.ঢাকা, শুক্রবার   ১৯ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৫ ১৪২৬,   ১৩ শা'বান ১৪৪০

প্রতিবাদের বিষয় হোক নারীর সম্মান

 প্রকাশিত: ১৯:৪২ ২৩ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৯:৪২ ২৩ অক্টোবর ২০১৮

দেশের হাওয়া এখন বেশ উত্তপ্ত। নির্বাচন, জাতীয় ঐক্য, ইসি বিভক্তি ইত্যাকার বিষয়াদিতে যখন আলোচনায় মুখর চারদিক, তখন রাজনীতির বাইরের একটা বিষয় কদিন ধরে বেশ আলোচিত হচ্ছে। অবশ্য রাজনীতির বাইরেও বলা চলে না। কারণ ঘটনাটি উৎপত্তি হয় জনাব মইনুল হোসেন কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কীনা এমন একটি প্রশ্ন থেকেই।

গত ১৬ অক্টোবর রাতে একাত্তর টিভির এক আলোচনা অনুষ্ঠানে আমাদের অর্থনীতির জ্যেষ্ঠ নির্বাহী সম্পাদক মাসুদা ভাট্টি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে প্রশ্ন করেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে আপনাকে শিবিরের জনসভায় অংশ নিতে দেখা গেছে। সে কারণেই অনেকে প্রশ্ন করছেন, আপনি কি জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে উপস্থিত থাকছেন কি না?’  প্রশ্নটি করামাত্র মইনুল হোসেন ক্ষিপ্ত হয়ে মাসুদা ভাট্টির উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার সাহসের প্রশংসা করতে হয়, তবে আমি আপনাকে একজন চরিত্রহীন বলতে চাই।’

বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় ওঠে।  ১৮ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ নারী সাংবাদিকরা সম্মেলন করে জানান, মইনুল হোসেন প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাইলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। মাসুদা ভাট্টি সেদিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে তার কাছে ক্ষমা চান মইনুল হোসেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ক্ষমা করলেও মইনুল হোসেন অগণিত নারীকে অপমান করেছেন। জনসম্মুখে এ ঘটনা হওয়ায় তাকে অপরাধ স্বীকার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।’

মইনুল তার বক্তব্যের জন্য টেলিফোন করে মাসুদা ভাট্টির কাছে ক্ষমা চান, পরে বিবৃতিও পাঠান। কিন্তু প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাওয়ায় মাসুদা ভাট্টি  তার বিরুদ্ধে মামলা করেন।  উক্ত মামলায় বিবাদীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়।

একই বিষয়ে জামালপুরে জেলা যুব মহিলা লীগের আহ্বায়কও একটি মামলা করেন। ওই মামলাতেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।

মানহানির দুই মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর বিকালে হাইকোর্টে আত্মসমর্পণ করে অর্ন্তবর্তীতীকালীন জামিন চাইলে হাইকোর্ট বেঞ্চ মইনুলকে পাঁচ মাসের আগাম জামিন দেন। মইনুলের আইনজীবীরা দাবি করেন, এ মামলার পেছনে একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে।

 দেশের ৫৫ জন বিশিষ্ট সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন।  ঘটনাটা এই মামলার মধ্য দিয়ে শেষ হতে পারত বা মইনুল হোসেন প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলে মিটে যেত কিংবা মাসুদা ভাট্টি টেলিফোনে ক্ষমা চাওয়ায় ক্ষমাও করে দিতে পারতেন। কিন্তু এর কোনটাই হলো না। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন মাসুদা ভাট্টিকে উকিল নোটিস পাঠালেন।

নোটিসে  উল্লেখ করা হয়, চ্যানেল একাত্তরের একটি টকশোতে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর প্রশ্ন করে তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছেন মাসুদা ভাট্টি।  নোটিশ প্রাপ্তির ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করা হবে। একই সঙ্গে তিনি যে তথ্যের ভিত্তিতে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের উদ্দেশ্যে জামায়াত প্রসঙ্গে কথা বলেছেন তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতির সামনে প্রকাশ করতে বলা হয়েছে।  উকিল নোটিস প্রেরণের দিন রাতেই  রংপুরের একটি মানহানির মামলায় মইনুলকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

মাসুদা ভাট্টির পক্ষে যেমন অনেকে আছেন মইনুল হোসেনের পক্ষেও যে নেই তাও নয়। এমনকি মাসুদা ভাট্টির ব্যক্তিজীবন নিয়েও লেখালিখি হচ্ছে। তিনি পুরুষ থেকে নারী হয়েছেন, স্কুল জীবনে কী কী অশালীন ঘটনা ঘটিয়েছেন, পাকিস্তানীকে বিয়ে করে ডিভোর্স দেবার পরও তার পদবী বয়ে বেড়াচ্ছেন এমন অনেক কথা।  তবে  মোক্ষম তীরটি ছুঁড়েছেন নির্বাসিত লেখক  তসলিমা নাসরিন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি লিখেছেন, ‘ কে মইনুল হোসেন, কী করেন, কী তার চরিত্র, কী তার আদর্শ আমি জানি না, তবে জানি মাসুদা ভাট্টি একটা ভীষণ রকম চরিত্রহীন মহিলা। চরিত্রহীন বলতে আমি কোনোদিন এর ওর সঙ্গে শুয়ে বেড়ানো বুঝি না। চরিত্রহীন বলতে বুঝি, অতি অসৎ, অতি লোভী, অতি কৃতঘœ, অতি নিষ্ঠুর, অতি স্বার্থান্ধ,অতি ছোট লোক। মাসুদা ভাট্টি এসবের সবই।’ এরপর তিনি ১৯৯৬ বা ১৯৯৭  এবং তারপর ২০০৩ সালের দুটি ঘটনার উল্লেখ করে জানিয়েছেন, তিনি তার পাবলিশার হিসেবে চিঠি লিখে  কীভাবে মাসুদা ভাট্টির বৃটেনে পলিটিক্যাল এসাইলামের ব্যবস্থা করেছিলেন।  কিন্তু তার আত্মজীবনীর তৃতীয় খন্ড 'ক'  বের হবার পর দেশের নারী-বিদ্বেষী আর ধর্মান্ধ মৌলবাদি গোষ্ঠির সঙ্গে এক কাতারে  সামিল হন মাসুদা ভাট্টি। মাসুদা  লেখেন,  'ক' বইটি নাকি ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে শরীরে ঘিনঘিনে ঘাওলা রাস্তায় পড়ে থাকা এক বুড়ি বেশ্যার আত্মকথন!’ তসলিমা আক্ষেপ করে আরো লিখেছেন, যখন তার মাথার দাম ঘোষণা করা হলো, তার বিরুদ্ধে লক্ষ লোকের লং মার্চ হলো, ফাঁসির দাবিতে সারাদেশে দিনের পর দিন মিছিল হলো, সরকার একের পর এক তার বই নিষিদ্ধ করলো, তার মত প্রকাশের বিরুদ্ধে মামলা করলো, তাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিল, দেশের কোনো সম্পাদক বা সাংবাদিক কেউ তার জন্য টুঁ শব্দ করেননি।   ২৪ বছর ধরে কোনো সরকারই তাকে দেশে ফিরতে দিচ্ছে না, তা নিয়ে কোনো বিশিষ্টজন  মুখ খোলেন না। নারী সাংবাদিকরা  মাসুদা ভাট্টির পক্ষে প্রেস কনফারেন্স করছেন। তিনি নারীর সমানাধিকারের পক্ষে ৪০ বছর ধরে লিখছেন, লেখার কারণে  তাকে হেনস্থা করলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, কোনো নারী সাংবাদিক  তার ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি ছোটখাটো প্রেস কনফারেন্সও কোনোদিন করেনি।

 তসলিমার দেওয়া স্ট্যাটাসের জবাবে পাল্টা একটি স্ট্যাটাস দেন মাসুদা ভাট্টি। তিনি লেখেন,  তসলিমা সত্যিই তার জন্য চিঠি দিয়েছিলেন কারণ তখন তাকে ব্রিটেন থেকে বের করে দেওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে তিনি পাবলিশার হিসেবে লেখেননি। চিঠি  দিয়েছিলেন তার একজন ‘ফ্যান’ বা সমর্থক হিসেবে বর্ণনা করে। তিনি আরও লেখেন,  তার প্রথম আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘ক’ বের হলে  বই-এর প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি একটি পুস্তক সমালোচনা লেখেন।  তিনি সমালোচনায় বইটি সম্পর্কে এই কথাই বলতে চেয়েছিলেন যে, একজন ব্যক্তির সঙ্গে আরেকজন ব্যক্তির স্বেচ্ছা-সম্পর্কের দায় দু’পক্ষের সমান এবং তা প্রকাশের আগে অন্যপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন পড়ে -‘ক’ বইটি পাঠে তার তা মনে হয়নি। প্রায় কুড়ি বছর আগে লেখা সেই সমালোচনায় তিনি তসলিমা নাসরিনকে কোনোভাবেই ব্যক্তিগত কোনো আক্রমণ করেননি।  তিনি প্রশংসা করে লিখেছেন, আমরা মেয়েরা যে অনায়াস-লেখা লিখতে পারছি তার মূলপথ আমাদের জন্য উন্মুক্ত করেছেন তসলিমা নাসরিন। কিন্তু তিনি মইনুল হোসেনের দেওয়া তকমা “চরিত্রহীন”- কে একটি “ভীষণ” শব্দ জুড়ে দিয়ে তার চরিত্রের সার্টিফিকেট- কে আরো শক্ত করেছেন।

তসলিমা নাসরিন মাসুদার জন্য চিঠি লিখেছেন সেটি ভাট্টি স্বীকার করেছেন। তার বইয়ের সমালোচনা করারও কথাও লিখেছেন। কিন্তু তসলিমা  মাসুদা যে বাক্যটা লিখেছেন  বলে উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ, ‘ক' বইটি নাকি ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে শরীরে ঘিনঘিনে ঘাওলা রাস্তায় পড়ে থাকা এক বুড়ি বেশ্যার আত্মকথন!  সেটি লিখেছেন কীনা সে সম্পর্কে কিছু বলেননি। যদি তিনি সেটি সত্যিই লিখে থাকেন তবে একসময় যিনি তাকে বড় ধরনের সাহায্য করেছিলেন এটি তার প্রতি কোন ভদ্রজনোচিত শালীন বা রুচিশীল বাক্য নয় । তা তার যতই  মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকুক না কেন।  তিনি আক্ষেপ করেছেন, অনেকবার ক্ষমা চাওয়ার পর, অনেক প্রশংসা করার পরও তসলিমা বিষয়টি ভুলতে পারেননি। তসলিমা বার বার লিখেই যাচ্ছেন। হতে পারে , তবে তসলিমার কলমে এর আগে বিষয়টি আমি পড়িনি। এবারই প্রথম জানলাম। 

হ্যাঁ এ কথা ঠিক, মাসুদার এই সঙ্কটকালে তসলিমা এভাবে নাও লিখলে পারতেন।  পুরুষতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট নারীদের সব সময়েই উচিত সঙ্কটকালে একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়ানো। যেমনটি সেদিন তসলিমা মাসুদার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু একথাও তো ঠিক, তসলিমার আক্ষেপ ও ক্ষোভেরও যথেষ্ট কারণ আছে। সত্যিই তো আজ পর্যন্ত তেমনভাবে কেউ কখনই তার পাশে দাঁড়ায়নি, না পুরুষ না নারী।

তসলিমা যদি সত্যিই তোন অপরাধ করে থাকে তার বিচার হতে পারে কিন্তু তাকে নির্বাসিত রাখা হবে কেন? এ ব্যাপারে আমরা কেউ কথা বলি না কেন?  না কোনো নারী সংগঠন না কোনো সম্পাদক বা বুদ্ধিজীবী মহল। কেন? তসলিমার লেখা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে কিন্তু তিনি  সাহসী প্রতিবাদী নির্ভীক স্বচ্ছ। একসময় নারীদের জাগিয়েছিলেন একথা তো ঠিক,  যেটা মাসুদাও স্বীকার করেছেন। আজও অনেকে তার লেখার জন্য অপেক্ষায় থাকে। তারপরও কি তিনি আমৃত্যু নির্বাসিত থাকবেন? যারা আজ সোচ্চার হয়েছেন মাসুদার জন্য তারা কি সোচ্চার হবেন না তসলিমার জন্য?  মাসুদা ভাট্টি আপনার অনেক সমর্থক আছেন, তারা আপনার পাশে আছেন।  একবার তাদের সঙ্গে নিয়ে তসলিমার জন্য সোচ্চার হোন। হবেন মাসুদা?