ঢাকা, শুক্রবার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৯ ১৪২৫,   ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০

প্রতিকারহীন প্রতারণার ফাঁদ

 প্রকাশিত: ১৭:২০ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৭:২০ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আমার চল্লিশ বছরের পুরোনো এক বন্ধু সকালে ম্যাসেঞ্জারে  ৫০০০টাকা চেয়ে কাল ফেরৎ দেয়ার অঙ্গিকার করলেন। আমি সম্মত হলাম। উনি একটি পার্সোনাল বিকাশ নাম্বার পাঠিয়ে বিকাশ করতে বললেন। 

জানালাম, আমি ভীষণ অসুস্থ, হাঁটতে পারছি না।  ছেলে ঘরে ফিরলে বিকেলে পাঠাবো। উনি বার বার অনুরোধ করতে লাগলেন। এমন অনুরোধ ওনার স্বভাবের সঙ্গে যায় না। ভাবলাম, নিশ্চয়ই খুব প্রয়োজন ওনার। তাই ড্রাইভারের মাধ্যমে বিকাশ করে বন্ধুকে টাকা পাঠানোর খবর জানালাম। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু বললেন, তার আইডি হ্যাক হয়েছে। আমিসহ আরো দুতিনজনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। দুজন ফোন করায় বেঁচে গেছে।

আমি বিকাশের দোকানে পাঠালাম যদি ভাগ্যক্রমে টাকা না যেয়ে থাকে। তারা জানালো, টাকা সঙ্গে সঙ্গে চলে গেছে । তাদের আর কিছু করণীয় নেই। বিকাশ হেল্প লাইনের একটা নাম্বার দিয়ে বলল, ওদের সঙ্গে কথা বললে আদৌ যদি কিছু করার থাকে ওরা করবে। দুঃখজনকভাবে সকাল থেকে  সন্ধ্যে অবধি চেষ্টা করেও তাদের হেল্পলাইনে ঢুকতে পারলাম না। নেট থেকে অন্যান্য নাম্বার নিয়েও চেষ্টা করলাম। ফলাফল শূন্য।

বিকাশ কোম্পানি একচেটিয়া ব্যবসা করছে । তাদের কেন মাত্র একটা হেল্পলাইন? আর সেটি যদি সারাক্ষণ ব্যস্তই থাকে তাহলে ওটাকে হেল্পলাইন বলার অর্থ কী? এই প্রহসনের মানে কী? কাস্টমারদের সুবিধা  আর সুরক্ষা প্রদানের কি ব্যবস্থা তারা নিয়েছে? নাকী এদেশে কোনো কিছুর প্রতিকার হয় না বলে তারা ধরেই নিয়েছে যা হয় হোক, আমাদের কিছু হবে না?

এরপর পুলিশের দ্বারস্থ হতে চাইলাম। ৯৯৯-এ ফোন করলে কেউ একজন বলল, এ জাতীয় কাজ তারা করেন না। ৯৯৯ জাতীয় এমার্জেন্সির কাজ করে। অর্থাৎ সাইবার ক্রাইম জাতীয় এমার্জেন্সির মধে পড়ে না আর আমিও এ জাতির কেউ না। আমি একটু কড়া গলায় কথা বললে তিনি জানালেন, এখান থেকে ট্রেকিং-এর কোন ব্যবস্থা নেই। তবে আমি বড় অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে পারি। সেটাই চাইলাম। বড় অফিসার একই কথা বলে স্থানীয় থানায় লাগিয়ে দিলেন।

এবার থানা। ওসি সাহেব নেই । ডিউটি অফিসার ধরলেন। তিনি মহিলা। সব শুনে বললেন, আমি টাকাটা পাঠিয়ে খুবই  বোকামি করেছি। জানালেন জিডি না করলে কিছুই করার নেই। আমাকে গিয়ে জিডি করতে হবে। আমি অনলাইনে জিডি করা যায় কিনা জিজ্ঞাসা করলে তিনি অনিশ্চিতভাবে বললেন, ‘এমন তো দেখিনি।’ আমার অসুস্থতার কথা  বলাতে বললেন, ‘এক কাজ করুন একটা জিডি লিখে ড্রাইভারকে দিয়ে পাঠিয়ে দিন অথবা সাদা কাগজে সই করে পাঠিয়ে দিন। জিডি না করলে আমি একসনে যেতে পারছি না।’

সদ্য ধরা খেয়ে সাদা কাগজে সই করার সাহস আর হলো না। নিজ হাতে লিখে জিডির দুটো কপি ডিউটি অফিসারকে ফোন করে ড্রাইভারের নাম বলে ওকে পাঠালাম। কি করতে হবে পই পই করে বলে দিলাম ড্রাইভারকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ড্রাইভার ফোন দিয়ে জানালো,  ডিউটি অফিসার তাকে বলেছেন কাওরানবাজারে তাদের একজন অফিসার আছে তাকে জিডি দেখিয়ে আনতে। আবার ফোন করলাম ডিউটি অফিসারকে। অফিসার ড্রাইভারের ওপর মারাত্মক চটে গিয়ে বললেন, ‘অফিসার থানাতেই আছে। আমার ড্রাইভার ভুল শুনেছে। তিনি ড্র্রাইভারকে তার কাছে পাঠাচ্ছেন। এটা তাদেও নতুন নিয়ম।’ আমিও ড্রাইভারকে গালমন্দ করলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ড্রাইভার জানালো, যার সঙ্গে দেখা করতে হবে তিনি আছেন ডিউটিতে বসুন্ধরার সামনে। এখন ও সেখানে যাবে। আমি তার কাছ থেকে ওই অফিসারের ফোন নাম্বার নিয়ে তাকে  ফোন দিয়ে জানলাম তিনি সত্যিই ডিউটিতে আছেন এবং বসুন্ধরার সামনে। আমি মহিলা অফিসারের কথার বৈপরীত্যে অবাক হলাম। বসুন্ধরার সামনে যিনি আছেন তাকে বললাম, ‘জিডিটা কি আপনাকে দেখানো সতিই জরুরি। আমি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলাম।’ এবার তিনিও ড্রাইভারের দোষারোপ করলেন।  বললেন, ড্রাইভার তাকে কিছুই খুলে বলেনি। আমি অবশ্য তাকে জিজ্ঞাসা করিনি তিনি জানতে চেয়েছলেন কীনা। এরপর তিনি বললেন, ঠিক আছে দেখানোর কিছু নেই। এটা খুন বা মারামারি জাতীয় কিছু নয়। তিনি থানায় বলে দিচ্ছেন। তবে সঙ্গে এটাও বললেন, এই জাতীয় জিডিতে কিছুই হয় না। কিছুদিন আগে একজন তার কাছ থেকে মেসেঞ্জারে মেসেজ পাঠিয়ে ২৫০০টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আমি বিরক্তির সঙ্গে বললাম, ‘আপনি চেষ্টা না করে, নেগেটিভ কথা বলেই যাচ্ছেন’। তখন তিনি বললেন, থানায় বলে দিচ্ছেন। ডিউটি অফিসার  জিডি নিয়ে নেবেন। এরপর আবারো সেই মহিলা অফিসারকে থানায় ফোন দিয়ে বললাম, তিনি যার কথা বলেছেন তিনি থানায় নেই, আছেন বসুন্ধরার সামনে। এবার মহিলা তড়িঘড়ি বললেন, থানা এলাকাতে ডিউটিতে আছেন। আচ্ছা আচ্ছা আমি জিডি নিয়ে নিচ্ছি। এবং অবশেষে জিডি হলো কিন্তু বুঝে গেলাম অন্য অনেক জিডির মতোই এটা করার জন্য করা। এতে  কোনই ফললাভ হবে না। এটা ঘুমন্ত থাকবে থানাতেই।

তা নয় হল, এ আর নতুন কথা কী! কিন্তু যে অফিসার ডিউটিতে টহলে থাকবেন তিনি কী করে থানায় জিডি দেখবেন বুঝলাম না। আর এটা যদি সত্যিই নিয়ম হয়ে থাকে তাহলে জিডি করার জন্য একজন ভিকটিমকে খুঁজে বের করতে হবে ওই  অফিসার কোথায় টহলে আছেন। থানা অধিক্ষেত্রের মধ্যে যেখানেই তিনি থাকবেন সেখানেই যেতে হবে ভিকটিমককে। তারপর ফিরতে হবে থানায় । আর যদি লেখা অফিসারের পছন্দমতো না  হয়, তাহলে নতুন করে আবার রাস্তায় বা মাঠে বসে জিডি লিখতে হবে। বাংলাদেশ পুলিশের অবস্থা কী এতটাই খারাপ বা জনবল এতটাই কম যে থানার কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে এই দায়িত্ব দেয়া যায় না!

তবে ধন্যবাদ দিই ওই পুলিশ অফিসারকে যিনি সরাসরি বলেছেন জিডি করলে কিছুই হবে না। ধন্যবাদ আপনার সত্যবাদিতার জন্য। জিডি বা এফআইআর করে যে কতটা ফল হয় তা কম- বেশি সবাই জানেন। বছর পাঁচেক আগে আমার ছেলের দুই লাখ টাকা ছিনতাই হয়। ছেলে ছিল রিকশায় আর ছিনতাই হয় গাড়ি থেকে।  এবং সেই ছিনতাই ঠেকাতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে  ছেলের ডানহাত ভেঙে যায়। তেজগাঁ থানায় জিডি করা হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকতার কথা অনুযায়ী। জিডি তিনিই লেখেন। ছেলে বাম হাতে সই করে তাতে। পরবর্তীতে অন্য একটি সূত্রে ওই গাড়িটি ধরা পড়লে কাগজে খবর পড়ে আমার ছেলে গাড়ি এমনকি আসামীও সনাক্ত করে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে নিজে পুলিশ কমিশনারকে বলেছিলেন। আমি তখন চাকরিতে ছিলাম । বার বার পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের বলেছিলাম। আমার ছেলে টাকা ফেরৎ পায়নি। ধৃত আসামিদের কি হয়েছে জানার স্পৃহা আর হয়নি। তখন বলা হয়েছিল জিডি ত্রুটিপূর্ণ। অথচ জিডি তাদেরই লেখা।

এপ্রিল মাসে কাওরানবাজার সিগনালে গাড়ি থেকে আমার মোবাইল ছিনিয়ে নেয় চার আঙ্গুল গ্লাসের ফাঁক দিয়ে। জিডি করি। অনেক বলা কওয়া করি।  কিছুই হয়নি। যেমন আমার হয়নি তেমনি অধিকাংশের হয়নি। আমি তো তবু জিডি করতে পেরেছি, অনেকে তাও পারে না।

অথচ আমরা শুনি, পুলিশ নাকী দারুণ কাজ করছে ! পুলিশ দারুণ কাজ করছে নাকী নিদারুণ সেটাই বুঝি না।  প্রযুক্তিতে নাকী দুর্দান্ত  গতিতে এগিয়ে গেছি! এগিয়ে গেছি অপরাধে, প্রতিকারে নয়। থানার মহিলা পুলিশ অফিসার বলেছিলেন, আমি  সরল, বোকামি করেছি। কিন্তু দেশের সব মানুষকে যদি প্রতি দিন প্রতি মুহূর্তে বুদ্ধিমান চালাক আর জটিল হবার চেষ্টা করতে হয় তাহলে দেশ থেকে তো সুকুমার বৃত্তিগুলো, বিশ্বাস আস্থা দরদ ভালবাসা উঠে যাবে।  বন্ধু বন্ধুর উপকারে লাগবে না, দুর্ঘটনার খবর পাবার পরও পিতা ছেলেকে টাকা পাঠাবে না। হয় নিজে যাবে নাহয় ফোন করবে। যেতে গিয়ে যদি অবধারিত জ্যামে পড়ে বা পথে কোনো সমস্যা হয় কিংবা ফোন যদি বন্ধ থাকে বা নেটওয়ার্কে সমস্যা থাকে আর সমস্যাটা সত্যিকার হলে সেই সময়ে ছেলে মারাও যেতে পারে সেটার প্রতিকার কী!

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর