প্রাইভেট কোম্পানির ওষুধ লিখলে কমিশন বেশি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল

প্রাইভেট কোম্পানির ওষুধ লিখলে কমিশন বেশি

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:১৪ ১১ জুন ২০১৯   আপডেট: ২২:২৫ ১১ জুন ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

জনবল সংকট, চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলা, ওষুধ বিতরণে অনিয়ম নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল। কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দিয়ে জরুরি বিভাগের সেবা দেয়ায় সামান্য অসুস্থতা নিয়েই রংপুর মেডিকেলে যেতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। হাসপাতালে পর্যাপ্ত সরকারি ওষুধ সরবরাহ থাকালেও চিকিৎসকরা বাইরের কোম্পানি ওষুধ লিখছেন। রোগীদের অভিযোগ এতে ডাক্তাররা ওইসব কোম্পানি থেকে কমিশন পান।

সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ঘড়ির কাটা তখন সকাল ৯টা। হাসপাতালের পরিবেশ একেবারেই শুনশান। কোথাও হাসপাতালের কোন কর্মকর্তাদের চোখে পড়ছে না। তালাবদ্ধ টিকিট কাউন্টার ও চিকিৎসকদের কক্ষ। তত্ত্বাবধায়কের কক্ষ খোলা থাকলেও উপস্থিত নেই তিনি। হাজিরা খাতায় নেই কারো উপস্থিতির স্বাক্ষর। তবে ডেইলি বাংলাদেশের প্রতিনিধিকে ক্যামেরা হাতে দেখে শুরু হয় কর্মকর্তা কর্মচারীদের তোরজোড়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর চিকিৎসকদের দেখা মিললেও সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট নন সাধারণ রোগীরা।

লালমনিরহাট সদর হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার অনুমোদন থাকলেও বর্তমানে ১শ’ শয্যার সেবা চালু আছে। গোটা হাসপাতালে ৩৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৬ জন। ১৯ জন মেডিকেল অফিসারের মধ্যে ১৫টি পদই খালি। যে চার জন আছেন, তাদের মধ্যেও দুজন একেবারেই অনিয়মিত। সিনিয়র জুনিয়র মিলিয়ে ১১ জন কনসালটেন্ট থাকলেও কেউই ঠিকমত অফিস করেন না বলে অভিযোগ। উপ সহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দিয়েই চলে জরুরি বিভাগের সেবা। ফলে সামান্য অসুস্থতা নিয়েও যেতে হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌড়াত্মও কম নয়। যে দু-চারজন চিকিৎসক আছেন সেখানে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিরে ডাক্তারের দেখা মেলাই ভার। ডাক্তারের সাক্ষাতের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সাধারণ রোগীদের। এছাড়া স্থান সংকুলান না হওয়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে করিডোরে দেয়া হয়েছে রোগীদের বিছানা।

হাসপাতালটিতে প্যাথলজির জন্য অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি থাকলেও টেকনিশিয়ানের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সেসব। স্থানীয়রা বলছেন, প্রায় ১৮ লাখ মানুষের চিকিৎসা কেন্দ্র লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের জনবল সংকট দূর করে কর্মকতাদের দায়িত্বশীল করা গেলে নিশ্চিত হবে স্বাস্থ্যসেবা।

অপরদিকে স্বাস্থ্য সেবার বেহাল অবস্থা লালমনিরহাটের চরাঞ্চলের ক্লিনিকগুলোতেও। কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও স্বাস্থ্য কর্মী থাকলেও নূন্যতম সেবা মিলছে না চরবাসীদের ভাগ্যে। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে চরাঞ্চলবাসী।

মফস্বল শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচার গোবর্ধণ দ্বীপচর। এই দ্বীপচরের বাসিন্দা সোলেমান-আর্জিনা দম্পতি। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে জানেন না ছয় সন্তানের এই দম্পতি। তাদের মধ্যে নেই পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কিত কোন ধারণা। সরকারের স্বাস্থ্য সেবাদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকলেও কেউ-ই যায় না দ্বীপচরগুলোতে। ফলে গর্ভবর্তী মায়েদের স্বাস্থ্য পরিচর্যা, মাতৃত্বকালীন সেবা, শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান, বয়সন্ধীকালে করণীয় এমনকি পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কেও জানেন না দ্বীপচরের মানুষ।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, লালমনিরহাটের তিস্তা-ধরলার অর্ধশতাধিক চরে প্রায় চার লাখ মানুষের বসবাস। স্বাস্থ্যসেবায় এসব চরে কমিনিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও এরই মধ্যে নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে বেশ কয়েকটি। আর যেগুলো রয়েছে, সেগুলোতেও মিলছে না কাঙ্খিত সেবা। তাই সেবা নিতে ছুটতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা জেলা সদরে। কিন্তু আমাদের এই দুর্গম চর পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অনেকের মৃত্যু হয়।

এদিকে স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত সাবেক ছিটমহল দহগ্রাম আঙ্গোরপোতাবাসী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া উপহার দহগ্রাম ১০ শয্যার হাসপাতালটিতে তালা ঝুলছে। দেশের বহুল আলোচিত সাবেক ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতাবাসীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপহার হিসেবে হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের মাত্র ৮ বছরের মাথায় ভেঙে পড়েছে হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবা। সরকারিভাবে হাসপাতালে জনবল নিয়োগ থাকলেও বাস্তবে সেখানে কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী চোখে পড়ে না।

হাসপাতালের মূল ফটকে তালা ঝুলতে দেখা যায়। চিকিৎসক ও নার্সদের বসবাসের জন্য করা ৮টি কোয়াটার, রোগী পরিবহনের একটি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার না করায় রুগ্ন হয়ে পড়েছে। পুরো হাসপাতাল জুড়ে একমাত্র ওয়ার্ডবয় মিজানুর রহমান পরিবার নিয়ে চিকিৎসকের একটি কোয়াটারে থাকেন। রোগীদের থাকার বেডগুলো নিজের কোয়াটারে নিয়ে খাট হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি।

লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক গোলাম মোহাম্মাদ ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, সদর এই হাসপাতালের রোগীদের সেবার মান বরাবরেই ভালো। তবে হাসপাতালে কিছু চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীরা তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই অবস্থা বেশিদিন থাকবে না। এরইমধ্যে চিকিৎসকের চাহিদা দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই চিকিৎসক সংকটের সমাধান হবে। এছাড়াও হাসপাতালটিতে প্যাথলজির জন্য অত্যাধুনিক সব রকম যন্ত্রপাতি আছে। কিন্তু টেকনিশিয়ান না থাকার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সেসব যন্ত্রপাতি চালানোর জন্যও জনবল চাওয়া হয়েছে।

লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. কাশেম আলী ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, চরবাসীসহ জেলার সকল মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত এর সমাধান হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস