Alexa প্রতিবন্ধী হয়েও অন্যদের হাসিয়ে জীবন পার করেছিলেন তিনি

ঢাকা, শুক্রবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ৮ ১৪২৬,   ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৪১

Akash

প্রতিবন্ধী হয়েও অন্যদের হাসিয়ে জীবন পার করেছিলেন তিনি

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৫৩ ২৪ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৬:৫৭ ২৪ জানুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

একটা সময় প্রতিবন্ধী শিশু জন্মালে তা সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ বলে ধরা হতো। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে পৌঁছে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। তারা তাদের কর্মেই জয় করেছেন বিশ্ব। আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন নিজের জন্য।

স্টিফেন হকিং বা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা গণিতবিদ জন ন্যাস অথবা ক্রিস্টি ব্রাউন ছাড়াও আরো অনেকের কথাই জানেন। তবে আজকে ডেইলি বাংলাদেশের সাতরং এর আয়োজনে আপনাদের জন্য থাকছে অন্য একজনের গল্প। যিনি শারীরিক এবং মানসিক দিক থেকে দুর্বল হওয়ার পরও অন্যদের আনন্দ দিয়ে গেছেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন মানুষকে খুশি রাখতে শারীরিক বা মানসিক কোনো প্রতিবন্ধকতাই বাঁধা হতে পারে না। মানুষের মনের ভালো থাকাই তাকে খুশি রাখতে সাহায্য করে।

সেহলিটিজযার কথা বলছি তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১০ই সেপ্টেম্বর ১৮৯০ সালে আমেরিকার ব্রনক্সে। সাইমান মেডস পোশাকি নাম হলেও পৃথিবী তাকে চিনেছিল সেহলিটিজ নামেই। সেহলিটিজ জন্মের পর আর দশটা সাধারণ শিশুর মতোই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে জানা যায় তিনি মাইক্রোসেফলি নামক এক মস্তিষ্কের রোগে আক্রান্ত। এটি এমন একটি রোগ যেটাতে মানুষের চেহারা শিশু অবস্থা থেকে মাত্র সামান্যই পরিবর্তন হয়। শরীর বেড়ে উঠলেও মস্তিষ্কের বৃদ্ধি থমকে যায় একটা সময় পর্যন্ত।
 
যারা এ রোগে আক্রান্ত তাদের অনেক নামেই ডাকা হয়ে থাকে। এরমধ্যে থ্রুস, র‍্যাগ পিপলস বা পিন হেটস পিপলস বেশি প্রচলিত নাম। মাইক্রোসেফলিতে সাধারণত শিশু গর্ভাবস্থায় থাকাকালীন আক্রান্ত হয়ে থাকে। গর্ভাবস্থায় মায়ের অতিরিক্ত মদ্যপান এ রোগের জন্য সবথেকে বেশি দায়ী। এছাড়াও জেনেটিক কারণেও এটি হয়ে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মাইক্রোসেফলির কোনো চিকিৎসা নেই।

সেহলিটিজ এবং তারই মতো আরো অনেকে সেহলিটিজের জন্ম আমেরিকার একটি ধনী পরিবারে হয়েছিল। আথিলা নামে সেহলিটিজের একটি বোন ছিল। দুর্ভাগ্যবশত সেও একই রোগে আক্রান্ত ছিল। সেহলিটিজের বাবা-মা তাদের এই আজব দেখতে বাচ্চাদের জন্য লজ্জাবোধ করতেন। তারা ভয় পেতেন যে তাদের বাচ্চাদের দেখে মানুষজন হাসাহাসি করবে। এমনকি সেহলিটিজ এবং আথিলকে তারা সবসময় বাড়িতেই লোক চোক্ষুর আড়ালে রাখার চেষ্টা করতেন। এরপর সেহলিটিজের বাবা-মা তাদের দুই ভাই বোনকে ড্রিমল্যান্ড সাইডস নামে একটি সার্কাসে বিক্রি করে দেন। যাতে অন্যরা তাদের দেখে মজা নিতে পারে আর অন্যদিকে তারাও নিজেদের মতো বাঁচতে পারে। এখানেই তারা সঠিকভাবে বেড়ে উঠবে, আর ভালোবাসা এবং পরিচর্যা পাবে।

সেহলিটিজ ও তার বোন আর এখান থেকেই সেহলিটিজ এবং আথিলের নতুন জীবনের শুরু হয়েছিল। পরিণত যুবক হওয়া স্বত্বেও সেহলিটিজের মস্তিষ্কের গঠন ছিল একটি তিন বছরের শিশুর মতো। তিনি কথা বলতেন শিশুদের মতো ছোট ছোট শব্দে। সার্কাসে থাকাকালীন সেহলিটিজকে সব সময় মেয়েদের পোশাক পরিয়ে রাখা হতো। আর এ পোশাক পরেই তিনি সার্কাসে পারফ্রম করতেন। সেহলিটিজ তার সারল্য আর আদুরে ভাব দিয়ে সবার মন জয় করে ফেলতো নিমিষেই। কিন্তু সেহলিটিজ কি করছেন আর করবেন তা কিছুক্ষণ পর পর ভুলে যেতেন। আর খুব তাড়াতাড়িই ধৈর্য্যচ্যুত হয়ে পড়তেন। তাই সেহলিটিজের কেয়ারটেকার সবসময় তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকতেন। অল্পকিছুদিনের মধ্যেই সেহলিটিজের হাসিখুশি থাকা আর সবাইকে খুশি রাখার প্রতিভা সবাইকে মুদ্ধ করে। সেইসঙ্গে সবাই তার ভক্ত হয়ে যেতে থাকে। তার আশেপাশে যে মানুষরাই থাকতেন তারাই খুব তাড়াতাড়ি তার স্বভাব এবং কথায় খুশি হয়ে যেতেন।

সেহলিটিজসার্কাসের মাধ্যমে সেহলিটিজ এতোটাই বিখ্যাত আর পরিচিত হয়ে যান যে, পরবর্তীতে তাকে হলিউডের বিখ্যাত এবং বড় বড় পরিচালকরা কাজের আমন্ত্রণ জানায়। এরপর তিনি ফ্রিকস ছাড়াও বক্স অফিস কাপানো বেশ কিছু ছবিতে কাজ করেছেন। ছবিতে কাজ করার পর থেকে সেহলিটিজের খ্যাতি আরো ছড়িয়ে যায়। এছাড়াও তার ভক্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকে।

১৯৩৬ সালে জর্জ নামের সার্কাসের একজন ট্রেইনার সেহলিটিজকে দত্তক নেন। কিন্তু জর্জের মৃত্যুর পর তার মেয়ে সেহলিটিজকে একটি মানসিক হাসপাতালে রেখে আসে। সেই হাসপাতালে তিন বছর থাকার পর সেহলিটিজকে তার এক বন্ধু অন্য একটি সার্কাসে কাজের জন্য নিয়ে যায়। হাসপাতালের বন্দী জীবন সেহলিটিজকে আরো অসুস্থ করে দিয়েছিল। তাই তার বন্ধুর অনুরোধে হাসপাতাল কতৃপক্ষ সেহলিটিজকে মুক্ত করে দেয়। এ সার্কাসেই সেহলিটিজের অনেক দিন কেটে যায়।

সেহলিটিজসেহলিটিজের এতো খ্যাতি থাকলেও তার নিজের কোনো ঠিকানা ছিল না। এরপর সেহলিটিজ অবসরে চলে যান। সেহলিটিজ তার অসুস্থতার কারণে অনেক কষ্ট করেছেন। সেহলিটিজির মাইক্রোসেফলি ছাড়াও মৃগী রোগ ছিল। তাছাড়া শেষ বয়সে এসে তিনি ঠিকভাবে দেখতে এবং শুনতে পেতেন না। ১৯৭১ সালে ৭০ বছর বয়সে সেহলিটিজ মৃত্যুবরণ করেন।     

ভাবতে পারেন কেমন এক জীবন পার করেছেন সেহলিটিজ। সারাটা জীবন তিনি অন্যের হাসি মুখের কারণ হয়েছেন। নিজের জন্য কিছুই করেন নি। না করেছিলেন একটি বাড়ি, না করেছিলেন বিবাহ। তিনি পৃথিবীকে দেখিয়েছিলেন মানুষের শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতা থাকলেও অন্যকে হাসানো সম্ভব। আর পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে শারীরিক, মানসিক সুস্থতা বা অর্থ বিত্তের তেমন কোনো প্রয়োজন নেই। মনের সুস্থতাই আপনাকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখবে দীর্ঘদিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ