প্রতিযোগিতার ৫০ বছর পর দেয়া হয় পুরস্কার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২০,   আশ্বিন ১৭ ১৪২৭,   ১৪ সফর ১৪৪২

মিস বেলভেডিয়ার গল্প

প্রতিযোগিতার ৫০ বছর পর দেয়া হয় পুরস্কার

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৪৪ ৩ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৩:১২ ৩ আগস্ট ২০২০

৫০ বছর পর মিস বেলভেডিয়ার। ছবি: সংগৃহীত

৫০ বছর পর মিস বেলভেডিয়ার। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন এখন, আর পুরস্কার পাবেন ৫০ বছর পরে। এমনটা কখনো শুনেছেন? অদ্ভুত হলেও সত্য, এমনই এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় আমেরিকার ওকলাহোমার টালসা শহরে।

সময়টা ১৯৫৭ সাল। সেদিন ছিল মার্কিন অঙ্গরাজ্য ওকলাহোমার সুবর্ণজয়ন্তী। বেশ অদ্ভূত এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তারা। ওই প্রতিযোগিতায় টালসা শহরের বাসিন্দারা অংশ নেন। সবাইকে প্রশ্ন করা হলো, পঞ্চাশ বছর পর টালসা শহরের জনসংখ্যা কত হবে? যার অনুমান ঠিকঠাক বা কাছাকাছি যাবে তিনিই হবেন বিজয়ী।

এই মজার প্রতিযোগিতার পুরস্কারও ছিল বেশ দামি। আবার এটি বেশ পরিচিতও। ভাবছেন কী সেই পুরস্কার? বিজয়ী পাবেন একটি নতুন প্লিমাউথ বেলভেডিয়ার সেডান গাড়ি। সঙ্গে নগদ অর্থ। তখনই ঘোষণা করা হয়, বিজয়ী এসব পুরস্কার পাবেন পঞ্চাশ বছর পর। অর্থাৎ ২০০৭ সালে তিনি এসবের মালিক হবেন। এর কারণটা হচ্ছে, ওকলাহোমার রাজ্যের শতবর্ষপূর্তি হবে ২০০৭ সালে।

যেদিন প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেদিন থেকেই পুরস্কারগুলো সযত্নে রাখা হয়। গাড়িটিকে পঞ্চাশ বছরের জন্য রেখে দেয়া হয়, মাটির নীচে তৈরি করা একটি কংক্রিটের ভল্টে। বিজয়ী যদি জীবিত থাকেন তবে তিনিই পাবেন গাড়িটি। আর যদি তিনি মারা যান, তাহলে গাড়িটি দেয়া হবে তার সবচেয়ে কাছের আত্মীয়কে। এছাড়াও ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখা হবে ১০০ ডলার। সেই টাকা পঞ্চাশ বছর পর বেড়ে যত টাকা হবে, তাও দেয়া হবে বিজয়ীকে।

বেশ জমে উঠেছিল প্রতিযোগিতার আয়োজন। শহরের অনেকেই অংশ নেন এই প্রতিযোগিতায়। উদ্যোক্তাদের কাছে আসতে শুরু করে হাজার হাজার পোস্ট কার্ড। তাতে লেখা ছিল পঞ্চাশ বছর পরে টালসা শহরের আনুমানিক জনসংখ্যা। একটি গোপন খাতায় লেখা হয়েছিল প্রতিযোগীদের নাম ঠিকানা ও তাদের অনুমান করা জনসংখ্যার সংখ্যা। তারপর খাতাটিকে রাখা হয়েছিল ব্যাংকের সুরক্ষিত অ্যাকাউন্টে। এরপর টালসা শহরের কোর্টহাউস প্রাঙ্গণে বানানো হয় ১২ ও ২০ ফুট মাপের কংক্রিটের ভল্ট। উদ্যোক্তারা দাবী করেন, এই কংক্রিটের ভল্টটি যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এমনকি পারমাণবিক বিস্ফোরণও সইতে পারবে।

যেদিন প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেদিনই গাড়িটি সযত্নে রাখা হয়। ছবি: সংগৃহীত

দেখতে দেখতে চলে এলো সেই দিন। শো-রুম থেকে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে টালসা শহরের কোর্টহাউস প্রাঙ্গণে আসে সোনালি রঙা একটি নতুন প্লিমাউথ বেলভেডিয়ার সেডান। গাড়িটি দিয়েছিল প্লিমাউথ মোটর। উদ্যোক্তারা গাড়িটির নাম দেন মিস বেলভিডিয়ার। কয়েক হাজার মানুষের উপস্থিতিতে, গাড়িটিকে ক্রেনে করে নামানো হয় মাটির নিচে থাকা কংক্রিটের ভল্টে। গাড়িটির ভেতরে বিজয়ীর জন্য রাখা হয়েছিল পাঁচ গ্যালন গ্যাসোলিন, পার্কিং লটের টিকিট, সিগারেট, দেশলাই, চিরুনি, লিপস্টিক, চ্যুইংগাম, টিস্যু পেপার, রেইনকোট ও খুচরা  পয়সা। একটি বিশেষ প্যাকেটে রাখা হয়েছিল আমেরিকার পতাকা ও বিভিন্ন শহর থেকে আসা গণ্যমান্যদের শুভেচ্ছা পত্র।

এছাড়াও গাড়িতে ছিল বিজয়ীর প্রাপ্য সেভিংস অ্যাকাউন্টের নথিপত্র। যে অ্যাকাউন্টে বিজয়ীর জন্য রাখাছিল ১০০ ডলার। সঙ্গে রাখা হয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের পাঠানো পোস্টকার্ডগুলোও। এবার প্লাস্টিকের চাদরে মুড়িয়ে ফেলা হয় গাড়িটিকে। কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করে দেয়া হয় ভল্টের ছাদ। কালকুঠরিতে পঞ্চাশ বছরের জন্য বন্দি হয়ে যায় মিস বেলভেডিয়ার।

বিজয়ী হয়েছিলেন রেমন্ড হাম্বার্টসন

দেখতে দেখতে কেটে যায় ৫০ বছর। চলে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করছিল দিনটির জন্য। ১৪ জুন, ২০০৭ সাল। পুরো শহরবাসী অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে মিস বেলভেডিয়ার জন্য। জানার অপেক্ষায় বিজয়ীর নাম। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন রেমন্ড হাম্বার্টসন। ৮২১ জন প্রতিযোগীর মধ্যে বিজয়ী হয়েছিলেন রেমন্ড হাম্বার্টসন। তার অনুমান প্রায় মিলেই গিয়েছিল। তিনি অনুমান করেছিলেন, ২০০৭ সালে টালসা শহরের জনসংখ্যা হবে তিন লাখ ৮৪ হাজার ৭৪৩ জন। প্রকৃত জনসংখ্যা ছিল তিন লাখ ৮২ হাজার ৪৫৭ জন।

বিজয়ী হাম্বার্টসনের খোঁজ করতে গিয়ে জানা যায়, ১৯৭৯ সালে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। তার স্ত্রীও প্রয়াত হন ১৯৮৮ সালে। তাদের কোনো সন্তান না থাকায় তার নিকট আত্মীয়দের খোঁজ শুরু হয়। অবশেষে খুঁজে পাওয়া যায় হাম্বার্টসনের বোন ও বোনের ছেলেকে। তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় মিস বেলভেডিয়ারকে। সঙ্গে সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখা ১০০ ডলার। তবে এতদিনে তা বেড়ে ছয়শ’ ৬৬ দশমিক ৮৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে মিস বেলভেডিয়ার আর তার যৌবনে নেই। ৫০ বছর মাটির নিচে পার করা মিস বেলভেডিয়ার তখন তার যৌবনের সবটুকুই হারিয়েছে।

মনখারাপ হয়ে যায় শহরবাসীর

ভল্টের ওপরের মাটি সরিয়ে, কংক্রিটের ছাদ ভাঙার পর দেখা যায় ভল্টটি চৌবাচ্ছায় পরিণত হয়ে গিয়েছে। প্রায় দুই হাজার গ্যালন পানির নিচে ডুবে আছে মিস বেলভেডিয়ার। ছেঁচে ফেলা হয় ভল্টে জমা সব পানি। মিস বেলভেডিয়ারকে ঢেকে রাখা প্লাস্টিকের চাদরের ওপর এতদিন ধরে কাদামাটি জমে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছে। ক্রেনে করে উপরে তোলা হয় গাড়িটিকে। ট্রাকে করে নিয়ে আসা হয় শহরে। মিস বেলভেডিয়ারের শরীর থেকে তুলে নেয়া হয়েছিল প্লাস্টিকের চাদর। মিস বেলভেডিয়ার দশা দেখে মনখারাপ হয়ে যায় শহরবাসীর।

২০০৭ সালের ১৪ জুন গাড়িটি চৌবাচ্ছা থেকে তোলা হয়, তবে মিস বেলভেডিয়ারের সেই যৌবনে নেই। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরে পানিতে ডুবে থাকার কারণে, পুরো শরীরজুড়ে মরিচা ধরে গেছে। গাড়ির ইঞ্জিন থেকে টায়ার, সবই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। নষ্ট হয়ে গিয়েছিল গাড়ির ভেতরে বিজয়ীর জন্য রাখা সব পুরস্কার। এ অবস্থাতেই বিজয়ীর হাতে তুলে দেয়া হয় গাড়িটিকে।

হাম্বারটনের আত্মীয়রা, ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে, মিস বেলভেডিয়ারকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিউ জার্সিতে। কারণ গাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ইতিহাস। তাই তারা চাইছিলেন মিস বেলভেডিয়ারকে তার আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিতে। এজন্য গাড়িটি তারা দান করেছিলেন আল্ট্রা-ওয়ান নামে একটি সংস্থাকে। সংস্থাটি জানিয়েছিল মিস বেলভেডিয়ারের শরীর থেকে মরিচা তুলতে সময় লাগবে। আল্ট্রা-ওয়ানের মালিক ডুইট ফস্টার, ২০০৯ সালের মে মাসে মিস বেলভেডিয়ারের কয়েকটি ছবি মানুষের সামনে আনেন। দেখা গিয়েছিল, মিস বেলভেডিয়ারের শরীরে শক্ত হয়ে জমে থাকা কাদা ও মরিচা পুরোটাই উঠিয়ে ফেলা হয়েছে।

ফস্টার জানিয়েছিলেন, তিনি ১৯৫৭ সালে তৈরি হওয়া, একটি প্লিমাউথ স্যাভয় গাড়ি কিনেছেন। যে গাড়িটি তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করবে মিস বেলভেডিয়ারকে। সবাই ভেবেছিলেন এটা ফস্টারের ব্যবসায়িক চাল। আদৌ কোনো দিন হারানো সৌন্দর্য ফিরে পাবে না মিস বেলভেডিয়ার। তবে ফস্টার ছিলেন নাছোড়বান্দা। মিস বেলভেডিয়ারের সৌন্দর্য ফেরাতে গিয়ে খরচ করে ফেলেছিলেন ১৫ হাজার ডলার।

শেষমেষ গাড়িটির জায়গা হয় জাদুঘরে। ছবি: সংগৃহীত

অবশেষে ঠাঁই হলো জাদুঘরে

মিস বেলভেডিয়ারের জন্য একটি মিউজিয়াম খুঁজছিলেন ফস্টার। যে মিউজিয়ামে মিস বেলভেডিয়ারকে তার প্রাপ্য সম্মান দিয়ে রাখা হবে। তিনি টালসা শহরের প্রশাসনিক কর্তাদের অনুরোধ করেছিলেন শহরের কোনো মিউজিয়ামে গাড়িটিকে স্থায়ীভাবে রাখার জন্য। তবে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল টালসা শহর। কারণ মিস বেলভেডিয়ারের দুর্দশার জন্য তারাই দায়ী ছিল। শহরের গাফিলতির নিদর্শনকে স্থায়ীভাবে জনসমক্ষে রেখে দিতে চায়নি তারা।

হাল ছাড়েননি ফস্টার। আমেরিকার বিভিন্ন মিউজিয়ামকে অনুরোধ করে চলেছিলেন ঐতিহাসিক গাড়িটিকে স্থান দেয়ার জন্য। অবশেষে সফল হয়েছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে ফস্টার ঘোষণা করেন, ইলিনয়ের হিস্টোরিক অটো অ্যাট্রাকশন মিউজিয়ামে ঠাঁই পেতে চলেছে মিস বেলভেডিয়ার। পঞ্চাশ বছর ধরে কালকুঠরিতে বন্দি থাকার পর, এরইমধ্যে গ্যারেজেও দশ বছর কাটিয়ে ফেলেছে মিস বেলভেডিয়ার। অবশেষে কপালে জুটেছিল স্থায়ী ঠিকানা।

২০১৭ সালের জুন মাসে রওনা হয়েছিল মিস বেলভেডিয়ার, নতুন ঠিকানার উদ্দেশ্যে। বিশ্ব অবাক হয়ে গিয়েছিল মিস বেলভেডিয়াকে। হারানো যৌবন ফিরে এসেছে ষাট বছর বয়সী মিস বেলভেডিয়ারের শরীরে। মৃত্যুর শিকল ছিঁড়ে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে মিস বেলভেডিয়ার, ডুইট ফস্টারের জাদুকাঠির ছোঁয়ায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে