Alexa প্রাইভেট পড়িয়ে খরচসহ চালাতেন সংসার, হলেন বিভাগের সেরা

ঢাকা, সোমবার   ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ১১ ১৪২৬,   ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৪১

Akash

প্রাইভেট পড়িয়ে খরচসহ চালাতেন সংসার, হলেন বিভাগের সেরা

রুমান হাফিজ, চবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১১ ২০ জানুয়ারি ২০২০  

ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

ছোটোবেলা থেকেই চঞ্চল স্বভাবের সুমন। পুরো নাম আশরাফুল ইসলাম সুমন। ফরিদপুরের বোয়ালমারীর নিম্ন মধ্যবিত্ত কৃষক বাবার ঘরে জন্ম। পাঁছবছর বয়সে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর আগ্রহ জাগলো বাবার। শিক্ষকদের অনেক অনুরোধ করে তাকে ভর্তি করালেন বালিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রথম শ্রেণি থেকেই বাজিমাত! ক্লাসে প্রথম হয়ে শেষ করেন পড়াশোনার প্রাথমিক ধাপ। এরপর মাধ্যমিকের পড়াশোনা হয় পোহাইল বাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগে। একই বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন বঙ্গবন্ধু কলেজে।

কণ্টকময় পথ পেরিয়ে

পরিবারে ঘিরে ধরেছে রাজ্যের অস্বচ্ছলতা। একারণে এসএসসি পরীক্ষার পর থেকেই প্রাইভেট পড়ানো শুরু। একবছর পর এলাকায় শুরু করলেন প্রাইভেট ব্যাচ। এতে করে মাস শেষে নিজের খরচ বাদে কিছু টাকা বাবার হাতে তুলে দিতে পারতেন। প্রাইভেট পড়ানো একদিকে যেমন আর্থিক সাহায্য করত অন্যদিকে পড়াশোনা করতেও ব্যস্ত রাখতো। এইচএসসি পরীক্ষার সময় ব্যস্ত হয়ে পড়েন পড়াশোনায়। ছোটবেলা থেকে ক্লাস ফাঁকি দেয়ার অভ্যেস ছিল না। নিয়মিত ক্লাসে যাওয়া, নোট করা সাহায্য করেছে পরীক্ষায়।

এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হতেই ঝোঁক উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। অজপাড়াগাঁয়ে থাকায় এ ব্যাপারে কার সহযোগিতা নেবেন সেই ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। এমন সময় এক মামার কাছে সহযোগিতা চান। তিনি ঢাকায় চাকরি করেন। এই মামার কাছে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং এবং পড়াশোনার কাজটুকু সারেন। ভর্তি পরীক্ষার পর সুযোগ পান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিজ্ঞানের প্রতি প্রবল ঝোঁক আর গণিতের উপর ভালোলাগা থেকেই পরিসংখ্যান বিভাগেই ভর্তি হন। 

এবার নতুন যাত্রা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন জীব্ন। পরিবার থেকে তার খরচ দেয়া সম্ভব ছিলো না। সেজন্য আবারো শুরু করলেন টিউশন। কিন্তু নতুন জায়গা, নতুন মানুষ সব মিলিয়ে প্রথম তিনমাস টিউশন ছাড়াই চলতে হয়েছে। এরপর দুইটা টিউশন পেলেন। যা দিয়ে প্রথম বর্ষের ক্যাম্পাস লাইফ চলে গেলেও পরিবারকে আগের মতো সহায়তা করা সম্ভব হয়নি। তাই আরো দুটো টিউশন জোগাড় করলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পদচারণা ছিল সব ক্ষেত্রেই, বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনে যুক্ত থেকে কাজ করেছেন সক্রিয়ভাবে। এরমধ্যে সামাজিক সংগঠন বিন্দু, বিতর্ক সংগঠন সিইউডিএস, সাংস্কৃতিক সংগঠন অঙ্গনসহ অন্যান্য সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। পদে থেকে দায়িত্বও পালন করছেন সঠিকভাবে।

মোড় ঘুরে যায় যখন

প্রথমবর্ষে যখন মেধাতালিকায় নিজেকে প্রথম তিনজনে দেখেছিলেন সেদিন থেকেই জীবনের মোড় নিয়েছিল ভিন্নভাবে। অনেকের ক্ষেত্রে শুনতেন টিউশন করলে রেজাল্ট ঠিক আসে না, কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন থেকে এগিয়েছিলেন একান্ত নিজের মতো করে। তবে অনার্স ফাইনালে সিজিপিএ ৩.৪৮ আসায় একটু হতাশায় ফেলে সুমনকে। একদিকে ৪/৫ টা টিউশন চালিয়ে অন্যদিকে নিজের পড়াশোনা ঠিকঠাক রাখতে হাপিয়ে উঠতে হয়েছিলো। তবে হতাশ হলেও হাল ছাড়েননি। যার ফলস্বরূপ মাস্টার্স এ সিজিপিএ ৩.৭৫ আসে (থিসিসসহ)। বিভাগের সেরা চারজনের মধ্যে নিজেকে দেখতে পেয়ে সব কষ্টের গল্প ভুলে যান। 

প্রাইভেট পড়ানো, নিজের পড়ালেখা, ক্লাসসহ অন্যান্য সব কাজ কিভাবে ভালো রেজাল্ট সম্ভব হয়েছে? প্রশ্নের উত্তরে স্বভাবসুলভ হাসি টেনে বলতে লাগলেন সুমন, নিয়মিত ক্লাস করতাম, এরপর ক্লাস শেষে টানা ৬/৭ ঘণ্টা টিউশন। রুমে এসে ১২টার পর বই নিয়ে বসে গভীর রাত পর্যন্ত পড়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকতো। বন্ধের দিনগুলোতেও কাজে লাগাতাম, তবে টিউশনবিহীন কোনদিন ছিলো না! 

অনুপ্রেরণায় যারা

প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেড়ে ওঠা আশরাফুল ইসলাম সুমনের অনুপ্রেরণায় সবার আগে বাবা-মা। কৃষক বাবা আবুল হোসেন এবং গৃহিণী জোৎস্না বেগমের পরিবারে তিন ছেলে আর এক মেয়ে। পরিবারে উপার্জনের একমাত্র ব্যক্তি বাবাই ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা। নিজের দুই খন্ড জমির বাইরে অন্যদের জমি চাষ করে সংসার চালানো বাবা সবসময় সাহস আর অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। 

সুমন বললেন, বাবা-মা ছিলেন সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণার কেন্দ্রস্থল। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এতদূর আসা কল্পনার বাইরে ছিলো। পরিসংখ্যান বিভাগের  প্রিয় রোকোনুজ্জামান স্যারের অনুপ্রেরণা ছিলো বর্ণনার বাইরে। সবকিছুতেই শতভাগ দিয়েছি বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী পেয়েছি, ভালবাসা পেয়েছি শিক্ষক এবং বন্ধুদের। সবার প্রতি সবসময় কৃতজ্ঞতা থাকবে। 

বাবার স্বপ্ন পূরণের পালা 

বাবার স্বপ্ন ছেলে উচ্চতর শিক্ষা শেষে একজন ম্যাজিস্ট্রেট হবে। বাবার স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন করে সেই লক্ষ্যে এগিয়ে চলছেন। স্বপ্ন বিশাল, ছুঁতে হলে নিজেকে শতভাগ দিতে হবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছুর সাথে সক্রিয় থেকেও নিজের পড়াশোনায় ঘাটতি রাখেন নি বিন্দুমাত্র। 

সুমন বললেন, শেষ কবে নিজে ফ্রি থেকে সময় কাটিয়েছি ভুলেই যেতে বসেছি। জানি না কখন ফ্রি সময় আসবে। তবে বাবার স্বপ্ন শিগগিরই পূর্ণ করে অস্বচ্ছল পরিবারে সুখের পরিবর্তন আনতে চাই।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম