.ঢাকা, শনিবার   ২০ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৭ ১৪২৬,   ১৪ শা'বান ১৪৪০

নি য় মি ত ক লা ম

প্রকাশনা শিল্পের উৎকর্ষ ও লেখকের সৃজনশীলতা

 প্রকাশিত: ১৩:৩২ ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৭:১৭ ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ফকির-ইলিয়াস--কবি-প্রাবন্ধিক-স্থায়ীভাবে-বসবাস-করছেন-নিউইয়র্কে-প্রকাশিত-গ্রন্থসংখ্যা---১৮-কমিটি-টু-প্রটেক্ট-জার্নালিস্টসএকাডেমি-অব-আমেরিকান-পোয়েটস-দ্যা-এমনেস্টি-ইন্টারন্যাশনাল-আমেরিকান-ইমেজ-প্রেস--এর-সদস্য

আমাদের চারপাশে এখন অনেক লেখক। কেউ খুব ভালো লেখেন। লেখার প্রস্তুতি নেন কেউ। পড়া-জানা-অধ্যবসায়  খুলে দেয় লেখালেখির দরোজা। অনলাইনে অনেক ভালো লেখক আছেন। অনেক লেখকের লেখা অনেক পাঠকের ভালো লাগে। আবার অনেক সমোঝদার, হৃদয়বান পাঠক আছেন- যারা লেখার পৃষ্ঠপোষকতা করেন উদারতা দিয়ে।

লেখালেখি যারা করেন তারা চান, তাদের লেখা প্রকাশিত হোক। কিন্তু দিনে দিনে প্রকাশনার সংকট যেনো বেড়েই চলেছে।
প্রকাশকরা প্রথম যে বিষয়টিকে নিরুৎসাহিত করেন তা হচ্ছে কবিতা। কবিতার বই ৩০০ কপি ছাপিয়েও চলে না! এমন একটা অভিযোগ শোনা যায় প্রতিনিয়ত। অনেকে নিজে টাকা খরচ করে বই বের করেন।  তারপর তা বিক্রি করে টাকা তোলার চেষ্টা করেন। অনেকের টাকা থাকে না। তাই মেধাবী লেখক/কবি হবার পরও বই বের করা হয় না তাদের। এটা বেদনাদায়ক। আজকালের মুক্তবাজার অর্থনীতির মাঠে বই বের করলেই শুধু নয়, বইয়ের বিজ্ঞাপন ছাপতে খরচ করতে হয় বেশ বড় অংকের টাকা। ৪০/৫০ হাজার টাকা চলে যায় বিজ্ঞাপনে। এটাই বাস্তবতা। এই সংকটকালীন সময়ে ক্রমঃশ-ই ছোটো হয়ে আসছে প্রকাশনার ব্যাপৃতি। মেধাবী অনেক লেখকই বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকাশনা থেকে।

এ বিষয়ে কিছু কথা আমি সব সময় ভাবি। যারা সামর্থবান-সমোঝদার পাঠক, তারা কি তাদের প্রিয় কোনো মেধাবী লেখকের কোনো বইকে একক অথবা যৌথভাবে স্পনসর করতে পারেন না? একজন লেখকের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসতে পারেন না?
অন্যদিকে যারা সৃজনশীল প্রকাশক , তারা লেখকদের কাছ থেকে টাকা না নিয়ে (রয়ালটি দেয়া তো দূরের কথা !) কি প্রতি বছর অধিক সংখ্যক বই প্রকাশে আগ্রহ বাড়াতে পারেন না ? একটা প্রকাশনা সংস্থা তো মেধাকে  প্রথম বিবেচনা দিতে পারে। দেয়া দরকার ও। আর তা না হলে একটা জাতির, ভাষার সাহিত্য এগুবে কিভাবে ঢাকায় একুশে বইমেলা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের একুশের বইমেলা মাসব্যাপী আয়োজনের মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বের সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে একটি নিজস্বতা তৈরি করে নিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই বইমেলা হয়। তবে মাসব্যাপী নয়। তিন/চারদিন। কখনো এক সপ্তাহ। আর পাশ্চাত্যে এখন বইক্রেতারা অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন ইন্টারনেটের ওপর। ‘বার্নস এন্ড নোবলস’ কিংবা ‘আমাজন ডটকমে’ অর্ডার দিয়ে ঘরে বসে প্রিয় বইটি পেতেই বেশি আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্রের পাঠকরা। বই প্রকাশনার ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট একটা বড়ো ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। অনেকগুলো ই-ম্যাগাজিন উদ্যোগী হয়ে বের করছে ই-বুক।

আজ থেকে প্রায় একযুগ আগে পশ্চিম বাংলা এবং ইউরোপ-আমেরিকা-কানাডার জয়েন্ট ভেঞ্চারে পরিচালিত একটি কবিতার ওয়েবসাইট যখন আমাকে, আমার একটি কবিতার বই বের করার আহ্বান জানায়, তখন আমি আশ্চার্যান্বিত না হয়ে পারিনি। পরে তারা যখন আমার বইটি আপলোড করলেন তখন মুগ্ধ হয়েছিলাম মনে প্রাণে। কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তির সঙ্গে চমৎকার চিত্রশিল্পের সমন্বয় করেছেন ডিজাইনাররা। ভাষা, কবিতা এবং শিল্পের প্রতি এই যে দরদ, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। একটি প্রজন্মের, একটি মানবগোষ্ঠীর সৃষ্টিশীলতা এমনটিই হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা পারছি না অনেক কিছুই। কিংবা আমাদেরকে পারতে দেওয়া হচ্ছে না। গোটা সভ্যতার অগ্রযাত্রাকেই যেন থামিয়ে দেওয়ার সর্বাতক প্রচেষ্টা! বিশ্বব্যাপী দেশে-দেশে। আজ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বরাদ্দের চেয়ে, অস্ত্রের প্রতি বরাদ্দ বেশি। অস্ত্র জীবন হনন করে। আর সংস্কৃতি গড়ে তোলে চিত্তের বিশালতা। তারপরও কেন এই হনন পর্ব? কেন রক্তের হোলিখেলা?

বাংলাদেশের একুশের বইমেলা স্বচক্ষে আমার দেখা হয়নি দীর্ঘদিন। তারপরও প্রতিদিনের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রতিদিনের বইমেলার রিপোর্ট পড়ে আমিও যেন মিশে যাই বইমেলার লাইন দেওয়া জনতার সঙ্গে। প্রতিদিনের বই প্রকাশের তালিকা পড়ে পড়ে আমিও যেন পাল্টে দেখি নতুন বইগুলোর প্রচ্ছদ। বইমেলার প্রাত্যহিক তালিকা দেখে আমার প্রিয় এবং প্রয়োজনীয় বইগুলোর একটি তালিকা আমি করে রাখি প্রতি বছরই। এবং সময় সুযোগ মতো বইগুলো সংগ্রহও করি। নিউইর্য়কে এখন বই বিতান একটিই জ্যাকসন হাইটস এলাকায়। মুক্তধারা।
এর আগে অবসর, অবকাশ, অনন্যা­ নামে আরও তিনটি বইঘর ছিল। এখন নেই।বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

বাংলাদেশী টাকায় একশত টাকার বইটির মূল্য এখানে নেওয়া হয় পাঁচ ডলার। অর্থাৎ বিশ টাকার সমানে এক ডলার। অথচ এক ডলারের ব্যাংকিং মুদ্রামূল্য প্রায় পঁচাশি টাকা। যারা বইগুলো বিক্রির জন্য আনেন, তাদের বক্তব্য হচ্ছে আনাতে ওজন খরচ দিতে হয় খুব চড়া। প্রবাসীরা নানা দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট নিউইয়র্ক পর্যìত আনার ব্যবস্থা করেছিলেন। বিমান আসার পরও কিন্তু বই আমদানিকারকরা বইয়ের মূল্য কমাননি। এখন বিমান বন্ধ হয়ে গেছে। আমদানিকারকরা ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, গালফ এয়ার, এমিরেটস, ইতিহাদ, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, থাই এয়ারওয়েজে তাদের মালামালগুলো আনছেন। বইয়ের মূল্য বিমান যখন আসতো­ তখন যেমন ছিল, এখনো তেমনি আছে। তাহলে লাভবান কারা হচ্ছেন? পাঠকরা না বিক্রেতারা? পাঠকতো পড়তে চান। বই বিক্রিতে মুনাফা একটু কম করলে হয় না? বইয়ের সঙ্গে অন্যান্য মালপত্তর তো ব্যবসায়ীরা আনছেন। এ কথা কে কাকে বুঝাবে?

বলছিলাম ই-বুকের কথা। ই-বুকের একটি বিশেষ সুবিধা হচ্ছে ইন্টারনেট এক্সেস থাকলে বইটি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে বসে পড়তে পারেন পাঠক-পাঠিকা। এক সঙ্গে হাজারো পাঠক-পাঠিকা পড়তে পারেন। ই-বুক প্রকাশনায় ভারতের, বিভিন্ন শিক্ষালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীরা দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন।

সাহিত্যের প্রতি এই যে মমত্ববোধ, তা-ই আজকের বিবর্তনের একটি অন্যতম ধাপ। অধ্যয়নই তো মানুষের জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয়। মানুষকে আলোকিত করে।

বাংলাদেশে, বাংলা ভাষায় এই যে আলোর প্রজ্বলন ঘটানোর সংগ্রাম তা অনেকেই করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। এদের অন্যতম একজন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্ণধার অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ।।অধ্যাপক সায়ীদ এই দেশ ও জাতির মননে সৃষ্টির চেতনা জাগানোর যে অক্লান্ত শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন, তাতে তার চাওয়া পাওয়া কিছুই নেই।

 একটি সুসভ্য দেশে সাহিত্য-সংস্কৃতির বলয়কে রাজনীতি, রাজনৈতিক মতবাদ প্রভাবিত করে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিল ক্লিনটন,বারাক ওবামা,ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন লেখক, নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের এই সময়ের পোয়েট লোরিয়েট এলিশিয়া অস্ট্রিকার'-ও তেমনি একজন লেখক। এ ক্ষেত্রে দুজনের আসনই সমান। এখানের বিচারকরাও ‘ডেমোক্রেট’ কিংবা ‘রিপাবলিকান’ বলয়ের তাবু টাঙিয়ে বিভক্তির সেতু রচনা করেন না। অথচ বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যের কোটি কোটি পাঠকের চোখে ধুলো দিয়ে প্রতারিত করা হয়েছে, হচ্ছে। এই দুর্ভাগ্য গোটা জাতির।
 মননশীল এবং সৃজনশীল লেখক তৈরিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা আছে বৈকি। কিন্তু তা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে। যারা বিচারক হবেন কিংবা যাদেরকে বিচারকের দায়িত্ব দেওয়া হবে তাদেরকে মনে রাখতে হবে তারা একটি জাতি, একটি সাহিত্যের বিবেক হিসেবে কাজ করছেন।

এখানে একজন খ্যাতিমান মার্কিন কবি ডনাল্ড হালের একটি উদ্ধৃতি দিতে চাই। কবি বলেন, প্রতিটি সাহিত্যে দুধরনের পাঠক থাকে। একদল বলে, আপনার অমুক লেখাটি দেখেছি। আর অন্যদল বলেন, আপনার অমুক লেখাটি পড়েছি। কোনো সমাজে ‘দেখেছি’র সংখ্যা যদি বেড়ে যায় তবে বিপর্যয় দেখা দেয় সামাজিকভাবে। তাই সব সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেকোনো ভাষায়, যেকোনো সাহিত্যে ‘পড়েছি’র সংখ্যাধিক্য যেন বহাল থাকে।

এবার বলি বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প বিষয়ে। প্রকাশরা লেখক বাগাতে ব্যস্ত। না, এমনটি হবার কথা ছিল না। আমরা দেখেছি মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা লেখক খুঁজে বের করে বই প্রকাশ করতেন। বাংলাদেশের অনেক (আজ প্রতিষ্ঠিত) লেখককের বই বের করেছিলেন চিত্ত বাবু। সেই সময় এখন নেই কেন? সেই প্রকাশক এখন নেই কেন? যাদের বই দরদাম করে বের করা হয় তাদের সংখ্যা হাতেগোনা। আর বাকিরা! বাংলাদেশেই নয়, ভারতেও চলছে এখন প্রকাশনা বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের প্রধান খদ্দের- দেশের যশপ্রার্থী নতুন কবি, প্রাক্তন আমলা, প্রাক্তন সেনা অফিসার, আর বিদেশে অবস্থানরত এক শ্রেণীর লেখক-কবি। এছাড়াও কিছু মিডিয়ার সাংবাদিক বন্ধুরা মাথা বিক্রি করেছেন, কিছু তথাকথিত ‘প্রকাশক’দের কাছে। তারা কাউকে তুলছেন। কাউকে নামাচ্ছেন। সততার খুবই অভাব সর্বত্র।

সবচেয়ে বেশি শিকার প্রবাসী লেখকরা। কথার শুরুতেই প্রকাশক বলেন, ৩৫/৪০ হাজার টাকা দেবেন। বই করে দেবো প্রথম কোয়ালিটি। লেখক তাতেই খুশি। বই বেরুচ্ছে! লেখক ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ব্লগ, ফেসবুক, ইমেজ প্রচারণায়। আর প্রকাশক টাকা কামাই করে ১০০ কপি বই প্রবাসী লেখককে ধরিয়ে দিয়ে তাকান ‘নেক্সট টার্গেট’ এর দিকে।

আচ্ছা, দেশে এই যে এত প্রকাশক তারা ক'টি সৃজনশীল বই বের করেন? প্রকাশ নাকি বানিজ্য- তা নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। যাবে।
তাই বলে বাংলাদেশে পেশাদার প্রকাশক যে নেই, তা আমি বলছি না। এমন অনেক প্রকাশক আছেন, যারা লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে নিজেদের অবস্থান দাঁড় করাতে চাইছেন। এদের কেউ কেউ কোনোমতে টিকে আছেন। কেউ কেউ এই পেশা থেকে সরে দাঁড়াবার কথাও ভাবছেন। প্রকাশনা জগতে এখন চলছে আরেক ধরনের সন্ত্রাস। কিছু কিছু প্রকাশনী ভারতীয় নামকরা লেখকদের বই তাদের অনুমতি না নিয়েই সস্তা কাগজে ছেপে বাজারে ছেড়ে টাকা কামাচ্ছে। আবার কিছু প্রকাশক, বিভিন্ন অনুবাদকের বই তাদের অনুমতি না নিয়েই ছেপে টাকা কামাই করছে। এরা অনুবাদকের অনুমতি নেয়া, কিংবা রয়্যালিটি দেয়া- দুটোর কোনোটাই করছে না। কে রুখবে এদের?

প্রকাশনা শিল্পের আরেকটি দুঃখজনক অধ্যায় হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় উদারতার অভাব। দেখা যায় যখন বিএনপি ক্ষমতায় থাকে তখন তারা নিজ দল ও মতের কিছু লেখকের বই কিনে সরকারি উদ্যোগে। আবার আওয়ামী লীগ এলে তারাও নিজ নিজ মতাদর্শের গুরুত্ব দিয়ে কিছু বই কেনে। প্রকৃতপক্ষে যে পরিমাণ বই সরকারি পর্যায়ে কেনা হয়, তা কোনো মতেই পর্যাপ্ত নয়। বিশ্বের প্রতিটি উন্নত দেশে ‘পাবলিক লাইব্রেরি’ রয়েছে জমজমাট পসরা নিয়ে। যেসব দেশের সরকার এসব লাইব্রেরির জন্য বই কিনে বড় বাজেটের। বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি শক্তভাবে গড়ে ওঠেনি। দুচারটি এনজিও কিছু বই কিনলেও সরকারি উদ্যোগ হতাশাজনক। সরকার চাইলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বই কেনার একটা বড় বাজেট রাখতে পারতো। বিভিন্ন লাইব্রেরিতে তারা বই কিনে ডোনেট করতে পারতো। যে কাজটি একইভাবে করতে পারেন দেশের চিত্তবান-বিত্তবান ব্যক্তিরাও। তারা নিজ নিজ উদ্যোগে বই কিনে স্থানীয় স্কুল-কলেজ লাইব্রেরিতে উপহার দিতে পারেন। মনে রাখা দরকার সরকার এবং সমাজের বৈভবশালীদের উদার পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া প্রকৃত প্রকাশকদের বেঁচে থাকা কঠিন কাজ।

আমরা দেখছি, প্রকাশনা শিল্পটি বাংলাদেশে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাওয়ায়, বাংলাদেশে এখন ফুলে ফেঁপে উঠছে কিছু মৌসুমিদের ‘প্রকাশনা বাণিজ্য’। লিটল ম্যাগের সম্পাদক থেকে শুরু করে মুদি দোকানদার অনেকেই প্রকাশক। বাংলাবাজার-শাহবাগ থেকে কাঁটাবনের কনকর্ড এম্পোরিয়ামে এখন প্রকাশকদের মেলা। টার্গেট কতোটা ‘শিকার’ পাওয়া যায়। এমন অনেক প্রকাশকদের আবার এজেন্ট আছে বিদেশেও। পাওয়া যায় কমিশন। পাণ্ডুলিপি আর পাউন্ড-ডলার-ইউরো-রিয়াল-দিনার জোগাড় করে দিতে পারলেই কমিশন! এসব প্রকাশকদের কারো কারো আবার ‘লেফাফা দুরস্থ’ আছে।

আসল কথা হচ্ছে, এই যে ‘প্রকাশনা বাণিজ্য’ ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে, তাতে বাংলা সাহিত্যের লাভ হচ্ছে কতোটুকু? আদৌ লাভ হচ্ছে কি? শিল্প-সাহিত্যের চর্চা আসে বিবেক থেকে। বাংলা সাহিত্যের সমাজ ও মানসে এই বিবেকের পরিশুদ্ধ চর্চা চলছে বলে মনে হয় না। না হলে, ‘মোড়ক উন্মোচন’ এর নামে লাখ টাকার বাজেট কেউ রাখতে পারে? প্রকাশনা উৎসবের নামে কেউ মেজবান খাওয়ায়?
বিশ্বের বড় বড় লেখকরা কি তা করেছেন কখনো? মুদ্রাবিলাসের দাপট দেখানো ভালো। তবে তা হওয়া উচিত সৎ-মহৎ কাজের জন্য। কারো কাছে টাকা থাকলে তিনি একজন অসচ্ছল অথচ মেধাবী তরুণ কবির বই বের করে দিতে পারেন। তা না করে তিনি নিজেই কিভাবে লেখক হবেন- সে চিন্তায় অস্থির থাকছেন দিনরাত। হায় সমাজ! হায় লেখক বাণিজ্য প্রকল্প!
আমাদের লেখালেখির আরেক মাধ্যম এখন ফেসবুক। স্ট্যাটাসগুলোই হয়ে উঠছে ‘কাব্যমালা’। নির্মলেন্দু গুণ ‘মুঠোফোনে’ কবিতা লিখে নাম দিয়েছিলেন মুঠোফোনের কাব্য। হ্যাঁ, স্ট্যাটাসগুচ্ছও কাব্য হতে পারে। কিন্তু এর মাঝে তো মাল-মশল্লা থাকতে হবে। আমরা জানি কম লিখেও কবি হওয়া যায়। হেলাল হাফিজকে কে-না জানে। তার ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থ ৩০টি মুদ্রণ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। কবি শহীদ কাদরীর কাব্যগ্রন্থ সংখ্যা মাত্র পাঁচটি।

বাংলাদেশে প্রকাশনা শিল্পে যে মাশরুম কাল চলছে এর প্রতিকার দরকার। আমি জানি না ‘সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা’ নামের সংগঠনটি আদৌ কোনো কিছু করে, করতে পারে কিংবা পারবে কি না! টাকা দিয়ে বই করার চেয়ে অ-লেখক হয়ে থাকাই শ্রেয়। এমন একটা স্লোগানের জন্য অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ। মফস্বল থেকে জমি বিক্রি করে টাকা এনে ঢাকায় প্রকাশকের হাতে তুলে দিচ্ছে যে তরুণ কবি, তার বোধোদয় দরকার। এটা চলতে পারে না। বই প্রকাশের যোগ্য হলে তা প্রকাশ কারা করবে, কারা করতে পারবে- বাংলাদেশ এমন প্রকাশকের অপেক্ষায়। সেদিন আসবে কি? না-কি এই ‘প্রকাশক বেপারী’রা শুধু ফুলে ফেঁপেই উঠবে একুশের বইমেলাকে পুঁজি করে? এই প্রশ্নটি করা দরকার সবাইকে।

আমি সবসময় বলি- বই পড়ুন,নিজে শাণোত হোন। সমাজকে শাণিত করুন। না- বিদেশে এখনও বইয়ের পাঠক কমে নি। এখনও ট্রেনে কামরায় প্রতি ১০ জনের একজনের হাতে বই-ম্যাগাজিন দেখা যায়। এই ধারা বাংলাদেশেও বাড়ুক। আলোকিত হোক আমাদের প্রজন্ম।
ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর