প্রবাসের মানবিকতা ও দেশজ রাজনীতি

ঢাকা, বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১২ ১৪২৬,   ২১ শাওয়াল ১৪৪০

প্রবাসের মানবিকতা ও দেশজ রাজনীতি

 প্রকাশিত: ১৬:১৬ ১ এপ্রিল ২০১৯  

অজয় দাশগুপ্ত সিডনি প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও ছড়াকার। জনপ্রিয় কলাম লেখক অজয় দাশ গুপ্তের জন্ম চট্রগ্রামে। দীর্ঘকাল প্রবাসে বসবাসের পরও তিনি দেশের একজন নিয়মিত কলাম লেখক। সম-সাময়িক বিষয়ের পাশাপাশি তির্যক মন্তব্য আর প্রেরণা মুলক লেখায় তিনি স্বীয় আসন নিশ্চিত করেছেন।

সিডনির বাংলাদেশি সমাজেও গুরুতর প্রভাব ফেলেছে ক্রাইষ্টচার্চের করুণ ঘটনা। প্রতিবাদ মুখর এখানকার সুধি সমাজ সাংবাদিক লেখকরা এক হয়েছিলেন। তাদের মনের ভাষা চাপ কষ্ট মিলেমিশে একাকার। একটাই চাওয়া বন্ধ হোক এই হানাহানি। ধর্মের নামে উগ্রতার নামে জঙ্গিবাদের নামে এসব নারকীয় হত্যাযজ্ঞ বন্ধ বা হলে মানুষ বাঁচবে কী করে? 

এই ক্রোধ বা আগ্রাসনের পেছনে যারাই থাকুক তাদের খুঁজে বের করা দরকার। বলবো নিউজিল্যান্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে প্রতিবাদ ও সহমর্মিতা কাকে বলে। সে দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে সংসদ সর্বত্র যে শিষ্টাচার আর নম্রতা এবং মুসলমান সমাজের জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা তার প্রতিফলন ঘটুক সব দেশে। তারা সংসদে পবিত্র কোরান পাঠ করা একদিন সবাই মিলে হিজাব পরিধান সহ যা যা করেছেন তা তূলনাহীন। পাশাপাশি আমাদের সমাজ আজ এসব ভাবতেও পারে না। আমাদের বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে কেবল সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠীর আচরণ বা তাদের কথাই শিরোধার্য।

গণতন্ত্রের নামে সর্বজনীন বলে বেশিরভাগ মানুষের কথা শোনার যে প্রবনতা তা সবসময় মঙ্গলের নাও হতে পারে। যে কথা বলছিলাম আমরা এখনো অন্তর্ঘাতী রাজনীতি থেকে বের হতে পারিনি। আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাই সব ধরে রাখেন বলে এখনো নিরাপদ আর ভালো আছে দেশ। যে সব জঙ্গি বা বিপথগামীরা নানা কারণে দেশ ও মানুষের সর্বনাশ করে তারা কি চোখ খুলে দেখবে ক জন নীরিহ বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছে নিউজিল্যান্ডে? খুনের বদলা খুন চোখের বদলে চোখ এমন করতে করতে একসময় অন্ধ পৃথিবী আর মানুষহীন দুনিয়া এই কি চাই আমরা? 

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়ানো এক ছবিতে একটি সিরিয়ান শিশুর একা মরুভূমি পাড়ি দেয়া এখন বিশ্বের টনক নাড়ালেও কেউ সমস্যার সমাধান করতে চায় না। এই শিশুটি একা যে দূস্তর মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছিলো তাতে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিলো খুব কম। ভাগ্য ভালো জাতিসংঘের কিছু মানুষের চোখে পড়েছিল বাচ্চাটি। তাই এবার প্রাণে বেঁচে গেছে। কিন্তু জানেন কী কী ছিলো তার সঙ্গে? তার বগলে বা হাতে রাখা পুটলিতে কোনো বোম ছিলো না। পিস্তল ছিলো না। ছুরিও না। ছিলো মা বোনের কিছু কাপড়। আহা স্মৃতি। হয়তো গৃহযুদ্ধে তারা সবাই আজ মৃত অথবা নিখোঁজ। অসহায় বাচ্চা ওই কাপড় বুকে নিয়ে জীবন কাটাতে ছুটেছিল জর্ডানের পথে। কোথায় মানবতা? কোথায় শান্তি আসলে? দুনিয়ার এখন বড় সমস্যা মিডিয়া একদিকে সে মানুষকে প্রলোভন আর নানা উপকরণে ভুলিয়ে রাখে আরেকদিকে মাঝে মাঝে মানবিকতা উস্কে দেবার চেষ্টা করে। সহজ টার্গেট হতে পারতো আমাদের দেশ ও। গুলশান ট্র্যাজেডি সেটাই মনে করিয়ে দেয়। শেখ হাসিনার সরকার তা রোধ করেছেন।

উস্কানি আর সর্বনাশের রাজনীতি এখনো আমাদের কি ভাবে প্রভাবিত করছে তার একটা নমুনা বলি। সিডনিতে যারা বিএনপি করেন তাদের সবাই খারাপ এটা বলা অন্যায়। ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজনকে জানি যারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সৃজন  ঐতিহ্য শক্তি বোঝেন। মানেনও। কিন্তু ভুল রাজনীতির কারণে তারা এমন সব কথা বার্তা বলেন বা উস্কানি দেয় যা বিষতূল্য। আমার এক অনুজপ্রতিম সম্পাদক আমাকে সেদিন বললো এমন এক বিএনপি নেতা  আমার বরাত দিয়ে সামাজিক মিডিয়ায় উস্কানী ছড়ানোর চেষ্টা করেছিল। সে না বললে আমি জানতাম ওনা। কারণ রাজনীতির নামে কাদা ছোঁড়াছোঁড়ির কোনো ওয়েব বা হিংসা বিদ্বেষ বিবাদ ছড়ানোর কোন বন্ধু  নামের কারো মুখ বই আমি দেখি না। জানলাম তার ভাষ্য মতে আমি নাকি বলেছি বিএনপির নেতারা সুবেশী কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা লেবাস ধারী। অকারণে তিনি সাকা চৌধুরীর মত একজন জানোয়ারের কথা ও নাকি তুলে এনেছে। সাকা চৌধুরীর মত জঘন্য যুদ্ধাপরাধীর নাম আমি উচ্চারণ করতেও ঘৃণা বোধ করি। আমার মত সব লেবাসধারী নেতার বিরুদ্ধে । তারা আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যে দলের হোক না কেন দেশ বিরোধী সাম্প্রদায়িক হলেই আমরা তার বিরুদ্ধে বলবো।

বলবো এই কারণে আজ সারা দেশে সারা বিশ্বে মৌলবাদের নামে উস্কানী-ই মূল সমস্যা। নিউজিল্যান্ডের পর যে অষ্ট্রেলিয়া বা বাংলাদেশ নিরাপদ তার গ্যারান্টি দেবে কে? রাজনীতির বড় সমস্যা দলবাজী। দেশে গণতন্ত্রের নামে বহু দল থাকবে সেটাই নিয়ম। কিন্তু এই বহু দলে জামাত থাকবে কোন কারণে? কী কারনে দেশবিরোধী সমাজ বিরোধী আর মানুষ বিরোধী দলগুলো রাজনীতি করবে? গলা ফুলিয়ে শেখ হাসিনা ও প্রগতি বিরোধী কথা বলবে? আমরা এসব কথা বললেই অনেকে মনে করেন আমরা দলকানা। এক চোখ কানা মানুষ কী করে আরেক জনকে দলকানা মনে করেন জানি না। তবে দিনের পর দিন শক্তিহীন আর সাজা পাবার পরও এদের বোধোদয় ঘটেনি।

বলছিলাম সারা বিশ্বে আলোড়ন তোলা দুর্ঘটনার কথা। এই দুর্ঘটনা আমাদের শিখিয়েছে সাবধান হওয়ার বিকল্প নাই। এখন যখন শান্তি ও সহিষ্ণুতা আমাদের কাম্য তখন দেশ ও দেশের বাইরে সতর্ক হবার বিকল্প কোথায়? কোথাও আজ জানমাল নিরাপদ না। যেসব দেশ সভ্য আর উন্নত তারাও আজ  অসহায়। সিকিউরিটি বলে যে পদার্থ তা এখন হাস্যকর। মূলত এটা প্রমাণিত মানুষ না চাইলে কোনো নিরাপত্তা ব্যবসহা কার্যকর হয় না। এবং কোনো যন্ত্রের সাধ্য নেই পালন করে দেখায়। তাই মানুষকেই জাগতে হবে। সভ্যতার একটা বড় সুফল বোধ। এই বোধ যদি কাজ না করে তাহলে কোন দেশের মানুষ নিরাপদ থাকবেনা। সমস্যা হলো আমাদের সমাজ সে বোধ হারাতে চলেছে। নানা উস্কানী আর প্রলোভন অন্যদিকে ভুল রাজনীতি তাকে যেন বিপদে ফেলতে না পারে। 

সিডনির বাংলাদেশি সমাজ সন্ত্রাস আর হত্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন । উদ্বিগ্ন বিশ্বের সাধারণ মানুষ। সে কারণেই ঐক্য গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে। যার বড় প্রমাণ এ দেশের এক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে রেকর্ড পরিমাণ সাইন করা প্রতিবাদ। শ্বেতাঙ্গরা তাদের দিল খোলা ভালোবাসা আর সমর্থন জানাতে কার্পণ্য করেন নি। আমাদের চোখে হিরো হয়ে ওঠা ডিমবয় কে ভোলা যাবে? মুসলমান না হয়েও তাদের প্রতি ভালোবাসা আর হত্যা নারকীয়তার প্রতিবাদে ঝুঁকি নেয়া এই যুবককে স্যালুট জানানোর পাশাপাশি আমাদের যুবকদের ভেতর ও যেন এই প্রবণতা যেগে ওঠে। যুবশক্তি না জাগলে কি আমরা দেশো সমাজকে মুক্ত ও স্বাধীন রাখতে পারবো? না পারবো আরাধ্য  গন্তব্যে পৌঁছাতে?

বিশ্ববাঙালির নিরাপত্তা ও আজ হুমকির মুখে। মানুষে মানুষে শুভবোধ আর ভালোবাসা গড়ে উঠুক। নিরাপদ হোক এই পৃথিবী। রবীন্দ্রনাথের সে বাণী যেন ভুলে না যাই আমরা; মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। সে বিশ্বাস ই যেন বড় করে তোলে আমাদের। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর