পৌরাণিক গল্পে বিশ্বাস, জানুন ‘মিথ’ ধারনার আদ্যোপান্ত

ঢাকা, সোমবার   ১৩ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৯ ১৪২৭,   ২১ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

পৌরাণিক গল্পে বিশ্বাস, জানুন ‘মিথ’ ধারনার আদ্যোপান্ত

নিয়াজ মাহমুদ সাকিব ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:১৫ ১২ জুন ২০১৯   আপডেট: ১৩:৪৫ ১২ নভেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনীগুলো একেকটা আদর্শের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত থাকা মিথগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য আর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মিথ তথা পৌরাণিক গল্পের প্রভাব সুস্পষ্ট। আর মিথ কখনো কোনো আদর্শ গড়ে তোলার সময়ে সত্যকে গোপনও করেনা আবার উন্মোচন করেও রাখেনা!  শুধুমাত্র সত্য আর বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত হতে চায় খানিকটা! 

আর পৌরাণিক কাহিনীর মূল কাজই হলো কোনো একটি ধারণাকে প্রাকৃতিকীকরণ করা। কোনো একটা বিশ্বাসের জন্ম দেয়া। একটি ঐতিহ্যগত গল্প যা কিনা সাধারণত অতিপ্রাকৃত কোনো কাল্পনিক চরিত্রকে জড়িয়ে গড়ে ওঠে কিংবা জনপ্রিয় প্রাকৃতিক অথবা সামাজিক কোন চাঞ্চল্যকর ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় মিথের। 

সেল্টিক পন্ডিতেরা আবার চারটি পৌরাণিক শিকড়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন। যে শিকড়গুলোর প্রত্যেকটা শাখা প্রশাখারই লাখ লাখ চরিত্র নির্মিত হয়েছিল সেল্টিক দেব–দেবীদের পূর্ব অভিজ্ঞতামূলক প্যান্থিওনগুলো থেকে। এর পেছনে প্রাচীন জেব্রাইক এবং ওয়েস্ট জারমানিক প্রাচীন অক্ষরগুলোরও বেশ অবদান আছে। উল্লেখ্য, ওই অক্ষরগুলোকে জাদুর অক্ষর বলা হতো। 

এ কথা স্বভাবত মোটামুটি সব পণ্ডিত ই স্বীকার করে নিয়েছিলেন, মিথ হচ্ছে এক ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম। এবং এই যোগাযোগের নেপথ্যের উদ্দেশ্যই হচ্ছে কোননোএকটা নির্দিষ্ট মতাদর্শ কিংবা নৈতিকতার বুদ্ধিদীপ্ত পরিস্ফুটণ। এই অর্থে মিথ শুধুমাত্র দেব-দেবী কিংবা মানব জাতির গোড়াপত্তন কীভাবে হয়েছিল সেসব কিছু বর্ণনার থেকেও অনেক বেশি কিছু। আধুনিক বই যেমন ‘দ্য লর্ড অফ দ্যা রিংস’ , তারপর আবার স্টার ওয়ারস, দ্য ব্যাট্ম্যানের মতো চলচ্চিত্রে আমরা মিথের দেখা পাই এখনো। 

আধুনিক শিল্প, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন, ম্যাগাজিনেও এখন হরহামেশাই দেখা যায় নানা রকমের মিথ আর এর নেপথ্যের উদ্দেশ্য।  প্রকৃতপক্ষে, কোনো একটি সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত যেকোনো কিছু,(হতে পারে, গল্প, চলচ্চিত্র, কোনো বস্তু কিংবা কোনো বিশেষ ব্যক্তি) হয়ে উঠতে পারে কোনো মিথ কিংবা পৌরাণিক কোনো কাহিনীর মূল উপজীব্য তথা হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা একেকটা চরিত্রের পেছনের চালিকাশক্তি।  

বারথেস বলেছিলেন, মিথ তথা পৌরাণিক কাহিনী হলো এক বিশেষ ধরনের বক্তৃতা, বিবৃতি ,মূলত তিনি বলতে চেয়েছেন, মিথ কোনো গল্পের শ্রেণী বিভাগ নয়, মিথ এক ধরনের বলার ধরন যার পেছনে থাকে কোনো এক অমোঘ উদ্দেশ্য। 

‘মিথোলজিস’ নামে প্রকাশিত রোল্যান্ড বারথেস এর ধারাবাহিক প্রবন্ধগুলোতে একটু নজর দিলেই বোঝা যাবে তখনকার মাত্র ৩৯ বছর বয়সী একজন সাহিত্যের অধ্যাপক কেন এই প্রবন্ধগুলো লেখার কাজে হাত দিলো! রহস্য উদ্ঘাটন হয়ে যায়, যখনি একটু গভীরে গিয়ে বারথেস এর জীবনী পর্যবেক্ষণ করা হয়! 

পৌরাণিক কিংবা অনুমিত কাহিনীর আদ্যোপান্তে নজর দেয়া এই অধ্যাপকের জীবনেও ছিল ঠিক ফরাসি তত্ত্বের বিশেষ প্রভাব। যে প্রভাব আদতে তখনকার সব আমেরিকান বুদ্ধিজীবীদের ওপরই বেশ ভালোভাবেই বিস্তার এবং বিরাজ করেছিল। জেফ্রে ইউজেনিডেস এর সাম্প্রতিক একটি উপন্যাস ‘দ্য ম্যারেইজ প্লটে লেখা আছে সংকেত বিজ্ঞানের এক অধ্যাপক সম্পর্কে একটি লাইন, যে লাইনটা ছিল অনেকটা এরকম, 

‘কোনো একটা ডিনার পার্টিতে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল রোল্যান্ড বারথেস এর। তিনি নিজ থেকেই পরিবর্তিত হয়ে গেলেন। আগের মানুষটি আর রইলেন না, ফিরে এলেন নতুন সব বিশ্বাস নিয়ে।’

এটা এমনই এক বাক্য যা একই সঙ্গে বর্ণনা করে তার উভয় দিক। ঠিক কতটা রহস্য ঘেরা মানুষ ছিলেন বারথেস এবং রহস্যময় কোন প্রক্রিয়াই বা তাকে মোহিত করতো! ওই সংকেতবিজ্ঞানের যেখানে কিনা ভাবার কথা ছিলো এই মোটা সসেজটা এখানে কি করছে, সেখানে সে নিজেই এখন নতুন সব ধ্যান-ধারণায় কট্টরপন্থী বিশ্বাস ধারণ করে ফিরে এসেছে। 

যেখানে খুঁজে পাওয়ার কথা ফরাসি তত্ত্বের বিশেষ প্রভাব, মুখোশ খুলতেই অন্যরকম একটা মানুষ! আর নেপথ্যের অবদান সেই বারথেস এর। স্বৈরতান্ত্রিক প্রতারণার মহান কৌশল মিথকেই কাজে লাগাচ্ছেন বারথেস, এই বিষয়টা বুঝতেও বুদ্ধিজীবীদের সময় লেগেছিল প্রায় দেড়শো বছরের বেশি। 

যে কেউ স্টেক ফ্রাইটের পুরাণে বা বার্সেস-পঞ্চাশের এলি ম্যাগাজিনের রেসিপিগুলোতে বার্থেস পড়তে পারে- কৃষকের থালা কোনো উপলক্ষ্য ছাড়া কখনো সমাজে গৃহীত নয়, যদি না শহরগুলো দেহাতি চটকদার না হয়ে ওঠে’ - অবিলম্বে বুঝে নিতে হবে, আমেরিকান প্রফেসর আসলে একটি ভোক্তা মানসিকতার দ্বিগুণ ব্যঞ্জনা নিয়ে সমাজে মিথের ধারণাকে সুস্পষ্ট করেছেন। যা আমাদের সংস্কৃতির, গ্যাস্ট্রোনোমিক, ধর্মীয় এবং বুদ্ধিজীবী অভিজ্ঞতাগুলোকে অস্পষ্টভাবে বিভ্রান্ত করে তোলে। 
 
ফ্রান্সের আটলান্টিক উপকূলে প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারে জন্ম নেয়া সমকামী এক লেখক। যে কি-না সবকিছুতে মানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টায় ন্যস্ত আছে। তার সঙ্গে ফরাসি রন্ধনশিল্পের প্রাদেশিক স্বাদ মিলিয়ে ফেলাটা উচিত হবেনা! 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস