প্রমীলাদের জয়ে, আমরাও জয়ী

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৫ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১১ ১৪২৬,   ২০ শাওয়াল ১৪৪০

প্রমীলাদের জয়ে, আমরাও জয়ী

 প্রকাশিত: ২০:৩৩ ২০ জুলাই ২০১৮   আপডেট: ২২:৪৮ ২০ জুলাই ২০১৮

তোমরা জিতলে, জিতে যাই আমরা

তোমরা জিতলে, জিতে যাই আমরা

বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারদের সাফল্য এখন সবদিকে। নারীরা যেখানেই খেলছেন, সেখান থেকেই জয় ছিনিয়ে আনছেন। যেন খেলছেন আর জয় করছেন!

সম্প্রতি, নারী ক্রিকেটাররা এশিয়া কাপ টি-২০ তে ভারতকে বধ করে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এর আগে এশিয়া কাপ টি-২০ এর শিরোপা প্রতিবারই ভারত নিয়েছে। এছাড়া এবার বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার গৌরব অর্জন করেছে নারী ক্রিকেট দল। সবশেষ আয়ারল্যান্ডকেও হারিয়েছে তারা। তাদের একের পর এক বিজয়ে উল্লাসিত-উচ্ছ্বাসিত গোটা দেশের মানুষ।

তাদের পাশাপাশি ক্রিকেটারদের খুব কাছাকাছি থাকেন তাদের পরিবার। যারা প্রতিনিয়ত দেখেছেন, কতো কষ্ট আর ত্যাগের পর কীভাবে একটা মেয়ের জাতীয় দলে আসা। আর সব কিছুর পরে যখন তাদের এতো সাফল্য, তখন পরিবার-পরিজনরাই সবার আগে বেশি আনন্দিত-গৌরাবান্বিত হন।

তখন কেমন লাগে তাদের, কি অনুভূতি জাগে তাদের মনে? জানতে চেয়েছি সেই সব পরিবারের সদস্যদের কাছে। যাদের ত্যাগে আজ গর্বিত গোটা জাতি।

‘খুব টেনশন হয়, যেটা বলে বোঝানো যাবে না। যখন দেখি আমার মেয়ে খুব ভালো করছে, তখন খুব আনন্দ লাগে। তবে শুধু সালমা নয়, শুকতারা, রুমানা, জাহানারা, ওদের সবার পারফরমেন্সেই আমি মুগ্ধ।’এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন, প্রথমবারের মতো ভারতকে বধ করে এশিয়া কাপ টি-২০ তে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ প্রমীলা ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সালমা খাতুনের মা ফরিদা বেগম।

২০১১ সালে ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষিক্ত খুলনার মেয়ে সালমা খাতুন বর্তমানে প্রমীলা ক্রিকেট দলের টি-২০ ফরমেটের অধিনায়ক। তার হাত ধরেই এশিয়া কাপ টি-২০ ও নেদারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশ স্মরণকালের সেরা সাফল্য পায়।

সালমার মা বলেন, ‘সালমা অনেক কষ্ট করে এ পর্যন্ত এসেছে, তাই তার স্বপ্ন যাতে পূরণ হয় সেজন্য আমি নামাজ ও বেশি বেশি ইয়াসিন সূরা আর আয়াতুল কুরসি পড়ে দোয়া করি।’

তিনি বলেন, গ্রামের মানুষও তাকে নিয়ে অনেক আশাবাদী। এশিয়া কাপ জয়ের পর বাড়ি আসার খবরে গ্রামের মানুষ নদীর ঘাট থেকে বাড়ি পর্যন্ত ফুল দিয়ে সাজিয়েছিল। তারা সারা রাত জেগে অপেক্ষা করেছিল সালমার জন্য। বাজি ফুটিয়েছিল, আনন্দে মেতে উঠেছিল। মানুষের এই ভালোবাসা আমাদের জীবনের অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত। অবশ্য মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় খুশিতে তিনি গ্রামের সবাইকে সেদিন মিষ্টিমুখ করিয়েছেন বলেও জানান।

নারী ক্রিকেট দলের আরেক নক্ষত্র রুমানা আহমেদ। তার বাড়িও খুলনায়। ডানহাতি ব্যাটসম্যান ও লেগ ব্রেক বোলার রুমানা। তিনি ওয়ানডে ফরমেটের অধিনায়ক। নারী ক্রিকেট দলের অনেক কৃতিত্ব আসে তার হাত ধরে।

ইটালির ফ্লোরেন্সে থাকেন রুমানা আহমেদের ভাই শেখ ইফতেখার হোসেন। নারী ক্রিকেটারদের সাফল্যের আনন্দ তাকে সবসময় আলোড়িত করে। আর রুমানার সাফল্যে তিনি খুঁজে পান তার স্বপ্ন পূরণের স্বাদ।

সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আলাপকালে ইফতেখার হোসেন বলেন, আমি এবং আমার বোন সেলিনা আহমেদ রুমানাকে ক্রিকেট খেলার জন্য ভর্তি করি। যখন ভর্তি করেছিলাম তখন স্বপ্ন দেখেছিলাম, সে যেন অনেক বড় খেলোয়াড় হয়। রুমানা আমার স্বপ্ন পূরণ করেছে, আমি গর্বিত।

তিনি বলেন, আমি বিদেশে থাকলেও সব সময় তাদের খেলার খোঁজ রাখি। যখন টিভিতে খেলা লাইভ হয়, তখন সব কাজ ফেলে আগে রুমানাদের খেলা দেখি। শুধু আমি না, এখানে যারা আমার পরিচিত আছেন, তারা সবাই খেলা দেখেন। তারা যেন বিজয়ী হয় এ জন্য বাড়িতে মা নফল নামাজ পড়ে দোয়া করেন। আর রুমানা যখন কোনো সম্মাননা পায়, তখন আমার বা পরিবারের সবার খুব ভালো লাগে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে ভালো লাগে যখন রুমানাকে দেখিয়ে সবাই বলে, শেখ হাতেম আহমেদের মেয়ে যাচ্ছে বা শেখ হাতেম আহমেদের মেয়ে জাতীয় দলে খেলে। বাবাও খেলাধুলা খুব পছন্দ করতেন। তিনি এখন আর বেঁচে নেই। যদি থাকতেন, তাহলে অনেক খুশি হতেন। রুমানা যখন বাড়িতে যায়, তখন খুলনা জেলা প্রশাসক ও খুলনার এমপি মিজানুর রহমান আমাদের বাসায় গিয়ে রুমানাকে সংবর্ধনা দিয়ে আসেন, অভিনন্দন জানান।  বিষয়গুলো আমাকে অনেক বেশি আনন্দ দেয়।

আয়েশা রহমান শুকতারা । তিনি বাংলাদেশে নারী ক্রিকেট দলের অন্যতম একজন অলরাউন্ডার। মজার ব্যাপার হলো এই শুকতারাও কিন্ত খুলনার মেয়ে। ২০১১ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তার অভিষেক হয়।

শুকতারা রহমানের মা পারভীন রহমান বলেন, ওরা যখন দেশের বাইরে বা দেশে খেলে তখন খুব চিন্তায় থাকি। টেনশনে গায়ে শক্তি থাকে না। সব সময় আল্লাহকে ডাকি। সালাতুল হাজত নামাজ পড়ি, যেন মেয়েরা বিজয়ী হয়।

মেয়ে ক্রিকেটার হওয়ায় সবার কাছ থেকে তার পরিবারের সদস্যরা অন্য রকম সম্মান পেয়ে থাকেন জানিয়ে পারভীন রহমান বলেন, যখন আমার ছোট মেয়ের স্কুলে যাই, তখন স্কুলের স্যার ম্যাডামরা অন্য রকম সম্মান করেন।

একজন আরেক জনকে ডেকে বলেন, দেখেন, দেখেন কে এসেছেন। আমাদের শুকতারার মা এসেছে। আবার যখন বাজারে কিংবা বাইরে যাই, দোকানদাররাই বেছে বেছে ভালো পণ্যটি আমাকে দেন। এই সম্মানগুলো আমার এতো ভালো লাগে যা বলার মতো না। মেয়ে যদি ক্রিকেটার না হতো তাহলে হয়তো এতো সম্মান পেতাম না। তিনি বলেন, এটা খুব গর্বের যে, একজন মা তার মেয়ের জন্য সব জায়গায় সম্মানিত হচ্ছে।

ডানহাতি ব্যাটসম্যান ও লেগ ব্রেক বোলার ফাহিমা খাতুন। ২০১৩ সালে ভারতের বিপক্ষে তার অভিষেক হয়। ৬টি ওডিআই ও ১৫টি টি-২০ ইন্টারন্যাশনাল খেলা ফাহিমা বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের আরেক ভরসার নাম।

ফাহিমার বোন আঁখি বলেন, পরিবারের সবাই তাকে নিয়ে গর্ব করে। তবে খুব খারাপ লাগে যখন তাদের সব খেলা টিভিতে লাইভ করে না। অনলাইনে তাদের খেলা দেখতে হয়। মিস করি তাদের। তারা যখন জয়ের পথে যায়, তখন এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করে। খুব ভালো লাগে। এ এক অন্যরকম ভালো লাগা। এটা বোঝানো যায় না।

আঁখি বলেন, আমি বড় আর ফাহিমা ছোট। তাই সব সময় তাকে উৎসাহ দিতে হয়। তাকে সব সময় বলি পজেটিভ থাকতে। ও খুব পরিশ্রম করে। পুরুষ ক্রিকেটারদের চেয়ে সুযোগ-সুবিধা কম পায় বলে তার মন খারপ থাকে। তখন তাকে বলি, এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে।

আকরাম খানরা যখন খেলা শুরু করেছিলেন, তখন তারাও তেমন কোনো সুবিধা পেতেন না। এখন খেলা জনপ্রিয় হয়েছে। সবাই সুযোগ-সুবিধা বেশি পাচ্ছে। মেয়েরাও এক সময় পাবে।

ফারজানা হক পিংকী। বাড়ি গাইবান্ধায়। ২০১১ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এই ডানহাতি ব্যাটসম্যানের অভিষেক। অনেক ঘাত প্রতিঘাত আর মানুষের কথা তার এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হতে পারেনি।

ফারজানা হক পিংকীর স্বামী মো. মাহবুব রাকিব বলেন, স্ত্রী দেশের জন্য খেলে এটা অনেক গর্বের বিষয়। যদি সে আউট হয়ে যায়, তখন আমার খারাপ লাগবে এই ভয়ে আমি তার খেলা দেখি না। তবে বন্ধুরা বা সহকর্মীরা দেখে আমাকে আপডেট জানায়। আমি শুধু তাকে বলি, তুমি ১৬ কোটি মানুষের জন্য খেলছ, তাদের নিরাশ করো না।

মাহবুব রাকিব বলেন, আমাদের বাড়ি গাইবান্ধার প্রত্যন্ত এক গ্রামে। পিংকীকে বিয়ের পর প্রতিবেশীরা নানান কথা বলত। একটা মেয়ে ক্রিকেট খেলে, এটা নিয়ে আড় (বাঁকা) চোখে তাকাতো। এমনকি বিয়ের আগে আমার মাও প্রথমে তাকে মেনে নিতে পারেনি। এখন অবশ্য মেনে নিয়েছে। প্রতিবেশীরাও এখন অনেক ভালো কথা বলেন। জিতলে সবাই ফোন করে অভিনন্দন জানায়।

জয় হোক বাংলাদেশ ক্রিকেটের, জয় হোক এইসকল নারী ক্রিকেটারদের, আর যারা তাদের পেছনে থেকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন অবিরত।  

ডেইলি বাংলাদেশ, এসআই/সালি