার তৈরি ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে নিজস্ব ঐতিহ্য এখনো অটুট রয়েছে। খাবার ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি টেবিল-চেয়ার। টেবিলে সাজানো স্টিলের থালা আর গ্লাস। দেয়ালে টাঙ্গানো আছে পুরোনো কিছু ছবি ও খাবারের মূল্য তালিকা। এখানে এলে সর্ষে ইলিশ অবশ্য খাবেন।

সর্ষে মাখা ঝোলে বেশ বড় আকারের একটি ইলিশের টুকরো দিয়েছিল। গল্প করতে করতে সেটা শেষের পথে! যে ইলিশের টুকরো সেই মাছটিও বড় মাছ। বড় ইলিশের স্বাদ এমনিই বেশি হয়। মাছটি বেশ সুস্বাদু ছিল। আমার বেশি ভালো লেগেছিলো সর্ষে ইলিশের ঝোল। এবার পাতে নিলাম ভর্তা। বাঙালি আয়োজনের খাবার খাবো আর তাতে ভর্তা থাকবে না চিন্তাও করা যায় না। এখানে বিভিন্ন ধরনের ভর্তা পাওয়া যায়। তবে সব দিনই একই পদের ভর্তা পাবেন তাও নিশ্চিত হয়ে বলা যায় না। আমি নিয়েছিলাম টাকি মাছের ভর্তা, শিম ভর্তা এবং মিষ্টি কুমড়ার ভর্তা। চাইলে চাটনি ও ডালও নিতে পারেন।

বিউটি বোর্ডিং-এ থাকার জায়গা

খাওয়া শেষ করে মিষ্টি জাতীয় কিছু না খেলে ব্যাপারটা কিন্তু জমে না! বিউটি বোর্ডিং-এ কোনো ধরনের মিষ্টি পাওয়া না গেলেও দই পাওয়া যায়। অগত্যা দই নিলাম। তবে সাধারণ কাপ দই দেখেই আশাহত হলাম। ভেবেছিলাম হয়তো অন্যরকম কিছু পাবো। দইয়ের স্বাদ ভালো ছিল না। তবে সেটা পুষিয়ে দিয়েছিল সেখানকার স্টাফরা! যারা খাবার সরবরাহ করেন তাদর ব্যবহার মুগ্ধ করার মতো। যেকোনো প্রয়োজনে তারা ব্যস্ত হাতে খাবার সরবরাহ করেন।

এ নিয়ে অনেকবার গিয়েছি এই বিল্ডিং-এ। নাটক সিনেমায় তো শত শত বার দেখেছি! এইতো অমিতাভ রেজা চৌধুরীরর সিনেমা আয়নাবাজি’র বেশ কয়েকটা দৃশ্য এই লেনেই ধারণ হয়েছে। এখানে এলেই টের পাওয়া যায়, পুরাতন এবং ইতিহাস সমৃদ্ধ বাড়ি, চারদিকে স্যাঁতস্যাঁতের ঘ্রাণের মধ্যে কেমন যেন শান্তি বিরাজমান।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে